অহির বাস্তবতা বিশ্লেষণ (১৩তম পর্ব)

-আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রাযযাক*
(মিন্নাতুল বারী- ২০তম পর্ব)


[যে হাদীছের ব্যাখ্যা চলছে :

حَدَّثَنَا مُوسَى بْنُ إِسْمَاعِيلَ، قَالَ: حَدَّثَنَا أَبُو عَوَانَةَ، قَالَ: حَدَّثَنَا مُوسَى بْنُ أَبِي عَائِشَةَ، قَالَ: حَدَّثَنَا سَعِيدُ بْنُ جُبَيْرٍ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ فِي قَوْلِهِ تَعَالَى: {لاَ تُحَرِّكْ بِهِ لِسَانَكَ لِتَعْجَلَ بِهِ} [ القيامة : 16] قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ يُعَالِجُ مِنَ التَّنْزِيلِ شِدَّةً، وَكَانَ مِمَّا يُحَرِّكُ شَفَتَيْهِ فَقَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ: فَأَنَا أُحَرِّكُهُمَا لَكُمْ كَمَا كَانَ رَسُولُ اللَّهِ يُحَرِّكُهُمَا، وَقَالَ سَعِيدٌ: أَنَا أُحَرِّكُهُمَا كَمَا رَأَيْتُ ابْنَ عَبَّاسٍ يُحَرِّكُهُمَا، فَحَرَّكَ شَفَتَيْهِ فَأَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَى: {لاَ تُحَرِّكْ بِهِ لِسَانَكَ لِتَعْجَلَ بِهِ إِنَّ عَلَيْنَا جَمْعَهُ وَقُرْآنَهُ} [ القيامة : 17] قَالَ: جَمْعُهُ لَكَ فِي صَدْرِكَ وَتَقْرَأَهُ: {فَإِذَا قَرَأْنَاهُ فَاتَّبِعْ قُرْآنَهُ} [ القيامة : 18] قَالَ: فَاسْتَمِعْ لَهُ وَأَنْصِتْ: {ثُمَّ إِنَّ عَلَيْنَا بَيَانَهُ} [ القيامة : 19] ثُمَّ إِنَّ عَلَيْنَا أَنْ تَقْرَأَهُ، فَكَانَ رَسُولُ اللَّهِ بَعْدَ ذَلِكَ إِذَا أَتَاهُ جِبْرِيلُ اسْتَمَعَ فَإِذَا انْطَلَقَ جِبْرِيلُ قَرَأَهُ النَّبِيُّ كَمَا قَرَأَهُ.

অনুবাদ :

মহান আল্লাহর বাণী, ‘তাড়াতাড়ি অহি আয়ত্ত করার জন্য আপনার জিহ্বা দ্রুত নাড়াবেন না’ (আল-ক্বিয়ামাহ, ৭৫/১৬)। এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনু আব্বাস h বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ a অহি নাযিলের সময় তা আয়ত্ত করতে বেশ কষ্ট স্বীকার করতেন এবং এজন্য তিনি তাঁর ঠোঁট (দ্রুত) নাড়াতেন। ইবনু আব্বাস h বলেন, আমি তোমাদেরকে ঠিক সেভাবে ঠোঁট নেড়ে দেখাচ্ছি যেভাবে রাসূলুল্লাহ a তাঁর ঠোঁট নাড়াতেন’।

সাঈদ pতাঁর ছাত্রদের বললেন, আমি তোমাদেরকে ঠিক সেভাবে আমার ঠোঁট নেড়ে দেখাচ্ছি যেভাবে আমি ইবনু আব্বাস h-কে তাঁর ঠোঁট নাড়াতে দেখেছি অতঃপর তিনি তাঁর ঠোঁট নেড়ে দেখান। ইবনু আব্বাস h বলেন, এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা নাযিল করলেন, ‘তাড়াতাড়ি অহি আয়ত্ত করার জন্য আপনার জিহ্বা দ্রুত নাড়াবেন না’। এর সংগ্রহ ও পাঠ করানোর দায়িত্ব আমারই’ (আল-ক্বিয়ামাহ, ৭৫/১৬-১৮)।

