অহির বাস্তবতা বিশ্লেষণ (৬ষ্ঠ পর্ব)

আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রাযযাক*


[যে হাদীছের ব্যাখ্যা চলছে :

حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ بُكَيْرٍ، قَالَ: حَدَّثَنَا اللَّيْثُ، عَنْ عُقَيْلٍ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، عَنْ عُرْوَةَ بْنِ الزُّبَيْرِ، عَنْ عَائِشَةَ أُمِّ الْمُؤْمِنِينَ أَنَّهَا قَالَتْ: أَوَّلُ مَا بُدِئَ بِهِ رَسُولُ اللهِ مِنَ الْوَحْيِ الرُّؤْيَا الصَّالِحَةُ فِي النَّوْمِ، فَكَانَ لَا يَرَى رُؤْيَا إِلَّا جَاءَتْ مِثْلَ فَلَقِ الصُّبْحِ، ثُمَّ حُبِّبَ إِلَيْهِ الْخَلَاءُ، وَكَانَ يَخْلُو بِغَارِ حِرَاءٍ، فَيَتَحَنَّثُ فِيهِ وَهُوَ التَّعَبُّدُ اللَّيَالِيَ ذَوَاتِ الْعَدَدِ قَبْلَ أَنْ يَنْزِعَ إِلَى أَهْلِهِ ، وَيَتَزَوَّدُ لِذَلِكَ، ثُمَّ يَرْجِعُ إِلَى خَدِيجَةَ فَيَتَزَوَّدُ لِمِثْلِهَا، حَتَّى جَاءَهُ الْحَقُّ وَهُوَ فِي غَارِ حِرَاءٍ، فَجَاءَهُ الْمَلَكُ فَقَالَ: اقْرَأْ، قَالَ: مَا أَنَا بِقَارِئٍ. قَالَ: فَأَخَذَنِي فَغَطَّنِي حَتَّى بَلَغَ مِنِّي الْجَهْدُ، ثُمَّ أَرْسَلَنِي فَقَالَ: اقْرَأْ، قُلْتُ مَا أَنَا بِقَارِئٍ، فَأَخَذَنِي فَغَطَّنِي الثَّانِيَةَ حَتَّى بَلَغَ مِنِّي الْجَهْدُ، ثُمَّ أَرْسَلَنِي فَقَالَ: اقْرَأْ، فَقُلْتُ مَا أَنَا بِقَارِئٍ، فَأَخَذَنِي فَغَطَّنِي الثَّالِثَةَ، ثُمَّ أَرْسَلَنِي فَقَالَ: {اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ – خَلَقَ الإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ – اقْرَأْ وَرَبُّكَ الأَكْرَمُ} فَرَجَعَ بِهَا رَسُولُ اللهِ يَرْجُفُ فُؤَادُهُ، فَدَخَلَ عَلَى خَدِيجَةَ بِنْتِ خُوَيْلِدٍ i فَقَالَ: زَمِّلُونِي زَمِّلُونِي فَزَمَّلُوهُ حَتَّى ذَهَبَ عَنْهُ الرَّوْعُ، فَقَالَ لِخَدِيجَةَ وَأَخْبَرَهَا الْخَبَرَ: لَقَدْ خَشِيتُ عَلَى نَفْسِي فَقَالَتْ خَدِيجَةُ: كَلَّا وَاللهِ مَا يُخْزِيكَ اللهُ أَبَدًا، إِنَّكَ لَتَصِلُ الرَّحِمَ، وَتَحْمِلُ الْكَلَّ، وَتَكْسِبُ الْمَعْدُومَ، وَتَقْرِي الضَّيْفَ، وَتُعِينُ عَلَى نَوَائِبِ الْحَقِّ. فَانْطَلَقَتْ بِهِ خَدِيجَةُ حَتَّى أَتَتْ بِهِ وَرَقَةَ بْنَ نَوْفَلِ بْنِ أَسَدِ بْنِ عَبْدِ الْعُزَّى، ابْنَ عَمِّ خَدِيجَةَ، وَكَانَ امْرَأً تَنَصَّرَ فِي الْجَاهِلِيَّةِ، وَكَانَ يَكْتُبُ الْكِتَابَ الْعِبْرَانِيَّ، فَيَكْتُبُ مِنَ الْإِنْجِيلِ بِالْعِبْرَانِيَّةِ مَا شَاءَ اللهُ أَنْ يَكْتُبَ، وَكَانَ شَيْخًا كَبِيرًا قَدْ عَمِيَ، فَقَالَتْ لَهُ خَدِيجَةُ : يَا ابْنَ عَمِّ، اسْمَعْ مِنَ ابْنِ أَخِيكَ. فَقَالَ لَهُ وَرَقَةُ : يَا ابْنَ أَخِي مَاذَا تَرَى؟ فَأَخْبَرَهُ رَسُولُ اللهِ خَبَرَ مَا رَأَى، فَقَالَ لَهُ وَرَقَةُ: هَذَا النَّامُوسُ الَّذِي نَزَّلَ اللهُ عَلَى مُوسَى، يَا لَيْتَنِي فِيهَا جَذَعًا، لَيْتَنِي أَكُونُ حَيًّا إِذْ يُخْرِجُكَ قَوْمُكَ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ أَوَمُخْرِجِيَّ هُمْ؟! قَالَ: نَعَمْ. لَمْ يَأْتِ رَجُلٌ قَطُّ بِمِثْلِ مَا جِئْتَ بِهِ إِلَّا عُودِيَ، وَإِنْ يُدْرِكْنِي يَوْمُكَ أَنْصُرْكَ نَصْرًا مُؤَزَّرًا. ثُمَّ لَمْ يَنْشَبْ وَرَقَةُ أَنْ تُوُفِّيَ ، وَفَتَرَ الْوَحْيُ. تابَعَهُ عَبْدُ اللهِ بْنُ يُوسُفَ وأَبُو صالِحٍ. وتابَعَهُ هِلالُ بْنُ رَدَّادٍ عن الزُّهْرِيِّ. وقالَ يُونُسُ ومَعْمَرٌ:  بَوادِرُهُ.

