আতরওয়ালা বন্ধু
মুহাম্মাদ জাহিদ হাসান*


আতরওয়ালা বন্ধু! কী অবাক হচ্ছেন, তাই না? অনেকে হয়তো ভাবছেন আতরওয়ালাকে আবার কীভাবে বন্ধু বানায়? আমি যখন আমার এলাকার ছোট ভাই অথবা বন্ধুবান্ধব ও বড় ভাইদেরকে বলি যে, ‘ভাই জীবনে বন্ধু বানাতে হলে আতরওয়ালা বন্ধু বানাবেন। তখন তারা কিছুক্ষণ চিন্তায় পড়ে যায়। তারা আমাকে বলে, ‘ভাই, আতরওয়ালাকে আমি আবার কীভাবে বন্ধু বানাবো? সে তো সবসময় আতর নিয়েই ব্যস্ত থাকে’। যাহোক, সুধী পাঠক! চিন্তার কোনো কারণ নেই। আজকে এই বিষয়টা নিয়েই কিছু লেখার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।

আমাদের জীবনে কম-বেশি সবারই বন্ধুবান্ধব আছে। বন্ধু নেই এমন মানুষ নেই বললেই চলে। স্বয়ং আমাদের রাসূল a-এরও বন্ধু ছিল। ছাহাবী শব্দের অর্থই হচ্ছে— সঙ্গী অথবা সাথী। তাই তো আল্লাহ তাদের উপর খুশি হয়ে বলেন, ﴿رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ﴾ ‘আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে’ (আল-মুজাদালা, ৫৮/২২)

আমাদেরও কম-বেশি বন্ধু আছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের যারা বন্ধু আছে তারা কেমন বন্ধু? আর আমাদের বন্ধু সম্পর্কে ইসলাম কী বলে? সেটা কি আমাদের জানা আছে?

তাহলে চলুন, আতরওয়ালা বন্ধু সম্পর্কে হাদীছে কী এসেছে দেখে নিই— আবূ মূসা c হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল a বলেছেন, ‘সৎসঙ্গী ও অসৎসঙ্গীর উদাহরণ আতর বিক্রেতা ও কর্মকারের হাপরের ন্যায়। আতর বিক্রেতাদের থেকে শূন্য হাতে ফিরে আসবে না৷ হয় তুমি আতর খরীদ করবে, না হয় তার সুঘ্রাণ পাবে। আর কর্মকারের হাপর হয় তোমার ঘর অথবা তোমার কাপড় পুড়িয়ে দেবে, না হয় তুমি তার দুর্গন্ধ পাবে’।[1]

আমি যখন মানুষকে এই হাদীছটি বলি, তখন তারা অনেকেই বলে, ‘ভাই আতরওয়ালা তো আতর বিক্রি করে তার সাথে আমরা বন্ধুত্ব করব কীভাব?’ আসলে ব্যাপারটা এরকম না। এখানে আতরওয়ালা বন্ধু সম্পর্কে তাদেরকে বলা হয়েছে, যারা ঈমানদার, তাক্বওয়াবান, পরহেযগার, দ্বীনদার, মুত্তাক্বী, সত্যবাদী, যার আখলাক খুবই সুন্দর, যাকে দেখলে আখেরাতের কথা স্মরণ হয়।

আপনি যখন এ সকল মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করবেন, দেখবেন অটোমেটিক আপনার মাঝে আতরের সুঘ্রাণ ছড়াবে। কেননা আমরা হাদীছটিতে দেখতে পাচ্ছি, যখন আপনি কোনো আতরের দোকানে আতর কিনতে যাবেন, তখন হয় আপনি আতর কিনবেন, না হয় আতরের সুঘ্রাণ আপনার মাঝে থাকবে। আর আপনি আপনার বাসায় যাওয়ার পরও সেই আতরের সুঘ্রাণ টের পাবেন।

কেননা আপনি যখন একজন দ্বীনদার বন্ধুর সাথে বন্ধুত্ব করবেন, তখন তার ভালো গুণগুলো আপনার মাঝে প্রবেশ করতে থাকবে। আর এ সম্পর্কে হাদীছে এসেছে— আবূ হুরায়রা c হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ a বলেছেন, ‘মানুষ তার বন্ধুর দ্বীন গ্রহণ করে থাকে। সুতরাং তোমাদের সকলেরই খেয়াল রাখা উচিত, সে কার সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করছে’।[2]

এছাড়াও একজন দ্বীনদার বন্ধু আপনাকে প্রতিনিয়ত উপদেশ ও পরামর্শ দিয়ে থাকবে। আখেরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দিবে। আপনার বিপদেআপদে নানাভাবে আপনাকে সাহায্য করবে। আপনাকে সৎ পথে চলতে সহযোগিতা করবে। আল্লাহর আনুগত্যে সর্বদা উদ্বুদ্ধ করবে; পাপ কাজে বাধা দান করবে। আপনাকে কখনোই সে ক্ষতির মুখে পড়তে দিবে না। আর এটাই হলো আতরওয়ালা বন্ধু। আর একটু উদাহরণ দিলে ক্লিয়ার হবে ইনশাআল্লাহ।

