আজব দেশের আজব রাজা

-মুহাম্মদ মুস্তফা কামাল*


একবার এক জ্ঞানী যুবক দেশ ভ্রমণে বের হলো। বিভিন্ন দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি, সামাজিক, অর্থনৈতিক অবস্থা ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতি তার ছিল গভীর আগ্রহ। এভাবে ঘোরাঘুরির সাথে সাথে দিন মজুরি করে নিজের দু’বেলার খাবারও যোগাড় করে ফেলত। জ্ঞানী-গুণী ও পণ্ডিত ব্যক্তিদের দরবারেও তার ছিল অবাধ যাওয়া-আসা। এভাবেই একদিন ঘুরতে ঘুরতে সে সেই আজব দেশের সীমানায় এসে পৌঁছল, ঠিক বছরের শেষের দিনেই। দূর থেকে সে লক্ষ্য করল, অপূর্ব সাজসজ্জায় সজ্জিত হয়ে অগণিত মানুষ ঢাক-ঢোল বাজিয়ে নেচে-গেয়ে কাউকে যেন স্বাগত জানাচ্ছে। গভীর আগ্রহে কাছাকাছি পৌঁছতেই দেখা গেল, সবাই তাকে নিয়েই মাতামাতি শুরু করেছে। তাকে পেয়ে সবার খুশির মহোৎসব শুরু হলো। তাকে ফুলের মালা পরিয়ে, পায়ের নিচে গালিচা বিছিয়ে সবাই স্বাগত জানাতে লাগল।
অনেক দিন আগের কথা। পাহাড়-জঙ্গলে ঘেরা এক অপূর্ব সুন্দর রাজ্য ছিল। সেই রাজ্যের রাজা বানানোর পদ্ধতি ছিল অসাধারণ ও আশ্চর্যজনক। সে দেশের গণ্য-মান্য ও অভিজাত শ্রেণি নিয়ে একটি মন্ত্রিপরিষদ ছিল। তারা বছরের প্রথম দিন, তাদের রাজা পরিবর্তন করত। তারা বছরের শেষের দিন যে ব্যক্তি সর্বপ্রথম রাজ্যের সীমানা অতিক্রম করে ভেতরে আসত, তাকে রাজা বানিয়ে নিত। আর যে এক বছর তাদের রাজা ছিল, তাকে তারা গভীর জঙ্গলের এমন এক ভয়ংকর জায়গায় ছেড়ে আসত, যেখানে বিষধর সাপ ও বিচ্ছুতে পরিপূর্ণ থাকত। আশে-পাশের ভয়ংকর গুহাগুলোতে নরকঙ্কাল পড়ে থাকত। সেই সাথে আশে-পাশের গাছগুলো ছিল খুব বিষাক্ত। তদুপরি নরখাদক জীবজন্তুর আবাস ছিল সেখানে। অতএব বিপদ থেকে যদি কোনো রাজা বেঁচেও যেত, কিন্তু ক্ষুধা-পিপাসায় কাতর হয়ে এক সময় ধুঁকে ধুঁকে তাকে মরতেই হতো। এভাবেই বছরের পর বছর নতুন কোনো পথিক এক বছরের জন্য রাজ্যের সর্বময় কর্তৃত্বপূর্ণ রাজা নির্বাচিত হতো এবং বছর শেষে তাকে এই ভয়ংকর পরিণতি বরণ করতে হতো। এভাবেই অনেক রাজা সারা বছর আরাম-আয়েশ ভোগ-বিলাস, মদ-নর্তকী, গান-বাজনা ইত্যাদি জাঁকজমকতায় মেতে থাকত। বছর শেষে তাকে গহীন অরণ্যের সেই ভয়ংকর মৃত্যুপুরীতে ছেড়ে আসা হতো।

সে অবাক হয়ে তাদের জিজ্ঞেস করল, কেন এভাবে তাকে স্বাগত জানানো হচ্ছে? তাকে বলা হলো, আপনাকে এই রাজ্যের রাজা নির্বাচন করা হয়েছে। তাকে অনেক ইযযত ও সম্মানের সাথে রাজমহলে নিয়ে যাওয়া হলো। যুবক একেবারেই হতভম্ব, সেই সাথে অনেক খুশি। সেই এই বিশাল রাজ্যের রাজা। সিংহাসনে বসানোর পর তাকে রাজমুকুট পরানো হলো। সামনে সুবিশাল আসনে সভাসদরা বসে একে একে তাকে রাজ্যের শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে বোঝাতে লাগল। অপূর্ব এক আনন্দ ও আভিজাত্যে তার অন্তর পুলকিত হতে লাগল। প্রাসাদের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য ও সৈন্য-সামান্তের বহর দেখে তার হৃদয় আনন্দে ভরে উঠল। সুন্দরী রাণী ও বাঁদীদের আনাগোনায় নিজেকে সবচাইতে সুখী ব্যক্তি বলে তার মনে হলো। এভাবেই বেশ কিছুদিন অতিবাহিত হলো।