ইবনু আব্বাস h বলেন, এর অর্থ হলো আপনার অন্তরে তা সংরক্ষণ করা এবং আপনার দ্বারা তা পাঠ করানো। আল্লাহর বাণী, ‘সুতরাং যখন আমি তা পাঠ করি আপনি সে পাঠের অনুসরণ করুন’ (আল-ক্বিয়ামাহ, ৭৫/১৯)। ইবনু আব্বাস h বলেন, অর্থাৎ মনোযোগ সহকারে শুনুন এবং চুপ থাকুন। আল্লাহর বাণী, ‘এরপর আপনার কাছে তা ব্যাখ্যা করার দায়িত্ব আমারই’ (আল-ক্বিয়ামাহ, ৭৫/১৯)। অর্থাৎ অতঃপর আপনাকে পাঠ করানোর দায়িত্বও আমারই। এরপর যখন রাসূলুল্লাহ a-এর কাছে জিবরীল e আসতেন, তখন তিনি মনোযোগ সহকারে কেবল শুনতেন এবং জিবরীল e চলে গেলে রাসূলুল্লাহ a ঠিক সেভাবে পড়তেন, যেভাবে জিবরীল e পড়েছিলেন।]

কুরআন তেলাওয়াতের সময় চুপ থাকা :

উক্ত হাদীছে আলোচিত আয়াতে যে গুরুত্বপূর্ণ দিক-নির্দেশনাগুলো প্রদান করা হয়েছে, তন্মধ্যে একটি হচ্ছে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতের সময় চুপ থাকা। যেমন মহান আল্লাহ বলেন, ﴿فَإِذَا قَرَأْنَاهُ فَاتَّبِعْ قُرْآنَهُ﴾ ‘আমরা যখন পড়ি, তখন আপনি আমাদের পড়ার অনুসরণ করুন!’ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস c বলেন, فَاسْتَمِعْ لَهُ وَأَنْصِتْ ‘আপনি মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করুন এবং চুপ থাকুন!

কুরআন তেলাওয়াতের সময় চুপ থাকা ও মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত। মহান আল্লাহ অন্য আয়াতেও এ বিষয়ে স্পষ্ট দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেন,﴿وإذا قُرِئَ القُرآنُ فاستَمِعُوا له وأَنْصِتُوا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ﴾ ‘আর যখন কুরআন তেলাওয়াত করা হয়, তখন তোমরা তা মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করো এবং চুপ থাকো! যাতে করে তোমাদের উপর দয়া করা হয়’ (আল-আ‘রাফ, ৭/২০৪)

কুরআন তেলাওয়াতের সময় চুপ থাকার বিষয়টিকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে— (১) ছালাতের মধ্যে কুরআন তেলাওয়াত এবং (২) ছালাতের বাহিরে কুরআন তেলাওয়াত।

ছালাতের বাহিরে কুরআন তেলাওয়াতের ক্ষেত্রে হানাফী মাযহাবের মতে চুপ থাকা ওয়াজিব এবং জমহূর ওলামায়ে কেরামের মতে চুপ থাকা সুন্নাত। ছালাতের মধ্যে ইমাম সাহেব যখন উচ্চৈঃস্বরে কুরআন তেলাওয়াত করেন, তখন চুপ থাকা সকল মাযহাবের মতে ওয়াজিব। শুধু সূরা ফাতেহা পড়ার ক্ষেত্রে মতভেদ রয়েছে, যা উপযুক্ত জায়গায় আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ।

