অহঙ্কার ও আল্লাহভীতি

-কাযী ফেরদৌস করীম (মুন্নি)
বি‘র আলী, হাই উম্মে খালেদ, মদীনা. সঊদী আরব।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘কারূন ছিল মূসার সম্প্রদায়ভুক্ত, কিন্তু সে তাদের প্রতি যুলুম করেছিল, আমি তাকে দান করেছিলাম ধনভাণ্ডার, যার চাবিগুলো বহন করা একদল বলবান লোকের পক্ষেও কষ্টসাধ্য ছিল। স্মরণ করো! তার সম্প্রদায় তাকে বলেছিল, দম্ভ করো না। নিশ্চয় আল্লাহ দাম্ভিকদের পসন্দ করেন না। আল্লাহ যা তোমাকে দিয়েছেন, তা দ্বারা পরলোকের কল্যাণ অনুসন্ধান করো এবং ইহলোকে তোমার বৈধ সম্ভোগ তুমি উপেক্ষা করো না। তুমি সদাশয় হও, যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি সদাশয় এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চেয়ো না। আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের ভালোবাসেন না। সে বলল, এ সম্পদ আমি আমার জ্ঞানবলে প্রাপ্ত হয়েছি। সে কি জানত না, আল্লাহ তার পূর্বে ধ্বংস করেছেন বহু মানবগোষ্ঠীকে, যারা তার চাইতে শক্তিতে ছিল প্রবল, সম্পদে ছিল প্রাচুর্যশালী? অপরাধীদের তাদের অপরাধ সম্পর্কে (তা জানার জন্য) প্রশ্ন করা হবে না। কারূন তার সম্প্রদায়ের সম্মুখে উপস্থিত হয়েছিল জাঁকজমক সহকারে। যারা পার্থিব জীবন কামনা করত, তারা বলল, আহা! কারূনকে যা দেওয়া হয়েছে, আমাদের যদি তা দেওয়া হত! প্রকৃতই সে ভাগ্যবান। যাদের জ্ঞান দেওয়া হয়েছিল, তারা বলল, ধিক তোমাদের! যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তাদের জন্য  আল্লাহর  পুরস্কারই শ্রেষ্ঠ এবং ধৈর্যশীল ছাড়া তা কেউ পাবে না। এরপর আমি কারূনকে ও তার প্রাসাদকে ভূ-গর্ভে তলিয়ে দিলাম। তার স্বপক্ষে এমন কোনো দল ছিল না, যে আল্লাহর শাস্তির বিরুদ্ধে তাকে সাহায্য করতে পারত এবং সে নিজেও আত্মরক্ষায় সক্ষম ছিল না’ (আল-ক্বাছাছ, ৭৬-৮১)।

আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘যার অন্তরে এক বিন্দু পরিমাণ অহঙ্কার আছে, সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না’। জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর  রাসূল (ছাঃ)! সকলেই তো এটা পসন্দ করে যে, তার পোশাক ভালো হোক, জুতাজোড়া ভালো হোক, এসব কি অহঙ্কারের মধ্যে শামিল? তিনি (ছাঃ) বললেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা নিজেও সুন্দর, তিনি সৌন্দর্যকে পসন্দও করেন। আর অহঙ্কার হলো হক্বকে বাতিল করা এবং মানুষকে হেয় প্রতিপন্ন করা’।[1]

মহান আল্লাহ বলেন, ‘অবজ্ঞাভরে তুমি লোকদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে কথা বলো না এবং পৃথিবীতে দম্ভভরে বিচরণ করো না। আল্লাহ কোনো অহঙ্কারী দাম্ভিককে পসন্দ করেন না (লোকমান, ১৮)।

