অহির বাস্তবতা বিশ্লেষণ (১ম পর্ব)

-আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রাযযাক
এম, এ (অধ্যয়নরত), উলূমুল হাদীস বিভাগ, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব।

(মিন্নাতুল বারী- ৮ম পর্ব)

হাদীছ নং : ২

حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ يُوسُفَ، قَالَ: أَخْبَرَنَا مَالِكٌ، عَنْ هِشَامِ بْنِ عُرْوَةَ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ عَائِشَةَ أُمِّ المُؤْمِنِينَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا، أَنَّ الحَارِثَ بْنَ هِشَامٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ سَأَلَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، كَيْفَ يَأْتِيكَ الوَحْيُ؟ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَحْيَانًا يَأْتِينِي مِثْلَ صَلْصَلَةِ الجَرَسِ، وَهُوَ أَشَدُّهُ عَلَيَّ، فَيُفْصَمُ عَنِّي وَقَدْ وَعَيْتُ عَنْهُ مَا قَالَ، وَأَحْيَانًا يَتَمَثَّلُ لِيَ المَلَكُ رَجُلًا فَيُكَلِّمُنِي فَأَعِي مَا يَقُولُ» قَالَتْ عَائِشَةُ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا: وَلَقَدْ رَأَيْتُهُ يَنْزِلُ عَلَيْهِ الوَحْيُ فِي اليَوْمِ الشَّدِيدِ البَرْدِ، فَيَفْصِمُ عَنْهُ وَإِنَّ جَبِينَهُ لَيَتَفَصَّدُ عَرَقًا

ইমাম বুখারী বলেন, আমাকে হাদীছ শুনিয়েছেন আব্দুল্লাহ ইবনে ইউসুফ, তিনি বলেন, আমাকে হাদীছ শুনিয়েছেন মালেক, তিনি বলেন, আমাকে হাদীছ শুনিয়েছেন হিশাম ইবনে উরওয়া, তিনি বলেন, আমাকে হাদীছ শুনিয়েছেন আমার পিতা উরওয়া, তিনি বলেন, আমাকে হাদীছ শুনিয়েছেন আয়েশা (রাঃ), তিনি বলেন, হারিছ ইবনে হাশিম (রাঃ) রাসূল (ছাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল! কীভাবে আপনার নিকট অহি আসে? তখন রাসূল (ছাঃ) উত্তরে বললেন, কখনো অহি আসে ঘণ্টা ধ্বনির মতো। আর সেটা আমার জন্য অনেক কষ্টকর হয়। যতক্ষণে তা শেষ হয় ততক্ষণে আমি অহি মুখস্থ করে ফেলি। আর কখনো ফেরেশতা মানুষের রূপ ধারণ করে আসে এবং আমার সাথে কথা বলে এবং আমি তার কথাকে সংরক্ষণ করে নিই। আয়েশা (রাঃ) বলেন, আমি কঠিন শীতে রাসূল (ছাঃ)-এর উপর অহি অবতীর্ণ হতে দেখেছি, যতক্ষণে অহি শেষ হয় ততক্ষণে তার কপাল থেকে ঘামের কারণে পানি পড়তে থাকে।

তাখরীজ :

(ক) ইমাম তিরমিযী হাদীছটি শুনেছেন ইসহাক্ব ইবনে মূসা থেকে তিনি মা‘ন থেকে।[1]

(খ) ইমাম ইবনু খুযায়মা হাদীছটি শুনেছেন ইউনুস ইবনে আব্দুল আ‘লা থেকে, তিনি আব্দুল্লাহ ইবনে ওহাব থেকে।[2]

(গ) ইমাম ইবনু হিব্বান হাদীছটি শুনেছেন ওমর ইবনে সাঈদ থেকে, তিনি আহমাদ ইবনে অবুবকর থেকে।[3]

(ঘ) ইমাম নাসাঈ হাদীছটি শুনেছেন মুহাম্মাদ ইবনে সালামা থেকে, তিনি ইবনুল ক্বাসিম থেকে।[4]

