আলেম-ওলামার বিদায় : শোকের ছায়া মুসলিম সমাজে

আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রাযযাক
এম.এ. (অধ্যয়নরত), উলূমুল হাদীছ বিভাগ,
মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব। 

عَبْدَ اللهِ بْنَ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ يَقُولُ : سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ :إِنَّ اللهَ لَا يَقْبِضُ الْعِلْمَ انْتِزَاعًا يَنْتَزِعُهُ مِنَ النَّاسِ، وَلَكِنْ يَقْبِضُ الْعِلْمَ بِقَبْضِ الْعُلَمَاءِ، حَتَّى إِذَا لَمْ يَتْرُكْ عَالِمًا اتَّخَذَ النَّاسُ رُؤُوسًا جُهَّالًا، فَسُئِلُوا فَأَفْتَوْا بِغَيْرِ عِلْمٍ فَضَلُّوا، وَأَضَلُّوا.

আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে ‘আছ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয় মহান আল্লাহ মানুষের মধ্য থেকে ইলম ছিনিয়ে নিবেন না। বরং আলেমগণের মৃত্যুর মাধ্যমে ইলম উঠিয়ে নিবেন। এমনকি যখন তিনি কোনো আলেম অবশিষ্ট রাখবেন না, তখন মানুষ অজ্ঞদেরকে নেতা হিসাবে গ্রহণ করবে। অতঃপর তারা জিজ্ঞাসিত হলে বিনা ইলমে ফৎওয়া দিবে। ফলে তারা নিজেরাও পথভ্রষ্ট হবে, অন্যদেরও পথভ্রষ্ট করবে’।[1]

আলেমগণের বিদায়ে সৃষ্ট শূন্যতা যে অপূরণীয় তা উক্ত হাদীছে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। আলেমগণ সমাজের বট বৃক্ষস্বরূপ। যাদের সান্নিধ্যে সাধারণ মানুষ হেদায়াতের আলোয় উদ্ভাসিত হয়। সমাজে প্রচলিত দুর্গন্ধময় আমল, অশ্লীল সংস্কৃতি এবং অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে যুগ যুগ ধরে তারাই ঢাল হিসাবে দাঁড়িয়ে আছেন। আলেমগণ প্রদীপ সমতুল্য। অন্ধকারাচ্ছন্ন পৃথিবীকে আলোকিত করাই তাদের কাজ। তারা যেখানেই থাকেন সেখানেই জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেন। আর এই উম্মতের আলেমগণের গুরুত্ব অনেক বেশি। অন্য উম্মতের ক্ষেত্রে একজন নবীর মৃত্যু হলে দাওয়াতের কাজ অব্যাহত রাখার জন্য মহান আল্লাহ নতুন নবী প্রেরণ করতেন। এমনকি তিনি কখনো কখনো একই সময়ে একাধিক নবীও পাঠিয়েছেন। যেমন- যাকারিয়া (আ.), ইয়াহ্ইয়া (আ.), ঈসা (আ.) এবং ইবরাহীম (আ.) ও লূত (আ.)। কিন্তু মুহাম্মাদ (ছা.) সর্বশেষ নবী। তাঁর পরে আর কোনো নবী আসবেন না। কোনো নবী না আসা সত্ত্বেও ১৪০০ বছর যাবৎ ইসলামের দাওয়াত অব্যাহত আছে। ক্বিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে ইনশাআল্লাহ। নবীর অবর্তমানে দাওয়াতী কাজের এই নিরবিচ্ছিন্নতার মূল রহস্যই হচ্ছে ইলম  ও ইল্মের বাহক আলেমগণ। মক্তব, মাদরাসা ও মসজিদে প্রদত্ত জানা-অজানা অগণিত আলেমের দারস, লেখনী ও বক্তব্যের মাধ্যমে হাজার বছর পর হাজার মাইল দূরে আজ আমাদের পর্যন্ত ইসলামের দাওয়াত পৌঁছেছে। আমরা তাদের নাম না জানলেও মহান আল্লাহ তাদের চিনেন। এজন্যই তো রাসূল (ছা.) বলেছেন,إِنَّ الْعُلَمَاءَ وَرَثَةُ الأَنْبِيَاءِ إِنَّ الأَنْبِيَاءَ لَمْ يُوَرِّثُوا دِينَارًا وَلاَ دِرْهَمًا إِنَّمَا وَرَّثُوا الْعِلْمَ ‘আলেমগণ হচ্ছেন নবীর ওয়ারিছ বা উত্তরাধিকারী। নবীগণ উত্তরাধিকার সূত্রে দীনার-দিরহাম রেখে যাননি। বরং তাঁরা রেখে গেছেন ইলম ’।[2]

