اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ وَحْدَهُ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلٰى مَنْ لَّا نَبِيَّ بَعْدَهُ

আপনার রাসূল (ছাঃ) কে সাহায্য করুন

মহান আল্লাহ সৃষ্টিকে সৃষ্টি করে কতককে কতকের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। মানুষকে তিনি ‘আশরাফুল মাখলূক্বাত’ হিসাবে সৃষ্টি করে তাদের উপরে মুহাম্মাদ (ছাঃ) কে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। সর্বশ্রেষ্ঠ বংশে নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) জন্মগ্রহণ করেন (মুসলিম, হা/২২৭৮)। তিনি কখনও মিথ্যা বলেননি। প্রতারণা, ধোঁকা ইত্যাদি তাকে স্পর্শ করেনি। তিনি সকলের নিকট বিশ্বস্ত ও আমানতদার হিসাবে পরিচিত ছিলেন (হাকেম, হা/১৬৮৩)। নবুঅত প্রাপ্তির আগে জাহিলী যুগেও তিনি কোনো দিন মদের ধারে কাছেও যাননি; কোনো দিন মূর্তিও স্পর্শ করেননি। গরীব-মিসকীন-দুর্বলদের সাথে তিনি উঠাবসা করতেন, তাদের সাথে খানাপিনাও করতেন। তাদের প্রতি ছিলেন দয়ালু (মুসলিম, হা/২৩১৬)। ছোটদেরকে তিনি ভালবাসতেন, আদর-স্নেহ করতেন, তাদেরকে আগে সালাম দিতেন (মুসলিম, হা/২১৬৮; তিরমিযী, হা/১৯১৯)। তিনি ছিলেন প্রশস্ত মনের মানুষ, তার দুই হাত ছিল উদার, অধিক দানশীল (বুখারী, হা/৬০৩৪)। দুনিয়া এবং এর সৌন্দর্যের প্রতি তার সামান্যতম কোনো আসক্তি ছিল না (তিরমিযী, হা/২৩৭৭)। অবৈধ নারীপ্রেম থেকে তিনি ছিলেন পুত পবিত্র। সেজন্য এমনকি বায়‘আত নিতে গিয়েও কোনো দিন কোনো বেগানা নারীর হাত তিনি স্পর্শ করেননি (বুখারী, হা/৭২১৪)। আল্লাহর ভয়ে সর্বদা তিনি ছিলেন ভীত (মুসলিম, হা/১১০৮)। ছালাতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তিনি কাঁদতেন (আবুদাঊদ, হা/৯০৪)। দিনের পর দিন চলে যেত, অথচ তার বাড়িতে একটি খেজুরের দানা ছাড়া কিছুই থাকতো না; কখনও পানি ছাড়া কিছুই থাকতো না। দিনের পর দিন বাড়িতে চুলা জ্বলতো না (বুখারী, হা/২৫৬৭; মুসলিম, হা/২৯৭৭)। তিনি তার মুখ দিয়ে কাউকে কোনো দিন আঘাত করেননি, কষ্ট দেননি (আলে ইমরান, ৩/১৫৯; মুসলিম, হা/২৩০৯)। তার কোনো খাদেম, স্ত্রী, এমনকি কোনো প্রাণীকেও কোনো দিন মারেননি (মুসলিম, হা/২৩২৮)। সর্বদা চাঁদমাখা মুচকি হাসি তার মুখে লেগেই থাকতো (তিরমিযী, হা/৩৬৪১)। তিনি ছিলেন অত্যন্ত লজ্জাশীল (বুখারী, হা/৬১০২)। তিনি ছিলেন রহমতের মূর্তপ্রতীক। হৃদয়টা ছিল রহমত আর দয়ায় ভরা (আত-তাওবাহ, ৯/১২৮)। এমনকি কাফের ও শত্রুর প্রতিও তিনি ছিলেন দয়ালু (আল-আম্বিয়া, ২১/১০৭; মুসলিম হা/২৫৯৯)। জীব-জন্তুর প্রতিও তার দয়ার অন্ত ছিল না (মুসলিম, হা/১৯৫৫; আবুদাঊদ, হা/২৬৭৫)। তিনি ছিলেন ক্ষমার মূর্তপ্রতীক (বায়হাকী, সুনানে কুবরা, হা/১৮২৭৬)। নিজের ক্ষেত্রে কখনও কারো প্রতিশোধ নেননি (মুসলিম, হা/২৩২৮)। তার মধ্যে এতসব গুণের সমাবেশ ঘটেছিল যে, ছাহাবায়ে কেরাম তাকে সবচেয়ে বেশী ভালবাসতেন (তিরমিযী, হা/২৭৫৪)। শ্রদ্ধায় বড় বড় ছাহাবী পর্যন্ত তার চোখে চোখ রেখে তাকাতে পারতেন না (মুসলিম, হা/১২১)। এমনকি ইয়াহূদী-খৃষ্টানদের কোনো কোনো বাদশা এবং ধর্মগুরু ও বড় বড় ব্যক্তিদের কেউ কেউ তার সাক্ষাত কামনা করতেন, তাকে সেবা করতে চাইতেন, তাকে সত্যবাদী মনে করতেন (বুখারী, হা/৪৫৫৩; তিরমিযী, হা/২৪৮৫)। সর্বপ্রথম তিনিই কবর থেকে উত্থিত হবেন। কিয়ামতের ময়দানে তিনিই সর্বপ্রথম সুপারিশকারী এবং সর্বপ্রথম তার সুপারিশই গ্রহণ করা হবে (মুসলিম, হা/২২৭৮)। তিনিই সর্বপ্রথম পুলছিরাত পার হবেন (বুখারী, হা/৭৪৩৭)। তার প্রবেশের মধ্য দিয়েই জান্নাতের উদ্বোধন সম্পন্ন হবে (মুসলিম, হা/১৯৭)। এককথায় রাসূল ধ-এর মধ্যে যাবতীয় ভালো গুণের সমাবেশ ঘটেছিল এবং সবধরনের মন্দ বৈশিষ্ট্য থেকে তিনি ছিলেন দূরে। সেকারণেই মহান আল্লাহ একবাক্যে তার চারিত্রিক সনদ দিচ্ছেন এভাবে, ‘নিশ্চয়ই তুমি মহান চরিত্রের উচ্চমার্গে উন্নীত’ (আল-ক্বলাম, ৬৮/৪)।

