আমি আগামীকাল তা করব[1] বলার শিষ্টাচার


 [১৪ রজব, ১৪৪২ হি. মোতাবেক ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২১। পবিত্র মদীনা মুনাওয়ারার আল-মাসজিদুল হারামে (মসজিদে নববী) জুমআর খুৎবা প্রদান করেন শায়খ ড. আব্দুল বারী বিন আওয়াদ্ব আছ-ছুবায়তী (রাহিমাহুল্লাহ)উক্ত খুৎবা বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেন আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, রাজশাহীর সম্মানিত মুহাদ্দিছ ও ‘আল-ইতিছাম গবেষণা পর্ষদ’-এর গবেষণা সহকারী শায়খ আব্দুল বারী বিন সোলায়মান। খুৎবাটি মাসিক আল-ইতিছাম’-এর সুধী পাঠকদের উদ্দেশ্যে প্রকাশ করা হলো।]

প্রথম খুৎবা



আল্লাহর জন্য সকল প্রশংসা, যাঁর প্রশংসার কোনো সীমা নেই। আমি তাঁর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি- তাঁর পথে চলার মতো এত সুন্দর নেয়ামত দান করার জন্য। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। তিনি একক, তাঁর কোনো শরীক নেই। তিনি বলেছেন, وَلَا تَقُولَنَّ لِشَيْءٍ إِنِّي فَاعِلٌ ذَلِكَ غَدًا ‘আর কোনো বিষয়ে কখনোই বলো না যে, আমি আগামীকাল তা করব’ (আল-কাহফ, ১৮/২৩)। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আমাদের নবী মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর বান্দা ও রাসূল। তিনি ছালাত, ছিয়াম ও ক্বিয়াম এত বেশি করতেন যে তার পা পর্যন্ত ভুলে যেত। আল্লাহ রহমত বর্ষণ করুন তার প্রতি এবং তার পরিবারবর্গ ও কিয়ামত পর্যন্ত তার সকল অনুসারীদের উপর।

অতঃপর, সর্বপ্রথম আমি নিজেকে এবং আপনাদের আল্লাহভীতির ব্যাপারে অছিয়ত করছি। কারণ গোপনে, প্রকাশ্যে আল্লাহকে ভয় করাই নাজাতের মাধ্যম। আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে যথাযথ ভয় করো। আর মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না’ (আলে ইমরান, ৩/১০২)

জীবন চলার পথে মানুষ বারবার যে শব্দটি আওড়িয়ে থাকে তা হলো- ‘আমি আগামীকাল তা করব। তার মনের মধ্যে থাকা পরিকল্পনা, আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং সুস্থতা, নিরাপত্তা, প্রাচুর্য, ধন-সম্পদ, প্রশস্ত বাড়ি, উন্নত গাড়ি, পদ-পদবী ইত্যাদি যা কিছু কামনা করে সেক্ষেত্রে এ শব্দটি উচ্চারণ করে থাকে। কিন্তু ইসলাম এ সকল আশা-আকাঙ্ক্ষা কিংবা প্রত্যাশার ভাষাটি কীভাবে বলতে হয় তারও শিষ্টাচার শিখিয়ে দিয়েছে। আল্লাহ বলেন,

وَلَا تَقُولَنَّ لِشَيْءٍ إِنِّي فَاعِلٌ ذَلِكَ غَدًا – إِلَّا أَنْ يَشَاءَ اللَّهُ وَاذْكُرْ رَبَّكَ إِذَا نَسِيتَ وَقُلْ عَسَى أَنْ يَهْدِيَنِي رَبِّي لِأَقْرَبَ مِنْ هَذَا رَشَدًا

‘আর কোনো বিষয়ে কখনোই বলো না যে, আমি আগামীকাল তা করব। ‘আল্লাহ চাইলে’ এ কথা বলা ছাড়া। যদি ভুলে যাও (তবে মনে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে) তোমার প্রতিপালককে স্মরণ করো। আর বলো ‘আশা করি আমার প্রতিপালক আমাকে এর চেয়েও সত্যের নিকটবর্তী পথে পরিচালিত করবেন’ (আল-কাহফ, ১৮/২৩-২৪)