কুরআন ও হাদীছের ইলম হাজার বছর ধরে নিজেদের বক্ষে ধারণ করে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার এই মহান দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন আলেমগণ। তাই তাদের বিদায় সবসময় দেশ ও জাতির সীমাহীন ও অপূরণীয় ক্ষতির কারণ। বড় বড় আলেমগণের বিদায়ে করোনা ভাইরাসে বিপর্যস্ত পৃথিবী যেন আরো নিস্তব্ধ হয়ে আসছে। তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন- অধ্যাপক মোবারক আলী, ড. ইলিয়াস আলী, আইনুল বারী আলিয়াভী ও মুফতী সাঈদ আহমাদ পালানপুরী (রহি.)। প্রথম তিন জন উভয় বাংলার আহলেহাদীছ সমাজের উজ্জ্বল নক্ষত্র। আর শেষের জন দেওবন্দী ধারার জ্ঞানের বাতিঘর; আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক।

অধ্যাপক মোবারক আলী :

অধ্যাপক মোবারক আলীর সাথে জড়িয়ে আছে কিছু সুখস্মৃতি। ১লা ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সালে আয়োজিত সুরিটোলা স্কুল মাঠের এক প্রোগ্রামে তার পাশে বসে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ হয়েছিল। সেদিনের বক্তব্যের বিষয় ছিল ‘জাল ও যঈফ হাদীছ’। বক্তব্য শুনে তিনি আমাকে বলেছিলেন, আল্লামা আলীমুদ্দীন নদিয়াভীর মতো হাদীছ বিষয়ক বক্তব্য আজ বহুদিন পর শুনলাম। অল্প সময়ের সাক্ষাতে অনুভব করেছিলাম, তিনি প্রশস্ত হৃদয় ও উন্নত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন একজন আদর্শ পুরুষ। আহলেহাদীছদের ঐক্যের বিষয়ে যেকোনো পদক্ষেপের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অত্যন্ত ইতিবাচক। তিনি দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন। অসুস্থ থাকা অবস্থায় আমি এবং আব্বু তাকে একবার দেখতে গিয়েছিলাম। যতবারই তার কাছে গিয়েছি, তাকে অমায়িক ব্যবহারের অধিকারী একজন উদারমনা মানুষ হিসাবে পেয়েছি।

শিক্ষা জীবনে তিনি সরকারি মাদরাসা-ই-আলিয়া থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করার পর প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এ. অনার্সসহ অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে এম.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন। তার বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের সূচনা হয় মাদরাসায় শিক্ষকতার মাধ্যমে। অতঃপর মুন্সিগঞ্জ হরগঙ্গা সরকারি কলেজে অধ্যাপক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ কবি নজরুল সরকারি কলেজ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তারপর অল্প কিছুদিন ‘মাদরাসাতুল হাদীস’ নাজির বাজারের অধ্যক্ষ হিসাবে সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেন। চাকরি জীবনের পাশাপাশি ‘বাংলাদেশ জমঈয়তে আহলে হাদীস’-এর বিভিন্ন গুরত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করেন। সবশেষে তিনি ‘বাংলাদেশ জমঈয়তে আহলে হাদীস’-এর মাননীয় সভাপতি হিসাবে অত্যন্ত সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন।