কিন্তু দুঃখের বিষয় এমন একজন মহান ব্যক্তিকেও নানাভাবে মানসিক ও শারীরিক কষ্ট দেয়া হয়েছে। পাগল, মিথ্যাবাদী, কবি, যাদুকর ইত্যাদি বলে গালি দেয়া হয়েছে। তাকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ-উপহাস করা হয়েছে। কটূক্তি করা হয়েছে। বিভিন্ন সময় শারীরিক কষ্টও দেয়া হয়েছে। এমনকি সেজদারত অবস্থায় উটের পচা ভুড়ি পিঠে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে (বুখারী, হা/৩১৮৫)। হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে। বিষপানে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। এসব নতুন কোনো বিষয় নয়; বরং কষ্ট দেয়ার এ ধারা ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। সম্প্রতি ভোলার ঘটনা সেই ধারাবাহিক তারই অংশ বিশেষ। এসব ঘটনা শুধু নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) এর বেলায় ঘটেনি; বরং অন্যান্য নবী-রাসূলের সাথেও নির্বোধ লোকেরা এমন আচরণ করেছে (আল-আন‘আম, /১০)। কিন্তু এতে রাসূলগণের কিছুই যায় আসে না। কেননা আল্লাহ তাদেরকে সাহায্যের ওয়াদা দিয়েছেন (গাফির, ৪০/৫১)। নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) কে হিফাযতের স্পেশাল দায়িত্ব মহান আল্লাহ নিজেই নিয়েছেন (আল-মায়েদাহ, ৫/৬৭; আল-হিজর, ১৫/৯৫; আয-যুমার, ৩৯/৩৬)। অতএব, তাকে লাঞ্ছিত করা সম্ভব নয়; কারণ আল্লাহই তার মর্যাদা বাড়িয়ে দিয়েছেন (আল-ইনশিরাহ, ৯৪/৪)। যদি সারা পৃথিবীর ঝাড়–দার একত্রে ধুলা উড়িয়ে সূর্যের আলো নিভাতে চায়, তাহলে তা যেমন সম্ভব নয়। রবং অবশেষে ধুলা-ময়লা তাদের মুখেই পড়বে। তেমনি মুহাম্মাদ ধ নামক আলোকে নিভানো কারো পক্ষে সম্ভব নয়। এ আলো যতই নিভানোর অপচেষ্টা করা হবে, ততই এর গতি বৃদ্ধি পাবে (আছ-ছফ, ৬১/৮)।