উপরের চারজনই তথা (মা‘ন, আব্দুল্লাহ ইবনে ওহাব, আহমাদ ইবনে আবুবকর ও ইবনুল ক্বাসিম) সকলেই হাদীছটি শুনেছেন ইমাম মালেক থেকে।

(ঙ) ইমাম হুমায়দী ও ইসহাক্ব ইবনে রাহওয়াইহ হাদীছটি শুনেছেন ইমাম সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা থেকে।[5]

(চ) ইমাম আহমাদ হাদীছটি শুনেছেন ইমাম আব্দুর রাযযাক আছ-ছান‘আনী থেকে, তিনি হাদীছটি শুনেছেন মা‘মার ইবনে রাশেদ থেকে।[6]

(ছ) ইমাম আহমাদ হাদীছটি শুনেছেন মুহাম্মাদ ইবনে বিশর থেকে।[7]

(জ) ইমাম ত্বাবারানী হাদীছটি আইয়ূব আস-সাখতিয়ানীর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।[8]

(ঝ) ইমাম বুখারী তার গ্রন্থের ফেরেশতা অধ্যায়ে এই হাদীছটি অন্য সনদে এনেছেন আর তা হচ্ছে, তিনি ফারওয়া থেকে, তিনি আলী ইবনে মুসহির থেকে।

উপরের ছয়জনই (ইমাম মালেক, ইমাম সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা, মা‘মার ইবনে রাশেদ, মুহাম্মাদ ইবনে বিশর, আলী ইবেন মুসহির ও আইয়ূব আস-সাখতিয়ানী) সকলেই হাদীছটি শুনেছেন হিশাম ইবনে উরওয়া থেকে।

বর্ণনার পার্থক্য : সকল সূত্রের বর্ণনায় তেমন কোনো পার্থক্য নেই, শুধুমাত্র ইমাম সুফিয়ান ইবনে উয়াইনার বর্ণনায় সামান্য ভিন্নতা আছে। যথা-

وَيَأْتِينِي أَحْيَانًا فِي مِثْلِ صُورَةِ الْفَتَى فَيَنْبِذُهُ إِلِيَّ فَأَعِيهِ، وَهُوَ أَهْوَنُهُ عَلَيَّ

‘কখনো কখনো ফেরেশতা আমার নিকটে যুবকের আকৃতি নিয়ে আসে এবং অহিকে আমার উপর নিক্ষেপ করে আর আমি সেটা মুখস্থ করে নিই। এই পদ্ধতিটা আমার জন্য অনেক সহজ’।

ইমাম মালেকসহ অন্যদের বর্ণনায় : (ক) যুবকের কথা উল্লেখ নেই, শুধু ব্যক্তি বলা হয়েছে।

(খ) আরবী ‘ইয়াতাকাল্লাম’  তথা ‘কথা বলে’ বলা হয়েছে আর এখানে ‘ইয়াম্বিযু’ তথা ‘নিক্ষেপ করে’ বলা হয়েছে।

(গ) এই পদ্ধতিটা যে রাসূল (ছাঃ)-এর উপর সহজতর এটা স্পষ্টভাবে সেখানে উল্লেখ নেই, এখানে উল্লেখ আছে।

উল্লেখ্য, সুফিয়ান ইবনে উয়াইনার কোন সূত্রে এই পার্থক্যটা নেই। এই পার্থক্য শুধু ইমাম হুমায়দী ও ইসহাক্ব ইবনে রাহওয়াইহের সূত্রে রয়েছে। ইমাম মুসলিম যখন সুফিয়ান ইবনে উয়াইনার সূত্রে বর্ণনা করেছেন, তখন সেখানে শব্দগুলো ইমাম মালেকের মতোই বর্ণনা করেছেন।[9]  ওয়াল্লাহু আ‘লাম।

রাবীগণের পরিচয় :