‘আমি আগামীকাল তা করব কথাটি বলার ক্ষেত্রে উক্ত শিষ্টাচারের মূল রহস্য হলো, সেই পরিকল্পনা ও আশা-আকাঙ্ক্ষাকে আল্লাহর ইচ্ছার সাথে জুড়ে দেওয়া। কারণ মানব জীবনের সবকিছুর প্রত্যাবর্তনস্থল হলো আল্লাহর ইচ্ছার কাছে। আর এই চিন্তাই একজন মুসলিমকে সকল ক্ষেত্রে আল্লাহর তাওফীক্ব ও সাহায্যের উপর ভরসা করতে শেখায়।

মুসলমান যে কাজই করুক না কেন তার শুদ্ধতা এবং অশুদ্ধতা নির্ভর করে নিয়্যতের উপরে। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘সকল কাজের প্রতিফল নিয়্যতের উপর নির্ভরশীল। আর প্রত্যেক মানুষের জন্য তাই রয়েছে, যা সে নিয়্যত করে’।[2]

‘আমি আগামীকাল তা করব’ কথাটি বলার আরেকটি শিষ্টাচার হলো, কোনো কাজ করার দৃঢ় সংকল্প করার সময় ইস্তেখারা তথা আল্লাহর কাছে কল্যাণ কামনা করা। কারণ ইস্তেখারা ভবিষ্যতের পথকে আলোকিত করে, সফলতার জায়গা দেখিয়ে দেয় এবং পথচলাকে সঠিক ও সুন্দর করে। জাবের (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদেরকে কুরআনের সূরা শেখানোর মতো করে ইস্তেখারা শিখিয়ে দিতেন।[3] যখন কেউ কোনো কাজের সংকল্প করে বলে ‘আমি আগামীকাল তা করব’, তখন দৃঢ়প্রত্যয়ী ব্যক্তি সময়কে গনীমত মনে করে এবং সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই তা সম্পন্ন করার জোর প্রচেষ্টা চালায়। তার সংকল্প থেকে সরে কখনো আসে না কিংবা লক্ষ্যে পৌঁছার ক্ষেত্রে দ্বিধান্বিত থাকে না- যেন তার জীবনের ডায়ারিতে ফলপ্রসূ কর্মের প্রবাহ ও উজ্জ্বল সাফল্যের অধ্যায় সংযোজিত হয়। আল্লাহ বলেন, ‘যখন তুমি কোনো কাজের দৃঢ় সংকল্প করবে তখন আল্লাহর উপর ভরসা করো। নিশ্চয় আল্লাহ ভরসাকারীদের ভালোবাসেন’ (আলে ইমরান, ৩/১৫৯)

‘আমি আগামীকাল তা করব’ মানুষ এ শব্দটি আশা-আকাঙ্ক্ষার ক্ষেত্রে আওড়িয়ে থাকে। কিন্তু যদি এতে দুর্বার স্পৃহা এবং চূড়ান্ত ইচ্ছার সম্মিলন না ঘটে, তাহলে এর কোনো মূল্য থাকে না। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, বুদ্ধিমান হলো সেই লোক, যে মনকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং মৃত্যুর পরের জন্য আমল করে। আর অপারগ হলো সে লোক, যে মনের চাহিদার পিছনে ছুটে বেড়ায় এবং সে আল্লাহর কাছে অলীক আশা পোষণ করে’।[4] 

যাকে আল্লাহ সক্ষমতা দান করেছেন, তারপরও কাজ না করে বসে থাকে; সে মূলত নিজেকে অলসতার দিকে ঠেলে দেয়, জীবনের মূল্যবান সময় নষ্ট করে, কাফেলার পিছনে থেকে সন্তুষ্ট থাকে আর জীবনের প্রান্তসীমায় নিজেকে অকর্মণ্য প্রমাণ করে। উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, ‘তোমাদের কেউ যেন রিযিক্ব সন্ধান না করে বসে না থাকে’। তিনি আরো বলেছেন, ‘হে আল্লাহ! আমাকে রিযিক্ব দান করো’। (অতঃপর লোকদের লক্ষ্য করে তিনি বলেছেন), ‘তোমরা জানো আকাশ কখনো স্বর্ণ-রৌপ্য বর্ষণ করে না’। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,فَإِذَا قُضِيَتِ الصَّلَاةُ فَانْتَشِرُوا فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوا مِنْ فَضْلِ اللَّهِ ‘যখন ছালাত শেষ হয়ে যায় তখন তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ (রিযিক্ব) তালাশ করো’ (আল-জুমআ, ৬২/১০)

