অহির বাস্তবতা বিশ্লেষণ (৫ম পর্ব)
আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রাযযাক*
(মিন্নাতুল বারী- ১২তম পর্ব)


হাদীছ নং : ৩

حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ بُكَيْرٍ، قَالَ: حَدَّثَنَا اللَّيْثُ، عَنْ عُقَيْلٍ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، عَنْ عُرْوَةَ بْنِ الزُّبَيْرِ، عَنْ عَائِشَةَ أُمِّ الْمُؤْمِنِينَ أَنَّهَا قَالَتْ: أَوَّلُ مَا بُدِئَ بِهِ رَسُولُ اللهِ مِنَ الْوَحْيِ الرُّؤْيَا الصَّالِحَةُ فِي النَّوْمِ، فَكَانَ لَا يَرَى رُؤْيَا إِلَّا جَاءَتْ مِثْلَ فَلَقِ الصُّبْحِ، ثُمَّ حُبِّبَ إِلَيْهِ الْخَلَاءُ، وَكَانَ يَخْلُو بِغَارِ حِرَاءٍ، فَيَتَحَنَّثُ فِيهِ وَهُوَ التَّعَبُّدُ اللَّيَالِيَ ذَوَاتِ الْعَدَدِ قَبْلَ أَنْ يَنْزِعَ إِلَى أَهْلِهِ ، وَيَتَزَوَّدُ لِذَلِكَ، ثُمَّ يَرْجِعُ إِلَى خَدِيجَةَ فَيَتَزَوَّدُ لِمِثْلِهَا، حَتَّى جَاءَهُ الْحَقُّ وَهُوَ فِي غَارِ حِرَاءٍ، فَجَاءَهُ الْمَلَكُ فَقَالَ: اقْرَأْ، قَالَ: مَا أَنَا بِقَارِئٍ. قَالَ: فَأَخَذَنِي فَغَطَّنِي حَتَّى بَلَغَ مِنِّي الْجَهْدُ، ثُمَّ أَرْسَلَنِي فَقَالَ: اقْرَأْ، قُلْتُ مَا أَنَا بِقَارِئٍ، فَأَخَذَنِي فَغَطَّنِي الثَّانِيَةَ حَتَّى بَلَغَ مِنِّي الْجَهْدُ، ثُمَّ أَرْسَلَنِي فَقَالَ: اقْرَأْ، فَقُلْتُ مَا أَنَا بِقَارِئٍ، فَأَخَذَنِي فَغَطَّنِي الثَّالِثَةَ، ثُمَّ أَرْسَلَنِي فَقَالَ: {اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ – خَلَقَ الإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ – اقْرَأْ وَرَبُّكَ الأَكْرَمُ} فَرَجَعَ بِهَا رَسُولُ اللهِ يَرْجُفُ فُؤَادُهُ، فَدَخَلَ عَلَى خَدِيجَةَ بِنْتِ خُوَيْلِدٍ i فَقَالَ: زَمِّلُونِي زَمِّلُونِي فَزَمَّلُوهُ حَتَّى ذَهَبَ عَنْهُ الرَّوْعُ، فَقَالَ لِخَدِيجَةَ وَأَخْبَرَهَا الْخَبَرَ: لَقَدْ خَشِيتُ عَلَى نَفْسِي فَقَالَتْ خَدِيجَةُ: كَلَّا وَاللهِ مَا يُخْزِيكَ اللهُ أَبَدًا، إِنَّكَ لَتَصِلُ الرَّحِمَ، وَتَحْمِلُ الْكَلَّ، وَتَكْسِبُ الْمَعْدُومَ، وَتَقْرِي الضَّيْفَ، وَتُعِينُ عَلَى نَوَائِبِ الْحَقِّ. فَانْطَلَقَتْ بِهِ خَدِيجَةُ حَتَّى أَتَتْ بِهِ وَرَقَةَ بْنَ نَوْفَلِ بْنِ أَسَدِ بْنِ عَبْدِ الْعُزَّى، ابْنَ عَمِّ خَدِيجَةَ، وَكَانَ امْرَأً تَنَصَّرَ فِي الْجَاهِلِيَّةِ، وَكَانَ يَكْتُبُ الْكِتَابَ الْعِبْرَانِيَّ، فَيَكْتُبُ مِنَ الْإِنْجِيلِ بِالْعِبْرَانِيَّةِ مَا شَاءَ اللهُ أَنْ يَكْتُبَ، وَكَانَ شَيْخًا كَبِيرًا قَدْ عَمِيَ، فَقَالَتْ لَهُ خَدِيجَةُ : يَا ابْنَ عَمِّ، اسْمَعْ مِنَ ابْنِ أَخِيكَ. فَقَالَ لَهُ وَرَقَةُ : يَا ابْنَ أَخِي مَاذَا تَرَى؟ فَأَخْبَرَهُ رَسُولُ اللهِ خَبَرَ مَا رَأَى، فَقَالَ لَهُ وَرَقَةُ: هَذَا النَّامُوسُ الَّذِي نَزَّلَ اللهُ عَلَى مُوسَى، يَا لَيْتَنِي فِيهَا جَذَعًا، لَيْتَنِي أَكُونُ حَيًّا إِذْ يُخْرِجُكَ قَوْمُكَ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ أَوَمُخْرِجِيَّ هُمْ؟! قَالَ: نَعَمْ. لَمْ يَأْتِ رَجُلٌ قَطُّ بِمِثْلِ مَا جِئْتَ بِهِ إِلَّا عُودِيَ، وَإِنْ يُدْرِكْنِي يَوْمُكَ أَنْصُرْكَ نَصْرًا مُؤَزَّرًا. ثُمَّ لَمْ يَنْشَبْ وَرَقَةُ أَنْ تُوُفِّيَ ، وَفَتَرَ الْوَحْيُ. تابَعَهُ عَبْدُ اللهِ بْنُ يُوسُفَ وأَبُو صالِحٍ. وتابَعَهُ هِلالُ بْنُ رَدَّادٍ عن الزُّهْرِيِّ. وقالَ يُونُسُ ومَعْمَرٌ:  بَوادِرُهُ.

