অহির বাস্তবতা বিশ্লেষণ (৩য় পর্ব)

আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রাযযাক
এম. এ (অধ্যয়নরত), উলূমুল হাদীছ বিভাগ,
মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব।

(মিন্নাতুল বারী- ১০ম পর্ব)

[যে হাদীছের ব্যাখ্যা চলছে : হারিছ ইবনে হাশিম (রাঃ) রাসূল (ছাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল! কীভাবে আপনার নিকট অহি আসে? তখন রাসূল (ছাঃ) উত্তরে বললেন, কখনো অহি আসে ঘণ্টাধ্বনির মতো। আর সেটা আমার জন্য অনেক কষ্টকর হয়। যতক্ষণে তা শেষ হয় ততক্ষণে আমি অহি মুখস্থ করে ফেলি। আর কখনো ফেরেশতা মানুষের রূপ ধারণ করে আসে এবং আমার সাথে কথা বলে এবং আমি তার কথাকে সংরক্ষণ করে নিই। আয়েশা ম বলেন, আমি কঠিন শীতে রাসূল (ছাঃ)-এর উপর অহি অবতীর্ণ হতে দেখেছি; যতক্ষণে অহি শেষ হয় ততক্ষণে তার কপাল থেকে ঘামের কারণে পানি পড়তে থাকে।]

ফিক্বহী ব্যাখ্যা :

অহির সংজ্ঞা : আল্লামা যামাখশারী বলেন,  وأومي بمعنًى، ووحيت إليه وأوحيت إذا كلّمته بما تخفيه عن غيره ‘অহি করা অর্থ হচ্ছে ইশারা করা। আমি তার নিকট অহি করেছি তথা অন্যদের থেকে গোপনে তার নিকট কোনো কথা পৌঁছিয়েছি’।[1]   পবিত্র কুরআনে প্রায় সাতটি অর্থে অহি শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। যথা- ১. পাঠানো (নিসা, ১৬৩)। ২. ইশারা করা (মারইয়াম, ৯-১১)। ৩. ইলহাম করা (নাহল, ৬৮)। ৪. নির্দেশ দেওয়া (যালযালা, ৪-৫)। ৫. কথা বলা (শূরা, ৫১)। ৬. জানানো (নাজম, ১০)। ৭. ওয়াসওয়াসা (আন‘আম, ১১২)।

অহি আগমনের ধরন :

অহি আগমনের বা অহি পাঠানোর বিভিন্ন ধরন পবিত্র কুরআন ও হাদীছে পাওয়া যায়। নিম্বে সেগুলো পেশ করা হলো :

প্রথম ধরন : ইলহাম বা অন্তরে বলে দেওয়া : যেমন মহান আল্লাহ বলেন, وَأَوْحَى رَبُّكَ إِلَى النَّحْلِ أَنِ اتَّخِذِي مِنَ الْجِبَالِ بُيُوتًا وَمِنَ الشَّجَرِ وَمِمَّا يَعْرِشُونَ – ثُمَّ كُلِي مِنْ كُلِّ الثَّمَرَاتِ فَاسْلُكِي سُبُلَ رَبِّكِ ذُلُلًا يَخْرُجُ مِنْ بُطُونِهَا شَرَابٌ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ فِيهِ شِفَاءٌ لِلنَّاسِ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةً لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ ‘আর আপনার প্রতিপালক মৌমাছির নিকট অহি পাঠিয়েছেন যে, তোমরা ঘর তৈরি করো পাহাড়ে, গাছে ও মানুষ যা বানিয়েছে তাতে। আর তোমরা খাও বিভিন্ন ফল হতে, অতঃপর তোমার রবের দেখানো পথ অনুযায়ী (ঘরে ফিরে এসো!)। মৌমাছিদের পেট থেকে (এই খাবারগুলো প্রক্রিয়াজাত হয়ে) বিভিন্ন রঙের পানীয় বের হয়, যাতে রয়েছে মানুষের জন্য আরোগ্য। নিশ্চয় (মৌমাছির এই মধু তৈরির প্রক্রিয়ার মধ্যে) রয়েছে চিন্তাশীলদের জন্য নিদর্শন’ (নাহল, ৬৮-৬৯)।

উক্ত আয়াতে মহান আল্লাহ মৌমাছিদের নিকট অহি পাঠানোর কথা বলেছেন। এখানে অহি পাঠানো দ্বারা উদ্দেশ্য অন্তরে কোনো কথা বলে দেওয়া। মহান আল্লাহ সৃষ্টিগতভাবে মৌমাছিদের অন্তরে এই বাণী পাঠিয়ে দেন যেন তারা পাহাড় বা গাছের মতো উঁচু ও নিরিবিলি জায়গায় তাদের চাক তৈরি করে। অতঃপর বিভিন্ন ফল-ফুলের রস তারা ভক্ষণ করে। তাদের ভক্ষণ করা সেই রসকে তাদের পেটে প্রক্রিয়াজাত করে এমন মধু মহান আল্লাহ তৈরি করেন, যার মধ্যে মানুষের জন্য রোগমুক্তি রয়েছে। আল্লাহু আকবার!