হাদীছের প্রামাণিকতা : উক্ত হাদীছে উল্লেখিত আয়াতগুলোতে যে বিষয়গুলো ফুটে উঠেছে, তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে কুরআন অবতীর্ণ করার পাশাপাশি সেটি ব্যাখ্যা করে দেওয়ার দায়িত্বও মহান আল্লাহ তাআলার। মহান আল্লাহ মূলত সেই পবিত্র কুরআনের ব্যাখ্যা করে বাস্তবে প্রয়োগ করার জন্যই রাসূল a-কে প্রেরণ করেছিলেন। যা তিনি তার দীর্ঘ ২৩ বছরের জীবনে পালন করেছেন। পবিত্র কুরআনের আয়াতের বাহিরে তিনি তার ছাহাবীগণকে যে দিক-নির্দেশনা দিতেন, সেগুলোই কুরআনের ব্যাখ্যা। আর সেই ব্যাখ্যাই আমাদের নিকটে হাদীছ হিসেবে পৌঁছেছে। আমরা যদি হাদীছকে বাদ দিয়ে দেই, তাহলে পবিত্র কুরআন সকলের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যাবে। সবাই নিজ নিজ মনের মতো করে পবিত্র কুরআনের ব্যাখ্যা করবে। যেমন আজকের যুগে কেউ কমনসেন্স দিয়ে কুরআনের ব্যাখ্যা করছে; কেউ বিজ্ঞান দিয়ে কুরআনের ব্যাখ্যা করছে। যার ফলশ্রুতিতে মুসলিমদের একক আমল ও আক্বীদার উপর একত্রিত হওয়া কখনই সম্ভব হবে না। ফেতনার কোনো রাস্তা বন্ধ করা সম্ভব হবে না। সমাজে বৃষ্টির পানির মতো ফেতনা প্রবেশ করবে। সুতরাং হাদীছ ব্যতীত কুরআনের কল্পনা করা রাসূল a-এর ২৩ বছরের জীবন ব্যতীত কুরআনের কল্পনা করার সমান। হাদীছ ব্যতীত কুরআনের কল্পনা অর্থ হচ্ছে রাসূল a-এর ২৩ বছরের জীবনের সকল পরিশ্রম, যুদ্ধ-বিগ্রহ ও কষ্ট বৃথা। নাঊযুবিল্লাহ!

মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে তাঁর রাসূল aকে ও রাসূল a-এর হাদীছকে অনুসরণের কথা বলেছেন। যেমন তিনি বলেন,﴿وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا إِلَى مَا أَنْزَلَ اللَّهُ وَإِلَى الرَّسُولِ رَأَيْتَ الْمُنَافِقِينَ يَصُدُّونَ عَنْكَ صُدُودًا﴾ ‘আর যখন তাদেরকে বলা হয় এসো, মহান আল্লাহর অবতীর্ণ করা (কিতাবের) দিকে এবং তার রাসূলের দিকে, তখন আপনি দেখবেন মুনাফিক্বরা আপনার থেকে পরিপূর্ণরূপে মুখ ফিরিয়ে নিবে’ (আন-নিসা, ৪/৬১)। এই আয়াতে কুরআনের বাহিরেও সরাসরি রাসূল a-এর দিকে আসার আহ্বান করা হয়েছে।

﴿إِنَّ الَّذِينَ يَكْفُرُونَ بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ وَيُرِيدُونَ أَنْ يُفَرِّقُوا بَيْنَ اللَّهِ وَرُسُلِهِ وَيَقُولُونَ نُؤْمِنُ بِبَعْضٍ وَنَكْفُرُ بِبَعْضٍ وَيُرِيدُونَ أَنْ يَتَّخِذُوا بَيْنَ ذَلِكَ سَبِيلًا﴾

