আপনার সমীপে আপনার আমানত!
-মীযান মুহাম্মদ হাসান*


লিখার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত না হলেও আজ বড় ব্যথিত হৃদয় ও ভগ্ন মন নিয়ে লিখতে হচ্ছে। কারণ রূযীর তাড়না যাদের তাড়িয়ে ফেরে, তারা কী করে গবেষণার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজের আঞ্জাম দিবেন? কীভাবে এইরূপ উদ্ভাবন বা আবিষ্কারমূলক কাজ সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সম্পাদন করা সম্ভব হবে? 

কীভাবে তাদের কলম চলবে? দু’মুঠো অন্নের জন্য যাদেরকে আজ কর্তৃপক্ষের গোলামি করতে বাধ্য করা হচ্ছে। মাস অতিবাহিত হয়ে গেলেও অনেক সময় তাঁদের নির্ধারিত পারিশ্রমিক পরিশোধের ব্যবস্থা হয় না। মাদরাসার শিক্ষকের ক্ষেত্রে সচরাচর এমন অবস্থা পরিলক্ষিত হয়। এভাবেই অনাহারে-অর্ধাহারে লাখো আলেমকে অতিবাহিত করতে হচ্ছে জীবিকা উপার্জনের তাঁদের সংগ্রামী জীবন। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই যাদের একমাত্র লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, দিন শেষে তারাই হলেন এই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে অবহেলা ও অবজ্ঞার পাত্র।

সূরা ফাতিহা শুদ্ধ করে পাঠ করার মতো সৎ সাহস না থাকলেও আলেমের বিরুদ্ধে কর্তৃত্ব প্রদর্শনে তারা যথেষ্ট সিদ্ধহস্ত। যেন বাপের টাকায় কেনা গোলাম বেচারা ইমাম-মুআযযিন! যা-ই হোক এজন্যই সৎ সাহস দেখিয়ে কুরআন-হাদীছ ভিত্তিক আলোচনা ও হালাল-হারাম সম্পর্কে স্পষ্ট বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ সব আলেমের নেই। দিন দিন এ অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে। কোণঠাসা করা হচ্ছে আলেম সমাজকে। 

হে আলেম সমাজ! আল্লাহ তাআলা আপনাদেরকে নবুওয়াতের ইলম অর্জনের জন্য কবুল করেছেন। আপনাদের কারও ইলম যদিও মধ্যম স্তরের হয়, তবুও রূযী অন্বেষণের পাশাপাশি আপনার সহকর্মীর পরামর্শে নিজের/ উম্মাতের কল্যাণ সাধনে সময় ব্যয় করুন। দু‘আয়, কান্নায় ও তাহাজ্জুদে তাদের ঈমানের উপর অটল, অবিচল ও স্থায়ী থাকার জন্য আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করুন । 

আর যদি আল্লাহ তাআলা আপনাকে উচ্চ স্তরের ইলম দান করে থাকেন, সাথে আপনি যদি ভালো মানের আলেম হয়ে থাকেন, তবে জেনে রাখুন! আপনার যিম্মাদারি অনেক বেশি। দ্বীনের সঠিক দাওয়াত দেওয়া আপনার আমানত।

যাদের তাখাছছুছ ফিল ফিক্বহে বা শরঈ মাসআলার ক্ষেত্রে বিশেষ জ্ঞান অর্জনের সুযোগ হয়েছে, তাঁরা ফিক্বহী মাসআলা-মাসায়েল অধ্যয়ন ও গবেষণায় বেশি বেশি সময় ব্যয় করুন। যাদের উলূমুল হাদীছে তাখাছছুছ বা বিশেষ জ্ঞান লাভের সুযোগ হয়েছে, তাঁরা এ ক্ষেত্রে আরও বেশি গুরুত্বসহ অধ্যয়ন করুন। আলোচনা, বয়ান ও বক্তৃতায় সর্বত্র হাদীছে নববীর প্রমাণিকতাকে তুলে ধরুন। 

ফেতনার বিস্তার আজ সর্বত্র লক্ষণীয়। কেউ কুরআনকেই মুক্তির একমাত্র মাধ্যম মনে করেন; যেখানে হাদীছের অনুসরণ তাঁর নিকট নিষ্প্রয়োজন। আবার দল-মত প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম অনেককে হাদীছ অস্বীকার করতে বাধ্য করেছে। বর্তমানে মানুষ যেভাবে প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল হয়েছে, ঠিক সেইভাবে বাতিল আক্বীদায় বিশ্বাসীরা এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাধারণ জনগণকে প্রতিনিয়ত ধোঁকা দিয়ে যাচ্ছে। সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ভুমিকাও এ ক্ষেত্রে কম নয়। 