‘আমি আগামীকাল তা করব’ কতইনা উত্তম কথা! কতইনা উত্তম এর কথক! কতইনা উত্তম কাজ! কতইনা উত্তম এর কর্তা! যদি তা হয় সৎকর্ম সাধনের ময়দানে কল্যাণকর কাজে প্রতিযোগিতা এবং পুণ্য ও ইহসানের কাজে আত্মনিয়োগ করার দৃঢ়প্রতিজ্ঞা। আল্লাহ তাআলা বলেন, فَاسْتَبِقُوا الْخَيْرَاتِ ‘তোমরা কল্যাণকর কাজে প্রতিযোগিতা করো’ (আল-বাক্বারা, ২/১৪৮)

তিনি আরো বলেছেন,

وَسَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِنْ رَبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ * الَّذِينَ يُنْفِقُونَ فِي السَّرَّاءِ وَالضَّرَّاءِ وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ

‘আর তোমরা দৌড়িয়ে চলো তোমাদের রবের ক্ষমার দিকে এবং ওই জান্নাতের দিকে, যার বিস্তৃতি আসমানসমূহ ও যমীনের সমান, যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে মুত্তাক্বীদের জন্য। যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল অবস্থায় দান করে, যারা ক্রোধ সংবরণকারী এবং মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন’ (আলে ইমরান, ৩/১৩৩-১৩৪)

রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘সৎকর্ম মানুষকে অপমৃত্যু থেকে রক্ষা করে, গোপন দান আল্লাহর ক্রোধকে মিটিয়ে দেয় এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা মানুষের বয়স বৃদ্ধি করে। আর প্রতিটি ভালো কাজই ছাদাক্বা (দান)। দুনিয়াতে যারা ভালো কাজ করবে, পরকালে তারা ভালো বলেই বিবেচিত হবে’।[5]

সংকল্প করার ক্ষেত্রে ইসলামের শিষ্টাচার হলো, কোনো মানুষ যেন এমন কাজের সংকল্প না করে, যা তাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায় অথবা বিপদ, দুর্দশা ও পরীক্ষার চুল্লিতে নিক্ষেপ করে।

‘আমি আগামীকাল তা করব’ অতি উত্তম বাণী, পবিত্র আত্মা থেকে নির্গত ধ্বনি- যদি তা হয় তোমার আত্মশুদ্ধি, সন্তান-সন্ততি প্রতিপালন, নিষ্ঠার সাথে কর্মসম্পাদন, জমি চাষাবাদ এবং দেশ ও জাতির উন্নয়নে জীবনের আদর্শ ও কর্ম সম্পাদনের কার্যক্রম। আল্লাহ বলেন, ‘তিনি সেই সত্তা যিনি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাতেই তিনি তোমাদেরকে বসবাস করিয়েছেন’ (হূদ, ১১/৬১)। তাই যখন তুমি বলবে ‘আমি আগামীকাল তা করব’, অতঃপর কাঙ্ক্ষিত জ্ঞান হাছিল করলে, সফলতা অর্জন করলে, সম্পদ উপার্জন করলে অথবা সফলতার স্বর্ণ শিখরে পৌঁছে গেলে তখন ইসলামের শিষ্টাচার হলো, এই অনুগ্রহকে অনুগ্রহদাতার দিকে সম্বোধন করা এবং নেয়ামতকে নেয়ামত থেকে সম্বোধন করা। চিন্তা করে দেখো, একজন সৎ বান্দা ও আল্লাহ প্রেরিত নবীর আদব কেমন ছিল? আল্লাহ তাআলা তার সম্পর্কে বলেন,فَلَمَّا رَآهُ مُسْتَقِرًّا عِنْدَهُ قَالَ هَذَا مِنْ فَضْلِ رَبِّي ‘অতঃপর সুলাইমান যখন তা সামনে স্থির অবস্থায় দেখলেন তখন বলল, এ আমার রবের অনুগ্রহ’ (আন-নামল, ২৭/৪০)

