অহির বাস্তবতা বিশ্লেষণ (৪র্থ পর্ব)


আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রাযযাক*
(ফেব্রুয়ারি’২০ সংখ্যায় প্রকাশিতের পর)
(মিন্নাতুল বারী-১১তম পর্ব)


[যে হাদীছের ব্যাখ্যা চলছে : হিশাম ইবনু উরওয়া বলেন, আমাকে হাদীছ শুনিয়েছেন আমার পিতা উরওয়া, তিনি বলেন, আমাকে হাদীছ শুনিয়েছেন আয়েশা g, তিনি বলেন, হারেছ ইবনু হাশেম c রাসূল a-কে জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল! কীভাবে আপনার নিকট অহি আসে? তখন রাসূল a উত্তরে বললেন, কখনো অহি আসে ঘণ্টাধ্বনির মতো। আর সেটা আমার জন্য অনেক কষ্টকর হয়। যতক্ষণে তা শেষ হয় ততক্ষণে আমি অহি মুখস্থ করে ফেলি। আর কখনো ফেরেশতা মানুষের রূপ ধারণ করে আসে এবং আমার সাথে কথা বলে এবং আমি তার কথা সংরক্ষণ করে নিই। আয়েশা g বলেন, আমি কঠিন শীতে রাসূল a-এর উপর অহি অবতীর্ণ হতে দেখেছি; যতক্ষণে অহি শেষ হয় ততক্ষণে তার কপাল থেকে ঘামের কারণে পানি পড়তে থাকে।]

মানুষরূপে ফেরেশতার আগমন :

প্রথমত, এখানে ফেরেশতা বলতে জিবরীল e উদ্দেশ্য। কেননা আল্লাহর রাসূল a-এর নিকট অহি নিয়ে অন্য কোনো ফেরেশতা আসেননি; একমাত্র তিনিই এসেছিলেন।

দ্বিতীয়ত, ফেরেশতার মানুষের রূপ ধারণ করা সম্পর্কে উলামায়ে কেরামের বিভিন্ন মন্তব্য রয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, অতিরিক্ত পাখাগুলো খুলে ফেলে মানুষের রূপ ধারণ করেন।[1] হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী p বলেছেন, তুলা যেমন ফুলে থাকলে অনেক বড় দেখায় আবার চাপ দিলে সংকীর্ণ হয়ে আসে, ঠিক তেমনি ফেরেশতা নিজেকে অনেক সংকীর্ণ করে মানুষের আকৃতিতে আসে।[2] সবোর্পরি কথা হচ্ছে, মহান আল্লাহ তাদের মাঝে সে শক্তি দিয়েছেন যে, তারা চাইলে মানুষের রূপ ধারণ করতে পারে। সুতরাং মহান আল্লাহর অনুমতিতে তাদের জন্য এটা সহজ হয়ে যায়।

জিবরীল e দিহইয়া কালবীর আকৃতিতে আসতেন :

মানুষের আকৃতিতে আসার ক্ষেত্রে জিবরীল e অধিকাংশ সময় দিহইয়াতাল কালবী c নামক ছাহাবীর আকৃতিতে আসতেন।

أَنَّ جِبْرِيلَ n أَتَى النَّبِيَّ وَعِنْدَهُ أُمُّ سَلَمَةَ فَجَعَلَ يُحَدِّثُ ثُمَّ قَامَ فَقَالَ النَّبِيُّ لِأُمِّ سَلَمَةَ مَنْ هَذَا قَالَتْ هَذَا دِحْيَةُ قال فقَالَتْ أُمُّ سَلَمَةَ ايْمُ اللَّهِ مَا حَسِبْتُهُ إِلَّا إِيَّاهُ حَتَّى سَمِعْتُ خُطْبَةَ نَبِيِّ اللَّهِ يُخْبِرُ عن جِبْرِيلَ.

