অমনোযোগী পুত্রের প্রতি পিতার উপদেশ

মূল : আবুল ফারজ ইবনুল জাওযী p
-অনুবাদ : আব্দুল কাদের বিন রইসুদ্দীন*


ভূমিকা :

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার জন্য। যিনি আদি পিতা আদম e-কে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন। আর সন্তানদের সৃষ্টি করেছেন পাজর ও মেরুদণ্ডের হাড় থেকে। আত্মীয়তা ও বংশের মাধ্যমে গোত্রকে শক্তিশালী করেছেন। জ্ঞান ও সঠিক বুঝের মাধ্যমে তিনি আমার উপর অনুগ্রহ করেছেন। শৈশবে আমার সুন্দর লালনপালনের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। যৌবনে আমাকে রক্ষা করেছেন। আমাকে সন্তান দান করেছেন, যাদের মাধ্যমে আমি পূর্ণ ছওয়াবের আশা রাখি। ‘হে আমার প্রতিপালক! আপনি আমাকে এবং আমার বংশধরকে ছালাত প্রতিষ্ঠাকারী বানান। হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি আমার দু‘আ কবুল করে নিন। হে আমার প্রতিপালক! যেদিন হিসাব হবে সেদিন আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং মুমিনদেরকে ক্ষমা করুন’ (ইবরাহীম, ১৪/৪০-৪১)

এরপর যখন আমি বিবাহ ও সন্তানাদির গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারলাম, তখন আমি এক খতম কুরআন পড়ে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করলাম যে, তিনি যেন আমাকে ১০টি সন্তান দান করেন। আমার দু‘আ তিনি কবুল করে আমাকে ১০টি সন্তান দান করলেন। পাঁচটি পুত্র ও পাঁচটি কন্যা সন্তান। তাদের মধ্যে দুই কন্যা ও চার পুত্রকে আল্লাহ নিজের কাছে নিয়ে গেলেন। পুত্রদের মধ্যে রইল কেবল আবুল কাসেম। আল্লাহর কাছে আমি কাকুতিমিনতি করে চাইলাম যে, তিনি যেন আমার এই সন্তানকে সৎ উত্তরসূরী হিসাবে কবুল করেন এবং তার মাধ্যমে আমার মনবাঞ্ছনা পূরণ করেন।

কিছুদিন পর আমি তার পড়াশুনায় কিছুটা অলসতা অনুভব করলাম। তাই এই পত্রখানা লিখে জ্ঞানার্জনের প্রতি তার উৎসাহ-উদ্দীপনা বাড়াতে চেয়েছি এবং জ্ঞানার্জনে আমার পথ ও পদ্ধতি অবলম্বনের জন্য অনুপ্রেরণা দিয়েছি। সর্বোপরি তাকে আমি তাওফীক্বদাতা আল্লাহ তাআলার দরবারে আশ্রয় গ্রহণের নির্দেশনা দিয়েছি। কারণ আমি জানি, যাকে তিনি তাওফীক্ব দিবেন তাকে নিরাশ করার কেউ নেই। আর যাকে পথভ্রষ্ট করবেন, তাকে সুপথ দেখানোর কেউ নেই। কিন্তু আল্লাহ তাআলা একথাও বলেছেন, ﴿وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ﴾ ‘আর তারা পরস্পরকে হক্ব ও ধৈর্যের ব্যাপারে উপদেশ দেয়’ (আল-আছর, ১০৩/৩)। তিনি আরো বলেন, ﴿فَذَكِّرْ إِنْ نَفَعَتِ الذِّكْرَى﴾ ‘(হে নবী!) আপনি মানুষকে উপদেশ দিন, যদি উপদেশ মানুষের উপকারে আসে’ (আল-আ‘লা, ৮৭/৯)। সুউচ্চ সুমহান আল্লাহর হুকুম ছাড়া পাপ কাজ থেকে বাঁচার এবং আনুগত্য করার ক্ষমতা কারোই নেই।