অনুবাদ :

ইমাম বুখারী p বলেন, আমাকে ইয়াহইয়া ইবনু বুকায়র হাদীছ শুনিয়েছেন; তিনি বলেন, তাকে লায়ছ হাদীছ শুনিয়েছেন; তিনি বলেন, তাকে উকায়ল হাদীছ শুনিয়েছেন; তিনি ইবনু শিহাব থেকে, তিনি উরওয়া ইবনু যুবায়ের থেকে, তিনি আয়েশা g থেকে,  তিনি  বলেন,  সর্বপ্রথম  সত্য

স্বপ্নের মাধ্যমে রাসূল a-এর নিকট অহীর আগমন শুরু হয়। তিনি যে স্বপ্নই দেখতেন না কেন সেই স্বপ্ন সকালের মতো তার সামনে সত্যরূপে প্রকাশিত হতো। অতঃপর তার কাছে একাকিত্ব ভালো লাগতে লাগল। তিনি হেরা গুহায় একাকী থাকতেন এবং রাত্রিকালীন ইবাদতে মগ্ন থাকতেন- যতক্ষণ না পরিবারের কাছে ফিরে প্রয়োজনীয় জিনিস নেওয়ার প্রয়োজন না হতো। অতঃপর তিনি খাদীজা g-এর নিকট ফিরে আসতেন তিনি তার জন্য অনুরূপ পাথেয় প্রস্তুত করে দিতেন। এভাবেই তার নিকট একদিন মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অহী চলে আসে এমতাবস্থায় তিনি হেরা গুহায় ছিলেন। ফেরেশতা তার নিকটে এসে তাকে বললেন, পডুন! তিনি বললেন, আমি পড়া জানি না। রাসূল a বলেন, ফেরেশতা আমাকে ধরলেন এবং চাপ দিলেন। পুনরায় বললেন, পড়ুন! আমি বললাম, আমি পড়া জানি না। ফেরেশতা আমাকে পুনরায় ধরলেন এবং চাপ দিলেন অতঃপর আমাকে ছেড়ে দিলেন এবং বললেন, পড়ুন! আমি বললাম, আমি পড়া জানি না। তিনি আমাকে আবারও সজোরে চাপ দিলেন অতঃপর তিনি বললেন, ‘পড়ুন! আপনার প্রতিপালকের নামে যিনি আপনাকে সৃষ্টি করেছেন। যিনি মানুষকে জমাটবাধা রক্ত হতে সৃষ্টি করেছেন। পড়ুন! আর আপনার প্রতিপালক মহাসম্মানিত’।

