অন্ধভাবে মাযহাব মানার ভয়াবহ পরিণাম

-ড. রেজাউল করীম মাদানী*

পিএইচডি, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব।

(পর্ব-৬)

১০ম উদাহরণ : সময় হওয়ার সাথে সাথে ইফতার না করা।

ছওম হচ্ছে ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের অন্যতম একটি স্তম্ভ। আর প্রত্যেকটি মুমিন-মুসলিমের উচিত, এ রুকন বা ইবাদতকে ছহীহ হাদীছ অনুযায়ী আদায় করা। ছহীহ হাদীছ ও হাদীছে কুদসী দ্বারা প্রমাণিত যে, ছিয়াম পালনকারী ব্যক্তি তার ছওম খুলবে বা ইফতার করবে সূর্য অস্ত যাওয়ার সাথে সাথে। হাদীছে এসেছে, সাহল ইবনে সা‘দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) বলেন,

أنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ : «لاَ يَزَالُ النَّاسُ بِخَيْرٍ مَا عَجَّلُوا الفِطْرَ»

‘মানুষেরা ততক্ষণ পর্যন্ত কল্যাণের মধ্যে থাকবে, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তাড়াতাড়ি (সময় হাওয়ার সাথে সাথে) ইফতার করবে’।[1] অপর এক হাদীছে কুদসীতে এসেছে, আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

إِنَّ أَحَبَّ عِبَادِي إِلَيَّ أَعْجَلُهُمْ فِطْرًا.

‘আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয় বান্দা তারা, যারা সময় হওয়ার সাথে সাথে (তাড়াতাড়ি) ইফতার করে’।[2]

এছাড়াও আরো অনেক ছহীহ হাদীছ প্রমাণ করে যে, তাড়াতাড়ি অর্থাৎ সময় হওয়ার সাথে সাথে ইফতার করা আল্লাহর নিকট প্রিয় কাজ ও রাসূল (ছাঃ)-এর সুন্নাত। কিন্তু আমাদের মাযহাবপন্থী ভাইদেরকে যদি জিজ্ঞস করেন, এতসব ছহীহ হাদীছ বলছে তাড়াতাড়ি অর্থাৎ সময় হওয়ার সাথে সাথে ইফতার করতে এবং আজ বিজ্ঞানের এ উৎকর্ষতার যুগে যখন জানা যাচ্ছে কখন সূর্য অস্ত যাচ্ছে, তারপরও কেন আপনারা দেরী করে ইফতার করেন? উত্তরে বলেন, আমাদের মাযহাবে আছে দেরী করে ইফতার করতে হবে। তাছাড়াও আমাদের সমাজের হানাফী ইমাম ছাহেবগণ ও ওলামায়ে কেরাম দেরী করে ইফতার করার ফৎওয়া দেন, তাই আমরা দেরী করে ইফতার করি।

তাহলে আপনারা দেখলেন, এই হচ্ছে অন্ধভাবে মাযহাব মানার পরিণাম, অর্থাৎ কুরআন হাদীছ বলেছে এক কথা আর মাযহাব বলছে তার উল্টো বা বিপরীত কথা। যা আপনারা পূর্বে উল্লেখিত মাত্র কয়েকটি উদাহরণে দেখলেন। আর মাযহাব মানতে গিয়ে যে অসংখ্য ছহীহ হাদীছের খেলাফ করা হচ্ছে, তা যদি উল্লেখ করা হয় তাহলে বড় এক ভলিয়ম হয়ে যাবে। তাই সকল মাসআলার প্রমাণ উল্লেখ না করে, মাত্র দশটি উদাহরণ উল্লেখ করলাম। পরিশেষে আহবান জানাবো, আসুন! মাযহাবী গোঁড়ামী ছেড়ে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল ও ছাহাবায়ে কেরামের পথের অনুসরণ করি। এ পথেই মুক্তি, এ পথেই সাফল্য, এ পথেই নাজাত ও জান্নাত।

৪. মাযহাব ও অন্ধ তাকলীদ মানুষকে মানুষের প্রতি ঘৃণা-বিদ্বেষ, হিংসা ও অভিশাপ করতে শেখায় :

ইসলাম হচ্ছে মানবতার ধর্ম, শান্তির ধর্ম, ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধের ধর্ম, যেখানে মারামারি, কাটাকাটি, হিংসা-বিদ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা, প্রতিহিংসার কোন স্থান নেই। কিন্তু অধিকাংশ মাযহাবপন্থীদের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় এ ইসলামী অনাবিল মধুর চরিত্রের উল্টো। আর এর একটাই মাত্র কারণ, সেটা হল অন্ধভাবে মাযহাব মানা। যখন কোন হানাফী মাযহাবপন্থী ভাই অপর কোন হানাফী ভাইকে দেখেন তার সঙ্গে যতটুকু আন্তরিক হন, অন্য মাযহাবপন্থী বা যারা নির্দিষ্ট কোন মাযহাব না মেনে কুরআন-হাদীছ মানে তার সঙ্গে ততটুকু আন্তরিক হন না। এমনই চরিত্র দেখবেন অধিকাংশ মাযহাবপন্থী ভাইদের মধ্যে। অথচ এ গোঁড়ামি বা আছাবিয়াতের ইসলামে কোন স্থান নেই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ تَفَرَّقُوا وَاخْتَلَفُوا مِن بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْبَيِّنَاتُ 