ধরুন, আপনি একজন দ্বীনদার মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করলেন, হঠাৎ একদিন দেখলেন সে সমাজে গরীব-মিসকীনদের জন্য কাজ করছে অথবা দেখলেন সমাজে নানা বিষয়ে সে মানুষকে সহযোগিতা করছে এবং পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত যথারীতি মসজিদে আদায় করছে। এছাড়াও সমাজের খারাপ বখাটে ছেলেদের থেকে সবসময় দূরে থাকে, ঠিক তখন দেখবেন আপনার বাসার মানুষজন আপনাকে বলবে, ‘কীরে ওই ছেলেটা তোর বন্ধু না?’ ‘সে তো খুব ভালো ছেলে’, ‘ওর সাথেই সবসময় মিশবি’। সুতরাং দেখলেন তো কীভাবে আপনার বাসায়ও আতরের সুঘ্রাণ ছড়িয়ে গেল? আর একেই বলে আতরওয়ালা বন্ধু।

এছাড়াও আল্লাহ তাআলা বলেছেন,﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ﴾ ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর তাক্বওয়া অবলম্বন করো এবং সত্যবাদীদের সাথে থাকো!’ (আত-তওবা, ৯/১১৯)

আচ্ছা অনেক তো আতরওয়ালা বন্ধু নিয়ে বললাম, এবার না হয় একটু হাপরওয়ালা বন্ধু নিয়ে বলি? কেননা হাদীছে আতরওয়ালা বন্ধুর সাথে সাথে হাপরওয়ালা বন্ধুর কথাও বলা হযেছে এবং তার থেকে দূরে থাকারও নির্দেষ দিয়েছেন। যেমনটি হাদীছে এসেছে— ‘কর্মকারের হাপর হয় তোমার ঘর অথবা তোমার কাপড় পুড়িয়ে দেবে, না হয় তুমি তার দুর্গন্ধ পাবে’।

এখানে কর্মকারের হাপর দ্বারা যা বুঝানো হয়েছে তা হলো, যার ভিতর আল্লাহ তাআলার প্রতি তাক্বওয়া নেই। দুনিয়াতে যারা খারাপ, অসৎ, আল্লাহ তাআলার ইবাদত করে না, বরং আরও বিভিন্ন খারাপ কাজে লিপ্ত; সে প্রতিনিয়ত গুনাহ করে যাচ্ছে। সমাজের মানুষ তাকে খারাপ অথবা বখাটে জানে। ঠিক এরকমটাই হচ্ছে হাপরওয়ালা বন্ধু, যার সাথে চলাফেরা করলে হয় আপনার ঘর অথবা আপনার কাপড় পুড়িয়ে দেবে, না হয় আপনি তার দুর্গন্ধ পাবেন। একটি উদাহরণ দেই তাহলে কিছুটা ক্লিয়ার হবেন ইনশাআল্লাহ। ধরুন, আপনি এমন একজনের সাথে বন্ধুত্ব করলেন, যে ঠিক হাদীছের হাপরওয়ালা বন্ধুর মতো, যে হয়তো ধূমপান করে কিংবা নেশা করে। সমাজের মানুষ তাকে বখাটে হিসাবে জানে। যার ভিতরে নেই আল্লাহ তাআলার প্রতি তাক্বওয়া; নেই তার ভিতর ছালাত, ছিয়াম, পরহেযগারিতা। এছাড়াও রয়েছে আরও নানাবিধ সমস্যা।

তো একদিন তার সাথে বাইরে বের হলেন, দেখলেন সে একটি সিগারেট কিনে সেটা ধরাচ্ছে আর নানাবিধ নেশা করছে। কিন্তু আপনি তার সাথে নেশা করলেন না অথবা ধূমপানও করলেন না। যখন আপনি বাসায় যাবেন, ঠিক আপনার বাসার মানুষজন আপনাকে সন্দেহ করবে আর বলবে, ‘কীরে তুই কি ধূমপান করে এসেছিস?’ কেননা তারা আপনার শার্ট অথবা জামাকাপড় থেকে ধূমপানের দুর্গন্ধ পাবে। এছাড়াও সেই বন্ধু সমাজে খারাপ কাজ করলে তখন কিন্তু আপনার বাসাতেও তার প্রভাব পড়বে। মানুষ আপনার পিতা-মাতাকে দেখলে বলবে, ‘আপনার ছেলেটা না ওই খারাপ বখাটে ছেলের সাথে চলে’। আর এভাবেই তার সেই খারাপ দোষগুলো আপনার ভিতরে প্রবেশ করতে থাকবে। আর এজন্যই হাদীছে তার থেকে দূরে থাকার কথা এসেছে।

এছাড়াও মানুষ কিয়ামতের দিন বলবেন,﴿يَا وَيْلَتَى لَيْتَنِي لَمْ أَتَّخِذْ فُلَانًا خَلِيلًا﴾ ‘হায়, আমার দুর্ভোগ! আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম’ (আল-ফুরক্বান, ২৫/২৮)

সুতারং সুধী পাঠক! বন্ধু নির্বাচন করার সময় সতর্ক থাকুন। আপনার উপর নির্ভর করে আপনি কার সাথে বন্ধুত্ব করবেন। যদি আতরওয়ালার সাথে বন্ধুত্ব করেন, তাহলে সে আপনার দুনিয়াতে ও আখেরাতে কল্যাণ বয়ে আনবে। আর যদি হাপরওয়ালার সাথে বন্ধুত্ব করেন, তাহলে সে আপনার দুনিয়াতে ও আখেরাতে শুধু ক্ষতিই করে যাবে। তাই ভেবেচিন্তে বন্ধু নির্বাচন করুন। আল্লাহ আমাদের বুঝার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!


* শিক্ষার্থী, সরকারি মোল্লারটেক উদয়ন উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়, দক্ষিণখান, ঢাকা।

[1]. ছহীহ বুখারী, হা/২১০১।

[2]. তিরমিযী, হা/২৩৭৮, হাদীছ হাসান।