কিন্তু যারা রাসূল (ছাঃ) কে নিয়ে কটূক্তি করবে, তাদের কী হবে? ইহকাল ও পরকালে তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। মহান আল্লাহ বলেন, ‘(তোমার নাম-চিহ্ন কোনো দিন মুছবে না, বরং) তোমার প্রতি বিদ্বেষপোষণকারীরাই নাম চিহ্নহীন-নির্মূল’ (আল-কাওছার, ১০৮/৩)। তিনি আরো বলেন, ‘আর যারা আল্লাহর রাসূলকে কষ্ট দেয়, তাদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক আযাব’ (আত-তাওবাহ, ৯/৬১)। অন্য আয়াতের সতর্কবার্তা, ‘নিশ্চয় যারা আল্লাহ ও তার রাসূলকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত করেন এবং তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন অপমানজনক আযাব’ (আল-আহযাব, ৩৩/৫৭)। তৎকালীন পরাশক্তি পারস্য সম্রাট রাসূল (ছাঃ) এর চিঠি ছিড়ে ফেলে তাকে অপমানের অপচেষ্টা করায় আল্লাহ তাকে ও তার রাজত্বকে লন্ডভন্ড করে দেন (নাসাঈ, সুনানে কুবরা, হা/২৯২১)। রাসূল (ছাঃ) কে নিয়ে কটূক্তি করে মুরতাদ হওয়ার জঘন্য অপরাধে এক খৃস্টানকে মাটি পর্যন্ত উদগীরণ করে দেয় (বুখারী, হা/৩৬১৭; মুসলিম, হা/২৭৮১)। অতএব রাসূল (ছাঃ) কে গালমন্দকারীর নিস্তার নেই। তবে আল্লাহ তৎক্ষণাৎ শাস্তি না দিয়ে কখনও কখনও অবকাশ দিয়ে থাকেন (আর-রা‘দ, ১৩/৩২)।

এ গেলো রাসূল (ছাঃ) কে কটূক্তিকারীর আল্লাহ কর্তৃক সাজার দুয়েকটি নমুনা; প্রশ্ন হচ্ছে, রাসূল (ছাঃ) কে কটূক্তিকারীর হুকুম কী? উলামায়ে কেরামের সর্বসম্মতিক্রমে নবী (ছাঃ) কে গালমন্দকারী কাফের, মুরতাদ (আত-তাওবাহ, ৯/৬৫-৬৬) এবং তার শাস্তি হচ্ছে মৃত্যুদন্ড (তাফসীর কুরতুবী, ৮/৮২; মা‘আলিমুস সুনান, ৩/২৯৬)। কোনো কাফের কুফরী অবস্থায় নবী (ছাঃ) কে গালি দিয়ে পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করলে তার পূর্বে গুনাহসমূহ মাফ হয়ে যাবে (মুসলিম, হা/১২১); কিন্তু তার মৃত্যুদন্ড উঠে যাবে কিনা সে ব্যাপারে মতভেদ আছে। তবে কোনো মুসলিম তাঁকে গালমন্দ করে তওবা করলেও তার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করতে হবে (মাজমুউ ফাতাওয়াল উছায়মীন, ২/১৫১; ১০/৮৫২)। উল্লেখ্য, সরকার এই মৃত্যুদন্ড কার্যকর করবে। সাধারণ জনগণ আইন হাতে তুলে নিয়ে বিশৃঙ্খলা করবে না।