‘আর নিশ্চয় যারা কুফুরী করে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে এবং যারা চায় মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করতে এবং তারা বলে আমরা কিছু বিষয়ের প্রতি ঈমান আনয়ন করি এবং কিছু বিষয়কে অস্বীকার করি আর তারা কুফর ও ঈমানের মধ্যে একটা পথ বের করতে চায়। তারাই প্রকৃত কাফের’ (আন-নিসা, ৪/১৫০)। এই আয়াত প্রমাণ করে, কুরআন-হাদীছের মধ্যে পার্থক্য করাই মূলত আল্লাহ ও তাঁর রাসূল a-এর মধ্যে পার্থক্য করা। কেননা রাসূল a-এর পক্ষ থেকে কুরআন ব্যতীত আলাদা কিছু না থাকলে তো পার্থক্য করার প্রশ্নই আসে না। তখনই পার্থক্য করার প্রশ্ন আসে যখন কুরআনের বাহিরেও রাসূল a-এর পক্ষ থেকে আলাদা কিছু অহি আসবে আর সেটিই হচ্ছে হাদীছ।

﴿وَالَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ وَلَمْ يُفَرِّقُوا بَيْنَ أَحَدٍ مِنْهُمْ أُولَئِكَ سَوْفَ يُؤْتِيهِمْ أُجُورَهُمْ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَحِيمًا﴾

‘আর যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনয়ন করে এবং তারা উভয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য সৃষ্টি করে না তাদেরকে তাদের এই আমলের নেক প্রতিদান প্রদান করা হবে আর মহান আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল ও দয়ালু’ (আন-নিসা, ৪/১৫২)

﴿رَبَّنَا آمَنَّا بِمَا أَنْزَلْتَ وَاتَّبَعْنَا الرَّسُولَ فَاكْتُبْنَا مَعَ الشَّاهِدِينَ﴾

‘হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি যা অবতীর্ণ করেছেন আমরা তার প্রতি ঈমান আনয়ন করেছি এবং আপনার রাসূলের অনুসরণ করেছি। অতএব, আপনি আমাদেরকে সাক্ষ্যদানকারীদের অন্তর্ভুক্ত করে নিন’ (আলে ইমরান, ৩/৫৩)

﴿الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيَّ الْأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوبًا عِنْدَهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيلِ يَأْمُرُهُمْ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَاهُمْ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالْأَغْلَالَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ فَالَّذِينَ آمَنُوا بِهِ وَعَزَّرُوهُ وَنَصَرُوهُ وَاتَّبَعُوا النُّورَ الَّذِي أُنْزِلَ مَعَهُ أُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ﴾

‘আর যারা তাদের নিকটে থাকা তাওরাত ও ইঞ্জীলে লিখিত আকারে প্রাপ্ত উম্মী নবীর অনুসরণ করে, যে নবী তাদেরকে সৎকাজের আদেশ দেয় এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করে এবং তাদের জন্য পবিত্র জিনিসকে হালাল করে, অপবিত্র জিনিসকে হারাম করে, তাদের উপর চাপানো বিভিন্ন বোঝা নামিয়ে দেয় এবং বিভিন্ন আবদ্ধ বাধন থেকে তাদেরকে মুক্ত করে। অতএব, যারা এই নবীর প্রতি ঈমান আনয়ন করবে, তাকে সহযোগিতা করবে এবং তাকে শক্তিশালী করবে আর তার সাথে প্রেরিত নূর তথা পবিত্র কুরআনের অনুসরণ করবে তারাই তো সফলকাম!’ (আল-আ‘রাফ, ৭/১৫৭)

উক্ত আয়াতে নূর তথা পবিত্র কুরআনের অনুসরণের পাশাপাশি স্বাধীন ও স্বতন্ত্রভাবে আল্লাহর রাসূল a-এর আদেশ, নিষেধ, হালাল ও হারামের অনুসরণের কথা বলা হয়েছে। যা প্রমাণ করে, শরীআত প্রণয়নে পবিত্র কুরআনের বাহিরেও রাসূল a-এর স্বতন্ত্র সত্তা আছে। তিনি তার প্রতিপালকের নিকট থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানের ভিত্তিতে কুরআনের ব্যাখ্যাস্বরূপ সেগুলো করে থাকেন।

