আলী হুসাইন আস-সালাফী (রহি.)

আব্দুর রহমান বিন আব্দুর রাযযাক

[ভারতে আহলেহাদীছদের কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামি‘আহ সালাফিয়্যাহ, বানারাসের দীর্ঘ ৪০ বছরের মুহাদ্দিছ ও ফৎওয়া বোর্ডের প্রধান মুফতি আলী হুসাইন সালাফী (রহি.) গত ২৪ জুলাই এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাযিঊন। তার সুযোগ্য ছাত্র আব্দুর রহমান বিন আব্দুর রাযযাক জীবনীটি লিখে দিয়েছেন। আমরা শায়খের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাই এবং মহান আল্লাহর নিকট দু‘আ করি তিনি যে, শায়খের ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে দিয়ে তাকে জান্নাতবাসী করেন- আমীন! -প্রধান সম্পাদক]

শায়খুল হাদীছ আলী হুসাইন আস-সালাফী (রহি.) আমার একজন প্রাণপ্রিয় শিক্ষক। জামি‘আহ সালাফিয়্যাহ (বেনারস) নামক আকাশের এক নক্ষত্র, সালাফী ফুল বাগানের অনুপম সুগন্ধির অদ্বিতীয় ফুল, শত ফুলে বেষ্টিত বাগানের অক্লান্ত পরিশ্রমী মালি। জন্মগ্রহণ করেছিলেন ২৩শে জানুয়ারি ১৯৫৫ সালে, ভারতের ঝাড়খণ্ড প্রদেশের বিখ্যাত ঐতিহাসিক পাকুড় জেলার বড় শেরশাহ গ্রামে।

৯ বছর বয়সে নিজ গ্রামে শিক্ষা শুরু করেন এবং ১৫ বছর বয়সে বীরভূমের রাজগাঁও থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। দারুল উলূম দেওতলা থেকে আরবী শিক্ষা গ্রহণ করেন। তিন বছর সেখানে শারহে জামি, শারহে কাফিয়াহ এবং মিশকাত পড়েন। ১৯৭২ সালে উচ্চ শিক্ষার জন্য দিল্লীর নিযামুদ্দীন কাশফুল উলূম মাদরাসায় চার বছর পড়াশোনা করেন এবং দাওরায়ে হাদীছ শেষ করেন। এ কারণেই তাকে কাশেফীও বলা হতো। ১৯৭৬ সালে মারকাযী দারুল উলূম দারুল হাদীছ রহমানিয়ার পরে ভারতের অদ্বিতীয় সালাফী প্রতিষ্ঠানে আলিম দ্বিতীয় বর্ষে ভর্তি হন। সেই দিনগুলোতে জামি‘আহ সালাফিয়্যায় আলিম চার বছরের ছিল। তিনি সেখানেই আলিম এবং দাওরা বা ফাযিল শেষ করেন এবং সালাফী লক্ববে ভূষিত হন।

তিনি জামি‘আহ সালাফিয়্যার বিখ্যাত সকল শিক্ষকের নিকট থেকে ইলম অর্জন করেন। তার স্বনামধন্য শিক্ষকদের মধ্যে একজন ছিলেন আমীনুন নাহুর সম্মানিত লেখক আব্দুল মুঈদ আল-বানারাসী। আরও ছিলেন আহলেহাদীছ সমাজের দিকপাল, হিন্দুস্তানের বিখ্যাত আরবী সাহিত্যিক ড. মুকতাদা হাসান আল-আযহারী, মাওলানা শায়খ রাঈস নাদবী, ইদরীস আযাদ রহমানী, আব্দুল ওয়াহিদ রহমানী (রহি.) ।