‘আর তোমরা সেই লোকদের মত হয়ো না, যারা তাদের কাছে সুস্পষ্ট সত্য নিদর্শন পৌঁছার পরেও দলে দলে বিভক্ত হয়েছে ও মত পার্থক্য করেছে’ (আলে ইমরান, ১০৫)। রাসূল (ছাঃ) বলেন,

لَيْسَ مِنَّا مَنْ دَعَا إِلَى عَصَبِيَّةٍ، وَلَيْسَ مِنَّا مَنْ قَاتَلَ عَلَى عَصَبِيَّةٍ، وَلَيْسَ مِنَّا مَنْ مَاتَ عَلَى عَصَبِيَّةٍ

‘ঐ ব্যক্তি আমাদের মুসলিম মিল্লাতের অনুসারী নয়, যে অন্যায়ভাবে গোত্রের দিকে অথবা যুলুমের দিকে ডাকে এবং যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে গোত্রীয় খাতিরে যুদ্ধ করে ও মারা যায়, সেও আমাদের মুসলিম মিল্লাতের অনুসারী নয়’।[3]

মাযহাবপন্থী বন্ধুরা শুধু এতটুকু করেই ক্ষ্যান্ত হন না, বরং তারা তাদের মাযহাবের বিপরীত হাদীছ বর্ণনাকারী ছাহাবীকে পর্যন্ত প্রত্যাখ্যান করেন। দ্বীনের ধারক ও বাহক ওলামায়ে কেরামকে গালি দেন, অভিশাপ দেন। নিচে আপনাদের সমীপে অনেক উদাহরণের মধ্য হতে মাত্র কয়েকটি উদাহরণ পেশ করা হল :

১ম উদাহরণ : আনাস ইবনে মালেক (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূল (ছাঃ)-এর যুগে একজন ইয়াহূদী একটা বালিকার কাছ থেকে তার সোনার গয়নাগুলো কেড়ে নিয়ে তাকে দুই পাথরের মধ্যে মাথা রেখে হত্যা করে। অতঃপর উক্ত বালিকাকে রাসূল (ছাঃ)-এর দরবারে হাযির করা হয় এবং উক্ত ইয়াহূদীকেও ঐভাবে হত্যা করা হয়।[4]

কিন্তু এই হাদীছ হানাফী মাযহাবের বিপরীতে হওয়ায় তাদের অন্যতম তথাকথিত মুহাদ্দেছ আবু গুদ্দাহ জাহেদ আল-কাওছারী প্রখ্যাত ছাহাবী আনাস ইবনে মালেক (রাঃ) সম্পর্কে বলেন, আবু হানীফা (রাহঃ)-এর জ্ঞান ও বিবেকের সামনে আনাস (রাঃ) কে? শুধু তাই না বরং গর্বভরে বলেন,

وأسماء الصحابة الذين رغب الإمام عما انفردوا به من الرواياة المذكورة في المؤمل. وليس هذا إلا ةحريا بالغا في المروياة. يدل على عقلية أبي حنيفة الجبارة.

‘ইমাম আবু হানাফী যে সকল ছাহাবীর একক বর্ণিত হাদীছ গ্রহণ করা থেকে বিরত থেকেছেন, তাদের নাম ‘মুআম্মাল’ নামক কিতাবে উল্লেখ আছে। ইমাম ছাহেবের ছাহাবীদের বর্ণনা প্রত্যাখান করা তার মহাজ্ঞান ও বিবেকের পরিচায়ক’।[5]

ইন্নালিল্লাহি! মাযহাব কত বড় ভয়ানক বিষয় যা নাকি ছাহাবীর কথা প্রত্যাখ্যান করে একজন অনুসরণীয় ইমামের কথা মানাকে শ্রেয় মনে করে।

২য় উদাহরণ : আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি নবী (ছাঃ) থেকে বর্ণনা করেন, নবী (ছাঃ) বলেন,

لاَ تُصَرُّوا الإِبِلَ وَالغَنَمَ، فَمَنِ ابْتَاعَهَا بَعْدُ فَإِنَّهُ بِخَيْرِ النَّظَرَيْنِ بَعْدَ أَنْ يَحْتَلِبَهَا : إِنْ شَاءَ أَمْسَكَ، وَإِنْ شَاءَ رَدَّهَا وَصَاعَ تَمْرٍ

‘তোমরা গাভী বা বকরীর বাটে/ওলানে দুধ জমা করে তারপর বিক্রি কর না, যদি কেউ এমন গাভী বা বকরী কেনে এবং দুধ দোহন করে, তাহলে তার জন্য দু’টি উপায়- একটা হচ্ছে, যদি সে চায় রাখতে পারে, তা না হলে ফেরত দেবে। কিন্তু ফেরত দেওয়ার সময় গাভী বা বকরীর সাথে এক ছা‘ পরিমাণ খেজুর দিতে হবে’।[6]