﴿قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ﴾

‘হে নবী! আপনি বলে দিন, যদি তোমরা মহান আল্লাহকে ভালোবাসতে চাও তাহলে আমার অনুসরণ করো। অবশ্যই তোমাদেরকে মহান আল্লাহ ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন। আর তিনিই তো পরম ক্ষমাশীল ও দয়ালু’ (আলে ইমরান, ৩/৩১)

ইমাম ইবনু কাছীর p বলেন, فَعَلَيْكَ بِالسُّنَّةِ ‌فَإِنَّهَا ‌شَارِحَةٌ ‌لِلْقُرْآنِ وَمُوَضِّحَةٌ لَهُ ‘অতএব, তোমাদের উপর সুন্নাতের অনুসরণ জরুরী; কেননা সুন্নাত হচ্ছে পবিত্র কুরআনের ব্যাখ্যাকারী ও স্পষ্টকারী।[1] ইমাম শাতেবী p বলেন, أنَّ السُّنة إنما جاءت مُبيِّنة للكتاب ‘নিশ্চয় সুন্নাত এসেছে পবিত্র কুরআনের ব্যাখ্যাকারী হিসেবে’।[2]

জিবরাঈল শব্দের বিশ্লেষণ ও তার পরিচয় :

জিবরাঈল- হাদীছে এসেছে জিবরীল। তিনি জিবরাঈল ও জিবরীল এই দু’টি নামেই প্রসিদ্ধ। উক্ত শব্দের প্রায় ১৫ ধরনের উচ্চারণ বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে।[3]

জিবরাঈল শব্দটি সুরিয়ানী ভাষার শব্দ। সিরিয়ার আদি স্থানীয় ভাষা। যেটা ইবরাহীম e-এর মাতৃভাষা বলে পরিচিত। অনেকেই বলে থাকেন তাওরাত, ইঞ্জীলও সুরিয়ানী ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে। পরবর্তীতে তা ইবরানী বা হিব্রুতে অনুবাদ করা হয়। জিবরাঈল শব্দের আরবী অর্থ আব্দুল্লাহ। ‘জিবর’ অর্থ বান্দা আর ‘ঈল’ অর্থ আল্লাহ। ইকরিমা থেকে বর্ণিত আছে, জিবরাঈল অর্থ আব্দুল্লাহ আর মীকাঈল অর্থ উবায়দুল্লাহ।[4]

হাদীছ থেকে উপকারিতা :

(১) আধুনিক শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষকের অভিনয়কে অনেক গুরুত্ব দেওয়া হয়। এটা বাস্তবে কোনো কিছু করে দেখানো, শিখানোর সর্বোত্তম পদ্ধতিগুলোর একটি। সেই আধুনিক পদ্ধতিই আজ থেকে হাজার বছর আগে আল্লাহর রাসূল a ও তার ছাহাবা n প্রয়োগ করেছেন।

(২) কুরআন হিফয করতে পারা আল্লাহর দয়া। যেখানে আল্লাহর রাসূল a-এর হিফয করতে কষ্ট হচ্ছিল সেখানে মহান আল্লাহ নিজ দয়ায় তাকে মুখস্থ করার তাওফীক্ব দিয়েছেন। প্রত্যেকে যারা হাফেযে কুরআন হন, তাদের প্রতি মহান আল্লাহর এই দয়া থাকে।

(৩) কুরআন তেলাওয়াতের সময় চুপ থাকা এবং মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করা জরুরী।

(৪) উক্ত আয়াতগুলো প্রমাণ করে কুরআনের ব্যাখ্যাও মহান আল্লাহ করে দিয়েছেন তাঁর রাসূল a-এর মাধ্যমে। আর আল্লাহর রাসূল a-এর নিকট থেকে আমাদের কাছে কুরআনের বাইরে হাদীছ ব্যতীত আর কিছুই পৌঁছেনি। সুতরাং হাদীছ ব্যতীত আর কিছুই কুরআনের ব্যাখ্যা হতে পারে না।