অসংখ্য ছাত্র তার নিকট থেকে ইলম অর্জন করেছেন। ১৯৮১ সাল থেকে মৃত্যু অবধি প্রায় ৪০ বছর জামি‘আহ সালাফিয়্যার শিক্ষক ছিলেন। জামি‘আহ সালাফিয়্যার বর্তমান শিক্ষকমণ্ডলীর অধিকাংশই শায়খের ছাত্র। ড. আব্দুল হালীম মাদানী, ড. আব্দুছ ছবূর মাদানী, ড. রহমাতুল্লাহ সালাফী, ড. হাশরুদ্দীন মাদানী, ড. ফাউযান আযহারী, শায়খ আব্দুল হাকীম মাদানী (হাফি.) ।

সম্মানিত শায়খ তার জীবদ্দশায় বিখ্যাত কিছু গ্রন্থ লিখে গেছেন। শায়খের বিখ্যাত গ্রন্থসমূহের মধ্যে-

১. ‘ফাতহুল মুগীছ ফী শারহি আলফিয়াতিল হাদীছ লিস সাখাবী’ গ্রন্থের তাহকীক্ব এবং টীকা লিখেছেন। ফাতহুল মুগীছের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য এবং সর্বোত্তম তাহকীক্ব মনে করা হয় চার খ-ের এই বইটিকে। আরব বিশ্বের বিভিন্ন লাইব্রেরি থেকে এই বই ছাপানো  হয়েছে।

২. নবাব ছিদ্দীক্ব হাসান খান ভূপালী (রহি.) -এর উপর ৪০০ পৃষ্ঠার আরবী ভাষায় বিশাল গ্রন্থ রচনা করেন।

৩. ইনায়াতু ওলামায়ে আহলেহাদীছ বিমাসআলাতিত তাওহীদ, যা কিতাবুত তাওহীদের উর্দূ ব্যাখ্যা হিদায়াতুল মুছত্বাফীদের মুক্বাদ্দামার আরবী তরজমা।

৪. এজাযুল কুরআন, মাওলানা মুজীবুর রহমান (হাফি.)-এর বাংলা কিতাবের উর্দূ অনুবাদ।

এ ছাড়াও শায়খের অনেক রিসালাহ রয়েছে। যেমন: রিসালাহ রাফঊল ইয়াদাঈন, রিসালাহ আমীন বিল জাহর, রিসালাহ ছালাতে জানাযা ইত্যাদি।

শায়খ মৃত্যু অবধি জামি‘আহ সালাফিয়্যাহ বানারাসের শিক্ষক ছিলেন। জামি‘আহর শিক্ষক আবাসিক ভবনে তিনি তার পরিবারের সাথে বসবাস করতেন। তিনি মৃত্যু অবধি জামি‘আহ সালাফিয়্যার ফতওয়া বিভাগের প্রধান ছিলেন। শত শত ফতওয়ার উপর তার সিল ও স্বাক্ষর রয়েছে।

অত্যধিক পরিশ্রমের কারণে অল্প বয়সে দুর্বল হয়ে পড়েন। পা হেচড়ে হাঁটতেন। কানে একটু কম শুনতে পেতেন। বিশাল এই মুহাদ্দিছ অতি সাধারণ জীবন যাপন করতেন। হাদীছ, নাহু এবং ফিক্বহ শাস্ত্রে তার অগাধ ইলম ছিল। ফালসাফা, মানতেকসহ আরও বিভিন্ন ময়দানে শায়খের ইলমী গভীরতা ছিল অপরিমেয়। ছহীহুল বুখারীর দারসে তার আজীব আজীব নাহবী প্রশ্নে ছাত্ররা হয়রান হয়ে যেত। শেষ জীবনে এসে শায়খের অনেক কথা অস্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। শুধুমাত্র সামনে বসা ছাত্ররা তাঁর র্দাস বুঝতে পারত। পরে জামি‘আহর পক্ষ থেকে শায়খকে পকেট সাউন্ড বক্স দেওয়া হলেও বিশেষ কোনো কাজ হয়নি।