(ক) আব্দুল্লাহ ইবনে ইউসুফ আত-তিন্নিসী। তিনি ইমাম বুখারীর উস্তাদ। ইমাম মালেকের মযবূত ছাত্রদের মধ্যে একজন। ইমাম বুখারী তার থেকে প্রচুর রিওয়াত গ্রহণ করেন। ইমাম বুখারী তাকে সিরিয়ানদের মধ্যে সবচেয়ে মযবূত বলেছেন।[10]

(খ) মালেক। তিনি হচ্ছেন মদীনার ইমাম মালেক (রাঃ)। তার পূর্ণ নাম মালেক ইবনে আনাস ইবনে মালেক ইবনে আনাস ইবনে আমের ইবনে আমর আল-আছবাহী। তার ফযীলতে বহুল প্রচলিত একটি হাদীছ পেশ করা হয়ে থাকে। যথা-

عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- :« يُوشِكُ أَنْ يَضْرِبَ النَّاسُ آبَاطَ الْمَطِىِّ فِى طَلَبِ الْعِلْمِ ، فَلاَ يَجِدُونَ عَالِمًا أَعْلَمَ مِنْ عَالِمِ الْمَدِينَةِ.

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘অচিরেই একটা সময় আসবে যখন মানুষ ইলম অর্জনের জন্য ঘোড়া দৌঁড়াবে এবং মদীনার আলেমের চেয়ে জ্ঞানী কোনো আলেম পাবে না’।[11]

উক্ত হাদীছের হুকুম নিয়ে মুহাদ্দিছগণের মাঝে মতভেদ রয়েছে। ইমাম তিরমিযী, ইমাম হাকেম (মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/৩০৭) ও হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানীসহ অনেকেই হাসান বলেছেন। অন্যদিকে ইমাম ইবনু হাযম ও শায়খ আলবানী যঈফ বলেছেন। তার যঈফ বলার কারণ হচ্ছে, এই সনদে দুইজন মুদাল্লিস রাবী আছে, আবুয যুবায়ের ও ইবনু জুরায়েজ। ইমাম আলবানীর জবাবে অনেকেই ত্বাহাবীর মুশকিলুল আছার (মুশকিলুল আছার, হা/৪০১৬) ও ইমাম মাক্বদেসীর আরবাঈন আল-মুরাত্তাবা (আরবাঈন মুরাত্তাবা, ১/১৬০) বই থেকে এই দুইজন রাবীর শ্রবণের স্পষ্টতা প্রমাণ করতে চেয়েছেন। আবার অনেকেই ইমাম বুখারীর মত পেশ করে তাদের জবাব দেয়ার চেষ্টা করেছেন।[12] সর্বোপরি হাদীছের সনদ বিস্তর গবেষণার দাবী রাখে। আর মহান আল্লাহ সর্বাধিক অবগত।

আমরা বলব এই হাদীছ দিয়েই ইমাম মালেকের ফযীলত প্রমাণ করতে হবে এমনটি নয়। বরং ইমাম মালেক (রহিঃ) যে একজন মান্যগণ্য আলেম ও মুহাদ্দিছ এতে কোনো সন্দেহ নেই। তার নামেই চার মাযহাবের এক মাযহাব প্রচলিত হয়েছে। ইমাম শাফেঈ, ইমাম মুহাম্মাদ, ইমাম সুফিয়ান ছাওরী, ইমাম সুফিয়ান ইবনু উয়াইনা, ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক (রহিঃ)-দের মতো মহান ইমামগণ তার ছাত্র। তার লিখিত মুওয়াত্ত্বা একটি বে-নযীর কিতাব। ছহীহ বুখারীর আগে রচিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে সর্ববিশুদ্ধ কিতাব। তার সম্মান-মর্যাদা বিষয়ে অনেকেই আলাদা গ্রন্থ রচনা করেছেন; তন্মধ্যে অন্যতম ও বিশুদ্ধতম হচ্ছে ইমাম ইবনু আব্দিল বার (রহিঃ)-এর লিখিত ‘আল-ইন্তিকা ফী ফাযায়িলিছ ছালাছাতিল আয়িম্মাতিল ফুক্বাহা’। ইমাম বুখারী (রহিঃ)-এর মতে, ইমাম মালেক যে হাদীছগুলো নাফে‘ হতে এবং তিনি ইবনু ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণনা করে থাকেন সেগুলোই সর্ববিশুদ্ধ হাদীছ।