মহান আল্লাহ আরও বলেন, وَأَوْحَيْنَا إِلَى أُمِّ مُوسَى أَنْ أَرْضِعِيهِ فَإِذَا خِفْتِ عَلَيْهِ فَأَلْقِيهِ فِي الْيَمِّ وَلَا تَخَافِي وَلَا تَحْزَنِي إِنَّا رَادُّوهُ إِلَيْكِ وَجَاعِلُوهُ مِنَ الْمُرْسَلِينَ ‘আর আমি মূসার মায়ের নিকট অহি পাঠিয়েছি যে, তুমি তোমার সন্তানকে দুধ পান করাও! যদি তুমি তার ব্যাপারে আশঙ্কা করো, তাহলে তাকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করে দাও। আর তুমি ভয় পেয়ো না এবং চিন্তা করো না। নিশ্চয় আমরা তাকে তোমার নিকট ফিরিয়ে দিব আর আমরা তাকে রাসূল করে দিব’ (ক্বাছাছ, ৭)।

উক্ত আয়াতে মূসা (আঃ)-এর মায়ের নিকট অহি করার অর্থ এটাই যে, তার অন্তরে এই কথা ইলহাম করে দেওয়া। সুতরাং উপরের দু’টি আয়াত থেকে একথা স্পষ্টভাবে বুঝা গেল যে, অহি পাঠানোর একটি ধরন হচ্ছে অন্তরে ইলহাম করা, যা নবী-রাসূল থেকে সাধারণ পরহেযগার মানুষের মনেও আল্লাহর পক্ষ থেকে ইলহাম হতে পারে।

দ্বিতীয় ধরন : পর্দার আড়াল থেকে কথা বলা : যেমন আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আঃ) ও মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর সাথে পর্দার আড়াল থেকে কথা বলেছেন। তবে দুনিয়ার মাটিতে একমাত্র মূসা (আঃ)-ই কথা বলেছেন। এজন্য তাকে ‘কালিমুল্লাহ’ বলা হয়। আর কেউ যমীনে কথা বলার সুযোগ পাননি। আমাদের রাসূল (ছাঃ) সপ্তম আসমানের উপর কথা বলেছেন। আর আদম ব জান্নাতে বলেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, وَلَمَّا جَاءَ مُوسَى لِمِيقَاتِنَا وَكَلَّمَهُ رَبُّهُ قَالَ رَبِّ أَرِنِي أَنْظُرْ إِلَيْكَ قَالَ لَنْ تَرَانِي وَلَكِنِ انْظُرْ إِلَى الْجَبَلِ فَإِنِ اسْتَقَرَّ مَكَانَهُ فَسَوْفَ تَرَانِي فَلَمَّا تَجَلَّى رَبُّهُ لِلْجَبَلِ جَعَلَهُ دَكًّا وَخَرَّ مُوسَى صَعِقًا فَلَمَّا أَفَاقَ قَالَ سُبْحَانَكَ تُبْتُ إِلَيْكَ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُؤْمِنِينَ ‘মূসা যখন আমাদের নির্দিষ্ট সময় ও জায়গায় পৌঁছল এবং তার প্রতিপালক তার সাথে কথা বলল। তখন মূসা (আঃ) বললেন, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে দেখান যাতে আপনাকে দেখতে পাই। তখন মহান আল্লাহ বললেন, তুমি কখনই আমাকে দেখতে পারবে না। বরং এই পাহাড়ের দিকে দেখো! যদি সেই পাহাড় তার জায়গায় স্থির থাকতে পারে, তাহলে আমাকে দেখতে পারবে। যখন আপনার প্রতিপালক তার তাজাল্লি (নূর) প্রকাশ করলেন পাহাড়ের উপর, তখন পাহাড় চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল এবং মূসা অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন। অতঃপর যখন মূসার জ্ঞান ফিরে আসল, তখন তিনি বললেন, হে আল্লাহ আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করছি আর আমিই প্রথম ঈমান আনয়ন করছি’ (আ‘রাফ, ১৪৩)। মহান আল্লাহ আরও বলেন, وَكَلَّمَ اللَّهُ مُوسَى تَكْلِيمًا ‘আর মহান আল্লাহ মূসার সাথে কথা বলেছেন’ (নিসা, ৬৪)।