ইসলামের রঙে রঙিন ব্যক্তি যদি বলে ‘আমি আগামীকাল তা করব’ তখন কথার ক্ষেত্রে সর্বদা সে সত্যকে আঁকড়ে ধরে। বাহিরের সাথে তার ভেতরের মিল থাকে। কথার সাথে কর্মের সামঞ্জস্য থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতঃপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলে যদি তারা কৃত অঙ্গীকার সত্যে পরিণত করত, তবে তাদের জন্য তা অবশ্যই কল্যাণকর হতো’ (মুহাম্মাদ, ৪৭/২১)। শারঈ শিষ্টাচার ও নববী আদর্শ এটা নয় যে, কোনো ব্যক্তি বলবে ‘আমি আগামীকাল তা করব’, আর মনে তা ভঙ্গ করার ইচ্ছা রাখবে কিংবা ওয়াদাকৃত বিষয়ে গড়িমসি করবে। আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা ওয়াদা পূরণ করো’ (আল মায়েদা, ৫/১)। তিনি আরো বলেন, وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْئُولًا ‘তোমরা ওয়াদা পূরণ করো। কারণ ওয়াদা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে’ (আল ইসরা, ১৭/৩৪)। এর চেয়ে আরো ভয়ংকর অভ্যাস হলো, কসম ও শপথের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্য করা এবং প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে সেই কসম ভঙ্গ করা। আল্লাহ সুবহানাহুওয়া তাআলা বলেন, ‘আর তোমরা আল্লাহর অঙ্গীকার পূর্ণ করো- যখন পরস্পর অঙ্গীকার কর। আর তোমরা আল্লাহকে সাক্ষী রেখে শপথ দৃঢ় করার পর তা ভঙ্গ করো না। নিশ্চয় আল্লাহ জানেন, যা তোমরা কর। (আন-নাহল, ১৬/৯১)

যখন মুসলিম ব্যক্তি বলে ‘আমি আগামীকাল তা করব’, এর মাধ্যমে সে যেন ভবিষ্যতের ব্যাপারে দৃঢ় সংকল্প না করে। (অর্থাৎ আমি অবশ্যই তা সম্পাদন করতে পারব, এমন বিশ্বাস যেন না রাখে। -অনুবাদক)। কারণ ভবিষ্যৎ হলো গায়েব তথা অদৃশ্য বিষয়। যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। আল্লাহ বলেন, قُلْ لَا يَعْلَمُ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ ‘হে নবী! বলে দিন, আসমান যমীনে যারা আছে, আল্লাহ ব্যতীত তাদের কেউই গায়েব সম্পর্কে জানে না’ (আন-নামল, ২৭/৬৫)। অনুরূপভাবে ‘আমি আগামীকাল তা করব’ একথা বলে বান্দা ভুল করে, যখন সে জাদুকর কিংবা জ্যোতিষীর কথার উপর ভরসা করে। যা তাকে ধ্বংসের দিকে টেনে নিয়ে যায়। মহান আল্লাহর কাছে এর থেকে আশ্রয় চাচ্ছি। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জাদুকর কিংবা গণকের কাছে আসলো এবং তার কথাকে সত্য বলে বিশ্বাস করল সে মুহাম্মাদ এর উপর অবতীর্ণ হয়েছে তা অস্বীকার করল’।[6]

‘আমি আগামীকাল তা করব’ কথাটি আবার কখনো তার কথকের ধ্বংস ও ক্ষতি ডেকে আনে; যখন এর মাধ্যমে সে প্রবৃত্তি ও সংশয়ের মধ্যে ডুবে যায় এবং পাপ থেকে তওবা করার কাজটি দিনের পর দিন বিলম্ব করতে থাকে এই বলে যে, আগামীকাল তা করব। শেষপর্যন্ত তার কাছে মৃত্যু এসে উপস্থিত হয়ে যায়। তখন অনুশোচিত হয়ে চিৎকার করে বলে, رَبِّ ارْجِعُونِ – لَعَلِّي أَعْمَلُ صَالِحًا فِيمَا تَرَكْتُ ‘হে আমার রব! আমাকে দুনিয়ায় ফিরিয়ে দাও, যেন আমি সৎকর্ম করে আসতে পারি, যা আমি ছেড়ে এসেছিলাম’ (আল-মুমিনূন, ২৩/৯৯-১০০)। সে আরো বলতে থাকে, ‘হায় আফসোস! যদি আমার পরকালীন জীবনের জন্য কোনো কিছু প্রেরণ করতাম’ (আল-ফাজর, ৮৯/২৪)