অনুবাদ :

ইমাম বুখারী p বলেন, আমাকে ইয়াহইয়া ইবনু বুকায়র হাদীছ শুনিয়েছেন; তিনি বলেন, তাকে লায়ছ হাদীছ শুনিয়েছেন; তিনি বলেন, তাকে উকায়ল হাদীছ শুনিয়েছেন;

তিনি ইবনু শিহাব থেকে, তিনি উরওয়া ইবনু যুবায়ের থেকে, তিনি আয়েশা g থেকে, তিনি বলেন, সর্বপ্রথম সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে রাসূল a-এর নিকট অহীর আগমন শুরু হয়। তিনি যে স্বপ্নই দেখতেন না কেন সেই স্বপ্ন সকালের মতো তার সামনে সত্যরূপে প্রকাশিত হতো। অতঃপর তার কাছে একাকিত্ব ভালো লাগতে লাগল। তিনি হেরা গুহায় একাকী থাকতেন এবং রাত্রিকালীন ইবাদতে মগ্ন থাকতেন- যতক্ষণ না পরিবারের কাছে ফিরে প্রয়োজনীয় জিনিস নেওয়ার প্রয়োজন না হতো। অতঃপর তিনি খাদীজা g-এর নিকট ফিরে আসতেন তিনি তার জন্য অনুরূপ পাথেয় প্রস্তুত করে দিতেন। এভাবেই তার নিকট একদিন মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অহী চলে আসে এমতাবস্থায় তিনি হেরা গুহায় ছিলেন। ফেরেশতা তার নিকটে এসে তাকে বললেন, পডুন! তিনি বললেন, আমি পড়া জানি না। রাসূল a বলেন, ফেরেশতা আমাকে ধরলেন এবং চাপ দিলেন। পুনরায় বললেন, পড়ুন! আমি বললাম, আমি পড়া জানি না। ফেরেশতা আমাকে পুনরায় ধরলেন এবং চাপ দিলেন অতঃপর আমাকে ছেড়ে দিলেন এবং বললেন, পড়ুন! আমি বললাম, আমি পড়া জানি না। তিনি আমাকে আবারও সজোরে চাপ দিলেন অতঃপর তিনি বললেন, ‘পড়ুন! আপনার প্রতিপালকের নামে যিনি আপনাকে সৃষ্টি করেছেন। যিনি মানুষকে জমাটবাধা রক্ত হতে সৃষ্টি করেছেন। পড়ুন! আর আপনার প্রতিপালক মহাসম্মানিত’।