এই আয়াতগুলো নিয়ে আল্লাহর রাসূল ফিরে আসলেন এমতাবস্থায় তার বুক ধড়ফড় করছিল। তিনি খাদীজা g-এর নিকটে আসলেন এবং বললেন, আমাকে চাদর দাও! চাদর দিয়ে ঢেকে দাও! অতঃপর খাদীজা g তাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দিলেন। অতঃপর তার ভয় কেটে গেলে খাদীজা g-কে তিনি পুরো ঘটনা জানালেন এবং বললেন, আমি আমার জীবনের ভয় পাচ্ছি। তখন খাদীজা g বললেন, আল্লাহর কসম! কখনোই নয়! মহান আল্লাহ আপনাকে কখনোই অপমানিত করবেন না। নিশ্চয় আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করেন, দুর্বলের বোঝা বহন করেন, নিঃস্বকে সহযোগিতা করেন, মেহমানের সম্মান করেন, বিপদ-আপদে মানুষকে সাহায্য করেন। অতঃপর খাদীজা g তাকে সাথে করে নিয়ে তার চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবনু নওফেলের নিকট নিয়ে গেলেন। যিনি জাহেলী যুগে খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং তিনি হিব্রু ভাষায় বই লিখতেন। তিনি ইঞ্জীল গ্রন্থকে হিব্রু ভাষায় যতদূর আল্লাহ তাওফীক্ব দিয়েছিলেন লিখেছিলেন। তিনি একজন বৃদ্ধ ও অন্ধ মানুষ ছিলেন। খাদীজা g তাকে বললেন, হে আমার চাচার ছেলে! আপনার ভাইয়ের ছেলে কী বলে শুনুন! তখন ওয়ারাকা মুহাম্মাদ a-কে বললেন, আপনি কী দেখেছেন? রাসূল a যা দেখেছিলেন তাকে তা জানালেন। অতঃপর ওয়ারাকা বললেন, ইনিই সেই ‘নামূস’ যাকে মহান আল্লাহ মূসার নিকট পাঠিয়েছিলেন। হায়! আমি যদি সেদিন বেঁচে থাকতাম যেদিন তোমার জাতি তোমাকে বের করে দিবে! তখন রাসূল a বললেন, সত্যিই কি আমার জাতি আমাকে বের করে দিবে? হ্যাঁ, ইতোপূর্বে কোনো ব্যক্তির নিকটে এই লোক প্রেরিত হয়েছেন আর তাকে তার জাতি বের করে দেয়নি এমনটা হয়নি। তবে তোমার সাথে যেদিন এমন ঘটবে সেদিন যদি আমি বেঁচে থাকি আমি তোমাকে পরিপূর্ণ সহযোগিতা করব। এর কিছুদিন পর ওয়ারাকা c ইন্তেকাল করেন। আর অহী স্থগিত হয়ে যায়।

আব্দুল্লাহ ইবনু ইউসুফ p ও আবূ ছালেহ p অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। হেলাল ইবনু রাদদাদ p যুহরী p থেকেও অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। ইউনুস ও মা‘মার q فؤاده এর স্থলে بَوَادِرُهُ শব্দ উল্লেখ করেছেন।

