اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ وَحْدَهُ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلٰى مَنْ لَّا نَبِيَّ بَعْدَهُ

অবশ্যই ‘অশ্লীল নজর অসভ্যতা’


কথাটা লেখা ছিল পোশাকে অবাধ স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থানরত একজন মেয়ের হাতে। ঘটনার সূত্রপাত ১৮ মে ২০২২ ভোরে নরসিংদী রেলস্টেশনে। ঐদিন ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নারী শিক্ষার্থী অশালীন পোশাকে স্টেশনে আসে। সাথে ছিল দুই যুবক। মার্জিয়া আক্তার ওরফে শিলা নামের এক ভদ্র মহিলা মেয়েটির এমন পোশাক অপছন্দ করেন। ফলে তাদের মাঝে কথা কাটাকাটি হয়। লোকজন জড়ো হয় এবং কথা কাটাকাটি হাতাহাতিতে রূপ নেয়। এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক সমালোচনা হলে নরসিংদী রেলওয়ে পুলিশ ভৈরব রেলওয়ে থানায় মামলা করে। তরুণীকে হেনস্তা ও মারধরের অভিযোগে অভিযুক্ত শিলাকে পুলিশ ৩০ মে গ্রেপ্তার করে। জামিন শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের উদ্দেশ্যে উচ্চ আদালত প্রশ্ন রাখেন, ‘সভ্য দেশে এমন পোশাক পরে রেলস্টেশনে যাওয়া যায় কিনা?’ আদালত আরো বলেন, ‘(ঐ তরুণী) প্ল্যাটফর্মে আপত্তিকর অবস্থায় ছিল, সিডিতে দেখা যায়। এটি আপনার অধিকার? পোশাকের অধিকার?’ আদালত মার্জিয়া আক্তারকে ৬ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেন।
জামিন শুনানিতে উচ্চ আদালতের এ বক্তব্যকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী মানববন্ধন করে স্বাগত জানান এবং উচ্চ আদালতকে অভিবাদন জানান। পরে এর বিপক্ষেও মাঠে নামেন দেশের তথাকথিত কয়েকটি নারী অধিকার ও মানবাধিকার সংগঠন। তারা বলেন, ‘আদালতের ওই বক্তব্য সাংবিধানিক অধিকার, নারীর সমানাধিকার, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবাধিকারের নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক’। যেসব স্লোগান লিখে তাঁরা প্রতিবাদ জানান, সেগুলোর মধ্যে একটি ছিল—‘অশ্লীল নজর অসভ্যতা’।
আমরা বলতে চাই, জী, অবশ্যই ‘অশ্লীল নজর অসভ্যতা’ এবং ইসলামের দৃষ্টিতে গর্হিত কাজ। কিন্তু অশালীন পোশাক পরা তার চেয়ে কম অসভ্যতা নয়। ইসলামে নারীকে শালীন পোশাক পরতে বলা হয়েছে এবং অশালীন পোশাক পরিহিতার জন্য সরাসরি জাহান্নামের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে (মুসলিম, হা/২১২৮)। পূর্ণ পর্দা করেই কেবল প্রয়োজনে বাইরে বের হওয়ার অনুমতি দিয়েছে। যেনা-ইভটিজিং ইত্যাদি ঘটতে পারে এমন সকল সম্ভাব্য পথ ইসলাম বন্ধ করেছে। যেমন—আপাদমস্তক ঢেকে পূর্ণ পর্দাসহ বাইরে যাওয়া (আল-আহযাব, ৩৩/৫৯), দৃষ্টি নিম্নমুখী রাখা (আন-নূর, ২৪/৩০), নিজের সৌন্দর্য প্রকাশের মানসে সজোরে পদচারণা না করা (আন-নূর, ২৪/৩১), মাহরাম পুরুষ ছাড়া অন্য কোনো পুরুষের সাথে নির্জনে একত্রিত না হওয়া (আহমাদ, হা/১১৪), মাহরাম পুরুষ ছাড়া সফর না করা (বুখারী, হা/৩০০৬), কোনো পরপুরুষের সাথে গদগদ কণ্ঠে কথা না বলা (আল-আহযাব, ৩৩/৩২), সুগন্ধি মেখে ঘর থেকে বের না হওয়া (তিরমিযী, হা/২৭৮৬) ইত্যাদি। এমনকি হাদীছে এসেছে, ‘চক্ষুদ্বয়ের যেনা হচ্ছে দর্শন। কর্ণদ্বয়ের যেনা হচ্ছে শ্রবণ, জিহ্বার যেনা হচ্ছে কথন, হাতের যেনা হচ্ছে ধারণ এবং পায়ের যেনা হচ্ছে গমন’ (মুসলিম, হা/২৬৫৭)।