এই আয়াতগুলো নিয়ে আল্লাহর রাসূল ফিরে আসলেন এমতাবস্থায় তার বুক ধড়ফড় করছিল। তিনি খাদীজা g-এর নিকটে আসলেন এবং বললেন, আমাকে চাদর দাও! চাদর দিয়ে ঢেকে দাও! অতঃপর খাদীজা g তাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দিলেন। অতঃপর তার ভয় কেটে গেলে খাদীজা g-কে তিনি পুরো ঘটনা জানালেন এবং বললেন, আমি আমার জীবনের ভয় পাচ্ছি। তখন খাদীজা g বললেন, আল্লাহর কসম! কখনোই নয়! মহান আল্লাহ আপনাকে কখনোই অপমানিত করবেন না। নিশ্চয় আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করেন, দুর্বলের বোঝা বহন করেন, নিঃস্বকে সহযোগিতা করেন, মেহমানের সম্মান করেন, বিপদ-আপদে মানুষকে সাহায্য করেন। অতঃপর খাদীজা g তাকে সাথে করে নিয়ে তার চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবনু নওফেলের নিকট নিয়ে গেলেন। যিনি জাহেলী যুগে খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং তিনি হিব্রু ভাষায় বই লিখতেন। তিনি ইঞ্জীল গ্রন্থকে হিব্রু ভাষায় যতদূর আল্লাহ তাওফীক্ব দিয়েছিলেন লিখেছিলেন। তিনি একজন বৃদ্ধ ও অন্ধ মানুষ ছিলেন। খাদীজা g তাকে বললেন, হে আমার চাচার ছেলে! আপনার ভাইয়ের ছেলে কী বলে শুনুন! তখন ওয়ারাকা মুহাম্মাদ a-কে বললেন, আপনি কী দেখেছেন? রাসূল a যা দেখেছিলেন তাকে তা জানালেন। অতঃপর ওয়ারাকা বললেন, ইনিই সেই ‘নামূস’ যাকে মহান আল্লাহ মূসার নিকট পাঠিয়েছিলেন। হায়! আমি যদি সেদিন বেঁচে থাকতাম যেদিন তোমার জাতি তোমাকে বের করে দিবে! তখন রাসূল a বললেন, সত্যিই কি আমার জাতি আমাকে বের করে দিবে? হ্যাঁ, ইতোপূর্বে কোনো ব্যক্তির নিকটে এই লোক প্রেরিত হয়েছেন আর তাকে তার জাতি বের করে দেয়নি এমনটা হয়নি। তবে তোমার সাথে যেদিন এমন ঘটবে সেদিন যদি আমি বেঁচে থাকি আমি তোমাকে পরিপূর্ণ সহযোগিতা করব। এর কিছুদিন পর ওয়ারাকা c ইন্তেকাল করেন। আর অহী স্থগিত হয়ে যায়।

আব্দুল্লাহ ইবনু ইউসুফ p ও আবূ ছালেহ p অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। হেলাল ইবনু রাদদাদ p যুহরী p থেকেও অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। ইউনুস ও মামার q فؤاده এর স্থলে بَوَادِرُهُ শব্দ উল্লেখ করেছেন।]

কঠিন ও অপরিচিত শব্দ :

فَلَقٌ ‘ফালাক্ব’- ‘লাম’ বর্ণে ‘যবর’ দিয়ে উচ্চারিত হবে। এটি ‘ইসম’ (বিশেষ্য বা Noun)। ইমাম ইবনুল আছীর বলেন, সকালকে ‘ফালাক্ব’ বলা হয়। আর ‘লাম’ বর্ণে ‘সাকিন’ দিয়ে পড়লে হবে ‘মাছদার’, যার অর্থ হবে বিদীর্ণ করা। যেহেতু রাতকে বিদীর্ণ করে সকাল উদিত হয়, তাই তাকে ফালাক্ব বলা হয়।

يَتَحَنَّثُ শব্দটি মুযারে মা‘রূফ (مُضَارِع مَعْرُوْف) বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কালের অর্থপ্রদানকারী কর্তৃবাচক ক্রিয়া। ক্রিয়াটি ওয়াহেদ মুযাক্কার গায়েব (وَاحِد مُذَكَّر غاَئِب) একবচন নাম-পুরুষ। বাবে তাফাউউল (بَاب تَفَعُّلٌ) থেকে এসেছে। শব্দটির মূল অক্ষর হচ্ছে ‘হিনছ’ (حِنْثٌ), যার অর্থ গুনাহ বা পাপ। এই কারণে ওয়াদা করে ভঙ্গ করাকে হিনছ বলে।

যখন এটি বাবে তাফাউউল (بَاب تَفَعُّلٌ) থেকে এসেছে, তখন এটির অর্থ দাঁড়িয়েছে- এমন কিছু করা, যা পাপ থেকে বের করে দেয় বা পাপকে দূর করে দেয়।[1]

