আবূ হুরায়রা(রাযিয়াল্লা-হু আনহু)এর ইলম গোপন রাখার হাদীছের ব্যাখ্যা
-আহমাদুল্লাহ সৈয়দপুরী*


ভূমিকা : একজন বক্তা একদা বলে বসলেন, ‘আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লা-হু আনহু) যে হাদীছের মধ্যে ইলমের পাত্র গোপন রেখেছেন বলে উল্লেখ করেছেন, সেটি মূলত কিয়ামতের আলামত বিষয়ক। অর্থাৎ কিয়ামত সংশ্লিষ্ট কিছু আলামতের কথা তিনি ভয়ে বলেননি। যদি বলতেন, তাহলে তার গলা কেটে ফেলা হতো’।

উক্ত বক্তা সাহেবের এমন বক্তব্য প্রকাশিত হওয়ার পর কিছু দ্বীনী ভাই বিষয়টি নিয়ে একটি লেখা লিখতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাদের পরামর্শ ধরেই এই ছোট্ট লেখাটি রচিত হলো। আশা করি, এই ছোট্ট লেখনীই আপনাদেরকে সঠিক ধারণা দিতে সক্ষম হবে ইনশাআল্লাহ।

আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লা-হু আনহু)-এর ইলম গোপন রাখার হাদীছের সঠিক ব্যাখ্যা : হাদীছের ব্যাখ্যা জানার পূর্বে আমাদেরকে প্রথমে হাদীছটি অধ্যয়ন করতে হবে, যা নিম্নরূপ—

ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ) (মৃ. ২৫৬ হি.) বলেছেন,

حَدَّثَنَا إِسْمَاعِيلُ قَالَ حَدَّثَنِي أَخِي عَنِ ابْنِ أَبِي ذِئْبٍ عَنْ سَعِيدٍ المَقْبُرِيِّ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ حَفِظْتُ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ وِعَاءَيْنِ فَأَمَّا أَحَدُهُمَا فَبَثَثْتُهُ وَأَمَّا الآخَرُ فَلَوْ بَثَثْتُهُ قُطِعَ هَذَا البُلْعُومُ.

আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লা-হু আনহু) বলেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ) হতে ইলমের দুটি পাত্র সংরক্ষণ (অর্জন) করেছি। একটি আমি প্রসার করেছি। আর অপর পাত্রে থাকা ইলম যদি আমি প্রচার করি, তাহলে আমার গলার রগ কেটে ফেলা হবে।[1]

ব্যাখ্যা : এ হাদীছে আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লা-হু আনহু) যে অন্য ইলমটি গোপন করেছেন, তা জানার কোনো উপায় নেই। কেননা তিনি উল্লেখ করেননি। যেহেতু তিনি উল্লেখ করেননি, তার কোনো তাবেঈ ছাত্রও বিষয়টি বলে যাননি। সেহেতু আমাদের পক্ষে তা জানাও সম্ভব নয়।

যখন স্বয়ং আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লা-হু আনহু) বিষয়টি স্পষ্ট করেননি; তখন অন্য লোকেরা কি আলেমুল গায়েব হয়ে গিয়েছেন যে, তারা আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লা-হু আনহু)-এর অন্তরের কথা জেনে বসে আছেন?!

তবে (অন্যান্য হাদীছের আলোকে) এতটুকু কথা নিশ্চয়তার সাথে বলা যেতে পারে যে, এই ইলম দ্বারা আহকাম ও মাসায়েল বিষয়ক ইলমকে বুঝানো হয়নি। কেননা এগুলো গোপন রাখা জায়েয নয়। উপরন্তু আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লা-হু আনহু) জানের ভয়ের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। যা দ্বারা ইশারা পাওয়া যায়, এর দ্বারা ফেতনার সাথে সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয় হতে পারে।

ইমাম কুরতুবী (রাহিমাহুল্লাহ) (মৃ. ৬৭১ হি.) এ হাদীছ সম্পর্কে আহলে ইলমের ব্যাখ্যা পেশ করে বলেন,

قَالَ عُلَمَاؤُنَا وَهَذَا الَّذِي لَمْ يَبُثَّهُ أَبُو هُرَيْرَةَ وَخَافَ عَلَى نَفْسِهِ فِيهِ الْفِتْنَةَ أَوِ الْقَتْلَ إِنَّمَا هُوَ مِمَّا يَتَعَلَّقُ بِأَمْرِ الْفِتَنِ وَالنَّصِّ عَلَى أَعْيَانِ الْمُرْتَدِّينَ وَالْمُنَافِقِينَ وَنَحْوَ هَذَا مِمَّا لَا يَتَعَلَّقُ بِالْبَيِّنَاتِ وَالْهُدَى وَاللَّهُ تَعَالَى أَعْلَمُ.