(গ) হিশাম ইবনে উরওয়া ইবনে যুবায়ের ইবনে আওয়াম। তিনি  উরওয়া ইবনে যুবায়েরের ছেলে। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ)-কে দেখেছেন। তিনি তার মাথায় হাত রেখে দু‘আও করে দিয়েছেন। তিনি তার চাচা আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের থেকেও হাদীছ শুনেছেন। তার অধিকাংশ হাদীছ তাবেঈনের থেকে। তিনি মযবূত রাবী।[13]

(ঘ) উরওয়া ইবনে যুবায়ের ইবনে আওয়াম। তার পিতা হচ্ছেন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজন ছাহাবীর একজন যুবায়ের ইবনে আওয়াম (রাঃ)। তিনি তার সুযোগ্য সন্তান। তার ভাই বিখ্যাত ছাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রাঃ)। তার মা আবুবকর (রাঃ)-এর মেয়ে আসমা বিনতে আবুবকর (রাঃ)। তার নিজ খালা আয়েশা (রাঃ)। তার নিজ নানা আবুবকর (রাঃ)। তিনি আয়েশা (রাঃ)-এর হাদীছ বিষয়ে সবচেয়ে অভিজ্ঞ। নিজ খালা হওয়ায় এবং পর্দার সমস্যা না থাকায় তিনি আয়েশা (রাঃ) থেকে অনেক ইলম হাছিল করতে পেরেছিলেন। তার জ্ঞানের মাপকাঠি বুঝার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, তিনি মদীনার বিখ্যাত সাতজন ফক্বীহদের একজন। বাকী ছয়জন হচ্ছেন, সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যিব, ওবাইদুল্লাহ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে উতবা ইবনে মাসঊদ, ক্বাসেম ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আবুবকর আছ-ছিদ্দীক্ব, সুলায়মান ইবনে ইয়াসার, খারেজা ইবনে ইয়াযীদ ইবনে ছাবিত, সালিম ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর।[14]

(ঙ) আয়েশা (রাঃ)  তার নাম হচ্ছে আয়েশা বিনতে আবুবকর আব্দুল্লাহ ইবনে ওছমান ইবনে আমের ইবনে আমর ইবনে কা‘ব ইবনে সা‘দ ইবনে তাইম ইবনে মুররা ইবনে কা‘ব ইবনে লুয়াই।[15]

রাসূল (ছাঃ)-এর বংশনামার সাথে তার বংশনামা মুররা ইবনে কা‘বের এখানে এসে একত্রিত হয়েছে। তথা আয়েশা (রাঃ) কুরাইশ বংশের মেয়ে। তার মায়ের নাম উম্মে রুম্মান। তার ফযীলতসমূহ নিম্নরূপ :

(ক) তিনি দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর একমাত্র কুমারী স্ত্রী।

(খ) তিনি নবীগণের পরে দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ আবুবকর (রাঃ)-এর মেয়ে।

(গ) রাসূল (ছাঃ) তার বাড়ীতে তার কোলে মাথা রেখে মারা গেছেন।

(ঘ) তার ঘরেই রাসূল (ছাঃ)-কে দাফন করা হয়।

(ঙ) রাসূল (ছাঃ)-এর মৃত্যুর পূর্বে তার মুখে একমাত্র তারই মুখের লালা জায়গা পায়।

(চ) মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে তার পবিত্রতার পক্ষে মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে।

(ছ) তিনি রাসূল (ছাঃ)-এর বিছানায় থাকা অবস্থাতেও আল্লাহর রাসূলের উপর অহি অবতীর্ণ হত, যেটা অন্য স্ত্রীগণের ক্ষেত্রে ঘটত না। [16]