হাদীছ অস্বীকারকারীদের সম্পর্কে ভাববার সময় কী এখনও আসেনি? কুরআন ভিত্তিক ইসলাম প্রচারের নামে ইসলামের অপব্যাখ্যাকারীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার সময় কী এখনও হয়নি? কুরআন ভিত্তিক ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে আহলে কুরআন কর্তৃক কুরআনের অপব্যাখ্যা করা হচ্ছে। সুন্নাত, ওয়াজিব, ফরয ইত্যাদি ইবাদতের প্রতি মানুষের হৃদয়ে বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে। দাড়ি, টুপি ও বোরকা ইসলামী পোশাক বা সংস্কৃতি নয় বলে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো কুরআনের অপব্যাখ্যাকেই হাদীছ অস্বীকারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কুরআন বোঝার জন্য তাফসীর গ্রন্থকে আবশ্যক মনে করা হলেও সুকৌশলে মস্তিষ্ক প্রসূত যুক্তির মাধ্যমে হাদীছকে অস্বীকার করা হচ্ছে। তাঁরা কি সূরা আন-নাজমের এ আয়াতদ্বয় সম্পর্কে জানে না? ‘তিনি মনগড়া কিছুই বলেন না। কেবল যা অহি করা হয়, শুধু তাই তিনি বলেন’ (আন-নাজম, ৫৩/৩-৪)। অন্তত এ আয়াত দুটি সম্পর্কে যাদের নূন্যতম জ্ঞান আছে, তারা হাদীছ অস্বীকার করার মতো দুঃসাহস দেখাবে না? 

বলা হচ্ছে, কুরআনেই সব কিছু আছে। এর বাইরে হাদীছকে কুরআনের মতো মান্য করা বা অনুসরণ করা যাবে না। এমনকি হাদীছকে ঐতিহাসিক বক্তব্য বলে অপপ্রচার করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে ঐতিহাসিক বক্তব্য দলীল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। ইমাম ইবনু মাজাহ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মতো স্বনামধন্য মুহাদ্দিছকে অস্বীকার করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে এই নামে কোন মুহাদ্দিছের আবির্ভাব হয়নি। এই জাতীয় তথ্য সন্ত্রাস ছড়ানোর জন্য ইংরেজি ভাষাকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কুরআনের ইংরেজি অনুবাদে এ জাতীয় কৌশল সবচেয়ে বেশি আবলম্বন করা হচ্ছে।

তারা যদি ‘আল-ইমাম ইবনু মাজাহ ওয়া কিতাবুহুস সুনান’ কিংবা ‘ইমাম ইবনু মাজাহ আওর উলূমুল হাদীছ’ পড়তেন, তবে হয়ত তারা এ জাতীয় মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকতেন। 

আবার কুতুবে সিত্তাহ বা ছয়টি হাদীছ গ্রন্থ সংগ্রহে রাখা নাকি একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার। তবে যারা এই জাতীয় কর্মে লিপ্ত, তারা কী কুতুবে সিত্তাহ কী তা জানেন? এদের মূল উদ্দেশ্য কী? এরা কি ওরেন্টালিস্ট নয়? তবে কি এদের মাধ্যমে সুকৌশলে হাদীছকে অস্বীকার করা হচ্ছে না?

উলূমুল হাদীছের পাঠ আলোচনা ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা এখন সময়ের অন্যতম অনিবার্য দাবি হয়ে উঠেছে। 

হায়! এরা কি উলূমুল হাদীছও অস্বীকার করবে? অথচ যুগ যুগ ধরে এই বিষয়ের চর্চা হয়ে আসছে সারা পৃথিবী জুড়ে। এদের কার্যক্রম এখানেই শেষ নয়। এরা ইদানিং ফিক্বহের ইমামদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়া শুরু করেছে। এমন কি এরা ফিক্বহের ফৎওয়া শাস্ত্রকেও অস্বীকার করার মতো দুঃসাহস দেখাচ্ছে। 

হে উম্মাতের কান্ডারি আলেম সমাজ! তাই পরিশেষে এই একটি কথা বলে শেষ করতে চাই। তা হলো- সোশ্যাল মিডিয়া আকৃষ্ট,  প্রযুক্তি প্রেমিক  ও ইউটিউব নির্ভর জাতিকে রক্ষা করতে কুরআন-হাদীছের রেফারেন্সভিত্তিক প্রচুর প্রবন্ধ ও ভিডিও তৈরি ও সম্প্রচার করতে হবে। যাদের ইউটিউবে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় চ্যানেল আছে বিতর্কিত বিষয় বর্জন করে তাদের এই জাতীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা করা উচিত। এতে উম্মত উপকৃত হবে। গোমরাহি থেকে বহু লোক মুক্তি পাবে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে কুরআন, হাদীছ, দ্বীন, ঈমান, আক্বীদা ও ইসলাম সম্পর্কে নানারূপ বিভ্রান্তি থেকে হেফাযত করুন- আমীন।


* সাবেক খত্বীব, বৈরাগীরচালা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, শ্রীপুর, গাজীপুর।