অধ্যাপক মোবারক আলী ২০ মে, ২০২০, বুধবার, রাত ৯.৫০ মিনিটে রাজধানীর ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল আনুমানিক ৮০।  তিনি স্ত্রী, ২ পুত্র, ৬ কন্যা, নাতি-নাতনী ও অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে যান। তিনি দীর্ঘদিন যাবৎ বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন। পরদিন সকাল ১০ টায় বংশাল আহলেহাদীছ জামে মসজিদে তার প্রথম জানাযার ছালাত অনুষ্ঠিত হয়। জানাযায় ইমামতি করেন ‘জমঈয়তে আহলে হাদীস’-এর কেন্দ্রীয় সেক্রেটারী জেনারেল শায়খ শহীদুল্লাহ খান মাদানী। অতঃপর বেলা সাড়ে ১১ টায় মাদরাসা দারুল হাদীছ সালাফিয়াহ, পাঁচরুখী, নারায়ণগঞ্জে তার দ্বিতীয় জানাযা শেষে নরসিংদীর আখালিয়া গ্রামে তাকে দাফন করা হয়।

ড. মুহাম্মাদ ইলিয়াস আলী :

তিনি একাধারে একজন আলেম, সংগঠক, প্রশাসক, শিক্ষাবিদ, সাধারণ শিক্ষা ও আলিয়া শিক্ষার সমন্বয়ক। ১৯৪৯ সালের ১লা সেপ্টেম্বর চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলার দেবীনগরের এক আলেম পরিবারে জন্মগ্রহণ করা ড. ইলিয়াস ছিলেন একাধারে ক্বওমী, আলিয়া ও জেনারেল শিক্ষায় উচ্চশিক্ষিত একজন অনন্য ব্যক্তিত্ব। তার অর্জিত সার্টিফিকেটগুলো নিম্নরূপ :

১. দাওরায়ে হাদীছ : তিনি মাদরাসাতুল হাদীস নাজির বাজার ঢাকা ও দারুল হাদীছ, চাঁপাই নবাবগঞ্জ থেকে দাওরায়ে হাদীছ ডিগ্রি অর্জন করেন।

২. দাখিল : ১৯৬১ সালে মাদরাসা বোর্ড থেকে সারা দেশে ১৩ তম বোর্ড স্টান্ড করে কৃতিত্বের সাথে পাশ করেন।

৩. আলিম : ১৯৭৩ সালে মাদরাসা বোর্ড থেকে সারা দেশে ২০ তম স্থান অধিকার করে আলিম পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে পাশ করেন।

৪. ফাযিল : ১৯৭৫ সালে মাদরাসা বোর্ড থেকে ৯ম বোর্ড স্টান্ড অর্জনের অসামান্য সফলতা দেখিয়ে ফাযিল ডিগ্রি অর্জন করেন।

৫. কামিল : ১৯৭৭ সালে মাদরাসা বোর্ড থেকে ১০ম স্থান অর্জনের কৃতিত্ব নিয়ে তাফসীর বিভাগ থেকে কামিল পরীক্ষায় কৃতকার্য হন।

৬. এস.এস.সি. : ১৯৬৫ সালে স্কুল বোর্ড থেকে বিজ্ঞান বিভাগে ১ম ডিভিশনে এস.এস.সি পাশ করেন। একজন ক্বওমী মাদরাসার ছাত্র আলিয়ার পাশাপাশি স্কুল থেকেও ডিগ্রি নিচ্ছেন তাও আবার বিজ্ঞান বা সায়েন্স থেকে। কারো মেধা কতটা তুখোড় হলে এই কৃতিত্ব অর্জন সম্ভব!

৭. এইচ.এস.সি. : ১৯৬৭ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে ১ম ডিভিশনে এইচ.এস.সি. পরীক্ষায় সফলতা অর্জন করেন।

৮. অনার্স : ১৯৭০ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিসংখ্যান বিভাগে অনার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।

৯. মাস্টার্স : ১৯৭২ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিসংখ্যান বিভাগ থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন।

১০. ডিপ্লোমা : জাতিসংঘের UNDP-এর স্কলারশীপে ১৯৮০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যায়ের ইন্টারন্যাশন্যাল স্ট্যাটিসটিক্যাল প্রোগ্রাম সেন্টার (ISPC) থেকে স্যাম্পল সার্ভে মেথোড বিষয়ে পোস্ট গ্রাজুয়েশন ডিপ্লোমা ডিগ্রি অর্জন করেন। এছাড়াও তিনি ১৯৮৫ সালে নিউ দিল্লীস্থ অল-ইন্ডিয়া ম্যানেজমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন (AIMA) পোস্ট গ্রাজুয়েট ডিপ্লোমা ডিগ্রি লাভ করেন।