উল্লেখ্য, অনেক বাতিল ফির্কার লোকেরা মহান আল্লাহর কথা বলাকে অস্বীকার করে থাকে। নিম্বে মহান আল্লাহর কথা বলার উপর কিছু দলীল পেশ করা হলো :

আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনের বহু জায়গায় তাঁর নিজের জন্য ডাকা শব্দ বা ডাক দেওয়া শব্দ ব্যবহার করেছেন। যেমন তিনি বলেন,  وَنَادَاهُمَا رَبُّهُمَا أَلَمْ أَنْهَكُمَا عَنْ تِلْكُمَا الشَّجَرَةِ وَأَقُلْ لَكُمَا إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمَا عَدُوٌّ مُبِينٌ ‘আপনার প্রতিপালক আদম ও হাওয়াকে ডাক দিয়ে বললেন, আমি কি তোমাদেরকে ঐ গাছ থেকে নিষেধ করেছিলাম না, এবং বলেছিলাম না যে, শয়তান তোমাদের দুইজনের প্রকাশ্য শত্রু? (আ‘রাফ, ২২)। অন্যত্র আল্লাহ বলেন وَنَادَيْنَاهُ مِنْ جَانِبِ الطُّورِ الْأَيْمَنِ ‘আর আমরা মূসাকে তার ডান দিকের তূর পাহাড়ের পাশ থেকে ডাক দিয়ে বললাম’ (মারইয়াম, ৫২)। আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন,  وَنَادَيْنَاهُ أَنْ يَاإِبْرَاهِيمُ – قَدْ صَدَّقْتَ الرُّؤْيَا إِنَّا كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ ‘আর আমরা ইবরাহীমকে ডেকে বললাম, হে ইবরাহীম! তুমি তোমার স্বপ্নকে সত্যে রূপায়ন করেছো। নিশ্চয় আমরা এভাবেই আত্মনিবেদনকারীদের প্রতিদান দিয়ে থাকি’ (ছাফফাত, ১০৪-১০৫)।

এ রকম আরও বহু আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর জন্য ডাক দেওয়া শব্দ ব্যবহার করেছেন। ঠিক তেমনি হাদীছেও এসেছে,

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ اللَّهَ تَبَارَكَ وَتَعَالَى إِذَا أَحَبَّ عَبْدًا نَادَى جِبْرِيلَ: إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَحَبَّ فُلاَنًا فَأَحِبَّهُ، فَيُحِبُّهُ جِبْرِيلُ، ثُمَّ يُنَادِي جِبْرِيلُ فِي السَّمَاءِ: إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَحَبَّ فُلاَنًا فَأَحِبُّوهُ، فَيُحِبُّهُ أَهْلُ السَّمَاءِ، وَيُوضَعُ لَهُ القَبُولُ فِي أَهْلِ الأَرْضِ.

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘নিশ্চয় মহান আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন তিনি জিবরীল (আঃ)-কে ডাক দিয়ে বলেন, নিশ্চয় মহান আল্লাহ অমুক ব্যক্তিকে ভালোবাসেন, তুমিও তাকে ভালোবাসো! তখন জিবরীল আসমানে ডাক দিয়ে বলেন, নিশ্চয় মহান আল্লাহ অমুককে ভালোবাসেন, তোমরাও তাকে ভালোবাসো! তখন আসমানবাসী তাকে ভালোবাসা শুরু করেন। এভাবে পৃথিবীবাসীর মাঝে তার ক্ববূলিয়াত বা গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়’।[2]

এমনকি কিছু হাদীছে শব্দের কথা স্পষ্ট এসেছে। যথা-

عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الخُدْرِيِّ، قَالَ: قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ” يَقُولُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ يَوْمَ القِيَامَةِ: يَا آدَمُ، يَقُولُ: لَبَّيْكَ رَبَّنَا وَسَعْدَيْكَ، فَيُنَادَى بِصَوْتٍ

আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘নিশ্চয় ক্বিয়ামতের মাঠে মহান আল্লাহ বলবেন, হে আদম! তখন আদম (আঃ) বলবেন, লাব্বাইক হে আমাদের প্রতিপালক! ওয়া সা‘দাইক! তখন মহান আল্লাহ আওয়াযসহ ডাক দিবেন…’। [3]

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أُنَيْسٍ قَالَ: سَمِعْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: يَحْشُرُ اللَّهُ العِبَادَ، فَيُنَادِيهِمْ بِصَوْتٍ يَسْمَعُهُ مَنْ بَعُدَ كَمَا يَسْمَعُهُ مَنْ قَرُبَ: أَنَا المَلِكُ، أَنَا الدَّيَّانُ.