যেনা সংঘটিত হয়ে গেলে সেখানেও ইসলাম কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে। অবিবাহিতা হলে ১০০ বেত্রাঘাত ও এক বছরের নির্বাসন (মুসলিম, হা/১৬৯০) এবং বিবাহিতা হলে রজমের মাধ্যমে হত্যা করার মতো উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা ইসলামে রয়েছে (বুখারী, হা/২৪৬২)।
অতএব, ইসলামে প্রতিষেধকও আছে, চিকিৎসাও আছে। আর ইসলামের এ দু’ধরনের ব্যবস্থা অত্যন্ত যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক। কেনই-বা তেমন হবে না, এ যে প্রজ্ঞাময় মহান সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে তারই সৃষ্টির জন্য চির কল্যাণকর বিধান। মহান আল্লাহ পুরুষ ও নারীকে পরস্পরের চোখে আকর্ষণীয় করে সৃষ্টি করেছেন। সেজন্য নারী পর্দাহীন হলেই সেই আকর্ষণ কাজ করে। সাথে শয়তান ও কৃপ্রবৃত্তি যুক্ত হয়ে অবক্ষয়ে নিয়ে যায়। রাসূল a যথার্থই বলেছেন, ‘নারী গোপনীয় সত্তা, তারা বেপর্দা হয়ে লোকালয়ে বের হলে শয়তান তাদের দিকে উঁকি মেরে তাকায়’ (দ্র. তিরমিযী, হা/১১৭৩)। সুতরাং উভয়ের সমন্বয় ও বাস্তবায়ন ছাড়া নারীর ইযযত-আব্রু রক্ষা করা কস্মিনকালেও সম্ভব নয়।
শুধু কুরআন-হাদীছ নয়; বরং তাওরাত-ইনজীলেও নারীদের পর্দা করতে বলা হয়েছে। মাথা ও মুখমণ্ডলসহ সারা শরীর ঢাকার কথা স্পষ্ট এসেছে। হিন্দুধর্মেও নারীদেরকে দেহ আবৃত করে রাখতে বলা হয়েছে। নারীদেরকে পুরুষদের পোশাক পরতে নিষেধ করা হয়েছে। দৃষ্টি নিচু রাখতে বলা হয়েছে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আমাদের দেশীয় সভ্যতা-সংস্কৃতি ও সামাজিক রীতি-নীতিতেও নারীদের শালীন পোশাক পরার অভ্যাস যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। গ্রামাঞ্চলের নারীদের মধ্যে সেই সভ্যতার ছিটেফোটা এখনও লক্ষ্য করা যায়। তাছাড়া মানুষের স্বভাবজাত ও সুস্থ বিবেক ও রুচিবোধের দাবিও হচ্ছে শালীন পোশাক করে নিজের ইযযত-আব্রুর হেফাযত করা। তদুপরি মানুষের সৃষ্টিগত স্বাভাবিক লজ্জা-শরমের দাবিও কিন্তু নগ্ন বা অর্ধনগ্ন না হওয়া।
তাহলে তোমরা যারা পোশাকের অবাধ স্বাধীনতার নামে রাস্তায় নেমেছো, তোমরা আসলে কোন্‌ ধর্মের? তোমরা কোন্‌ সভ্যতা, সংস্কৃতি ও রীতি-নীতি লালন কর? তোমাদের আসলে স্বভাবজাত ও সুস্থ বিবেক আছে কি? ন্যূনতম মানবিক লজ্জা-শরমটুকুও কি তোমরা হারিয়ে ফেলেছো? তোমাদের এসব স্লোগান কীসের ইঙ্গিত বহন করে?- ‘শান্তিপূর্ণ দাসত্বের উপরে প্রশ্নবিদ্ধ স্বাধীনতা বেছে নিলাম’, ‘কয়দিন পর যদি নাম শুনেই সিডিউসড হয়ে যান’, ‘সিডিউসড হোন বা না হোন হামলে পড়বেন না’, ‘চোখ সরা’, ‘অশ্লীল লাগে’, ‘মাই বডি, মাই চয়েস’, ‘আমি স্বাধীন’, ‘শরীর আমার, পোশাকের স্বাধীনতা আমার, আপনি বলার কে?’
মনে রাখতে হবে, বর্তমান সময়ে স্বাধীনতা, সমাধিকার ও ফ্যাশনের নামে অশালীন পোশাক ও অবাধ চলাফেরার কারণে সমাজে যেনা-ব্যভিচার, ইভটিজিং, অবৈধ সম্পর্কসহ নানা বিপর্যয় নেমে আসছে, যার ভূরিভূরি নমুনা প্রতিনিয়ত ভাইরাল হচ্ছে।
পরিশেষে, আমরা উচ্চ আদালতকে ধন্যবাদ জানাই। আমরা বিশ্বাস করি, সকলের এধরনের সচেতনতামূলক অবস্থান অবক্ষয় রোধ করতে পারে। আমরা বলতে চাই, কতিপয় অর্বাচীন তরুণ-তরুণীর দাবির কাছে আত্মসমর্পণ করলে উল্টো তাদেরই ক্ষতি হবে। ফলে আগে দরকার প্রতিষেধক। নৌকার ফুটো বন্ধ না করে পানি সেচে আদৌ আশানুরূপ সুফল পাওয়া যাবে না। আল্লাহ আমাদেরকে বুঝার তাওফীক্ব দান করুন। আমীন!