১১. বিএড. : জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যাচেলর ডিগ্রি (বিএড)ও অর্জন করেন।

১২. পি.এইচ.ডি. : তিনি ২০০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক হতে পি.এইচ.ডি অর্জন করেন। তার অভিসন্দর্ভের বিষয় ছিল- ÔProblems and Prospects of Madrasah Education in Bangladesh’|

কী বর্ণাঢ্য তার শিক্ষা জীবন! কল্পনা করা যায়! খুব কম ছাত্রই এমন আছে যে ক্বওমী, আলিয়া ও জেনারেল উভয় লাইনে এই রকম কৃতিত্বের সাথে নিজের শিক্ষা জীবন সমাপ্ত করেছেন। তার শিক্ষা জীবন যেমন বিস্ময়কর ছিল, ঠিক তেমনি তার কর্মজীবনও বিস্ময়কর। বিভিন্ন ধরনের কাজের সমন্বয় ঘটেছে তার জীবনে। তার কর্ম জীবনেরআদ্যোপান্ত এত ছোট প্রবন্ধে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব নয়। সারর্মম হিসাবে বলতে গেলে তিনি প্রায় ৩২টি দেশ সফর করেছেন। তন্মধ্যে অধিকাংশ দেশে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ নিতে অথবা প্রশিক্ষণ দিতে সফর করেছেন। তিনি কম্পিউটার, কৃষি, শিক্ষা, প্লান এন্ড ম্যানেজমেন্ট, বিজ্ঞান, প্রশাসন, ইসলাম, জেন্ডার ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ের উপর দেশে-বিদেশে অগণিত প্রশিক্ষণ নিয়েছেন ও দিয়েছেন।

চাকরি জীবনে তিনি কখনো শিক্ষক আবার কখনো ব্যাংকার আবার কখনো সায়েন্টিফিক অফিসার, কখনো আবার গবেষণা সহকারী ও কখনো সরকারি মন্ত্রণালয়েও দায়িত্বরত ছিলেন। সর্বশেষ Bangladesh Bureau of Educational Information and Statistics (BANBEIS)বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রধান থাকা অবস্থায় তিনি সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। এছাড়া শিক্ষা বিষয়ক বিভিন্ন সরকারি কমিটির সদস্য থেকে শিক্ষার মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। যেমন:

১. প্রফেসর ড. মোঃ মনিরুজ্জামান মিয়া শিক্ষা কমিশন, ২০০৩ গঠিত সাব-কমিটির মেম্বার-সেক্রেটারি।

২. প্রফেসর ড. এম এ বারী মাদরাসা রিফোর্মস শিক্ষা কমিশন।

৩. ন্যাশনাল কারিকুলাম এন্ড টেক্সটবুক বোর্ড (NCTB)এবং বাংলাদেশ মাদরাসা এডুকেশন বোর্ড (BMEB)গঠিত কারিকুলাম ডেভেলপমেন্ট, অ্যাসেসমেন্ট এন্ড ইভালুয়েশন প্রসেস বিষয়ক বিশেষত সেকেন্ডারি লেভেলে ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম  শ্রেণি পর্যন্ত বিভিন্ন কমিটিতে তার কার্যকর ভূমিকা অতুলনীয়।

৪. এতদ্ব্যতীত ফাযিল ও কামিলকে সাধারণ শিক্ষার যথাক্রমে ব্যাচেলর এবং পোস্ট গ্রাজুয়েশন সমপর্যায়ে উন্নীতকরণ বিষয়ক (UGC)গঠিত মাদরাসা ইক্যুয়িভ্যালেন্স কমিটিতে তার বলিষ্ঠ ভূমিকা প্রশংসনীয়।

৫. স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার পোস্ট প্রাইমারি লেভেলের শিক্ষকদের সরকারের আর্থিক সহযোগিতা ‘মান্থলি পে অর্ডার’ (MPO)সম্প্রসারিত করার লক্ষ্যে গঠিত উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটির মেম্বার-সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেন।