উপদেশ-১ : এই উপকারী অছিয়তের আগে কিছু উৎসাহ ও নিরুৎসাহমূলক বক্তব্য

প্রিয় বৎস! আল্লাহ তোমাকে সঠিক বুঝ দান করুন! জেনে রাখো, শুধু জ্ঞান থাকলেই মানুষ শ্রেষ্ঠ হয়ে যায় না; জ্ঞানের দাবি অনুসারে কাজ করতে হয়। অতএব, তুমি বিবেককে হাযির করো, চিন্তাকে কাজে লাগাও, নির্জনতা অবলম্বন করো, প্রমাণসহকারে অনুধাবন করার চেষ্টা করো যে, তুমি দায়িত্বপ্রাপ্ত সৃষ্টি। তোমার কিছু দায়িত্ব-কর্তব্য রয়েছে, যা পালনের জন্য তোমাকে তলব করা হয়েছে। দুই জন ফেরেশতা তোমার প্রতিটি কথা ও দৃষ্টির হিসাব রাখছেন। প্রতিটি জীবনের শ্বাস-প্রশ্বাস চূড়ান্ত পরিণতি মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। দুনিয়ায় বসবাসের সময় অতি সামান্য। কবরে আবদ্ধ থাকার সময়টা অনেক দীর্ঘ। প্রবৃত্তি অনুসারে চলার শাস্তিও ভয়াবহ।

কোথায় গেল গতকালকের সুখস্বাচ্ছন্দ্য ও ভোগবিলাসিতা? সে চলে গেছে, কিন্তু রেখে গেছে শুধু এক গুচ্ছ অনুতাপ! কোথায় গেল মনের প্রবৃত্তি? কত মানুষের মাথা সে নিচু করে দিয়েছে! আর কত মানুষের পদস্খলন ঘটিয়েছে! মনের বিরুদ্ধে না চলে কেউ সৌভাগ্যবান হয় না। আবার দুনিয়াকে প্রাধান্য না দিলে কেউ হতভাগাও হয় না। অতএব, হে বৎস! তুমি শিক্ষা নাও সেই সকল রাজা-বাদশা ও সাধক থেকে, যারা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে। কোথায় গেল তাদের বিলাসবহুল জীবন? কোথায় গেল সূফী-সাধকের সে কষ্ট-সাধনা?

ভালো মানুষের জন্য রয়ে গেল স্মরণীয় অবদান ও পূর্ণ প্রতিদান। পক্ষান্তরে নাফরমানের জন্য রয়ে গেল মন্দ কথন ও ভয়াবহ পরিণাম। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ‘যে ছিল ক্ষুধার্ত সে আর ক্ষুধার্ত হবে না। আর যে ছিল পরিতৃপ্ত সে কখনও পরিতৃপ্ত হবে না’। ভালো কাজে অলসতা করা কতইনা খারাপ সঙ্গী! যে আরামপ্রিয়তা মানুষের লাঞ্ছনা টেনে আনে, যা তাকে সব ধরনের ভোগ-বিলাস ও আরাম-আয়েশের জিন্দেগীতে অভ্যস্ত করে তোলে। সুতরাং বৎস! এই বিষয়ে তুমি সতর্ক থাকবে। নিজের কল্যাণের জন্য পরিশ্রম করবে।

জেনে রাখো, ফরয বিধানসমূহ পালন করা এবং নিষিদ্ধ বিষয়গুলো থেকে বিরত থাকা একান্ত জরুরী। তাই মানুষ যখন সীমালঙ্ঘন করে, তখন তার জন্য থাকে আগুন! শুধুই আগুন!

