আল্লাহর দিকে দাওয়াত : দলীয় মোড়কে নাকি পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে?

মূল : আলী ইবনে হাসান আল-হালাবী আল-আছারী*
অনুবাদ : আব্দুল আলীম ইবনে কাওছার মাদানী**
(পর্ব-৬)


 

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ : মাধ্যম ও লক্ষ্যের ঠেলাঠেলির মাঝে দ্বীনী কার্যক্রম

যেসব অতিউৎসাহী যুবক পৃথিবীতে মুসলিম উম্মাহর হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনতে চায় এবং আল্লাহর শরী‘আত প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, তাদের অনেকের নিকট তাদের আবেগ, কর্ম ও দাওয়াতের মহাসমুদ্রে শরী‘আতের বহু বক্তব্য তালগোল পাকিয়ে যায়। চিন্তা-চেতনায় তালগোল পাকিয়ে যাওয়ার এ ব্যাপারটি থেকেই আল্লাহর দিকে দাওয়াত বা ইসলামী কাজের[1] স্বরূপ বুঝার ক্ষেত্রে সর্বদা তৈরি হয় তার চেয়ে বড় ভুল।

সেজন্য আপনি তাদেরকে যুবকদের সমবেত করা, সুসংগঠিত করা, দল গঠন করা ও তাদের শক্তি-সামর্থ্যকে পুঞ্জীভূত করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে দেখবেন। এগুলোকে যদি জায়েযও ধরে নেওয়া হয়, তবুও এর সবই যে মাধ্যম এবং একটাও যে লক্ষ্য নয়, চিন্তা-চেতনার ত্রুটির কারণে সে বিষয়ে তারা উদাসীন বা উদাসীনতার ভানকারী।

আমরা যেমনটি সাব্যস্ত করেছি যে, আল্লাহর জন্য যাবতীয় দাসত্ব ও ইবাদত প্রতিষ্ঠিত করা এবং অন্তরে তাওহীদের ভিত্তিগুলো গ্রোথিত করাই হচ্ছে মূল লক্ষ্য। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের মাধ্যমই হচ্ছে শরী‘আতের আওতায় থেকে মহান আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেওয়া, কল্যাণের উপদেশ দেওয়া, ভালোকাজের আদেশ করা ও মন্দকাজে নিষেধ করা। ‘এটা ভিন্ন অন্য কিছু নয়। কেননা আল্লাহর দিকে দাওয়াত একটি স্বভাবজাত ও সহজ বিষয়, কুরআন-সুন্নাহয় যার রূপরেখা সুস্পষ্ট। কোনো সময় এবং কোনো জায়গায় বাস্তব রূপ বা বাহ্যিক রূপ কোনো ক্ষেত্রেই এই দাওয়াতের নবুঅতী পদ্ধতি ও মানহাজ থেকে বের হওয়ার কোনো দরকার নেই।

এই পদ্ধতিতে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেওয়া এবং এর দাবি মানুষের অন্তরে গ্রোথিত করার জন্য কাজ করে যাওয়াই প্রত্যেকটি যোগ্য ব্যক্তির দায়িত্ব ও কর্তব্য। কেননা তা দলীয় সংকীর্ণতার অনেক ঊর্ধ্বে। কারণ এভাবে দাওয়াত দিলে ব্যাপক বিস্তৃত নবুঅতী পদ্ধতিতে আমল করা হয়। আর শরী‘আতের মূলনীতি বিষয়ে যোগ্য প্রত্যেক ব্যক্তির উপর একাজ করা ওয়াজিব। তিনি দলে যোগদানের দুয়ার উন্মুক্ত হওয়ার অপেক্ষায় বসে থাকবেন না। কারণ দাওয়াতী কাজে যোগদানের বিষয়টি দ্বীনের স্বীকৃত ও জ্ঞাত বিষয়। সেজন্য তিনি লোক তৈরির কাজে এবং মুসলিমদেরকে তাদের দ্বিতীয় অপরিচিত অবস্থা থেকে বের করে আনতে ময়দানে নামার অপেক্ষায় থাকবেন। রাসূল a এরশাদ করেছেন, بَدَأَ الْإِسْلَامُ غَرِيبًا، وَسَيَعُودُ كَمَا بَدَأَ غَرِيبًا، ‌فَطُوبَى ‌لِلْغُرَبَاءِ ‘ইসলাম শুরুতে অপরিচিত ছিল এবং অচিরেই তা আবার শুরুর মতো অপরিচিত হয়ে যাবে। সুতরাং এরূপ অপরিচিত অবস্থায়ও যারা ইসলামের উপর টিকে থাকবে, তাদের জন্য সুসংবাদ’।[2]

এই অপরিচিত অবস্থা কেবল সেভাবে দূর করা সম্ভব হবে, যেভাবে দূর করা সম্ভব হয়েছিল প্রথম অপরিচিত অবস্থা। ইমাম মালেক p যথার্থই বলেছেন,لَنْ يَصْلُحَ آخِرُ هَذِهِ الْأُمَّةِ إِلَّا بِمَا صَلَحَ بِهِ أَوَّلُهَا ‘এই উম্মতের প্রথম যুগের মানুষগুলো যা দ্বারা সংশোধিত হয়েছিলেন, শেষের মানুষগুলো তা ছাড়া অন্য কিছু দ্বারা কস্মিনকালেও সংশোধিত হতে পারে’। আর তা হয়েছিল নবুঅতী মানহাজ অনুসরণের মাধ্যমেই।