আমাদের আলেমদের বক্তব্য হলো, আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লা-হু আনহু) যে ইলমকে গোপন করেছিলেন এবং যেটি প্রসার করলে ফেতনা ও কতলের ভয় করেছিলেন, সেটির দ্বারা ঐ ইলম উদ্দেশ্য, যার সাথে ফেতনাসমূহের সম্পর্ক রয়েছে। যার মধ্যে মুরতাদ ও মুনাফেক্বদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আর সেগুলো এমন বিষয়, যার সাথে দলীল ও হেদায়াতের কোনো সম্পর্ক নেই। আল্লাহই ভালো জানেন।[2]

অর্থাৎ সাধারণভাবে আমরা কেবল এতটুকুই বলতে পারি যে, এর দ্বারা ঐ ইলমকে বুঝানো হয়েছে, যার সাথে ফেতনার সম্পর্ক রয়েছে। এর চেয়ে বেশি অগ্রসর হয়ে কোনো উদ্ভট ব্যাখ্যা করা যাবে না। কিয়ামতের আলামতের ব্যাপারে অসংখ্য হাদীছ রয়েছে। সেগুলো বাদ দিয়ে কিছু মনগড়া হাদীছ নিজের পক্ষ হতে অপব্যাখ্যা করে সেটিকে বৈধতা প্রদানের জন্য বুখারীর উক্ত হাদীছকে ঢাল বানানো ফেতনা বৈ কিছুই নয়।

বাতেনী ইলম : অনেকেই এ হাদীছ দ্বারা স্বীয় উদ্দেশ্য হাছিলের জন্য বাতেনী ইলম তথা ইলমে লাদুন্নীকে প্রমাণ করতে চেয়েছেন, যা মোটেও ঠিক নয়। কেননা এ হাদীছ দ্বারা বাতেনী ইলমকে উদ্দেশ্য করার কোনো নযীর সালাফদের মাঝে পাওয়া যায় না।

ইয়াযীদ ইবনু মুআবিয়া (রাযিয়াল্লা-হু আনহু) : অনেকে এ হাদীছটি দ্বারা মুসলিমদের খলীফা ও শাসক ইয়াযীদের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রমাণে সচেষ্ট থাকেন। কিছু মানুষ নিজের কথার সমর্থনে ইবনু হাজার (রাহিমাহুল্লাহ)-এর উক্তি ও ব্যাখ্যা পেশ করেছেন যে, হাফেয ইবনু হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) ইয়াযীদকে ঐ সকল নিকৃষ্ট শাসকদের মধ্যে গণ্য করেছেন, যাদের প্রতি আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লা-হু আনহু) এ হাদীছে ইশারা করেছেন।

এর জবাব হলো, হাফেয ইবনু হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) কয়েকটি বর্ণনার ক্ষেত্রে ভুল ধারণায় পতিত হয়েছেন। যেগুলোর মধ্য হতে কিছু বর্ণনা ছহীহ ও অপ্রমাণিত এবং কিছু বর্ণনার মর্ম ভিন্ন। যেমন হাফেয ইবনু হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) (৮৫২ হি.) বলেছেন,

حَمَلَ الْعُلَمَاءُ الْوِعَاءَ الَّذِي لَمْ يَبُثَّهُ عَلَى الْأَحَادِيثِ الَّتِي فِيهَا تَبْيِينُ أَسَامِي أُمَرَاءِ السُّوءِ وَأَحْوَالِهِمْ وَزَمَنِهِمْ وَقَدْ كَانَ أَبُو هُرَيْرَةَ يَكُنِّي عَنْ بَعْضِهِ وَلَا يُصَرِّحُ بِهِ خَوْفًا عَلَى نَفْسِهِ مِنْهُمْ كَقَوْلِهِ أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ رَأْسِ السِّتِّينَ وَإِمَارَةِ الصِّبْيَانِ يُشِيرُ إِلَى خِلَافَةِ يَزِيدَ بْنِ مُعَاوِيَةَ لِأَنَّهَا كَانَتْ سَنَةَ سِتِّينَ مِنَ الْهِجْرَةِ.

আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লা-হু আনহু) যে ইলমের প্রকাশ করেননি, সে বিষয়টিকে আলেমগণ ঐ হাদীছগুলোর উপর গণ্য করেছেন যেগুলোর মধ্যে মন্দ শাসক এবং তাদের অবস্থা ও তাদের শাসনকালের বর্ণনা রয়েছে। আর আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লা-হু আনহু) তাদের মধ্য হতে কতিপয়ের প্রতি ইশারা করতেন। কিন্তু তিনি স্পষ্টভাবে বলতেন না। যেমন আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লা-হু আনহু)-এর এই বক্তব্য রয়েছে যে, আমি আল্লাহর কাছে পানাহ চাইছি ৬০ (হিজরী) সনের সূচনালগ্নের এবং শিশুদের ইমারত হতে। আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লা-হু আনহু)-এর ইশারা ইয়াযীদ ইবনু মুআবিয়ার খেলাফতের প্রতি ছিল। কেননা এই খেলাফত ৬০ হিজরী সনে ছিল।[3]

জবাবে বলতে হয় যে, এখানে হাফেয ইবনু হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) স্বীয় ব্যাখ্যার ভিত্তিস্বরূপ  বলেছেন, আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লা-হু আনহু) ৬০ হিজরী সনের থেকে এবং শিশুদের (কমবয়সী শাসক উদ্দেশ্য) খেলাফত থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। অর্থাৎ হাফেয ইবনু হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) ৬০ হিজরী সংক্রান্ত বর্ণনাটির ভিত্তিতে এটা অনুধাবন করেছেন যে, ৬০ হিজরী সনের সময়টাই হলো কমবয়সী শাসকের শাসনকাল। অথচ এই বর্ণনা থেকে এমনটা অনুধাবন করা ভুল। ইবনু হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) যে হাদীছকে দলীল হিসেবে পেশ করেছেন তার সংক্ষিপ্ত আলোচনা নিম্নরূপ—

আবূ সাঈদ খুদরী (রাযিয়াল্লা-হু আনহু) হতে বর্ণিত যে, নবী (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ) ৬০ সনের ফেতনা হতে পানাহ চাইতেন।[4]

তাহক্বীক্ব : প্রথমত, এখানে ইয়াযীদের নাম নেই। দ্বিতীয়ত, নবী (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ) যখন এ কথা বলেছিলেন, তখন হিজরী সন বলে কিছু ছিল না। বরং তিনি ৬০ বছর পরের কথা বলেছিলেন। সে হিসেবে তিনি ৭০ হিজরীর কথা বলেছিলেন। আর ইয়াযীদ ৬৫ হিজরীতে মারা গেছেন। একটি ছহীহ হাদীছে এসেছে যে, আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লা-হু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ) বলেছেন, ‘৭০ সনের শুরু হতে আল্লাহর কাছে পানাহ চাও এবং ছেলেদের শাসন হতে আশ্রয় চাও’।[5]

এই হাদীছে স্পষ্টভাবে ৭০ সনের কথা রয়েছে, যা নবী (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম )-এর মৃত্যুর পরের ৭০ বছর। এটা মূলত হাজ্জাজ বিন ইউসুফের শাসনকাল।

উপরন্তু হাফেয ইবনু হাজার (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মতের বিস্তারিত খণ্ডনও পেশ করা হয়েছে। যা আমরা পরবর্তী কোনো এক প্রবন্ধে পেশ করব ইনশাআল্লাহ। সুতরাং, যেহেতু আসল ভিত্তিটাই ভুল, সেহেতু সেই ভুলের আলোকে আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লা-হু আনহু)-এর হাদীছে বর্ণিত গোপন ইলমের ব্যাখ্যা করাও ভুল।

উপসংহার : উপরিউক্ত হাদীছ দ্বারা কিয়ামতের আলামত, ইলমে বাতেনী কিংবা ইয়াযীদের কথা বুঝানো হয়নি। এর দ্বারা আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লা-হু আনহু) ‘কাকে’ বা ‘কী’ বুঝিয়েছেন তা কেবল আল্লাহই জানেন। আমরা কোনরূপ ধারণার ভিত্তিতে মত প্রদান থেকে বিরত থাকব। নতুবা ফেতনা বাড়তে থাকবে। আল্লাহ আমাদেরকে বুঝার তওফীক্ব দান করুন- আমীন!

[1]. ছহীহ বুখারী, হা/১২০।

[2]. আল-জামে লি আহকামিল কুরআন, ২/১৮৬।

[3]. ইবনু হাজার, ফাতহুল বারী, ১/২১৬।

[4]. আহমাদ, ৩/৩৮।

[5]. আহমাদ, ১৫/৪৮৬, আলবানী ছহীহ বলেছেন; সিলসিলা ছহীহ, হা/৩১৯১।