হাদীছ নং : ৫

حَدَّثَنَا عَبْدَانُ، قَالَ: أَخْبَرَنَا عَبْدُ اللَّهِ قَالَ: أَخْبَرَنَا يُونُسُ، عَنِ الزُّهْرِيِّ، ح وحَدَّثَنَا بِشْرُ بْنُ مُحَمَّدٍ، قَالَ: أَخْبَرَنَا عَبْدُ اللَّهِ، قَالَ: أَخْبَرَنَا يُونُسُ، وَمَعْمَرٌ، عَنِ الزُّهْرِيِّ، نَحْوَهُ قَالَ: أَخْبَرَنِي عُبَيْدُ اللَّهِ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ أَجْوَدَ النَّاسِ، وَكَانَ أَجْوَدُ مَا يَكُونُ فِي رَمَضَانَ حِينَ يَلْقَاهُ جِبْرِيلُ، وَكَانَ يَلْقَاهُ فِي كُلِّ لَيْلَةٍ مِنْ رَمَضَانَ فَيُدَارِسُهُ القُرْآنَ، فَلَرَسُولُ اللَّهِ أَجْوَدُ بِالخَيْرِ مِنَ الرِّيحِ المُرْسَلَةِ.

অনুবাদ :

ইমাম বুখারী p বলেন, আমাকে আবদান হাদীছ শুনিয়েছে। তিনি বলেন, আমাকে আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক p হাদীছ শুনিয়েছে। তিনি বলেন, আমাকে ইউনুস p হাদীছ শুনিয়েছে, তিনি যুহরী p থেকে।

ইমাম বুখারী p বলেন, আমাকে আরো হাদীছ শুনিয়েছেন বিশর ইবনু মুহাম্মাদ p। তিনি বলেন, আমাকে আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক p হাদীছ শুনিয়েছেন। তিনি বলেন, আমাকে ইউনুস ও মা‘মার হাদীছ শুনিয়েছেন, তারা যুহরী থেকে, তিনি বলেন, আমাকে হাদীছ শুনিয়েছেন উবায়দুল্লাহ ইবনু আব্দুল্লাহ p, তিনি আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস c থেকে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ a ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ দাতা। রামাযানে তিনি আরো বেশি দানশীল হতেন, যখন জিবরীল e তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতেন। আর রামাযানের প্রতি রাতেই জিবরীল e তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতেন এবং তাঁরা পরস্পর কুরআন তেলাওয়াত করে শোনাতেন। নিশ্চয়ই রাসূলুল্লাহ a রহমতের বাতাস থেকেও অধিক দানশীল ছিলেন।

হাদীছের তাখরীজ :

ইমাম বুখারী[5] p হাদীছটি বর্ণনা করেছেন বিশর ইবনু মুহাম্মাদ ও আবদান q থেকে। ইমাম মুসলিম[6] p আবূ কুরাইব মুহাম্মাদ ইবনুল আ‘লা p থেকে। তারা তিন জন (বিশর, আবদান ও আবূ কুরাইব o) হাদীছটি বর্ণনা করেছেন আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক p থেকে। ইমাম নাসাঈ[7] ও ইমাম ইবনু হিব্বান[8] q হাদীছটি বর্ণনা করেছেন আব্দুল্লাহ ইবনু ওয়াহাব আল-মিছরী p থেকে। ইমাম আহমাদ[9] p আবদ ইবনু হুমায়দ[10] ও আবূ ইয়া‘লা আল-মাওছেলী[11] q উছমান ইবনু উমার ইবনু ফারেস p-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তারা সকলেই (ইবনুল মুবারক, ইবনু ওয়াহাব ও উছমান ইবনু উমার o ইউনুস ইবনু ইয়াযীদ আল-আয়লী p থেকে। ইমাম মুসলিম p হাদীছটি আরো বর্ণনা করেছেন আবদ ইবনু হুমায়দ p থেকে। ইমাম আহমাদ ও আবদ ইবনু হুমায়দ q হাদীছটি বর্ণনা করেছেন আব্দুর রাযযাক ইবনু হাম্মাম আছ-ছান‘আনী p থেকে। তিনি মা‘মার p থেকে।[12] ইমাম ইবনু