আব্দুল্লাহ ইবনে উনাইস (রাঃ) বলেন, আমি রাসূল (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তা‘আলা সকল বান্দাকে একত্রিত করবেন এবং আওয়াযের সাথে ডাক দিয়ে বলবেন, আমিই বাদশাহ! আমিই বিচারক! তাঁর সেই আওয়ায যারা তাঁর নিকটে তারাও শুনতে পাবে, আর যারা দূরে আছে তারাও শুনতে পাবে’।[4]

এছাড়া মহান আল্লাহর কথা ও কথার শব্দ বা আওয়ায বিষয়ে আরও বহু দলীল ইমাম বুখারী (রহিঃ) তার ছহীহ বুখারীর কয়েকটি অধ্যায়ে একত্রিত করেছেন। অধ্যায়গুলো হলো-

(ক) মহান আল্লাহর বাণী, ‘শাফা‘আত কোনো উপকার দিবে না, তবে আল্লাহ যাকে অনুমতি দিবেন’ অধ্যায়।

(খ) মহান আল্লাহর বাণী, ‘আর তারা চায় মহান আল্লাহর কথা পরিবর্তন করতে’ অধ্যায়।

(গ) ‘ক্বিয়ামতের দিন নবীগণ ও অন্যদের সাথে মহান আল্লাহর কথা’ অধ্যায়।

(ঘ) ‘মূসা (আঃ)-এর সাথে মহান আল্লাহর কথা’ অধ্যায়।

(ঙ) ‘জান্নাতবাসীর সাথে মহান আল্লাহর কথা’ অধ্যায়।

তৃতীয় ধরন : ফেরেশতা পাঠানোর মাধ্যমে : আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَكَذَلِكَ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ رُوحًا مِنْ أَمْرِنَا مَا كُنْتَ تَدْرِي مَا الْكِتَابُ وَلَا الْإِيمَانُ وَلَكِنْ جَعَلْنَاهُ نُورًا نَهْدِي بِهِ مَنْ نَشَاءُ مِنْ عِبَادِنَا وَإِنَّكَ لَتَهْدِي إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ ‘আর এভাবেই আমি তোমার প্রতি অহি করেছি রূহ (কুরআন) আমার নির্দেশে; তুমি তো জনতে না কিতাব  কী ও ঈমান কী পক্ষান্তরে আমি একে করেছি আলো যা দ্বারা আমি আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা পথ-নির্দেশ করি। তুমি অবশ্যই প্রদর্শন করো সরল পথ’ (শূরা, ৫২)।

সাধারণত সকল নবী-রাসূলের নিকট অহি নিয়ে একজন ফেরেশতাই গিয়ে থাকেন আর তিনি হচ্ছেন জিবরীল (আঃ)। জিবরীল (আঃ)-এর আকৃতি ও তার আসার ধরন নিয়ে পবিত্র কুরআন ও হাদীছে যা বর্ণিত হয়েছে। তা নিম্বে পেশ করা হলো:

পবিত্র কুরআনে বর্ণিত জিবরীলের পাঁচটি গুণাবলি :  মহান আল্লাহ বলেন, إِنَّهُ لَقَوْلُ رَسُولٍ كَرِيمٍ – ذِي قُوَّةٍ عِنْدَ ذِي الْعَرْشِ مَكِينٍ – مُطَاعٍ ثَمَّ أَمِينٍ ‘নিশ্চয় তা সম্মানিত ফেরেশতার কথা। যিনি শক্তিশালী ও আরশের মালিকের নিকট উঁচু মর্যাদাসম্পন্ন। সেখানে তার কথা শোনা হয় এবং তিনি আমানতদার’ (তাকভীর, ১৯-২১)। তথা- জিবরীল (আঃ) হলেন, ১. সম্মানিত। ২. শক্তিশালী। ৩. আল্লাহর নিকট তার উঁচু মাক্বাম রয়েছে। ৪. তিনি আমানতদার। অতএব, এ রকম কোনো আশঙ্কা নেই যে, আল্লাহ তাকে অন্য কারও কাছে পাঠিয়েছিলেন আর তিনি খিয়ানত করে অন্য কারও কাছে অহি নিয়ে গেছেন বা এ রকমও কোনো আশঙ্কা নেই যে, আল্লাহ যা অহি পাঠিয়েছিলেন, তা না পৌঁছে দিয়ে মনগড়া কিছু পৌঁছে দিয়েছেন। ৫. আসমানের ফেরেশতারা তার আনুগত্য করে থাকেন।