আবার অনেকেই বলেছেন, উক্ত শব্দের ‘ছা’ (ث) বর্ণটি মূলত ‘ফা’ (ف) ছিল। তথা মূল শব্দ ছিল ‘তাহান্নুফ’ (تَحَنُّفٌ) সেখান থেকে উচ্চারণের পরিবর্তনের কারণে ‘তাহান্নুছ’ (تَحَنُّثٌ) হয়েছে। সেক্ষেত্রে ‘তাহান্নুফ’ (تَحَنُّفٌ) এসেছে ‘হানীফ’ (حَنِيْفٌ) শব্দ থেকে। তথা দ্বীনে হানীফের অনুসরণ করা।[2]

قَبْلَ أَنْ يَنْزِعَ إِلَى أَهْلِهِ ‘নুন-ঝা-আইন’ (ن- ز-ع) শব্দমূলটি যদি ‘নাঝউন’ (نَزْعٌ) মাছদার থেকে আসে, তাহলে অর্থ হয় অপসারণ করা বা টানা। আর যদি ‘নুঝূউন’ (نُزُوْعٌ) (নূন ও ঝা বর্ণে পেশ দিয়ে) মাছদার থেকে আসে, তাহলে অর্থ হয় কোনো কিছুর প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠা। এখানে দ্বিতীয় অর্থটিই গ্রহণযোগ্য। তথা আগ্রহের সাথে পরিবারের নিকট ফিরে যেতে চান। আর সেক্ষেত্রে ক্রিয়াটির সাথে ‘ইলা ছেলাহ’ ব্যবহৃত হয়। যেমনটি হাদীছের বাক্যে ব্যবহৃত হয়েছে।

حَتَّى جَاءَهُ الْحَقُّ কিতাবুত তাফসীর ও কিতাবুত তা‘বীর-এ এই জায়গায় فَجِئَهُ ‘ফাজিয়া’ ক্রিয়া ব্যবহার হয়েছে, যার অর্থ হচ্ছে হঠাৎ করে আসা।

غَطَّنِي ‘গত্ত্বা’ একটি অতীত অর্থপ্রদানকারী কর্তৃবাচক ক্রিয়া। ক্রিয়াটি ওয়াহেদ মুযাক্কার গায়েব (وَاحِد مُذَكَّر غَائِب) একবচন নাম-পুরুষ। তার শেষে ‘ইয়ায়ে মুতাকাল্লেম’ (يَاء مُتَكَلِّم) যুক্ত হয়েছে। ‘ইয়ায়ে মুতাকাল্লেম’ (يَاء مُتَكَلِّم) আসার কারণে ‘ত্ব’ (ط)-এর শেষে যের দেওয়ার প্রয়োজন হয়। কিন্তু যেহেতু ‘মাযী’ (مَاضِي) তথা অতীত অর্থপ্রদানকারী ক্রিয়ার শেষে সর্বদা যবর হয়, সেহেতু ‘ইয়া’ (يَاء)-এর পূর্বে ‘নূন বেকায়া’ (نُوْن وِقَايَة) যুক্ত করা হয়েছে। উক্ত ‘নূন বেকায়া’-এর ফলে ‘ত্ব’ (ط)-এর উপর যবর বাকী রাখা সম্ভব হয়েছে। ‘গত্ত্বা’ (غَطَّ) শব্দটি বাবে যরাবা (بَاب ضَرَبَ) তথা ‘গতীত’ (غَطِيْطٌ) মাছদার থেকে আসলে ঘুমের মধ্যে নাক ডাকার অর্থ প্রদান করে। আর বাবে নাছারা (بَاب نَصَرَ) তথা ‘গত্তুন’ (غَطٌّ) মাছদার থেকে আসলে কাউকে পানির নিচে ডুবিয়ে ধরা বা সজোরে চেপে ধরার অর্থ প্রদান করে থাকে।[3]

جهْدٌ ‘জাহদুন’।قَالَ ابْنُ الْأَثِيرِ قَدْ تَكَرَّرَ لَفْظُ الْجَهْدِ وَالْجُهْدِ فِي الْحَدِيثِ وَهُوَ بِالْفَتْحِ الْمَشَقَّةُ وَقِيلَ الْمُبَالَغَةُ وَالْغَايَةُ وَبِالضَّمِّ الْوُسْعُ وَالطَّاقَةُ অর্থাৎ ইমাম ইবনুল আছীর বলেন, ‘জাহদুন’ ও ‘জুহদুন’ (جَهْدٌ وَ جُهْدٌ) শব্দ দুটি হাদীছে প্রচুর ব্যবহৃত হয়েছে। ‘জীম’ (جِيْم) বর্ণে যবর দিলে অর্থ হবে কষ্ট ও ক্লান্তি এবং ‘জীম’ (جِيْم) বর্ণে পেশ দিলে অর্থ হবে সাধ্য ও চেষ্টা। তখন হাদীছের অর্থ দাঁড়াবে আমার সাধ্য ও চেষ্টার শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে অথবা আমার কষ্ট ও ক্লান্তির শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।