এটাও তুমি ভালো করে জেনে নাও, মর্যাদাপূর্ণ বিষয়ের সন্ধান করাই ছিল পরিশ্রমী সাধকদের চূড়ান্ত লক্ষ্য। অবশ্য মর্যাদাপূর্ণ বিষয়ের স্তরে তারতম্য আছে। কেউ মনে করেন ‘দুনিয়াবিমুখতা’ই হলো মর্যাদাপূর্ণ কাজ। আবার কেউ মনে করেন, ইবাদতে মশগূল থাকাই গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতপক্ষে ইলম ও আমলের সমন্বয় ব্যতিরেকে মর্যাদা কখনও পূর্ণতা লাভ করতে পারে না। এই দুটি গুণ কারো মধ্যে একত্রিত হলে সে ব্যক্তি মহান স্রষ্টাকে যথার্থরূপে চেনার পর্যায়ে পৌঁছে দেয় এবং আল্লাহর ভয়-ভালোবাসা ও তাকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার প্রতি তাকে আন্দোলিত করে। আর এটাই হলো কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য। আর দৃঢ় সংকল্প গ্রহণকারীর সামর্থ্যানুযায়ী সংকল্পের দৃঢ়তা আসে। তবে সকল আশাপোষণকারী লক্ষ্যে পৌঁছায় না তেমনি প্রত্যেক সন্ধানকারী সন্ধান লাভে সমর্থ হয় না। (তাই হাল ছেড়ে দেওয়া যাবে না) বরং মানুষকে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। কারণ হাদীছে এসেছে, ‘যাকে যার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, তার জন্য সেটা সহজ করে দেওয়া হয়’।[1] আল্লাহই উত্তম সাহায্যকারী।

উপদেশ-২ : জরুরী কর্তব্য ও দৃঢ় প্রত্যয়

সর্বপ্রথম যে বিষয়ে দৃষ্টিপাত করা উচিত তা হলো, দলীলসহকারে আল্লাহর পরিচয় জানা। এ কথা সুবিদিত যে, যখন কেউ মাথার উপরে আসমান দেখে, পায়ের নিচে জমিন দেখে, মযবূতভাবে নির্মিত স্থাপনা দেখে, বিশেষ করে নিজ দেহের সুনিপুন গঠনশৈলীর দিকে লক্ষ্য করে, তখন সে নিশ্চিতভাবে জানতে পারে যে, প্রত্যেকটি সৃষ্ট জিনিসের অবশ্যই একজন স্রষ্টা আছে।

অতঃপর যখন তার কাছে প্রেরিত রাসূল a-এর সত্যতার প্রমাণ নিয়ে চিন্তাভাবনা করে। আর কুরআনই হলো সবচেয়ে বড় প্রমাণ, সমগ্র সৃষ্টি যার অনুরূপ একটি সূরা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে। আর যখন তার কাছে মহা মহিয়ান স্রষ্টার অস্তিত্ব এবং রাসূল a-এর সত্যতা প্রমাণিত হবে, তখন তার লাগাম (নিজেকে) শরীআতের সামনে সোপর্দ করা আবশ্যক হয়ে যাবে। যদি এটা সে না করে, তাহলে বুঝতে হবে তার আক্বীদা-বিশ্বাসে গোলমাল রয়েছে।

অতঃপর ওযূ, ছালাত, (সম্পদ থাকলে) যাকাত ও হজ্জ ইত্যাদি ফরয বিধানের মাসআলাগুলো জানা তার জন্য অপরিহার্য। কারণ যখন সে ওয়াজিবের কদর সম্পর্কে জানবে, তখনই সে তা কাজে বাস্তবায়ন করতে সচেষ্ট হবে। সুতরাং দৃঢ় প্রত্যয়ী ব্যক্তির উচিত, মর্যাদাপূর্ণ আমলের দিকে ধাবিত হওয়া। অর্থাৎ কুরআন ও কুরআনের ব্যাখ্যা (তাফসীর) এবং রাসূল a-এর হাদীছ মুখস্থকরণে আত্মনিয়োগ করবে। সাথে সাথে রাসূল a, ছাহাবায়ে কেরাম ও পরবর্তী উলামায়ে কেরামের জীবনকর্ম সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করবে। যেন সে উচ্চ থেকে উচ্চতর স্তরে পৌঁছে যেতে পারে। পাশাপাশি ভাষা সুন্দর করার জন্য নাহু শাস্ত্র ও বহুল ব্যবহৃত বিষয়গুলো জানা জরুরী।