এত ব্যস্ততার মাঝেও তিনি ‘বাংলাদেশ জমঈয়তে আহলে হাদীস’-এর বিভিন্ন দায়িত্ব আন্তরিকতার সাথে পালন করতেন। ২০১০ সালে তিনি সভাপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। সভাপতি হিসাবে তিনি জমঈয়তের অনেক অসামান্য কাজ সম্পাদন করেছেন, যার অন্যতম হচ্ছে যাত্রাবাড়ীতে আধুনিক ভবনে জমঈয়তের অফিস, তর্জুমানুল হাদীছ পুনরায় প্রকাশ ইত্যাদি।

শ্রদ্ধেয় ড. ইলিয়াস আলী (রহি.)-এর লেখালেখির অভ্যাসও ছিল। এত দায়িত্ব পালন ও ব্যস্ততার মাঝে তিনি লিখতেন কীভাবে তাও ভাববার বিষয়। তার দু’টি বই বিদগ্ধ পাঠক সমাজে অনেক সমাদৃত। যথা- ‘যুগে যুগে শিক্ষা কমিশন ও শিক্ষার উত্তরণ’ এবং ‘শিক্ষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে বিশ্ববাসী মুসলিমদের কাছে ঋণী’।

এই মহান মানুষটি গত ১৫ মে, ২০২০, শুক্রবার সকাল ৬ টায় তার বড় ছেলের বাসভবনে বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭২ বছর। তিনি স্ত্রী, ৫ পুত্র, নাতি-নাতনী ও অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে যান। ঐদিন বাদ জুম‘আ বংশাল আহলেহাদীছ জামে মসজিদে তার জানাযার ছালাত অনুষ্ঠিত হয়। জানাযায় ইমামতি করেন ‘বাংলাদেশ জমঈয়তে আহলে হাদীস’-এর কেন্দ্রীয় সেক্রেটারী জেনারেল শায়খ শহীদুল্লাহ খান মাদানী। জানাযা শেষে তাকে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী গোরস্থানে দাফন করা হয়।

তিনি যখন মারা যান, আব্বু (শায়খ আব্দুর রাযযাক বিন ইউসুফ) তখন ই‘তিকাফে ছিলেন। আব্বুকে তার মৃত্যু সংবাদ জানালে তার বিষয়ে অনেক স্মৃতিচারণ করেন। আব্বুর সাথে তার সবচেয়ে বড় সম্পর্ক ছিল এলাকার সম্পর্ক। আব্বু তাকে চাচা বলে ডাকতেন। তিনি আব্বুকে ভাতিজা বলে ডাকতেন। বিভিন্ন প্রোগ্রামে একত্রিত হলে ‘চাচা-ভাতিজা যেখানে, ভয় নাই সেখানে’ বলে রসিকতাও করতেন।

উল্লেখ্য, চাঁপাই নবাবগঞ্জের দেবীনগর অঞ্চলটি ঐতিহাসিকভাবে কয়েকশ’ বছর ধরে আহলেহাদীছ অধ্যুষিত এলাকা। সারা বাংলাদেশে আহলেহাদীছ বা সালাফিয়্যাতের প্রচারে এই অঞ্চলের ওলামায়ে কেরামের অবদান অনস্বীকার্য। এই অঞ্চলে যেমন প্রচুর পরিমাণে আহলেহাদীছ ক্বওমী মাদরাসা রয়েছে, ঠিক তেমনি সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আহলেহাদীছ ক্বওমী মাদরাসার অধিকাংশ ছাত্র-শিক্ষকও এই অঞ্চলের।

আইনুল বারী আলিয়াভী (রহি.) :