فُؤَادُهُ অন্য বর্ণনায় এখানে বাওয়াদির تَرْجُفُ بَوَادِرُهُ শব্দটি ‘বাদেরাতুন’-এর বহুবচন। যার অর্থ হচ্ছে— কাঁধ ও ঘাড়ের মাঝামাঝি অংশ।

زَمِّلُوْنِي ‘ঝা-মীম-লাম’ (ز-م-ل) শব্দমূল বাবে নাছারা (بَاب نَصَرَ) থেকে আসলে অনুসরণ করা বা পিছনে আরোহন করা বুঝায়। যেখান থেকে ‘ঝামীলুন’ (زَمِيْلٌ) ব্যবহৃত হয়, যার অর্থ— সফরসঙ্গী বা বন্ধু। আর বাবে তাফঈল (بَاب تَفْعِيْل) বা তাঝমীল (تَزْمِيْل) মাছদার থেকে আসলে কাপড় জড়ানো বা সুন্দর করে সাজানো অর্থে ব্যবহৃত হয়। আর প্রত্যেক যা কাপড় দিয়ে জড়ানো হয় তা মূলত সাজানোই হয়। হাদীছে ব্যবহৃত শব্দটি আমর হাযের (أَمَر حَاضِر) বা আদেশ অর্থবোধক কর্তৃবাচক ক্রিয়া। ক্রিয়াটি জমা মুযাক্কার হাযের (جَمع مُذَكَّر حَاضِر) বহুবচন মধ্যম পুরুষ।[4]

الرَّوْعُ এর (راء) বর্ণে যবর দিয়ে অর্থ হচ্ছে ভয়ভীতি। আর ‘র’ (رَاء) বর্ণে পেশ দিয়ে ‘রূ‘’-এর অর্থ হচ্ছে অন্তর বা হৃদয়। যেমন স্বয়ং রাসূল a অন্যত্র বলেন, إِنَّ جِبْرِيْلَ نَفَّسَ فِيْ رُوْعِي ‘নিশ্চয় জিবরীল আমার অন্তরে ফুঁকে দিয়েছেন’।

اَلْكَلُّ ‘আল-কাল্লু’- শব্দটি ‘কাফ’ (كَاف) বর্ণে যবর দিয়ে উচ্চারিত হবে। ‘কাফ-লাম-লাম’ (ك-ل-ل) শব্দমূলটি দুর্বল হওয়া, ক্লান্ত হওয়া অর্থে ব্যবহৃত হয়। সেখান থেকেই ‘আল-কাল্লু’ (اَلْكَلُّ) অর্থ এমন বোঝা, যা মানুষকে ক্লান্ত ও দুর্বল করে দেয়। শব্দটি মুযাক্কার ও মুয়ান্নাছ (مُذَكَّر ومُؤَنَّث) তথা স্ত্রীলিঙ্গ ও পুংলিঙ্গ উভয়ের জন্যই ব্যবহৃত হয়। তবে ‘কাফ’ (كَاف) বর্ণে পেশ দিয়ে ‘কুল্লু’ (كُلُّ) পড়লে অর্থ হবে সবকিছু।[5]

تَكْسِبُ ‘তাকসিবু’- মুযারে মা‘রূফের (مضَارِع مَعْرُوْف) ছীগাহ তথা ভবিষ্যৎ ও বর্তমান অর্থপ্রদানকারী কর্তৃবাচক ক্রিয়া। ক্রিয়াটি ওয়াহেদ মুযাক্কার গায়েব (وَاحِد مُذَكَّر غَائِب) একবচন মধ্যম-পুরুষ। ‘কাসাবা’ (كَسَبَ) শব্দটি যখন বাবে যরাবা بَاب ضَرَبَ থেকে আসে, তখন অর্থ হয় রিযিক্ব অর্জন করা বা অর্জনের চেষ্টা করা। আর যখন শব্দটি বাবে ইফআল (بَاب اِفْعَال) থেকে আসে, তখন অর্থ হবে রিযিক্ব অর্জনে সহযোগিতা করা।[6]

اَلْمَعْدُوْمَ শব্দটি ইসমে মাফঊল (اِسْم مَفْعُوْل) বা কর্মবাচক বিশেষ্য। ওয়াহেদ মুযাক্কার (وَاحِد مُذَكَّر) বা একবচন পুংলিঙ্গ। ‘আইন-দাল-মীম’ ع-د-م শব্দমূল থেকে বাবে সামিয়া بَاب سَمِعَ, যার শাব্দিক অর্থ অনুপস্থিত হওয়া বা অস্তিত্ব না থাকা। সুতরাং ‘মা‘দূম’ শব্দটির অর্থ হচ্ছে যার অস্তিত্ব নেই বা অস্তিত্বহীন।