ফিক্বহ হলো জ্ঞানের মূল। আর উপদেশ জ্ঞানের মিষ্টতা ও ব্যাপক উপকার লাভের মাধ্যম। আল্লাহর অনুগ্রহে এই পুস্তিকায় আমি এমন সব বই থেকে তথ্য সাজিয়েছি, যা পূর্বে রচিত সকল বইয়ের বিপরীতে যথেষ্ট হবে। তোমার বিভিন্ন কিতাব খুঁজে বেড়ানো কিংবা কিতাব রচনার জন্য সাহস সঞ্চয় করার প্রয়োজন পূরণ করে দিয়েছি। মনে রেখো! হীনমন্যতায় না ভুগলে কখনও সাহসে ঘাটতি আসে না।

আমি প্রমাণসহকারে জানি যে, সাহস মানুষের সহজাত ধর্ম। কখনও হয়তো সাহস কমে আসে। উৎসাহ দেওয়া হলে তা আবার সচল হয়। যখন তোমার মনে হবে, তোমার মাঝে ব্যর্থতা ও অলসতা কাজ করছে, তখন তুমি তাওফীক্বদাতা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করো। কারণ তাঁর আনুগত্য ছাড়া কখনই তুমি কল্যাণ অর্জন করতে পারবে না। আর কল্যাণ কখনও তোমাকে বিদায় জানায় না তার নাফরমানী ছাড়া। কে এমন আছে যে আল্লাহর কাছে এসে কাঙ্ক্ষিত বস্তু পায়নি? এমন কে আছে যে আল্লাহবিমুখ হয়ে ফল পেয়েছে কিংবা কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য হাছিল করেছে? তুমি কবির কথা শোনোনি?

কসম আল্লাহর!

আমি তো আসিনি সকাশে তব-

বরং এসেছি জমিন মম কাছে গো।

ফের সরতে যখন চেয়েছি দূরে-

আটকা পড়েছি তখন মায়ার বন্ধনে।

উপদেশ-৩ : আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহ তোমাদের জ্ঞান দান করবেন

হে বৎস! শরীআতের সীমারেখার (হালাল-হারাম) সামনে তুমি নিজেকে কল্পনা করো, তাহলে বুঝতে পারবে তার ব্যাপারে কতটুকু যত্নশীল। কারণ, যে ব্যক্তি শরীআতের সীমারেখা মেনে চলবে, আল্লাহ তাকে রক্ষা করবেন। আর যে শৈথিল্য প্রদর্শন করবে, তাকে ঢিল দিয়ে দেওয়া হবে। আমি তোমার কাছে আমার কিছু জীবনবৃত্তান্ত বর্ণনা করব। হয়তোবা আমার পরিশ্রম দেখে তুমি তাওফীক্বদাতা মহান রবের কাছে আমার জন্য দু‘আ করবে। শুনে রাখো বৎস, আমার উপর থাকা প্রচুর অনুগ্রহ আমার অর্জিত সম্পদ নয়। বরং সেটা হলো আমার প্রতি দয়াময় আল্লাহর দান।

(ক) আমার নিজের কথা স্মরণ হয়, আমার অনেক উচ্চ আকাঙ্ক্ষা ছিল। তখন আমি মক্তবের ছয় বছরের বালক। কিন্তু আমি বড় ছেলেদের সাথে থাকতাম। ছোটবেলা থেকেই আল্লাহ আমাকে প্রচুর ধীশক্তি দান করেছিলেন। আমার মেধা আমার উস্তাযদের চেয়েও প্রখর ছিল। আমার মনে পড়ে না যে, কোনোদিন ছেলেদের সাথে রাস্তায় খেলেছি কিংবা অট্টহাসি হেসেছি।