আমার নানাকে দেখেছি ছালাতের জন্য সর্বদা একটি বইই খুঁজতেন, আর তা হচ্ছে- ‘আইনী তুহফা সালাতে মুস্তফা’। নানার এই বইয়ের প্রতি আগ্রহ থেকেই আমি পরিচিত হই আইনুল বারী আলিয়াভী নামটির সাথে। পরিচিত হওয়ার পর ধীরে ধীরে বুঝতে পারি, এই নামের খ্যাতি এপার ও ওপার বাংলার আহলেহাদীছের ঘরে ঘরে। আব্বু তার ২০১৭ সালের ভারত সফরে আইনুল বারী আলিয়াভী (রহি.)-এর সাথে সাক্ষাতের স্মৃতিচারণ করতেন মাঝে মধ্যেই।

যেদিন সকালে ড. ইলিয়াস (রহি.) মারা গেলেন, সেদিন সন্ধ্যাতেই এলো আইনুল বারী আলিয়াভী (রহি.)-এর মৃত্যুর খবর। একদিনে দুই বাংলার দুই আহলেহাদীছ আলেমের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে আসে দুই বাংলার আহলেহাদীছ সমাজে।

১৯৪৫ সালের ২ মার্চ কলকাতার মেটিয়াবুরুজের হালদারপাড়ার অন্তর্গত ধোপাপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করা ক্ষণজন্মা এই মহাপুরুষ ছাত্রজীবনে তীক্ষ্নমেধার পরিচয় দেন। তিনি কলকাতা আলিয়া থেকে কামিল (হাদীছ) ডিগ্রি অর্জন করেন এবং রেকর্ডসংখ্যক নাম্বার পেয়ে ১ম শ্রেণিতে ১ম স্থান অধিকার করেন। ১৯৬৮-৬৯ শিক্ষাবর্ষে তিনি ঢাকা আলিয়া মাদরাসা থেকে উর্দূ ডিপ্লোমা কোর্স সম্পন্ন করেন। তিনি আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন।

পড়াশোনা শেষে তিনি কর্মস্থল হিসাবে বেছে নেন কলকাতা আলিয়া মাদরাসাকে। ২০০৯ সালে অবসর গ্রহণের সময় তিনি কলকাতা আলিয়া মাদরাসার অধ্যাপক ছিলেন। তিনি ‘ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক’ (আইডিবি)-এর পূর্ব ভারতের সেন্ট্রাল প্যানেল মেম্বার ছিলেন।

চাকরির পাশাপাশি দাওয়াতী কাজেও রয়েছে তার অসামান্য অবদান। কুরআন ও ছহীহ হাদীছের প্রচারের লক্ষ্যে তিনি তার লেখনী ও সাংগঠনিক দক্ষতাকে কাজে লাগিয়েছেন। তিনি ১৯৭২ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত ‘জমঈয়তে আহলে হাদীস পশ্চিমবঙ্গ’-এর সাধারণ সম্পাদক ও ১৯৯৫ সাল থেকে আমৃত্যু সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া ১৯৯০ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত ‘মারকাযী জমঈয়তে আহলেহাদীছ হিন্দ’-এর নায়েবে আমীর হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।

সংগঠনের এই গুরু দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি লেখনির জগতেও ছিল তার যোগ্য কলমের আঁচড়। ১৯৭২ সালের অক্টোবর থেকে আমৃত্যু মাসিক ‘আহলে হাদীস’ পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তিনি পঞ্চাশের অধিক গ্রন্থ রচনা করেন। তন্মধ্যে অন্যতম কয়েকটি হলো- ১. আইনী তুহফা সালাতে মুস্তফা (২ খণ্ড), ২. কুরআন মাজীদ (সহজ অনুবাদ), ৩. তাফসীরে আইনী (২ খণ্ড), ৪. হাদীছের ইতিবৃত্ত, ৫. কুরআন ও তাফসীরের ইতিবৃত্ত ।

আইনুল বারী আলিয়াভী গত ১৫ মে, ২০২০, শুক্রবার সন্ধ্যা ৬ টায় কলকাতার মেটিয়াবুরুজে নিজ বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। তিনি স্ত্রী, ৪ পুত্র ও ৩ কন্যাসহ বহু আত্মীয়-স্বজন, ছাত্র ও গুণগ্রাহী রেখে যান। পরদিন শনিবার সকাল ১১ টায় মেটিয়াবুরুজের হালদারপাড়া আহলেহাদীছ জামে মসজিদে তার জানাযার ছালাত অনুষ্ঠিত হয়। জানাযায় ইমামতি করেন তার পুত্র হাফেয নাছরুল বারী (শিক্ষক, কলকাতা সরকারি আলিয়া মাদরাসা)। জানাযা শেষে তাকে হালদারপাড়া কবরস্থানে দাফন করা  হয়।