সুতরাং ‘তাকসিবুল মা‘দূম’ تَكْسِبُ الْمَعْدُوْمَ-এর অর্থ দাঁড়াবে অস্তিত্বহীনের জন্য উপার্জন করেন। এখানে মা‘দূম مَعْدُوْم-এর পূর্বে একটি গোপন ‘লাম’ لَام রয়েছে। আর যদি বলা হয় ‘তুকসিবুল মা‘দূম’ تكْسِبُ اَلْمَعْدُوْمَ তাহলে অর্থ হবে অস্তিত্বহীনকে উপার্জনে সহযোগিতা করেন। এখানে ইমাম খত্ত্বাবী অভিযোগ উত্থাপন করেছেন যে, অস্তিত্বহীন তথা মৃত ব্যক্তিকে কীভাবে সহযোগিতা করা যায়। তার জবাবে অন্যান্য ব্যাখ্যাকার বলেছেন যে, এখানে ‘মা‘দূম’ দ্বারা যা অচিরেই ঘটবে, তা বুঝানো উদ্দেশ্য। তথা ওই অসহায় ব্যক্তির এই অবস্থা চলতে থাকলে সে অস্তিত্বহীন হয়ে যাবে বা মারা যাবে। কিন্তু এখনো মারা যায়নি। আমরা ব্যবহারিক জীবনে এই ধরনের বাক্য ব্যবহার করে থাকি। যেমন কোনো সন্তান যদি পিতার জীবদ্দশায় বলে- আমিই এই বাড়ির মালিক, তখন অর্থ দাঁড়াবে— তার পিতার মৃত্যু হলে সেই মালিক হবে। এজন্য পূর্বেই নিজেকে মালিক বলে দাবি করছে। যদিও এখনো সে মালিক হয়নি, বরং তার পিতাই মালিক আছে। সুতরাং নিশ্চিত ফলাফলের দিকে লক্ষ্য করে ‘মা‘দূম’ অস্তিত্বহীন বলা হয়েছে।

এখানে আরও একটা অর্থ অনেকেই করেছেন, আপনি ওই জিনিস উপার্জন করেন, যা সেই দরিদ্র ব্যক্তির কাছে নেই। তথা তখন ‘মা‘দূম’ দ্বারা উদ্দেশ্য হবে অনুপস্থিত ধনসম্পদ।

نَوَائِبِ الْحَقِّ ‘নাওয়ায়েব’ শব্দটি ‘নায়েবা’ نَائِبَةٌ-এর বহুবচন। ‘নাবা-ইয়ানূবু-নাওবান’ نَابَ-يَنُوْبُ-نَوْبًا শব্দের অর্থে হচ্ছে ঘুরেফিরে বারবার আসা। জীবন চলতে গিয়ে বিপদাপদ আসতেই থাকার ক্ষেত্রে ‘নায়েবা’ نَائِبَةٌ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। সুতরাং ‘নাওয়াইবুল হক্ব’ نَوَائِبُ الْحَقِّ বাক্যাংশের অর্থ হচ্ছে হক্বের বিপদ বা হক্ব বিপদ। হক্ব বিপদ বলার মাধ্যমে বুঝানো হয়েছে বিপদ দুই ধরনের হতে পারে— একটি হক্ব; অন্যটি না হক্ব। যেমন কেউ মদ ও জুয়ার নেশায় টাকা-পয়সা নষ্ট করে ফক্বীর হয়ে গেল, এটা হচ্ছে না হক্ব বিপদ। খারাপ কাজে বিপদে পড়া। আর হক্ব বিপদ হচ্ছে ভালো মানুষ। সঠিকভাবে চলার চেষ্টা করে, তারপরও কোনো দুর্ঘটনার কারণে বিপদে পড়েছে।