উসামা ইবনু যায়েদ c থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা জিবরীল e আল্লাহর রাসূল a-এর নিকটে আসলেন এমতাবস্থায় তার নিকটে উম্মে সালামা g ছিলেন। জিবরীল e আল্লাহর রাসূল a-এর সাথে কথা শেষ করে চলে গেলেন। তখন রাসূল a উম্মে সালামা g-কে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি জানো, সে কে? উম্মে সালামা g বললেন, সে দিহইয়াতুল কালবী। উম্মে সালামা g (পরবর্তীতে) বলেন, আমি তাকে দিহইয়াতুল কালবীই মনে করেছিলাম, যতক্ষণ না আমি রাসূল a-এর খুৎবা শুনলাম এবং তিনি জানালেন যে, তার নিকট জিবরীল e এসেছিলেন।[3]

অন্যত্র স্বয়ং রাসূল a বলেন,وَرَأَيْتُ جِبْرِيلَ عَلَيْهِ السَّلَامُ، فَإِذَا أَقْرَبُ مَنْ رَأَيْتُ بِهِ شَبَهًا دَحْيَةُ ‘আমি জিবরীল e-কে দেখেছি; তিনি দেখতে দিহইয়ার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ’।[4]

তবে সবসময় যে দিহইয়া c-এর আকৃতিতে আসতেন তা নয়; বরং কখনো কখনো অন্য আকৃতিতেও আসতেন। যেমন বিখ্যাত হাদীছে জিবরীলে এসেছে,

بَيْنَمَا نَحْنُ عِنْدَ رَسُولِ اللهِ ذَاتَ يَوْمٍ إِذْ طَلَعَ عَلَيْنَا رَجُلٌ شَدِيدُ بَيَاضِ الثِّيَابِ شَدِيدُ سَوَادِ الشَّعَرِ لَا يُرَى عَلَيْهِ أَثَرُ السَّفَرِ وَلَا يَعْرِفُهُ مِنَّا أَحَدٌ

‘একদিন আমরা রাসূল a-এর সাথে ছিলাম; হঠাৎ আমাদের সামনে ধবধবে সাদা পোশাকে ও কালো চুলবিশিষ্ট একজন লোক আসলেন। যার চেহারায় সফরের কোনো আলামত ছিল না; তাকে আমাদের মধ্যে কেউ চিনত না’।[5] এই হাদীছে উল্লেখিত আগন্তুক জিবরীল e ছিলেন। এ হাদীছ প্রমাণ করে যে, যদি তিনি দেখতে দিহইয়া c-এর মতো হতেন, তাহলে অবশ্যই কেউ না কেউ তাকে চিনত। যেহেতু তাকে কেউ চিনতে পারেনি, সেহেতু অবশ্যই সেদিন জিবরীল e দিহইয়া ব্যতীত আলাদা ব্যক্তির বেশ ধারণ করে এসেছিলেন।

অহির সাথে কেন ঘণ্টাধ্বনির মতো অপছন্দনীয় জিনিসের সাদৃশ্য দেওয়া হলো?

অনেকেই অভিযোগ উত্থাপন করেছেন যে, অহির মতো মর্যাদাপূর্ণ শব্দকে কেন ঘণ্টাধ্বনির মতো অপছন্দনীয় বিষয়ের শব্দের সাথে তুলনা দেওয়া হলো? এই প্রশ্নের উত্তর মুহাদ্দিছগণ বিভিন্নভাবে দিয়েছেন।

প্রথমত, ইসলামের দৃষ্টিতে ঘণ্টাধ্বনিকে যখন সুললিত করে সুমধুরভাবে কানের জন্য মধুময় করে নির্দিষ্ট তালে বাজানো হয়, তখন সেটা অপছন্দনীয় হয়। কিন্তু স্বাভাবিক ঘণ্টাধ্বনি অপছন্দনীয় নয়। আর এই হাদীছে স্বাভাবিক ঘণ্টাধ্বনির সাথে তুলনা দেওয়া হয়েছে। নির্দিষ্ট তালের কোনো বাজনার সাথে নয়।

দ্বিতীয়ত, উক্ত হাদীছে ঘণ্টাধ্বনির গুরুত্ব বা মানুষের অন্তরে তার জন্য আগ্রহ সৃষ্টি করা উদ্দেশ্য নয়; বরং ঘণ্টাধ্বনির পরস্পর আওয়াজ উদ্দেশ্য। যাতে মানুষের সামনে অহির আওয়াজের ধরনটা স্পষ্ট হয়। যেমন রাসূল a বলেছেন, ‘ইসলাম মদীনায় ফিরে আসবে, যেভাবে সাপ তার গর্তে ফিরে আসে’।[6]