অধ্যাপক মোবারক আলী, ড. ইলিয়াস আলী ও হাফেয আইনুল বারী আলিয়াভী (রহি.)-এর মতো ক্ষণজন্মা মনীষীত্রয়কে হারিয়ে আহলেহাদীছ জাতি তাদের মাথার উপর থেকে বট বৃক্ষের ছায়া হারিয়ে ফেলল, যার ক্ষতি অপূরণীয়।

মুফতী সাঈদ আহমাদ পালানপুরী :

দারুল উলূম দেওবন্দের শায়খুল হাদীছ মুফতী সাঈদ আহমাদ পালানপুরী (রহি.)-এর নিকটে আমি ‘ছহীহ আল-বুখারী’ ১ম খণ্ড পড়েছি।

তার ক্লাসের ধরন ছিল সকাল সাড়ে ৯-১০টা থেকে ক্লাস শুরু হতো এবং প্রায় যোহরের আযান তথা ১২:৪৫ বা ১টা পর্যন্ত একটানা সাড়ে ৩-৪ ঘণ্টা ক্লাস চলত। তিনি ক্লাসে প্রবেশ করার ১০ মিনিট ১৫ মিনিট পূর্ব থেকে ছাত্ররা প্রস্তুতি নিয়ে থাকতো এবং অন্য শিক্ষকদের ক্লাসের তুলনায় মুফতী সাঈদ আহমাদ পালানপুরী (রহি.)-এর ক্লাসে পরিপূর্ণ এবং উপচে পড়া ভিড় থাকতো।

ছাত্ররা পূর্ব থেকেই সুনসান নীরব পরিবেশ বজায় রাখার চেষ্টা করত। উস্তাদজি দারসগাহে প্রবেশ করতে গিয়ে যদি বুঝতে পারতেন যে, ছাত্রদের মধ্যে কোনো আলোচনা, গল্প বা হইচই লক্ষ্য করা যাচ্ছে বা কোনো ছেলে মোবাইল চালাচ্ছে, তাহলে তিনি দারস না দিয়েই গেট থেকে ফেরত চলে যেতেন। আমাদের বছরে এরকম দুই/তিন দিন হয়েছে যে, উস্তাদজি গেট থেকে ফেরত চলে গেছেন ছাত্রদের অমনোযোগিতা লক্ষ্য করে। পরবর্তীতে উস্তাদজির কাছে গিয়ে মাফ চাইলে তিনি আবার পুনরায় ক্লাস নেওয়া শুরু করেন।

উস্তাদজি দারুল উলূম দেওবন্দ থেকে বেতন নিতেন না। নিজের পরিবার এবং সংসার পরিচালনার জন্য তিনি নিজে একটি দোকান ও প্রকাশনায় ব্যবসা করতেন।

তার একটি বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি প্রত্যেক কঠিন থেকে কঠিন মাসআলাকে অনেক সহজ ভাষায় সহজবোধ্য ও দুর্বল ছাত্রদের জন্য বোধগম্য করে পেশ করতেন। বিশেষ করে তার সবচেয়ে চমৎকার ও সুন্দর পদ্ধতি হচ্ছে, অন্যান্য মাদরাসায় ছহীহ আল-বুখারী প্রথম ১০ দিন, ১৫ দিন বা ১ মাস খুব ভালোভাবে পড়ানো হলেও ছহীহ বুখারী শেষ করানোর জন্য বছরের শেষের দিকে বা মাঝামাঝি থেকে ছাত্ররা শুধু পড়ে যায় আর শিক্ষক শুধু শুনে যান, কোনো প্রকার ব্যাখ্যা ছাড়াই; কিন্তু মুফতী সাঈদ আহমাদ পালনপুরী এর বিপরীতে প্রথম হাদীছ থেকে শেষ হাদীছ পর্যন্ত সমানভাবে প্রত্যেক হাদীছের ব্যাখ্যা করে সকল ছাত্রকে হাদীছ বুঝিয়ে পড়াতেন।