কুরআনে বর্ণিত অহি সংক্রান্ত রাসূল (ছাঃ)-এর পাঁচটি গুণ : মহান আল্লাহ বলেন, وَمَا صَاحِبُكُمْ بِمَجْنُونٍ ‘আর আপনার সাথী পাগল নন’ (তাকভীর, ২২)। আল্লাহ আরও বলেন, وَمَا هُوَ عَلَى الْغَيْبِ بِضَنِينٍ ‘তার নিকট পৌঁছানো অহি তিনি গোপন করেন না’ (তাকভীর, ২৪)। আল্লাহ অন্যত্র বলেন, مَا ضَلَّ صَاحِبُكُمْ وَمَا غَوَى – وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى ‘আপনাদের সাথী পথভ্রষ্টও হননি এবং রাস্তা হারিয়েও ফেলেননি। আর তিনি স্বেচ্ছায় কোনো কথাও বলেন না’ (নাজম, ২-৩)। অর্থাৎ ১. রাসূল (ছাঃ) বুদ্ধি-বিবেক হারিয়ে ফেলেননি। তিনি সঠিক বিবেকের অধিকারী। ২. তিনি অহিতে স্বেচ্ছায় কোনো ভুল করেননি। ৩. অহি পৌঁছাতে তার অজান্তেও কোনো ভুল হয়নি। ৪. তিনি অহি গোপন করেননি। ৫. তিনি নিজ থেকে বানিয়ে কোনো অহি বলেননি।

অহি সংক্রান্ত সম্ভাব্য অভিযোগের যে জবাব কুরআনে বর্ণিত হয়েছে : মহান আল্লাহ বলেন, وَلَقَدْ رَآهُ بِالْأُفُقِ الْمُبِين ‘আর তিনি তাকে খোলা আসমানে (তার আসল রূপে) দেখেছেন’ (তাকবীর, ২৩)। আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন, فَاسْتَوَى – وَهُوَ بِالْأُفُقِ الْأَعْلَى – ثُمَّ دَنَا فَتَدَلَّى – فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوْ أَدْنَى – فَأَوْحَى إِلَى عَبْدِهِ مَا أَوْحَى – مَا كَذَبَ الْفُؤَادُ مَا رَأَى ‘আর যখন তিনি (নিজ আকৃতিতে) খোলা আসমানে আবির্ভূত হলেন। অতঃপর তিনি নিকটবর্তী হলেন এবং আরও নিকটবর্তী হলেন। এমনকি মাত্র দুই ধনুকের ব্যবধান রইল বা তারও কম। অতঃপর আল্লাহ তাঁর বান্দার নিকট যে অহি করার ছিল, (জিবরীলের মাধ্যমে) সেই অহিই পৌঁছিয়ে দিলেন। আর চোখ যা দেখেছে অন্তর তাতে কোনো ভুল করেনি (বরং সঠিকভাবেই তা হৃদয়ঙ্গম করেছে)’ (নাজম, ৬-১১)। অর্থাৎ ১. এমন নয় যে, মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর নিকট যিনি অহি নিয়ে আসছেন, তাকে তিনি দেখেননি। বরং তিনি তাকে ভালোভাবেই দেখেছেন এবং তার আসল আকৃতিতেই দেখেছেন। ২. শুধু তাই নয়, তিনি তাকে চিনতেও পেরেছেন। ৩. এ রকম নয় যে, দূরে থাকার কারণে তিনি তার কথা শুনতে পাননি। বরং তারা একে অপরের অতি নিকটবর্তী হয়েছিলেন। ৪. এ রকমও সন্দেহ থাকার অবকাশ নেই যে, জিবরীল (আঃ) নিজে থেকে কোনো অহি বানিয়ে পেশ করেছেন। বরং আল্লাহ যা অহি করতে চেয়েছেন, জিবরীল (আঃ) সেটাই সঠিকভাবে পৌঁছে দিয়েছেন। ৫. এ রকমও নয় যে, আল্লাহর রাসূল অহি বুঝতে বা ফেরেশতা চিনতে ভুল করেছেন। বরং তিনি সবকিছুকেই সঠিকভাবে বুঝতে পেরেছেন।

(চলবে)

[1]. আসাসুল বালাগাত, ২/৩২৪।

[2]. ছহীহ বুখারী, হা/৭৪৮৫।

[3]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৭৪১।

[4]. ছহীহ বুখারী, ‘মহান আল্লাহর কথা আর শাফা‘আত কারও উপকার দিবে না’ অধ্যায় দ্রষ্টব্য।