উক্ত হাদীছে ইসলামের মতো মহান বিষয়ের তুলনা দেওয়া হয়েছে সাপের সাথে, যা বাহ্যিক দৃষ্টিতে কটু মনে হলেও বাস্তব উদ্দেশ্য চিন্তা করলে যৌক্তিক মনে হবে। এখানে সাপের গুরুত্ব বুঝানো উদ্দেশ্য নয়; বরং সাপ যেমন গর্ত থেকে বের হয়ে ইচ্ছামতো ঘুরাফেরা করে দিন শেষে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে নিজের গর্তে ফিরে যায়, ঠিক তেমনি ইসলাম মদীনা থেকে বের হয়ে পুরো দুনিয়া বিজয় করে একটা সময় পুরো দুনিয়া থেকে ইসলামের আসল রূপ হারিয়ে পুনরায় মদীনায় ফিরে যাবে।

এই ধরনের উদাহরণ আরো বিভিন্ন হাদীছে পাওয়া যাবে। যেমন রাসূল a-এর কবি হিসেবে বিখ্যাত ছাহাবী হাসসান c মুশরিকদের কটূক্তির জবাবে রাসূল a-কে লক্ষ্য করে বলেন, لَأَسُلَّنَّكَ مِنْهُمْ كَمَا تُسَلُّ الشَّعَرَةُ مِنَ العَجِينِ ‘(হে আল্লাহর রাসূল!) আমি আপনাকে মুশরিকদের কাব্য আক্রমণ থেকে এমনভাবে বের করে নিয়ে আসব, ঠিক যেভাবে আটা থেকে চুলকে বের করা হয়’।[7]

উক্ত হাদীছে রাসূল a-এর সাথে চুলের তুলনা করা হয়েছে। এটা বাহ্যিক দৃষ্টিতে কটু মনে হলেও বাস্তবে মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, আটার খামির থেকে চুল বের করে আনলে যেমন তার গায়ে কোনো কিছু লেগে থাকে না, ঠিক তেমনি তিনি কাব্য আক্রমণ থেকে রাসূল a-কে নিষ্কলুষভাবে বের করে আনবেন।

সুতরাং এই ধরনের সাদৃশ্যতে শারঈ দৃষ্টিতে কোনো সমস্যা নেই। ওয়াল্লাহু আ‘লাম বিছ ছওয়াব।

অহির শব্দের ধরন নিয়ে পরস্পরবিরোধী হাদীছ ও সামঞ্জস্য :

আমাদের আলোচ্য হাদীছে অহির শব্দকে ঘণ্টাধ্বনির সাথে তুলনা করা হয়েছে। অন্যদিকে অন্য কিছু হাদীছে ভিন্ন রকম তথ্য পাওয়া যায়। যথা—

উমার c থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

كَانَ رَسُولُ اللَّهِ إِذَا نَزَلَ عَلَيْهِ الْوَحْيُ يُسمع عِنْدَ وَجْهِهِ كَدَوِيِّ النَّحْلِ

‘রাসূল a-এর উপর যখন অহি অবতীর্ণ হতো, তখন তার মুখের নিকট থেকে মৌমাছির ভনভনানির মতো আওয়াজ শুনা যেত। আবূ হুরায়রা c থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল a বলেছেন,

إِذَا قَضَى اللَّهُ أَمْرًا فِي السَّمَاءِ ضَرَبَتْ الْمَلَائِكَةُ بأَجْنِحَتَهَا خُضْعَانًا لِقَوْلِهِ كَأَنَّهُ سِلْسِلَةٌ عَلَى صَفْوَانٍ

‘যখন মহান আল্লাহ আসমানে কোনো নির্দেশ জারি করেন, তখন ফেরেশতামণ্ডলী তাদের পাখা আসমানে মারতে থাকে। তাদের এই পাখার আঘাতে পাথরের উপরে জিঞ্জিরের পরস্পর আঘাতের ন্যায় শব্দ তৈরি হয়।