উল্লেখিত হাদীছটি আলেমগণ গ্রহণ করেছেন। কিন্তু হানাফী মাযহাবপন্থীরা এ হাদীছ ছহীহ হওয়া সত্ত্বেও গ্রহণ করতে পারেনি। কারণ তাদের ইমামের মাযহাবের বিপরীত এটি। মাযহাবপন্থী ভাইয়েরা আবু হুরায়রা (রাঃ)-এর এ হাদীছটিকে শুধু প্রত্যাখ্যান করেই ক্ষ্যান্ত হয়নি; বরং তার ব্যাপারে অপবাদ দিয়ে বলেছে, আবু হুরায়রা (রাঃ)-এর হাদীছ গ্রহণ করা যাবে না; কারণ তিনি ফক্বীহ নন।[7]

৩য় উদাহরণ : মহামতি অনুসরণীয় ইমামগণের ব্যাপারে হানাফী মাযহাবপন্থীদের বড় বড় আলেমগণের কটুক্তি ও মানহানিকর কথাবার্তা :

ইমামু দারিল হিজরা তথা মদীনার ইমাম, ইমাম মালেক (রাহঃ) সম্বন্ধে উস্তাদ কাওছারী বলেন, ‘ইমাম মালেক মাওয়ালিদের অন্তর্ভুক্ত’।[8]

মাওয়ালি শব্দের অনেক অর্থ আছে, তন্মধ্যে প্রসিদ্ধ হচ্ছে, কোন গোত্রের সাথে চুক্তিবদ্ধ হওয়া, তাদের সুখে-দুঃখে তাদের সাথে থাকা, চাকর, নোকর ইত্যাদি। শায়খ কাওছারী তার কথা দ্বারা ইমাম মালেক (রাহঃ)-কে চাকর, নোকর বংশের বলতে চেয়েছেন। অথচ এখানে মাওয়ালি শব্দের অর্থ কোন গোত্রের সাথে চুক্তিবদ্ধ হওয়া ।

উক্ত কিতাবের অপর এক জায়গায় ইমাম মালেক (রাহঃ)-এর ব্যাপারে বলেন,وأما مالك سكن المدينة في وقت لا فضل لسكناها. ‘মালেক এমন সময় মদীনায় ছিলেন, যখন মদীনায় থাকার কোন ফযীলত নেই’।[9] অথচ ঐ সকল গোঁড়া মুকাল্লিদের কি রাসূল (ছাঃ)-এর নিম্নোক্ত হাদীছগুলো জানা নেই। না গোঁড়ামি ও অন্ধ তাকলীদের অন্ধকারে তারা দেখতে পান না। রাসূল (ছাঃ) মদীনাবাসীদের জন্য দু‘আ করে গেছেন, মদীনায় মৃত্যুবরণ করলে তার জন্য সুপারিশের কথা বলেছেন। সর্বোপরি মদীনাতে দাজ্জাল ঢুকতে পারবে না। আল্লাহ যে জায়গা তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর হিজরতের জন্য চয়ন করলেন, সেখানকার মসজিদে নববীতে ছালাত পড়ার ফযীলতেও তিনি ধন্য, তার পরেও কি বলবেন মদীনায় থাকার কোন ফযীলত নেই?

 

(চলবে)

[1]. বুখারী, হা/১৯৫৭, ‘ইফতারি তাড়াতাড়ি করা’ অধ্যায়; মুসলিম, হা/২৬০৮, ‘ইফতারি তাড়াতাড়ি ও সাহরী দেরী করে করা’ অধ্যায়; মুসনাদে আহমদ, ৫/৩৩১।

[2]. মুসনাদে আহমাদ, ২/৩২৯; তিরমিযী, হা/৭০০, ‘ছওম’ অধ্যায়।

[3]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৮৫০।

[4]. ছহীহ বুখারী, ‘ক্বিছাছ’ অধ্যায়, হা/৫২৯৫; ছহীহ মুসলিম, ‘ক্বিছাছ’ অধ্যায়, হা/৪৪৫৪।

[5]. কাওছারী, আত-তারহীব, পৃঃ ২৪; আত-তা’নীব, পৃঃ ১৩৯; মু‘আলিস্নমী, আত-তানকীল, ১/১৩-১৪।

[6]. ছহীহ বুখারী, ‘কেনাবেচা’ অধ্যায়, হা/২১৪৮-২১৪৯; ছহীহ মুসলিম, ‘কেনাবেচা; অধ্যায়।

[7]. ইবনে হাজার, ফাতহুল বারী, ৪/৪৫৯-৪৬২; সুবকী, আর-রাসাইল আল-মুনীরা, ৩/১১৪।

[8]. আত-তা’নীব, পৃঃ ১০০; তানকীল, ১/৩৮২।

[9]. প্রাগুক্ত।

2 মন্তব্য