তাখরীজ : ইমাম বুখারী এই হাদীছকে ইয়াহইয়া ইবনু বুকায়র ও আব্দুল্লাহ ইবনু ইউসুফ থেকে বর্ণনা করেছেন, তারা দুই জন লায়ছ ইবনু সা‘দ থেকে তিনি উকায়ল ইবনু খালেদ থেকে। ইমাম বুখারী হাদীছটি আরও শুনেছেন আব্দুল্লাহ ইবনু মুহাম্মাদ থেকে। ইমাম মুসলিম (কিতাবুল ঈমান, হা/১৬০) হাদীছটি শুনেছেন মুহাম্মাদ ইবনু রা‘ফে থেকে। তারা দুই জন (আব্দুল্লাহ ইবনু মুহাম্মাদ ও মুহাম্মাদ ইবনু রা‘ফে) আব্দুর রাযযাক থেকে তিনি মা‘মার থেকে। ইমাম মুসলিম (কিতাবুল ঈমান, হা/১৬০) হাদীছটি আরও শুনেছেন আবূত্ব ত্বহের আহমাদ ইবনু আমর থেকে, তিনি আব্দুল্লাহ ইবনু ওয়াহাব থেকে, তিনি ইউনুস ইবনু ইয়াযীদ আল-আয়লী থেকে। ইমাম হাকেম (হা/৪৮৭১) হাদীছটিকে আব্দুল্লাহ ইবনু মুআয আস-সানআনী c-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (হা/৩৬৩২) হাদীছটি মুহাম্মাদ ইবনু ইসহাক্বের সূত্রে বর্ণনা করেছেন। উকায়ল ইবনু খালেদ, মা‘মার, ইয়াযীদ, আব্দুল্লাহ ইবনু মুআয, মুহাম্মাদ ইবনু ইসহাক্ব সকলেই হাদীছটিকে শব্দের বিভিন্নতা ও অর্থের একতার সাথে ইমাম যুহরী থেকে বর্ণনা করেন। তথা এই হাদীছের সকল সনদের কেন্দ্রস্থল ইমাম যুহরী। ইমাম যুহরী হাদীছটি বর্ণনা করেছেন উরওয়া থেকে, তিনি আয়েশা g থেকে। ইমাম বুখারী হাদীছটি তার ছহীহ বুখারী গ্রন্থে আরও ছয় জায়গায় এনেছেন— কিতাবুল আম্বিয়া (হা/৩৩৯২); কিতাবুত তাফসীর (হা/৪৯৫৩, ৪৯৫৫, ৪৯৫৬, ৪৯৫৭); কিতাবু তাবীর (৬৯৮২)। এছাড়া কুতুবে সিত্তাহর অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে শুধু ইমাম মুসলিম ও ইমাম তিরমিযী এই হাদীছটি তাদের গ্রন্থে এনেছেন। ছহীহ মুসলিম কিতাবুল ঈমান (হা/১৬০); সুনানে তিরমিযী, আবওয়াবুল মানাকিব (হা/৩৬৩২)।

রাবীগণের পরিচয় :

(১) ইয়াহইয়া ইবনু বুকায়র : তিনি ইয়াহইয়া ইবনু আব্দুল্লাহ ইবনু বুকায়র। লায়ছ ইবনু সা‘দের শ্রেষ্ঠ ও সবচেয়ে মযবূত ছাত্রগণের একজন। তার দাদার নাম বুকায়র। তার দাদার দিকে নিসবাত করেই তাকে স্মরণ করা হয়। তারা দাদার প্রসিদ্ধির কারণে। ইমাম যাহাবী p তার বিষয়ে বলেন,كان غزير العلم، عارفا بالحديث وأيام الناس، بصيرا بالفتوى، صادقا دينا، وما أدري ما لاح للنسائي منه حتى ضعفه، وقال مرة : ليس بثقة. وهذا جرح مردود، فقد احتج به الشيخان، وما علمت له حديثا منكرا حتى أورده ‘তিনি অনেক জ্ঞানী ছিলেন। হাদীছ ও ইতিহাস সম্পের্ক জানতেন। ফৎওয়া বিষয়ে সম্যক অবগত ছিলেন। দ্বীনদার পরহেযগার ছিলেন। আর আমি জানি না কেন নাসাঈ তার বিষয়ে দুর্বলতাসূচক মন্তব্য করেছেন। তার এই জারহটি পরিত্যাজ্য। কেননা ইয়াহইয়া ইবনু বুকায়রের হাদীছ শায়খায়ন গ্রহণ করেছেন। আর আমি তার পক্ষ থেকে কোনো মুনকার হাদীছ পাইনি’।[1]

(২) লায়ছ : তার পূর্ণ নাম। লায়ছ ইবনু সা‘দ ইবনু আব্দুর রহমান আল-ফাহমী। তার কুনিয়াত বা উপনাম আবুল হারেছ। তিনি বিখ্যাত ফক্বীহগণের একজন। মিসরের ইমাম হিসেবে তাকে গণ্য করা হতো। ইমাম শাফেঈ তার ফিক্বহের অনেক প্রশংসা করেছেন। তার নামে মাযহাব পর্যন্ত তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তার ছাত্ররা উস্তাযের ফিক্বহকে ধরে রাখতে পারেনি। তিনি অনেক বড় তাবেঈদের থেকে হাদীছ শুনেছেন। তন্মধ্যে অন্যতম ইবনু শিহাব যুহরী, সাইদ আল-মাকবূরী, নাফে ও আতা ইবনু আবী রাবাহ প্রমুখ। লায়ছের ছাত্রগণের মধ্যে অন্যতম মুহাম্মাদ ইবনু আজলান, আব্দুল্লাহ ইবনু মুবারক ও ইয়াহইয়া ইবনু বুকায়র প্রমুখ।