উপরিউক্ত দুটি হাদীছে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠানো অহির শব্দের দুই ধরনের আওয়াজের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই পরস্পরবিরোধী হাদীছের সমাধানে মুহাদ্দিছগণ যা বলেছেন, তার সারর্মম হচ্ছে, বাহ্যিক দৃষ্টিতে মতবিরোধ মনে হলেও প্রকৃত অর্থে কোনো পারস্পরিক বিরোধ নেই। বরং এই বাহ্যিক বিরোধের সমাধান হচ্ছে, অহির শব্দ যখন ফেরেশতাগণ শোনেন, তখন পাথরের উপর জিঞ্জিরের শব্দের ন্যায় শুনতে পান। অহিকে যখন মুহাম্মাদ a শোনেন, তখন ঘণ্টাধ্বনির মতো শব্দ শুনতে পান। অহিকে যখন ছাহাবায়ে কেরাম শোনেন, তখন মৌমাছির ভনভনানির মতো শুনতে পান। অর্থাৎ শ্রোতার পার্থক্য ভেদে আওয়াজের পার্থক্য হয়। ওয়াল্লাহু আ‘লাম।

অধ্যায়ের নামের সাথে হাদীছের সম্পর্ক :

আমাদের আলোচ্য অধ্যায়ের নাম ‘অহির শুরু’ কিন্তু এই হাদীছে অহির শুরু নিয়ে কোনো আলোচনা করা হয়নি। এই অভিযোগের উত্তরে মুহাদ্দিছগণ, যা বলেছেন তার সারর্মম নিম্নরূপ :

প্রথমত, এই হাদীছে অহির যে ধরনগুলো বলা হয়েছে, সেগুলোর কোনো একটা মাধ্যম দিয়েই হয়তো অহির যাত্রা শুরু হয়েছে। সুতরাং অধ্যায় ও হাদীছের মধ্যে কোনো সমস্যা নেই।

দ্বিতীয়ত, এই অধ্যায়ে শুধু অহি শুরুর ইতিহাস বলা উদ্দেশ্য নয়; বরং অহি সংশ্লিষ্ট সবকিছুর বর্ণনা দেওয়া উদ্দেশ্য। তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, অহি অবতীর্ণ হওয়ার পদ্ধতিসমূহের আলোচনা, যা এই হাদীছে আলোচিত হয়েছে। সুতরাং অধ্যায় ও হাদীছের মধ্যে সামঞ্জস্য তথা সম্পর্ক স্পষ্ট।

শিক্ষণীয় বিষয় :

১. ইলমী বিষয়ে জিজ্ঞেস করা জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম।

২. ফেরেশতা মানুষের রূপ ধারণ করতে পারে।

৩. অহি অনেক ভারী বিষয়, যা বহন করা বা গ্রহণ করা অনেক কষ্টের।

৪. মানুষের সাথে মহান আল্লাহর যোগাযোগের বা অহি আসার কয়েকটি মাধ্যম হতে পারে, যেমনটি হাদীছে ফুটে উঠেছে।

৫. রাসূল a মাটির তৈরি, যার ফলে অহি গ্রহণ করতে তার এত কষ্ট হয়েছে।

(চলবে)


(বিজ্ঞাপন-জামি‘আহতে দানের জন্য ‘অর্ধেক’ পৃষ্ঠা)

* এম. এ (অধ্যয়নরত), উলূমুল হাদীছ বিভাগ, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব।

 

[1]. ফাতহুল বারী, ১/২৬।

[2]. প্রাগুক্ত।

[3]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৬৩৪; ছহীহ মুসলিম, হা/২৪৫১।

[4]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৭১।

[5]. ছহীহ মুসলিম, হা/১; তিরমিযী, হা/২৬১০।

[6]. ছহীহ বুখারী, হা/১৮৭৬; ছহীহ মুসলিম, হা/১৪৬।

[7]. ছহীহ বুখারী, হা/৪১৪৫; ছহীহ মুসলিম, হা/২৪৯০।