মহান আল্লাহ আমাদেরকে সত্য গ্রহণ করার ব্যাপারে অহঙ্কার ত্যাগ করে আল্লাহর  হুকুমকে পরিপূর্ণরূপে মেনে নিয়ে যা কিছু ফিতনা, অন্যায়, শিরক-বিদ‘আত সমাজের সর্বদিকে ছড়িয়ে পড়েছে, তার সংশোধনে যত্নশীল হয়ে আমাদের ঈমানী দায়িত্ব পালনের তাওফীক্ব দান করুন। আমাদের অন্তরের যাবতীয় পার্থিব লোভ-লালসা, বাসনা, নাম-যশের মোহকে পরিত্যাগ করে আভ্যন্তরীণ পবিত্রতা ও বিশুদ্ধতা অর্জনের মাধ্যমে আল্লাহভীতি দ্বারা, অন্যের শরী‘আত অনুমোদিত ভালো কাজকে আন্তরিকতার সাথে মূল্যায়ন করতে পারাটাই আল্লাহভীতির অনিবার্য ফল।

কিন্তু এই আল্লাহভীতি না থাকার ফলে আমরা দেখতে পাচ্ছি, প্রকাশ্যভাবেই সমাজের কিছু নামধারী আলেম শরী‘আতের নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে যথেচ্ছভাবে সেসব লোকের বিরুদ্ধাচরণ করছে, যারা আল্লাহভীতি দ্বারা সঠিকতর পন্থায় সত্যপথের দিকে মানুষকে আহ্বান করছে এবং বিশুদ্ধ দ্বীনকে গ্রহণের দাওয়াতের মাধ্যমে শিক্ষা দিচ্ছে কীভাবে সন্দেহপূর্ণ শিরক-বিদ‘আত, কুফরকে চিনবে এবং এইসব শরী‘আত বিরোধী সন্দেহপূর্ণ কাজ থেকে সতর্ক থেকে কীভাবে নিজের ঈমান-আমলকে হেফাযত করবে।

আল্লাহ তা‘আলা তাদের ইলম আরও বাড়িয়ে দিন, তাদেরকে সকল কাফির, মুনাফিক্ব, ফাসিকের চক্রান্ত থেকে হেফাযত করুন।

ইতিহাস সাক্ষী, শয়তান সব সময়ই দলে ভারী ছিল। আর সত্যপথযাত্রী নির্যাতিত, উপেক্ষিত, সমালোচিত হয়েই ঈমানের দীপ্তশিখায় বিজয়ী ছিল এবং থাকবে। এই জিহাদ আল্লাহর  দ্বীনকে, আল্লাহর  বাণীকে সমুন্নত করার জিহাদ। আর তাই আল্লাহর  দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য আল্লাহভীতির মাধ্যমে জান-মাল দ্বারা, হিজরত দ্বারা জিহাদই মুমিনকে সর্বশ্রেষ্ঠ মর্যাদায় উন্নীত করেছে।

অহঙ্কার এবং আল্লাহভীতি দু’টি বিপরীতমুখী বিষয় কখনো একই অন্তরে স্থান লাভ করতে পারে না। কারণ অহঙ্কারী কখনই আল্লাহর ভয়ে ভীত হবে না, তাকে যতই আল্লাহর ভয়-ভীতি দ্বারা সতর্ক করা হোক না কেন; কারূন হলো তার জ্বলন্ত উদাহরণ।

আর মুত্তাক্বী বা আল্লাহভীরু কখনো গর্ব-অহঙ্কার প্রকাশকারী হতে পারে না, তা সে যত বড় জ্ঞানী, ইসলামী চিন্তাবিদ, গবেষক হোন না কেন। আমাদের রাসূল মুহাম্মাদ (ছাঃ) এবং তার অনুসারী ছাহাবায়ে কেরাম হলেন তার জ্বলন্ত উদাহরণ।

এখন এর মধ্য থেকে আল্লাহভীতি বা অহঙ্কার কোনোটাকে নির্বাচন করবেন, সে দ্বায়িত্ব একান্তভাবে আপনারই। শুধু মনে রাখবেন যে, এই দু’টো বিষয় ‘অহঙ্কার ও আল্লাহভীতি’ একই সাথে একই অন্তরে কখনো স্থান পেতে পারে না।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত, আগামীকালের জন্য সে কী প্রেরণ করে তা চিন্তা করা। আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করতে থাকো। তোমরা যা করো, আল্লাহ সে সম্পর্কে খবর রাখেন (আল-হাশর, ১৮)।

[1]. ছহীহ মুসলিম, হা/৯১; মিশকাত, হা/৫১০৮।