(খ) এভাবে আমি যখন কাছাকাছি সাত বছরে বিদ্যাঙ্গনে গিয়েছি, তখন শাখায় শাখায় ভাগ হয়ে বসে থাকা হালাকাগুলো (গ্রুপ স্টাডি) আমার পছন্দ হতো না; বরং আমি হালাকার উস্তাযকে খুঁজতাম। তিনি জীবনচরিত সম্পর্কে বর্ণনা করতেন। যা কিছু শুনতাম, তাই মুখস্থ করে ফেলতাম। অতঃপর বাড়ি ফিরে গিয়ে সবগুলো লিখে রাখতাম। শায়খ আবুল ফযল ইবনু নাছির p-এর শিষ্যত্ব গ্রহণের সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। তিনি আমাকে শায়খদের কাছে নিয়ে যেতেন এবং মুসনাদে আহমাদ ও অন্যান্য বড় বড় হাদীছের কিতাবগুলো পড়ে শোনাতেন। আমি জানতাম না, কেন আমার সাথে এরকম করা হতো। পাশাপাশি তিনি আমার শোনা হাদীছগুলো সংশোধন করে দিতেন। এভাবে একসময় আমি প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে গেলাম। তখন তিনি আমাকে তার পাণ্ডুলিপিটি প্রদান করলেন। তার মৃত্যুঅবধি আমি তার ছাত্র ছিলাম। আমি তার পাণ্ডুলিপি থেকে হাদীছ ও হাদীছ বর্ণনা বিষয়ে বিষদ জ্ঞান লাভ করি।

(গ) আমার সমবয়সী বালকরা যখন দজলা নদীতে সাঁতার কাটত, নদীর পুলের উপর বসে আড্ডা দিত, তখন আমি ‘রাক্কা’[2]-তে কোনো একটি বই নিয়ে লোকদের থেকে দূরে নির্জনে বসে জ্ঞানার্জনে মগ্ন হতাম।

(ঘ) অতঃপর আমি দুনিয়াবিমুখতার প্রতি অনুপ্রাণিত হই। তখন আমি লাগাতার ছিয়াম পালন করি, অল্প খাবার গ্রহণে অভ্যস্ত হই, ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা নিজের জন্য আবশ্যক করে নিই। এভাবে জোরালো প্রস্তুতি নিয়ে ধারাবাহিকভাবে রাত্রি জাগরণের চেষ্টা করতে থাকি। জ্ঞানের একটি বিষয়ে আমি সন্তুষ্ট থাকতাম না; বরং ফিক্বহ, উপদেশ ও হাদীছ শ্রবণ করতাম। দুনিয়াবিমুখীদের অনুসরণ করতাম। ভাষা-সাহিত্য অধ্যয়ন করতাম।

(ঙ) হাদীছ বর্ণনা করেন কিংবা ওয়ায-নছীহত করেন এমন কোনো লোকের মজলিসে উপস্থিত হওয়া বাদ দেইনি। এমনকি দূরদেশ থেকে আগত অচেনা কোনো লোকের মজলিসও বাদ দেইনি। সবসময় মর্যাদাপূর্ণ বিষয়কেই অগ্রাধিকার দিতাম। আমার সামনে দুটি বিষয় উপস্থিত হলে অধিকাংশ সময় অধিকতর গুরুত্বর্পূণ বিষয়টিকেই প্রাধান্য দিতাম।

ফলে আল্লাহ আমার চেষ্টা-প্রচেষ্টা ও প্রতিপালন সুন্দরভাবেই করেছিলেন। আমার উপযুক্ত পথে আমাকে পরিচালিত করেছেন। হিংসুক, শত্রু ও ষড়যন্ত্রকারীদের আমার থেকে প্রতিহত করেছেন। জ্ঞানার্জনের সকল ব্যবস্থাপনা তিনি করে দিয়েছেন। মহান আল্লাহ আমার কাছে এমন সব জায়গা থেকে কিতাবাদি পাঠাতেন, যা আমি কল্পনাও করতাম না। তিনি আমাকে দান করেছেন বোধশক্তি, দ্রুত মুখস্থশক্তি, লেখনীশক্তি এবং সুন্দর রচনাশক্তি। দুনিয়ার কোনো কিছুর অভাব আমাকে দেননি। তিনি আমাকে পর্যাপ্ত পরিমাণ রিযিক্ব দিয়েছেন; বরং বেশি দিয়েছেন। মানুষের হৃদয়ে আমার সীমাহীন গ্রহণযোগ্যতা দান করেছেন এবং আমার কথাগুলো তাদের অন্তরে গেঁথে দিয়েছেন। আমার কথার বিশুদ্ধতার ব্যাপারে তারা কোনো সন্দেহ পোষণ করে না। আমার হাতে প্রায় ২০০ কাফের ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং আমার মজলিসে লক্ষাধিক মানুষ তওবা করেছে। আর আমি ২০ হাজারেরও অধিক মানুষের শৈশবের চুল কাটিয়েছি, মূর্খ লোকেরা যার কারণে মানুষকে কষ্টের মধ্যে রাখত।[3]