একদিন দরবার চলাকালে সে তার সভাসদদের জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা আমার পূর্বে যে রাজা ছিল, সে এখন কোথায়? প্রশ্ন শুনে সবাই চোখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগল! কে বলবে এত বড় ঘটনার কথা। তাদের অঙ্গভঙ্গি দেখে যুবক রাজা তার প্রশ্নে অনড় থাকল। শেষে দরবারের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও বৃদ্ধ উযীর তাদের দেশের রাজা নির্বাচনের প্রথা ও তার পরিণতি সম্পর্কে তাকে বুঝিয়ে বলল যে, এই দেশে প্রতিবছর নতুন রাজাকে আপনার মতো সিংহাসনে বসানো হয় এবং বছর শেষে তাকে এক ভয়ংকর জঙ্গলে ছেড়ে আসে তার প্রতিরক্ষা বাহিনী।

এসব কথা শুনে সে ভেতর ভেতর চমকে উঠলেও মুখে কিছু বলল না। সে বুঝল যে, সে এক চমৎকার সাজানো গোছানা ফাঁদে পড়ে গেছে, যেখান থেকে বেরুবার কোনো রাস্তা নেই। সে সারারাত তার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনেক চিন্তা-ভাবনা করল। পরের দিন দরবারে ঘোষণা দিল, সে সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে আশে-পাশের সবচেয়ে ভয়ংকর জঙ্গলে শিকারে যাবে। ফলে সভাসদরাও শিকারে যাওয়ার আনন্দে মেতে উঠল। পরম আনন্দে ঢাক-ঢোল বাজিয়ে সবাই যাত্রা শুরু করল সেই বিভীষিকাময় জঙ্গলের পথে। রাজা হাতীর পিঠে চড়ে উযীর, নাযীর, মন্ত্রী ও সিপাহীদের নিয়ে মহাসমারোহে বের হলো। অবশেষে দীর্ঘ সফরের পর সেই জঙ্গলে তারা পৌঁছে গেল। রাজা শিকারের নামে সুকৌশলে পুরো জঙ্গলের অবস্থান ও স্থিতি পর্যবেক্ষণ করল। পুরো সপ্তাহ সে জঙ্গল সম্পর্কে বেশ ভালো ধারণা লাভ করল। পাহাড় ডিঙ্গিয়ে জঙ্গলের আরও গহীনে প্রবেশ করতে চাইলে সবাই ভয় পেয়ে গেল। রাজা বুঝল ওটাই সে স্থান, যেখানে বছর শেষে তাকে ফেলে আসা হবে। যেখানকার ভয়ংকর নরখাদক জন্তু ও বিষাক্ত সাপের গল্প সে সিপাহীদের মুখে আগেই শুনেছে।

যাহোক, আরেকটু ভিতরে প্রবেশের কথা শুনে সবাই রাজ্যে ফিরে যাওয়ার জন্য তোড়জোড় শুরু করতে লাগল। বিচক্ষণ রাজা সবই বুঝতে পারল। রাজ্যে ফিরেই সবাই তাদের শিকারের আনন্দদায়ক গল্পে রাজা মাতাতে লাগল। ফাঁক বুঝে বিচক্ষণ রাজা প্রস্তাব পেশ করল, রাজ্য থেকে ঐ জঙ্গল পর্যন্ত একটি প্রশস্ত রাস্তা নির্মাণ করা হোক, রাস্তার দু’পাশে ফলের গাছ লাগানো হোক, সেই সাথে সেই জঙ্গলের ঠিক মাঝামাঝিতে এক সুরম্য প্রাসাদ নির্মাণ করা হোক এবং প্রাসাদের চারপাশে বাগিচা ও নহর প্রস্তুত করা হোক। কী আর করা, রাজার হুকুম বলে কথা! রাস্তা নির্মাণ ও জঙ্গল পরিষ্কার করে প্রাসাদ নির্মাণের কাজ শুরু হলো। সেই সাথে উন্নতিকল্পে রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে সড়ক, কুয়া, বিভিন্ন সরকারি দফতর তৈরি করা হলো। এতে রাজ্যের প্রজারাও খুব খুশি হলো রাজার উপর। এভাবে রাজা তার শাসনকার্যকে খুব নিষ্ঠার সাথে পালন করতে লাগল।