তিনি আরবী সাহিত্য, কবিতা, নাহু-ছরফ ও হাদীছ থেকে শুরু করে ইলমের সকল জগতে ভালো পারদর্শিতা রাখতেন। তার সাথে ইমাম মালেকের কিছু চিঠি আদান-প্রদান হয়েছিল। তবে তিনি মুওয়াত্ত্বা ইমাম মালেক থেকে শুনেছেন কিনা এই বিষয়ে ইমামগণের মধ্যে মতভেদ আছে। তিনি অনেক টাকা-পয়সার মালিক ছিলেন। প্রতি বছর প্রায় ৮০ হাজার দীনার ইনকাম করতেন। কিন্তু এত পরিমাণে দান করতেন যে, যাকাত দেওয়ার সম্পদ কোনো সময়ই তার কাছে এক বছর জমা থাকেনি। ফলত তিনি কখনো যাকাত আদায় করতে পারেননি। ইমাম শাফেঈ বলেন, ইমাম মালেকের চেয়ে লায়ছ বেশি ফিক্বহ বুঝতেন। কিন্তু তার ছাত্ররা তার জ্ঞানের যত্ন নেয়নি। ক্বাযী ইবনু খল্লিকান বলেন, ইমাম লায়ছ নির্দিষ্ট কোনো মাযহাবের অনুসারী ছিলেন না।[2]

(৩) উকায়ল : আইনে পেশ দিয়ে পড়তে হবে। আকীল পড়লে ভুল হবে, কেননা তার দাদার নাম আকীল। আইনে যবর ও কাফে যের দিয়ে। তার পূর্ণ নাম হচ্ছে উকায়ল ইবনু খালেদ ইবনু আকীল। তিনি উছমান ইবনু আফফান c-এর আযাদকৃত গোলাম।

ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন বলেন, أثبت من روى عن الزهري مالكٌ، ثم مَعْمَرٌ، ثم عُقيل ‘ইমাম যুহরী থেকে বর্ণনাকারী সবচেয়ে মযবূত ছাত্রগণ হচ্ছেন ইমাম মালেক, মা‘মার ও উকায়ল’।[3]

(৪) যুহরী : তিনি আল-ইমাম আবূ বকর মুহাম্মাদ ইবনু মুসলিম ইবনু ওবায়দুল্লাহ ইবনু আব্দুল্লাহ ইবনু শিহাব আয-যুহরী। শামের অধিবাসী। বিখ্যাত তাবেঈ। তিনি আব্দুল্লাহ ইবনু উমার h-কে দেখেছেন কিন্তু তার থেকে হাদীছ শুনেননি। আনাস c ও সাহল ইবনু সা‘দ আস-সায়িদী cসহ প্রমুখ ছাহাবী থেকে তিনি হাদীছ শুনেছেন। তার শিক্ষক ও ছাত্রের সংখ্যা প্রচুর পরিমাণে হওয়ার ফলে তিনি বহু হাদীছের সনদেও কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়ে গেছেন। সব সনদ তার কাছে এসে জমা হয়েছে আবার তার কাছে থেকে বিভিন্ন সনদে রূপ নিয়ে পুরো দুনিয়াতে ছড়িয়ে পড়েছে। তার স্মৃতিশক্তি প্রচণ্ড প্রখর। তিনি মাত্র ৮০ দিনে কুরআন মুখস্থ করেছিলেন। তিনি নিজেই বলেছেন, তিনি যা শুনেন তা তিনি ভুলেন না। তার মযবূতী ও গ্রহণযোগ্যতার বিষয়ে কোনো মতভেদ নাই। তবে তিনি মুরসাল হাদীছ বর্ণনা করতেন। তার বর্ণিত মুরসাল হাদীছ তাহক্বীক্বের পরেই গ্রহণ করতে হবে।[4]

(৫) উরওয়া ইবনু যুবায়র ইবনু আওয়াম : পূর্বে আলোচনা হয়ে গেছে।

(৬) আয়েশা বিনতু আবী বাকর : পূর্বে আলোচনা হয়ে গেছে।

সনদের সূক্ষ্মতা :