এক্ষেত্রে আমাদের করণীয় কী? আমরা কীভাবে তাকে সাহায্য করতে পারি? যদিও আমরা রাসূল (ছাঃ) কে সাহায্য করি বা না করি তাতে কিছু যায় আসে না; কেননা খোদ আল্লাহই তাকে সাহায্য করেন (আত-তাওবাহ, ৭/৪০)। তবে, আল্লাহ আমাদেরকে তাকে সাহায্যের নির্দেশনা দিয়েছেন আমাদের পরীক্ষা করার জন্য এবং আমাদেরই কল্যাণে। যাহোক, আমাদের কয়েকটি করণীয় হচ্ছে: (১) রাসূল (ছাঃ) এর প্রতি ঈমান আনতে হবে, তাকে সর্বোচ্চ সম্মান করতে হবে, তার আনুগত্য করতে হবে এবং সাহায্য করতে হবে (আল-ফাতহ, ৪৮/৮-৯)। এটাই একজন মুমিনের করণীয় এবং এ পথেই সফলতা (আল-আ‘রাফ, ৭/১৫৭)। (২) তার সামান্যতম অপমাণও আমরা বরদাশত করবো না। কটূক্তিকারীদের ঘৃণা করা ঈমানের পরিচয়। ‘রসূলের অপমানে যদি নাহি কাঁদে তোর মন, মুসলিম নয়, মুনাফিক তুই, রাসূলের দুশমন’। তবে, আমাদেরকে সর্বাবস্থায় ধৈর্যধারণ করতে হবে। ধীরস্থিরতার সাথে শরী‘আতসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে (আলে ইমরান, ৩/১২০)। তাড়াহুড়া করে এমন কোনো ভূমিকা নেয়া যাবে না, যা ইসলাম ও মুসলিমদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। উত্তেজিত হয়ে হরতাল, ভাঙচুরের মত প্রতিবাদের নতুন নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করা যাবে না, যাতে অমঙ্গলই বেশী। (৩) প্রত্যেকেই তার অবস্থান থেকে সাধ্য অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। সরাসরি সাক্ষাত করে, টেলিফোন-মোবাইলে, পত্রের মাধ্যমে বিভিন্নভাবে অপরাধীদেরকে বিচারের আওতায় আনতে সরকারকে অনুরোধ করতে হবে। (৪) মুসলিমদের বিচ্ছিন্ন না হয়ে একতাবদ্ধভাবে প্রচেষ্টা চালাতে হবে (আলে ইমরান, ৩/১২০)। (৫) রাসূল (ছাঃ) এর জীবনী, তার বৈশিষ্ট্য ও আদর্শ সম্পর্কে জানতে হবে এবং ব্যাপক প্রচার করতে হবে। এক্ষেত্রে আধুনিক ইলেকট্রিক মিডিয়া, প্রিন্ট মিডিয়া সহ সব মিডিয়াকে কাজে লাগাতে হবে। এসব মিডিয়ায় বিভিন্ন ভাষায় নবীজীবনী ও ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরতে হবে। (৬) বিশ্বব্যাপী রাসূল (ছাঃ) এর পরিচয়, তার চারিত্রিক গুণাবলি ও মানবতার ধর্ম ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরার লক্ষ্যে শান্তিপূর্ণভাবে বিভিন্ন কর্মসূচী হাতে নিতে হবে। এ লক্ষ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে রাসূল ধ-এর জীবনী ও আদর্শ সম্পর্কিত গ্রন্থ সিলেবাসভুক্ত করতে হবে। এছাড়া বিভিন্ন সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, সভা, সমাবেশ ও কর্মশালার আয়োজন করা যেতে পারে। (৭) বিরুদ্ধবাদীদের উত্থাপিত বিভিন্ন সংশয় ও বিভ্রাটের দলীল ভিত্তিক ও যুক্তিসঙ্গত জবাবদানের জন্য আলেম-উলামা ও জ্ঞানীদেরকে এগিয়ে আসতে হবে।

মহান আল্লাহ আমাদেরকে রাসূল (ছাঃ) এর জন্য জীবন উৎসর্গ করার তাওফীক্ব দান করুন। আমীন!