দ্বিতীয় খুৎবা



হামদ ও ছালাতের পর…। আমি নিজেকে ও আপনাদের আল্লাহভীতির অছিয়ত করছি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তুমি তোমার রবকে স্মরণ করো। যখন ভুলে যাও’ (আল-কাহফ, ১৮/২৪)

মুসলিম ব্যক্তি কখনো কখনো ভুলে যাওয়ার কারণে বহু লক্ষ্য-উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হয়। আর ভুলে যাওয়ার ওষুধ হলো সর্বদা আল্লাহর স্মরণে ব্যস্ত থাকা। যে ব্যক্তি বলে ‘আমি আগামীকাল তা করবসে কোনোদিন তার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য পৌঁছাতে পারে না। পারলেও সামান্যই পারে। সুতরাং প্রত্যেক ব্যর্থতাই ধ্বংস ডেকে আনে। আর অকর্মণ্যতা কবেই বা সফলতা এনেছে।

আবার অদৃশ্য বিষয়টি কখনো কখনো হাতছাড়া হয়ে যাওয়া বিষয়টির চেয়ে উত্তম হতে পারে। সুতরাং যা হারিয়ে ফেলেছো তার জন্য চিন্তিত হয়ো না। কারণ বান্দা কখনো কখনো আপতিত বিপদের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কল্যাণের রহস্য জানতে পারে না। আল্লাহ বলেন, ‘আর বলো, আশা করি আমার প্রতিপালক আমাকে এর চেয়েও সত্যের নিকটবর্তী পথে পরিচালিত করবেন’ (আল-কাহফ, ১৮/২৩-২৪)। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘যা তোমার উপকারে আসবে তা অর্জনে আগ্রহী হও। আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও, সাহায্য চাইতে অক্ষম হয়ো না। আর যদি তোমার কোনো বিপদ হয় তাহলে এ কথা বলো না যে, যদি আমি ওটা করতাম, তাহলে এমন এমন হতো। বরং বলো, যা হয়েছে তা হলো আল্লাহর তাক্বদীর, তিনি যা চান তাই করেন। কারণ ‘যদি’ শব্দটি শয়তানের কাজের রাস্তা খুলে দেয়’।[7]

আল্লাহর বান্দাগণ! হেদায়াতের বার্তাবাহক রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উপর দরূদ পাঠ করুন। কারণ আল্লাহ তাঁর আদেশ দিয়ে বলেছেন,

إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

‘আল্লাহ এবং তাঁর ফেরেশতামণ্ডলী নবীর উপর পড়ে। অতএব ঈমানদারগণ! তোমরা তাঁর প্রতি দরূদ পড়ো এবং সালাম প্রেরণ করো’ (আল-আহযাব, ৩৩/৫৬)। এরপর তিনি দরূদে ইবরাহীম পাঠ করেন। চার খলীফার জন্য দু‘আ করেন এবং ইসলাম ও সমগ্র মুসলিমদের শক্তিশালী করা এবং কুফর ও কাফেরদের অপমানিত ও লজ্জিত করার দু‘আ করেন। আল্লাহর শত্রু ও তাঁর দ্বীনের শত্রুদের ধ্বংস করা এবং মক্কা-মদীনা ও সমগ্র মুসলিম জাহানের নিরাপত্তার জন্য দু‘আ করেন। এছাড়াও আরও বিভিন্ন দু‘আ করে বক্তব্য শেষ করেন।


[1]. আল-কাহফ, ১৮/২৩।

[2]. ছহীহ বুখারী, হা/১; মিশকাত, হা/১।

[3]. আবূ দাঊদ, হা/১৫৩৮; ছহীহ বুখারী, হা/১১৬২।

[4]. তিরমিযী, হা/২৪৫৯; মিশকাত, হা/৫২৮৯, হাদীছটি যঈফ।

[5]. ছহীহুল জামে‘, হা/৩৭৯৬, হাদীছ ছহীহ।

[6]. ছহীহুল জামে‘, হা/৫৯৩৯; মিশকাত, হা/৪৫৯৯।

[7]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৬৪; মিশকাত, হা/৫২৯৮।