তিনি যখনই কোনো অধ্যায় শুরু করতেন, তখন সেই অধ্যায়ের সারমর্ম এবং যখন কোনো হাদীছ শুরু করতেন তখন সে হাদীছের সারমর্মটা আগে বলে নিতেন। অধ্যায়ের সারমর্ম এবং হাদীছের সারমর্ম আগে বলে নেওয়ার ফলে হাদীছের অনুবাদ এবং হাদীছের ব্যাখ্যা বুঝতে ছাত্রদের সুবিধা হত।

উস্তাদের কিছু মত বা ফৎওয়া আমার ভালো লাগত। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে, দারুল উলূম দেওবন্দে একবার একজন ব্যক্তি বলেছিল যে, আয়েশা (রা.) তার স্বপ্নে এসে বলেছেন যে, তিনি দারুল উলূম দেওবন্দে ১০ টাকা দান করেছেন। তারপর সেই ব্যক্তি ১০ টাকার নোট জনসমাবেশকে দেখিয়ে বলে যে, এই ১০ টাকা তিনি দান করেছেন। তারপর জনগণের মধ্যে ১০ টাকা দান করার হিড়িক পড়ে যায়। এই মাসআলার তাহক্বীক্ব করে উস্তাদজি বলেন, যেকোনো জিনিস যদি কেউ স্বপ্নে দেখে, তাহলে সেই জিনিসটা বাস্তবে তার হাতে থেকে যাবে এমনটা নয়; বরং স্বপ্নের মধ্যে তা শেষ হয়ে যায়। সুতরাং তিনি ১০ টাকা দান করে থাকলে ঘুম ভাঙ্গার পর তার হাতে সেই টাকা থাকবে এই কথা মিথ্যা। বরং তা স্বপ্নের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে।

এ রকম আরো অনেক বিষয় ছিল, যেগুলোতে তিনি সংস্কারপন্থী ছিলেন। যেমন- মাদারাসার পাশে মুহতামিমদের কবর দেওয়ার যে রেওয়াজ দেওবন্দী মাদরাসাগুলোতে আছে, তিনি তার প্রচণ্ড নিন্দা করতেন। তিনি বলতেন দেওবন্দী ও ব্রেলভী কবরপূজারীদের মধ্যের পার্থক্য দিন দিন কমছে। আমরা যেন কবরপূজারীদের সাথে মিশে না যাই। এভাবে তিনি বিভিন্ন বিষয়ে দেওবন্দ অনুসারীদের মধ্যে সংস্কারের কাজ করতেন।

তার অনন্য যে বৈশিষ্ট্যটি তাকে সবার থেকে আলাদা করে দিয়েছিল, তা হচ্ছে ভারত্ব ও গাম্ভীর্যপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তিনি এতটাই ব্যক্তিত্ববান মানুষ ছিলেন যে, জীবনের শেষ প্রায় ২০/৩০ বছর তিনি কোনোদিন বাজারে যাননি। এমন মানুষটি গত ২৫ রামাযানের পবিত্র দিনে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেছেন।

করোনা ভাইরাসের চলমান দুর্যোগপূর্ণ সময়ে মৃত্যুর মিছিল বেড়েই চলেছে। আলেম-ওলামার লিস্টও অনেক লম্বা হচ্ছে এই মিছিলে। আমরা মহান আল্লাহর দরবারে দু‘আ করি, তিনি যেন তার দয়া দিয়ে এই সমস্ত দ্বীনের খাদেমের ভুল-ত্রুটি মাফ করে দেন! তাদেরকে জান্নাতে উঁচু আসন দান করেন! আমরা যারা বেঁচে আছি, তাদেরকে ইসলামের উপর থাকার তাওফীক্ব দান করেন! ভাগ্যে মৃত্যু থাকলে যেন ঈমানী মৃত্যু হয়। আমীন!

[1]. ছহীহ, বুখারী, হা/১০০; ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৭৩; মিশকাত, হা/২০৬।

[2]. তিরমিযী, হা/২৬৮২|