نَامُوْسٌ ‘নূন-মীম-সীন’ ن-م-س শব্দমূলটি বাবে যরাবা بَاب ضَرَبَ থেকে আসলে অর্থ হয় কোনো কিছু গোপন করা, লুকিয়ে রাখা। ‘নামূস’ نَامُوْسٌ শব্দটি ‘ফাঊল’ فَاعُولٌ-এর ওযনে ইসমে মুবালাগা اِسْم مُبَالَغَة-এর সীগাহ। তথা অত্যধিক গোপনকারী। ‘জাসূস’ جَاسُوسٌ ব্যবহার করা হয় মন্দ জিনিস গোপন করার ক্ষেত্রে; ‘নামূস’ نَامُوْسٌ ব্যবহার হয় কল্যাণকর জিনিস গোপন করার ক্ষেত্রে। আর অহী হচ্ছে কল্যাণকর জিনিস। সুতরাং যেহেতু জিবরীল e অহীর আমানত হেফাযত করে তা শয়তানসহ অন্যদের নিকট থেকে গোপন করে মহান আল্লাহর পক্ষ হয়ে নবী-রাসূলগণের নিকট পৌঁছিয়ে থাকেন, তাই সেটাকে নামূস বলা হয়।[7]

جَذَعًا ‘জীম ও যাল’ جِيْم و ذَال বর্ণে যবর দিয়ে পড়তে হবে। ‘জাযাআন’ جَذَعًا শব্দটি মূলত প্রাণীদের দাঁত ও বয়স নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। যেমন যে উট পাঁচ বছর বয়সে ও যে গরু দুই বছর বয়সে পদার্পণ করে এবং যে ভেড়া এক বছর পূর্ণ করে, তাদেরকে ‘জাযাআ’ বলা হয়। তথা শিশু থেকে যুবক হওয়ার ক্ষেত্রে শব্দটি ব্যবহৃত হয়। এই হাদীছে ওয়ারাকা যৌবনে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করত শব্দটি ব্যবহার করেছেন।[8]

مُؤَزَّرًا শব্দটি ইসমে মাফঊল اِسْم مَفْعُول-এর ওয়াহেদ মুযাক্কার وَاحِد مُذَكَّر-এর সীগাহ তথা একবচন কর্মবাচক পুংলিঙ্গ বিশেষ্য। ‘আযারা-ইয়াযিরু’ أَزَرَ-يَأْزِرُ বাবে যরাবা بَاب ضَرَبَ থেকে এবং ‘আযযারা-ইউয়াযযিরু-তাযীর’ أَزَّرَ-يُؤَزِّرُ-تَأْزِيْر বাবে তাফঈল بَاب تَفْعِيْل থেকে অর্থ হচ্ছে— শক্তিশালী করা, মযবূত করা। উল্লেখ্য, শব্দটির মূল ‘হামজা-ঝা-র’ ء-ز-ر নয়, বরং ‘ওয়াও-ঝা-র’و-ز-ر ।

لَمْ يَنْشَبْ বাবে সামিয়া بَاب سَمِعَ থেকে। শব্দটির অর্থ লেগে থাকা। আঁকড়ে থাকা, ধরে থাকা ইত্যাদি। তথা তিনি বেশি দিন ধরে রাখতে পারেননি নিজেকে; মারা গেছেন।

বাক্য বিশ্লেষণ বা তারকীব :

مِنَ الْوَحْيِ ‘মিন বায়ানিয়্যাহ’। مِثْلَ فَلَقِ الصُّبْحِ ‘মিছলা’ مِثْلَ শব্দের শেষে যবর হয়েছে গোপন মাওসূফের ছিফাত হিসেবে। তথা মূলত ছিল مَجِيْئًا مِثْلَ فَلَقِ الصُّبْحِ।

اللَّيَالِيَ ذَوَاتِ الْعَدَدِ পূর্বের ক্রিয়া ‘তাহান্নুছ’ تَحَنُّث-এর ‘যরফ’ ظَرْف হিসেবে হালাতে ‘মানসূব’ حَالَة مَنْصُوْب বা নছবের অবস্থায় রয়েছে।

فَيَتَزَوَّدُ لِمِثْلِهَا এই বাক্যে ‘মিছলিহা’-এর ‘হা’ যমীরের মারজে‘ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেছেন, ইবাদত। কেউ বলেছেন, ‘খালওয়াত’ বা একাকিত্ব। কেউ বলেছেন, ‘সানাত’ বা বছর। তথা পরের বছর আবার আগের বছরের মতো খাবার নিয়ে গুহায় যেতেন।

مَا أَنَا بِقَارِئٍ উক্ত বাক্যে ‘মা’ مَا বর্ণটি ‘ইস্তিফহাম’ اِسْتِفْهَام তথা জিজ্ঞাসার জন্য, না-কি ‘নাফী’ نَفِي তথা না-বাচক অর্থ প্রদানের জন্য, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে।

সীরাত ইবনে হিশামের বর্ণনায় আছে, ‘মা আক্বরায়ু’ مَا أَقْرَأُ এখানে দুই ধরনেরই অর্থ হতে পারে। ‘আমি কী পড়ব?’ অথবা ‘আমি পড়া জানি না’। জিজ্ঞাসাবোধক পড়ার ক্ষেত্রে দলীল হচ্ছে উরওয়া থেকে মুরসাল সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, كَيْفَ أَقْرَأُ তথা ‘কীভাবে পড়ব?’ উবাইদ ইবনু উমাইর থেকে মুরসাল সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, مَاذَا أَقْرَأُ ‘কী পড়ব?’ ইমাম যুহরী থেকে মুরসাল সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, كَيْفَ أَقْرَأُ ‘কীভাবে পড়ব?’