প্রথম যুগের মানুষগুলো এই নীতির উপর চলেছেন। অতএব, যারা তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করবে, তারাই ‘জামা‘আতুল মুসলিমীন’ বা মুসলিমদের জামা‘আত। তারাই প্রবৃত্তিপূজা ও সন্দেহ-সংশয়ের রোগ থেকে মুক্ত বিশুদ্ধ ইসলামী আক্বীদার ধারক-বাহক। যারা প্রকৃতপক্ষে বা মানহাজগতভাবে শরী‘আত বহির্ভূত কোনো নামে বা কোনো পরিকল্পনায় জামা‘আতুল মুসলিমীন থেকে আলাদা হয়ে গেছে এবং তাদের জামা‘আতকে ছেড়ে গেছে, তারা জামা‘আতুল মুসলিমীন নন।

অতএব, বৃদ্ধি করে বা কমিয়ে দিয়ে এমন কোনো পদ্ধতি পেশ করা যাবে না, যা নবুঅতী মানহাজের সাথে সাংঘর্ষিক। কারণ দাওয়াতী পদ্ধতিতে নামে বা পরিকল্পনায় যে কোনো ধরনের ত্রুটি ইসলাম ও মানবহৃদয়ের মধ্যে প্রতিবন্ধক হিসেবে গণ্য হবে। কেননা সেটা তখন ত্রুটিপূর্ণ পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত। আর ত্রুটিপূর্ণ পদ্ধতি থেকে পূর্ণতা প্রাপ্তির আশা করা যায় না’।[3]

উপর্যুক্ত ব্যাপারটা স্পষ্ট হলে এখন আমি বলতে চাই, যদি কেউ ধারণা করে যে, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য যেহেতু সঠিক, সেহেতু দাওয়াতী মাধ্যমগুলোতে দাঈর জন্য প্রশস্ততা রয়েছে। ফলে তিনি প্রত্যেকটা সময়ে অবস্থা বা স্থানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ পদ্ধতি চয়ন করতে পারেন, তাহলে তার সেই ধারণা কোনো অবস্থাতেই জায়েয নেই।

আমরা আরো বলতে চাই,‍ উপরে যে সূত্র বা মূলনীতির দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, তা সবসময় গ্রহণযোগ্য নয়। সূত্রটি হচ্ছে, لِلْوَسَائِلِ حُكْمُ الْمَقَاصِدِ ‘উদ্দিষ্ট বিষয়ের যে হুকুম, মাধ্যম বা উপকরণেরও সেই একই হুকুম’। ‘কারণ উপকরণ কখনও এমন অনিষ্ট ধারণ করতে পারে, যার জন্য সেই উপকরণটাই মাকরূহ বা হারাম হয়ে যায়। অথচ যে লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য সেটিকে মাধ্যম বা উপকরণ হিসেবে ধরা হচ্ছে, সেই লক্ষ্য হারামও নয়, মাকরূহও নয়’।[4]

বর্তমান সংগঠন ও দলগুলোর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা হুবহু এরকমই। এগুলোর উপস্থিতি দাঈগণের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করেছে, মনের রোগ সারিয়ে তোলা জটিল করে দিয়েছে, উম্মতকে ভাগ ভাগ করে ফেলেছে এবং উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার জন্ম দিয়েছে। যদিও আমরা স্বীকার করি যে, ‘মুসলিমদের জন্য এসব ইসলামী জামা‘আতের অনেক অবদান রয়েছে, যা কেবল জেদী ব্যক্তিই অস্বীকার করতে পারে’।[5]

সংগঠনগুলোর উপস্থিতিকে ইজতেহাদী মাধ্যম হিসেবে গণ্য করা হলেও উলামায়ে কেরামের নিকট সেগুলো এমন মাধ্যমের অন্তর্ভুক্ত, যেগুলো বৈধ কোনো বিষয়ের জন্য তৈরি করা হয়েছে এবং সেগুলো দ্বারা সাধারণত কোনো অকল্যাণ ও অনিষ্ট অর্জনের লক্ষ্য থাকে না। কিন্তু (দেখা যাচ্ছে) বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেগুলো অকল্যাণের দিকেই নিয়ে যাচ্ছে এবং সেগুলোর কল্যাণের চেয়ে অকল্যাণই বেশি’।[6] আর এরকম মাধ্যম নিষিদ্ধ।

আমাদের কোনো দাঈ যদি তার আশেপাশে তাকান, তাহলে তিনি মানুষের কতগুলো ভাগ খুঁজে পাবেন? তিনি তাদেরকে এভাবে দেখতে পাবেন-