(১) আয়েশা g এই ঘটনা দেখেননি বা ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন না। এই ঘটনার সময় তার জন্মই হয়নি। হয় তিনি ঘটনাটি স্বয়ং রাসূল a থেকে শুনেছেন, তাহলে এটা তার নিজের মুসনাদ। অথবা তিনি এই ঘটনা অন্য ছাহাবী থেকে শুনেছেন, তাহলে এটা তার জন্য মুরসাল। ছাহাবীগণ যে সমস্ত বর্ণনা অন্য ছাহাবী থেকে শুনে বর্ণনা করেন সে সমস্ত বর্ণনাকে মুরসাল ছাহাবী বলা হয়। নামকরণের দিক থেকে তা মুরসাল ছাহাবী হলেও হুকুমের দিক থেকে তা মুসনাদ মুত্তাছিল বা সংযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য। কেননা যেহেতু সকল ছাহাবী ন্যায়পরায়ণ সেহেতু ছাহাবীর জাহালাত বা অপরিচিত হওয়াতে কোনো সমস্যা নাই। অতএব, বর্ণনাকারী ছাহাবী অন্য যে ছাহাবী থেকে হাদীছটি শুনলেন তা জানা না থাকলেও সমস্যা নাই।

(২) এই হাদীছের সব রাবী কুতুবে সিত্তাহর রাবী। শুধু ইয়াহইয়া ইবনু বুকায়র ব্যতীত।

(৩) এই সনদে পরস্পর দুইজন তাবেঈ একজন আরেকজন থেকে হাদীছ বর্ণনা করেছেন। যুহরী উরওয়া থেকে।

(৪) হাদীছের শেষে ইমাম বুখারী এই হাদীছের কিছু মুত্বাবাআত ও বর্ণনার পার্থক্য উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন,تَابَعَهُ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ يُوسُفَ، وَأَبُو صَالِحٍ  এই বক্যের তাবাআহু-এর সর্বনাম দ্বারা ইয়াহইয়া ইবনু বুকায়র উদ্দেশ্য। তথা ইয়াহইয়া ইবনু বুকায়রের মুত্বাবাআত করেছে আরও দুইজন আব্দুল্লাহ ইবনু ইউসুফ ও আবূ ছালেহ। তথা উক্ত হাদীছটি ইমাম বুখারী তিন জন শায়খের থেকে শুনেছেন এক জনের নাম তিনি মূল হাদীছের সাথে নিয়েছেন আর বাকী দুই জনের নাম তিনি মুত্বাবাআত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এই তিন জন তথা ইয়াহইয়া, আব্দুল্লাহ ইবনু ইউসুফ ও আবূ ছালেহ সকলেই হাদীছটি লায়ছ ইবনু সা‘দ থেকে বর্ণনা করেছেন।

وَتَابَعَهُ هِلاَلُ بْنُ رَدَّادٍ عَنِ الزُّهْرِيِّ.

এখানে সর্বনাম দ্বারা উকায়ল উদ্দেশ্য। তথা ইমাম যুহরী থেকে এই হাদীছটি শুধু উকায়ল বর্ণনা করেছে এমন নয়; বরং হাদীছটি ইমাম যুহরী থেকে হেলাল ইবনু রাদ্দাদও শুনেছে।

وَقَالَ يُونُسُ وَمَعْمَرٌ بَوَادِرُهُ.

এখানে ইমাম বুখারী বর্ণনার পার্থক্য উল্লেখ করেছেন। দীর্ঘ হাদীছে ইমাম যুহরী থেকে যখন উকায়ল বর্ণনা করেছে তখন সেখানে আল্লাহর রাসূলের ভীতসন্ত্রস্ত বুঝাতে গিয়ে অন্তরের আরবী শব্দ ফুয়াদ ব্যবহার করা হয়েছে। তথা তার অন্তর কাঁপছিল বা ধকধক করছিল। অন্যদিকে ইউনুস ও মা‘মার যখন হাদীছটি যুহরী থেকে বর্ণনা করেছে তখন তারা ফুয়াদের পরিবর্তে বাদিরাতুন এর বহুবচন বাওয়াদির ব্যবহার করেছে। তথা কাঁধ ও ঘাড়ের মধ্যের জায়গা কাঁপছিল।


[1]. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১০/৬১৩।

[2]. আজুলুনী, ফায়যুল জারী, ১/১৪৭।

[3]. তাযকিরাতুল হুফফায, ১/১৬১।

[4]. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১০/৪৫।