গত ২২ জুলাই শায়খ হুট করেই অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে মেডিকেলে নেওয়া হয়, হালকা সুস্থ হলে বাসায় নিয়ে আসা হয়। কিন্তু ২৪ জুলাই দুপুরে হুট করেই আবার তার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে এবং প্রায় দু’টার সময় শায়খ আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে পরপারে পাড়ি জমান। এ দিন বাদ এশা ৯.৩০ মিনিটে জামি‘আহর শায়খ ইফনুস মাদানী (হাফি.) তার জানাযার ছালাত আদায় করান। জামি‘আহর পশ্চিম পার্শ্বস্থ কবরস্থানে শায়খকে দাফন করা হয়।

তার শূন্যস্থান পূরণ হবার নয়। শত অনুপ্রেরণার বাতিঘর ছিলেন তিনি। মানুষ শায়খের কাছে দূর-দূরান্ত থেকে রুকিয়ার জন্য আসত। পরামর্শ নেওয়ার জন্যও আসত। তিনি পারিবারিক কলহ-বিবাদের ক্ষেত্রে উত্তম পরামর্শদাতা ছিলেন। বানারাস শহরের নানা মসজিদে খুৎবা দেওয়াসহ দাওয়াতী কাজ করতেন। বিভিন্ন বাসায় সাপ্তাহিক দ্বীনী প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করতেন। তার অনুপস্থিতি মাদারে ইলমী জামি‘আহ সালাফিয়্যার প্রতিটি দেওয়ালে দেওয়ালে গুঞ্জরণ করবে। শত হৃদয়ের উচ্চ মাক্বাম ছিল শায়খের। কিছুদিন পূর্বে ‘তাওছীফ সালাফী’ নামে আমাদের সিনিয়র এক ভাই শায়খকে أَوَلَمْ يَرَوْا أَنَّا نَأْتِي الْأَرْضَ نَنْقُصُهَا مِنْ أَطْرَافِهَا এই আয়াতের তাফসীর জিজ্ঞেস করেছিলেন। শায়েখ লম্বা চওড়া বিশাল তাফসীর উল্লেখ করতে করতে এ কথাও বলেন, দুনিয়া থেকে আলেম-ওলামা উঠিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে দুনিয়াকে সংকুচিত করা হয়। শায়খ একজন অনাড়ম্বর জীবন যাপনকারী ইলমী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। জামি‘আহর দারুল ইফতা এবং লাইব্রেরি ছিল তার সবচেয়ে পসন্দের জায়গা। আমি নিজে অনেকদিন শায়খকে দারুল ইফতায় শুয়ে যেতে দেখেছি রাতে। সাধারণ একটি সাদা পাঞ্জাবি এবং ঢিলেঢালা সাদা পায়জামা ছিল শায়খের সবসময়ের পোশাক। তিনি অনেক ছাত্রের রুহানী তারবিয়াত করেছেন। শায়খের মৃত্যু হিন্দুস্তানের আহলেহাদীছ সমাজের জন্য একটি বিশাল ধাক্কা। মারকাযী দারুল উলূম জামি‘আহ সালাফিয়্যাহ বানারাসের ছহীহুল বুখারীর শিক্ষক ছিলেন তিনি। আমার জীবনে দেখা সালাফিয়্যার সেরা শিক্ষকদের তিনি একজন। আমার দেখা হিন্দুস্তানের সেরা আলেমদের তিন জনই জামি‘আহ সালাফিয়্যার বাইরে অন্য কোথাও পড়াশোনা করেননি। তিনি তাদের মধ্যে একজন। আমি নিজেকে ধন্য মনে করি যে, আমি তার মতো আলেমে দ্বীনের সান্নিধ্য লাভ করতে পেরেছি।

আল্লাহ তা‘আলা শায়খকে জান্নাতে সুউচ্চ মাক্বাম দান করুন- আমীন!

তথ্যসূত্র :

মাওলানা আব্দুল হাকীম আব্দুল মা‘বূদ মাদানী, সালনামাহ তারীখে আহলেহাদীছ ২০১৮-১৯।