(জ) রাসূল (ছাঃ) তার স্ত্রীগণের মধ্যে খাদীজা (রাঃ) ও তাকেই বেশী ভালবাসতেন।

(ঝ) রাসূল (ছাঃ) থেকে সর্বাধিক হাদীছ বর্ণনাকারী একমাত্র নারী তিনি। আর অন্যান্য ছাহাবীগণের তুলনায় তিনি অধিক বর্ণনাকারী সাতজনের একজন।

(ঞ) খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগে হাদীছ, ফিক্বহ ও তাফসীর এই তিন শাস্ত্রে তিনি অধিক জ্ঞানীদের মধ্যে গণ্য হতেন। ছাহাবায়ে কেরাম কঠিন থেকে কঠিনতর ইলমী বিষয়ে তার থেকে সমাধান গ্রহণ করতেন।

(ট) তিনি আরবী কবিতা ও সাহিত্য, বংশনামার জ্ঞান ও ডাক্তারী বিদ্যাতেও সমান পারদর্শিতা রাখতেন।

এককথায় তিনি শ্রেষ্ঠ পিতার শ্রেষ্ঠ মেয়ে। শ্রেষ্ঠ স্বামীর শ্রেষ্ঠ স্ত্রী। তাক্বওয়া, বুদ্ধিমত্তা, বিদুষিতা, দুনিয়াবী ও দ্বীনী জ্ঞান এবং উঁচু বংশ মর্যাদা সবকিছুই একসাথে তার মধ্যে একত্রিত হয়েছিল। রাযিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা।

তার বর্ণিত হাদীছের সংখ্যা :

তিনি প্রায় ১২০০ হাদীছ বর্ণনা করেছেন। তন্মধ্যে ইমাম বুখারী ও মুসলিম উভয়ই তাদের গ্রন্থে ১৭৪ হাদীছটি বর্ণনা করেছেন। আর ইমাম বুখারী এককভাবে ৫৪টি ও ইমাম মুসলিম এককভাবে ৬৮টি হাদীছ বর্ণনা করেছেন।[17]   তথা বুখারীতে বর্ণিত তার মোট হাদীছ সংখ্যা ১২৮টি ও মুসলিমে বর্ণিত তার মোট হাদীছ সংখ্যা ২৪২টি।

ফাতেমা (রাঃ), খাদীজা (রাঃ)ও আয়েশা (রাঃ)-এর মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ? :

মুহাদ্দিছগণের মধ্যে এটি একটি মতভেদপূর্ণ মাসআলা। এই মাসআলাতে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া কঠিন। আর কে সর্বশ্রেষ্ঠ এটা জানার মধ্যেও তেমন বিশেষ কোনো উপকারিতা নেই। নিম্বে আমরা সেসমস্ত হাদীছ পেশ করব যেখানে নারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ নারী নিয়ে বলা হয়েছে-

(১) (1) سَيِّدَاتُ نِسَاءِ أَهْلِ الْجَنَّةِ أَرْبَعٌ: مَرْيَمُ بِنْتُ عِمْرَانَ ، وَفَاطِمَةُ بِنْتُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، وَخَدِيجَةُ بِنْتُ خُوَيْلِدٍ ، وَآسِيَةُ (১) জান্নাতের মহিলাদের সরদার হবেন চারজন- মারইয়াম বিনতে ইমরান, ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ (ছাঃ), খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ এবং ফেরাঊনের স্ত্রী আসিয়া। [18]

(2) يَا فَاطِمَةُ أَلاَ تَرْضَيْنَ أَنْ تَكُونِى سَيِّدَةَ نِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ – أَوْ – سَيِّدَةَ نِسَاءِ هَذِهِ الأُمَّةِ

(২) হে ফাতেমা! তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, মুমিন মহিলাগণের সরদার তুমি হবে? এই উম্মতের মহিলাগণের সরদার তুমি হবে? [19]

(3) أَفْضَلُ نِسَاءِ أَهْلِ الْجَنَّةِ خَدِيجَةُ وَفَاطِمَةُ وَمَرْيَمُ وَآسِيَةُ