আবী শায়বা[13] p হাদীছটি আরো বর্ণনা করেছেন ইয়াহইয়া ইবনু আদম p থেকে।[14] ইমাম আহমাদ p মুযাফফর আল-খোরাসানী p থেকে।[15] ইমাম বুখারী p হাদীছটি আরো বর্ণনা করেছেন মূসা ইবনু ইসমাঈল আত-তাবূযাকী p থেকে ও ইয়াহইয়া p আল-ক্বারশী p থেকে।[16] ইমাম মুসলিম p হাদীছটি বর্ণনা করেছেন মুহাম্মাদ ইবনু জা‘ফর আল-ওরাকানী p থেকে।[17] ইমাম তিরমিযী[18] ও ইবনু খুযায়মা[19] q হাদীছটি বর্ণনা করেছেন আব্দুল্লাহ ইবনু রাযীন p থেকে। তারা সকলেই (ইয়াহইয়া ইবনু আদম, খোরাসানী, তাবুযাকী, ক্বারশী, আল-ওরাকানী ও ইবনু রাযীন o ইবরাহীম ইবনু সা‘দ আয-যুহরী p থেকে। হাদীছটি ইমাম ইবনু আবী শায়বা, ইমাম আহমাদ ও আবদ ইবনু হুমায়দ o বর্ণনা করেছেন, ইয়া‘লা ইবনু উবাইদ আত-তনাফুসী p থেকে, তিনি মুহাম্মাদ ইবনু ইসহাক্ব p থেকে।[20]

তারা সকলেই (ইউনুস, মা‘মার, ইবরাহীম, মুহাম্মাদ ইবনু ইসহাক্ব o হাদীছটি বর্ণনা করেছেন যুহরী p থেকে, তিনি উবায়দুল্লাহ ইবনু আব্দুল্লাহ p থেকে, তিনি ইবনু আব্বাস c থেকে।

(চলবে)


* ফাযেল, দারুল উলূম দেওবান্দ, ভারত; বি. এ (অনার্স), মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব; এমএসসি, ইসলামিক ব্যাংকিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, ইউনিভার্সিটি অফ ডান্ডি, যুক্তরাজ্য।

[1]. তাফসীর ইবনু কাছীর, ১/৪।

[2]. আল-মুওয়াফাকাত, ৪/৪৭-৪৮।

[3]. তাজুল আরূস, ৩/৮৪।

[4]. উমদাতুল ক্বারী, ১/৭১।

[5]. ছহীহ বুখারী, হা/১৯০২, ৩২২০, ৩৫৫৪, ৪৯৯৭।

[6]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৩০৮, ২৩০৮।

[7]. নাসাঈ কুবরা, হা/২৪১৬, ৭৯৩৯।

[8]. ইবনু হিব্বান, হা/৩৪৪০, ৬৩৭০।

[9]. আহমাদ, হা/২০৭০, ২৬৫৯, ৩০৬৮, ৩৪৯২, ৩৫৩৮, ৩৬০৯।

[10]. আবদ ইবনু হুমায়দ, হা/৬৪৬, ৬৪৭।

[11]. আবূ ইয়া‘লা, হা/২৫৫২।

[12]. প্রাগুক্ত।

[13]. ইবনু আবী শায়বা, হা/২৭১৫৫, ২৭১৫৬, ৩০৯২০, ৩২৪৭১।

[14]. প্রাগুক্ত।

[15]. প্রাগুক্ত।

[16]. প্রাগুক্ত।

[17]. প্রাগুক্ত।

[18]. শামায়েলে তিরমিযী, হা/৩৫৩।

[19]. ইবনু খুযায়মা, হা/১৮৮৯।

[20]. প্রাগুক্ত।