(চ) আমি হাদীছ শ্রবণের জন্য উলামা-মাশায়েখদের কাছে ঘুরঘুর করতাম। ফলে জীবিকার সন্ধানে ছুটে বেড়ানো হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলাম, যেন হাদীছ শ্রবণে কেউ আমাকে ছাড়িয়ে যেতে না পারে। আমি সকালে উঠতাম, তখনও আমার কাছে কোনো খাবার থাকত না। আবার সন্ধ্যা হতো তখনও আমার কাছে খাবার থাকত না। আল্লাহ কখনও আমাকে কারও সামনে বেইজ্জত করেননি; বরং আমার সম্মান রক্ষার্থে আমাকে রিযিক্বের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। যদি আমার জীবনবৃত্তান্ত বিস্তারিত বর্ণনা করতে যাই, তাহলে কথা আরও দীর্ঘ হবে।

(ছ) এখন আমি কেমন আছি তা তুমি স্বচক্ষে দেখতে পাচ্ছ। একটি বাক্যে তার বিবরণ তোমাকে শোনাচ্ছি। আর তা হচ্ছে মহান আল্লাহর বাণী— ‘আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহ তোমাদের জ্ঞান দান করবেন’ (আল-বাক্বারা, ২/২৮২)

উপদেশ-৪ : সময় সচেতনতা ও প্রতিটি মুহূর্তকে গনীমত মনে করা

বাবা! তুমি নিজের সম্পর্কে সতর্ক হও। বিগত শিথিলতার জন্য অনুতপ্ত হও। সময় ও সুযোগ থাকলে সফল ব্যক্তিদের সান্নিধ্য পেতে চেষ্টা করো। তোমার গাছে পানি সিঞ্চন করো যতক্ষণ তাতে প্রাণ থাকে।[4] অযথা নষ্ট হওয়া সময়গুলোর কথা চিন্তা করে দেখো— আলস্যের তৃপ্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে, মর্যাদার স্তরগুলোও হাতছাড়া হয়েছে। আর এটাই তোমার উপদেশের জন্য যথেষ্ট।

সালাফে ছালেহীন ফযীলতপূর্ণ আমলসমূহ সংগ্রহ করতে ভালোবাসতেন। কোনো একটি ছুটে গেলে ক্রন্দন করতেন। ইবরাহীম ইবনু আদহাম p বলেন, ‘আমরা একজন অসুস্থ ইবাদতগুজার ব্যক্তির কাছে আসলাম। তখন তিনি তার দুই পায়ের দিকে তাকিয়ে কাঁদছিলেন। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কাঁদছেন কেন? উত্তরে তিনি বললেন, আমার এই দুই পা আল্লাহর রাস্তায় ধুলায় ধূসরিত হয়নি, তাই কাঁদছি’।


* শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, পবা, রাজশাহী।

[1]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৯৪৯; ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৪৭।

[2]. বাগদাদের পশ্চিমাঞ্চলের একটি এলাকা।

[3]. সেই সময়ে লোকেরা তওবা করলে মাথায় থাকা শৈশবের চুল কামিয়ে ফেলত।

[4]. বেঁচে থাকা অবধি জ্ঞান অর্জন করো।