(৩) জান্নাতের মহিলাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হচ্ছে মারইয়াম, খাদীজা, ফাতিমা ও আসিয়া।[20]

(4) سُئِلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَنْ أَحَبُّ النَّاسِ إِلَيْكَ؟ قَالَ: «عَائِشَةُ»، قِيلَ لَهُ: لَيْسَ عَنْ أَهْلِكِ نَسْأَلُكَ، قَالَ: «فَأَبُوهَا»

(৪) রাসূল (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনার নিকট সবচেয়ে প্রিয় ও ভালোবাসার মানুষ কে? তিনি উত্তরে বললেন, আয়েশা। তখন তাকে বলা হলো, আপনার পরিবারের মধ্যে নয় বরং আপনার পরিবারের বাইরে কে আপনার সবচেয়ে প্রিয়? তখন রাসূল (ছাঃ) উত্তরে বললেন, তার পিতা।[21]

(5) كَمَلَ مِنَ الرِّجَالِ كَثِيرٌ ، وَلَمْ يَكْمُلْ مِنَ النِّسَاءِ إِلاَّ مَرْيَمُ بِنْتُ عِمْرَانَ ، وَآسِيَةُ امْرَأَةُ فِرْعَوْنَ ، وَفَضْلُ عَائِشَةَ عَلَى النِّسَاءِ كَفَضْلِ الثَّرِيدِ عَلَى سَائِرِ الطَّعَامِ

(৫) পুরুষদের মধ্যে অনেকেই পূর্ণতা পেয়েছে আর মহিলাদের মধ্যে শুধুমাত্র মারইয়াম ও আসিয়া পূর্ণতা পেয়েছেন। আর আয়েশার শ্রেষ্ঠত্ব নারীদের মধ্যে, যেমন ছারীদের শ্রেষ্ঠত্ব খাবারের মধ্যে।[22]

উপরের হাদীছগুলো থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ নারী হচ্ছেন পাঁচজন: আসিয়া, মারইয়াম, খাদীজা, আয়েশা, ফাতিমা। তন্মধ্যে রাসূল (ছাঃ)-এর উম্মতের মধ্যে তিনজন। তাদের দুইজন উম্মাহাতুল মুমিনীন বা রাসূল (ছাঃ)-এর স্ত্রী খাদীজা ও আয়েশা। আরেকজন রাসূল (ছাঃ)-এর মেয়ে ফাতেমা। মূসা (আঃ)-এর উম্মতের মধ্যে একজন তিনি হচ্ছেন তার প্রধান শত্রু ফেরাঊনের স্ত্রী আসিয়া। ঈসা (আঃ)-এর উম্মতের মধ্যে একজন আর তিনি হচ্ছেন স্বয়ং তার মা মারইয়াম।

আর সকলের শ্রেষ্ঠত্বের বিভিন্ন দিক রয়েছে, খাদীজা (রাঃ) ছিলেন রাসূলের বিপদের সঙ্গী। অহিপ্রাপ্ত হয়ে দিশেহারা নবী তার নিকটেই আশ্রয় পেয়েছিলেন। হেরা গুহার মতো সুউচ্চ পর্বতে তিনিই পায়ে হেঁটে আল্লাহর রাসুল (ছাঃ) -কে খাবার দিয়ে আসতেন। দুনিয়াবাসী যখন তাকে পরিত্যাগ করেছিল, তখন মাথার ছায়া হয়ে পাশে থেকে উৎসাহ দিয়ে গেছেন তিনিই। একজন মালিনী যেভাবে গাছের গোড়ায় পানি দেয় ঠিক সেভাবে রাসূল (ছাঃ)-এর নবুঅতী জীবনে দাওয়াতী বিপ্লব রচনা করতে তিনি ধন-সম্পদ, সাহস, উৎসাহ, সেবা সবকিছু রাসূল (ছাঃ)-এর পায়ের নিচে সঁপে দিয়েছেন। এজন্যই যে বছর তিনি মৃত্যুবরণ করেন, সে বছরকে রাসূল (ছাঃ)-এর জন্য দুঃখের বছর বলা হয়ে থাকে। স্বয়ং মহান আল্লাহ তাকে সালাম পাঠিয়েছেন।[23]  রাসূল (ছাঃ) কখনই তাকে ভুলতে পারতেন না। রাসূল (ছাঃ) তাকে এত অধিক স্মরণ করতেন যে, আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)-এর স্ত্রীগণের মধ্যে একমাত্র তাকে নিয়েই আয়েশা (রাঃ)-এর ঈর্ষা হত।[24]  অথচ তখন তিনি মৃত। মহান আল্লাহ তার ঘরেই রাসূল (ছাঃ) সন্তানের নে‘মত প্রদান করেছেন। রাযিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা।