অন্যদিকে যারা না-বোধক অর্থকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তাদের দলীল হচ্ছে উপরের সকল বর্ণনা মুরসাল আর ছহীহ বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনা মুসনাদ মুত্তাছিল এবং বেশি বিশুদ্ধ। আর যেহেতু بِقَارِئٍ এই শব্দে ‘বা’ بَاء ‘হরফে যায়েদা’ যুক্ত হয়েছে আর ‘বা’ بَاء অতিরিক্ত বর্ণটি ‘মা নাফেয়া’ مَا نَافِيَةٌ-এর পরেই যুক্ত হয়। ‘ইস্তিফহামিয়া’ اِسْتِفْهَامِيَّة-এর পরে সাধারণত যুক্ত হয় না। সেহেতু না-বোধক অর্থ করাই বেশি প্রণিধানযোগ্য মত।

حَتَّى بَلَغَ مِنِّي الْجَهْدُ এই বাক্যে ‘জাহদু’ جَهْدُ-এর ‘দাল’ دَال বর্ণে পেশ ও যবর উভয় দিয়েই পড়া যায়। পেশ দিয়ে পড়লে শব্দটি নিজেই ‘বালাগা’ بَلَغَ ‘ফেল’ فِعْل -এর ‘ফায়েল’ فَاعِل হবে। আর যবর দিয়ে পড়লে শব্দটি ‘মাফঊল’ مَفْعُوْل হবে আর ‘ফায়েল’ فَاعِل হবে ‘গত্তুন’ বা চাপানো। উভয় অবস্থায় অনুবাদ দাঁড়াবে নিম্নরূপ :

পেশ দিয়ে পড়লে ‘আমার ক্লান্তি পৌঁছে যায় তার শেষ সীমায়’। যবর দিয়ে পড়লে ‘তার চাপানো পৌঁছে যায় আমার ক্লান্তির শেষ সীমায়’।

يَا لَيْتَنِي فِيهَا جَذَعًا ‘লায়তা’ لَيْتَ-এর ‘ইসম’ اِسْم ‘ইয়ায়ে মুতাকাল্লেম’ يَاء مُتَكَلِّم আর তার ‘খবর’ خَبَر হচ্ছে ‘জাযাআন’ جَذَعًا। সেই হিসেবে ‘জাযাআন’ جَذَعًا শব্দটি পেশবিশিষ্ট হওয়া উচিত। কিন্তু ‘খেলাফে ক্বিয়াস’ خِلَاف قِيَاس তা যবরবিশিষ্ট হয়েছে। এজন্য অনেকেই বলেছেন, এখানে গোপন ‘ফেলে নাক্বেছ’ فِعْل نَاقِص আছে। তথা বাক্যের মূল রূপ হচ্ছে— يَا لَيْتَنِي أَكُوْنُ فِيْهَا جَذَعًا ‘আকূনু’ أَكُوْنُ ‘ফেলে নাক্বেস’ فِعْل نَاقِص-এর ‘খবর’ خَبَر হিসেবে এখন যবরবিশিষ্ট হওয়া ঠিক আছে।

(চলবে)


* ফাযেল, দারুল উলূম দেওবান্দ, ভারত; এম. এ. (অধ্যয়নরত), উলূমুল হাদীছ বিভাগ, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব।

[1]. আন-নিহায়া ফী গরীবিল হাদীছি ওয়াল আছার, ১/১৪৯।

[2]. ফাতহুল বারী।

[3]. আন-নিহায়া ফী গরীবিল হাদীছি ওয়াল আছার, ৩/৩৭২।

[4]. লিসানুল আরাব, ৭/৫৭।

[5]. লিসানুল আরাব, ১৩/১০১।

[6]. আন-নিহায়া ফী গরীবিল হাদীছি ওয়াল আছার, ৪/১৭১।

[7]. আন-নিহায়া ফী গরীবিল হাদীছি ওয়াল আছার, ৫/১১৯।

[8]. আন-নিহায়া ফী গরীবিল হাদীছি ওয়াল আছার, ১/২৫০।