এভাবেই বছর শেষ হওয়ার আগেই রাস্তা, প্রাসাদ ও বাগিচা সবই তৈরি হলো। এভাবেই ঠিক শেষের দিন রাজা তার দরবারে বলল, দেশের প্রথা অনুযায়ী রাজাকে জঙ্গলে ছেড়ে আসার যে আইন সেটা পুরা করা হোক। তো দরবারীগণ বললেন, আমাদের পরামর্শসভায় এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে এবং এ বছর থেকে আমরা এ বিধান বদলে দিয়েছি। এ প্রথাকে রহিত করা হয়েছে। কেননা আমরা আমাদের সবচাইতে বুদ্ধিমান, বিচক্ষণ সুযোগ্য রাজা পেয়ে গেছি। ওখানে আমরা সেসব বেয়াকুব রাজাদের ছেড়ে আসতাম, যারা এক বছরের বাদশাহীর মজা লুটত ও আরাম-আয়েশ ও বিলাসে মেতে থাকত এবং বাকি জীবনকে ভুলে যেত। আগের রাজারাও জানত যে, তাদের সেই ভয়ংকর জঙ্গলে ছেড়ে আসা হবে। তারপরও তারা নিজেদের সুরক্ষার জন্য কোনো ব্যবস্থা করত না, ভোগ-বিলাসের আনন্দে তারা তাদের পরিণতির কথা সবই ভুলে যেত। কিন্তু হে মহামান্য রাজা! আপনি আপনার ভয়ংকর পরিণতির কথা সবসময় স্মরণ রেখেছেন এবং প্রজাদের সাথে ন্যায়বিচার করেছেন এবং তাদের সুখ-দুঃখের কথা ভেবেছেন। আমাদের এরকমই বিচক্ষণ রাজার প্রয়োজন ছিল। সুতরাং আপনি নিশ্চিন্তে আমাদের কর্ণধার হয়ে থাকেন এবং সারাজীবন আমাদের ওপর আপনার সুবিচার প্রতিষ্ঠা করুন।

সুধী পাঠক! এই অসাধারণ রাজ্যের নাম হলো পৃথিবী। আর সেই নতুন রাজা হলো আপনি, আমি, সবাই। আর সেই সফরে বিচ্ছু ও ভয়ংকর প্রাণীতে ভরা জঙ্গল হলো কবর। এবার আপনি সিদ্ধান্ত নিন, কিছু দিন এই পৃথিবীর স্বাদ গ্রহণ করার পর লোকজন এই জায়গাতে আমাদের ছেড়ে আসবে, যেখানে সাপ আর বিচ্ছু থাকবে এবং খাবার ও পান করার কিছুই থাকবে না। সেখানে থাকবে আযাবের ফেরেশতারা। আমরা কি নিজেদের সাথে বিচক্ষণতার পরিচয় দিচ্ছি? কিছু মাস বা কিছু বছর পর লোকজন যখন আমাদেরকে সেখানে রেখে আসবে, সেখানে কি আমরা নিজেদের জন্য মহল তৈরি করতে পেরেছি? আমরা কি সেখানে ফল-ফুলের বাগিচা তৈরি করতে পেরেছি? নাকি ঐসব বেয়াকুব রাজাদের মতো আমরা এই দুনিয়ায় মজা লুটছি? এটা জানার পরও যে, আমাদের যেতেই হবে সেই কবরে।

প্রিয় ভাই-বোনেরা! খুবই অল্প সময়ের এই জীবন আমাদের। এখনো আমরা জীবিত আছি। সুস্থ-সবল আছি। সুতরাং আমাদের এখনো অনেক কিছু করার আছে। শাহী আনন্দে জীবন যাপন করে এই মূল্যবান সময়কে নষ্ট না করি। চিন্তা করে দেখুন! এখনো আমরা অনেক কিছু করতে পারি। কিন্তু এমন সময় আসবে, ছালাত আদায় করার শক্তি থাকবে না। ছিয়াম রাখার শক্তি থাকবে না। কালেমা পড়ার জন্য হয়তো জিহ্বা নাড়ানোর ক্ষমতাটুকুও থাকবে না। অসহায়, অসুস্থ, স্থবির, শক্তিহীন, দুর্বল শরীরে মৃত্যুর পদধ্বনি শুনতে থাকব। ফিরে যাওয়ার কোনো পথ থাকবে না। একসময় আমাদের সবচাইতে আপনজনেরা আমাদের পরম আদরে বহন করে রেখে আসবে সেই বিপৎসংকুল দুর্গম জঙ্গলে অর্থাৎ কবরে। মহান আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানাই, তিনি যেন আমাকে এবং আপনাদেরকে মৃত্যুর পূর্বে সঠিকভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করার তাওফীক্ব দান করেন। আমাদের ঈমানকে শক্তিশালী ও মযবূত বানিয়ে দেন। আমাদের আমল দ্বারা আমরা যেন কবরে প্রাসাদ বানিয়ে নিতে পারি। জান্নাতের বাগান বানিয়ে নিতে পারি। হে আল্লাহ! আমাদের সকলকে সেই তাওফীক্ব দান করুন-আমীন!


* নামোশংকরবাটি, বাগানপাড়া, চাঁপাই নবাবগঞ্জ।