অন্যদিকে আয়েশা (রাঃ) জ্ঞান-গরিমা, বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে ছিলেন সকলের উপরে। রাসূল (ছাঃ)-এর রেখে যাওয়া  ইলমকে তিনি এত অল্প বয়সে যেভাবে নিজের মধ্যে সংরক্ষণ করেছেন এবং মানুষের মাঝে তা ছড়িয়ে দিয়েছেন তা সত্যিই বিস্ময়কর। মাত্র ১৩/১৪ বছর বয়সে নিজের পবিত্রতার প্রশ্ন নিয়ে যে মহা পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিলেন এবং সেই পরীক্ষায় যেভাবে ছবর করেছিলেন তা পড়লে যেকোনো মুমিনের চোখে অশ্রুর বন্যা বইতে বাধ্য হবে। যেখানে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)-এর মৃত্যু এত বছর পরও আমাদের কাঁদায় সেখানে মাত্র ১৮ বছর বয়সে নিজের প্রাণপ্রিয় স্বামীকে হারিয়ে পরবর্তী দীর্ঘ ৪০ বছর যে ছবরের সাথে জীবিত থেকেছেন এবং ইলম ছড়িয়েছেন, তা কল্পনা করলে গা শিউরে উঠে। রাযিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা।

(চলবে)

 

[1]. সুনানে তিরমিযী, হা/৩৬৩৪।

[2]. ইবনু খুয়ায়মা, তাওহীদ, ১/৩৫৮।

[3].  ছহীহ ইবনু হিব্বান, হা/৩৮।

[4]. সুনানুল কুবরা, হা/১১০৬৩।

[5]. মুসনাদ হুমায়দী, হা/২৫৮; মুসনাদ ইসহাক্ব ইবনে রাহওয়াইহ, হা/৭৫৪।

[6].  মুসনাদে আহমাদ, হা/২৫৩০৩।

[7]. মুসনাদে আহমাদ, হা/২৫২৫২।

[8]. মু‘জামুল কাবীর, হা/৩৩৪৪।

[9].  ছহীহ মুসলিম, হা/২৩৩৩।

[10]. তারীখুল ইসলাম, ৫/৩৬২।

[11]. সুনানে তিরমিযী, হা/২৬৮০।

[12]. ইত্তিহাফুস সালিক, ইবনু নাছিরুদ্দীন, পৃঃ ১০১।

[13].  সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৬/৩৪।

[14]. ইমাম নববী, শারহুল বুখারী, ১/৪১।

[15].  প্রাগুক্ত।

[16].  ছহীহ বুখারী, হা/২৫৮১।

[17]. ইমাম নববী, শারহুল বুখারী, ১/৪১।

[18]. সিলসিলা ছহীহাহ, ৩/৪১১।

[19]. ছহীহ বুখারী, হা/৬২৮৫; ছহীহ মুসলিম, হা/২৪৫০।

[20]. মুসনাদে আহমাদ, হা/২৬৬৮; ছহীহ ইবনু হিব্বান, হা/৭০১০।

[21]. তিরমিযী, হা/৩৮৮৬।

[22]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৪১১; ছহীহ মুসলিম, হা/২৪৩১।

[23]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৮২০।

[24]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৮১৮।