(১) কাফের বা নাস্তিক।

(২) মুসলিম, তবে নিস্তেজ। কিছু ফরযও পরিত্যাগ করে এবং কিছু পাপেও জড়িয়ে পড়ে।

(৩) মুসলিম, যিনি ফরয বাস্তবায়ন করেন এবং নিষিদ্ধ বিষয় থেকে দূরে থাকেন। তবে তিনি আল্লাহর দিকে দাওয়াতী কার্যক্রমে যথেষ্ট ঢিল।

(৪) আগের শ্রেণির মতোই, তবে তিনি কোনো দলাদলিতে না গিয়ে ইসলামের স্বাভাবিক নিয়মে ও সুন্নাহ মাফিক দাওয়াতী কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে থাকেন।

(৫) ইসলামী দল ও দাওয়াতী সংগঠন।

আপনি মুসলিমদের উপর্যুক্ত ৪টি শ্রেণির দিকে দেখুন এবং ভাবুন :

আপনি বিভক্তির জ্বলন্ত আগুন কোথায় খুঁজে পাচ্ছেন?

আপনি অন্তরের রোগ কোথায় খুঁজে পাচ্ছেন?

আপনি ধারালো দৃষ্টি কোথায় দেখতে পাচ্ছেন?

প্রকাশ্য বিভক্তি কোথায় খুঁজে পাচ্ছেন?

ক্রুর হাসি কোথায় খুঁজে পাচ্ছেন?

সমর্থন ও ধোঁকা কোথায় খুঁজে পাচ্ছেন?

সতর্কীকরণ ও বিতাড়ন নীতি কোথায় খুঁজে পাচ্ছেন?

আলোচনা-সমালোচনা কোথায় খুঁজে পাচ্ছেন?

স্বেচ্ছাচারিতা ও মন্তব্য কোথায় খুঁজে পাচ্ছেন?

নানা ভ্রান্ত গুজব কোথায় দেখতে পাচ্ছেন?

ব্যর্থ আহ্বান কোথায় খুঁজে পাচ্ছেন?

আমি নিশ্চিত যে, প্রশ্নগুলোর মাঝেই উত্তর রয়েছে। সুতরাং উত্তর পাওয়ার জন্য আপনাকে মোটেও মেহনত করতে হবে না।

‘অতএব, আজ ভিন্ন ভিন্ন ইসলামী জামা‘আত ও ভিন্ন ভিন্ন নেতৃত্ব রোগে পরিণত হয়েছে, যা কোনোভাবেই অব্যাহত থাকতে পারে না। এই রোগ নিরাময়ের জন্য প্রত্যেকটা মুসলিমই দায়িত্বশীল। তাহলে মুসলিমরা যে অবস্থায় ছিল, সে অবস্থায় ফিরে যেতে পারবে এবং দ্বীন পুরোটাই আল্লাহর জন্য হয়ে যাবে। মুসলিমদের অবস্থা তো ঠিক এরকম ছিলো-خَيْرَ أُمَّةٍ ‌أُخْرِجَتْ ‌لِلنَّاسِ   ‘সর্বোত্তম উম্মত, মানবতার কল্যাণের জন্য যাদের উত্থান ঘটানো হয়েছে’।[7]

অতএব, বলা যায়, ‘মহান আল্লাহর দাসত্ব এবং সেদিকে দাওয়াত দেওয়ার যে মহান লক্ষ্যে মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নের জন্য ও অন্যান্য দ্বীনী কাজের জন্য বিভিন্ন দলকে বাহ্যিকভাবে সুসংগঠিত মাধ্যম মনে হলেও তা আজ উম্মতের দেহে বিদঘুটে এক আকৃতি ধারণ করেছে… সেগুলো আজ বিভিন্ন লক্ষ্য-উদ্দেশ্যে রূপান্তরিত হয়েছে… সেগুলো আজ দ্বীনী কাজের নানা কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, যেখান থেকে অন্যান্য দল ও দাঈর বিরুদ্ধে নানান তকমা লাগানো হচ্ছে।

এসব দল আজ ব্যক্তিক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে, যাতে লড়াইয়ে টিকে থাকা যায়, মাল হাতিয়ে নেওয়া যায় এবং দখলদারিত্ব চালানো যায়’।[8]

সারকথা হচ্ছে, কোনো অবস্থাতেই শরী‘আত বহির্ভূত এমন কোনো মাধ্যম গ্রহণ করা যাবে না, যে ব্যাপারে দলীল নেই, অথবা এমন কোনো মাধ্যম গ্রহণ করা যাবে না, যা মূলত শরী‘আতসম্মত, কিন্তু তা অকল্যাণ ও অনিষ্টের দিকে নিয়ে যায় এবং কিতাব বা সুন্নাতের পরিপন্থী হয়। কেননা ‘যা কিছু ফেতনা ও বিভক্তি অবধারিত করে দেয়, তার কোনোটাই দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত নয়, চাই তা কথা হোক বা কাজ হোক’।[9]

এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি বিষয় রয়েছে, যা ব্যাপারটিকে আরো স্পষ্ট করে দিবে। বিষয়টি হচ্ছে, একজন মুসলিম শরী‘আতবিষয়ক তার সকল আমল কেবল মহান এক লক্ষ্যে পৌঁছার মাধ্যম হিসেবে সম্পাদন করে থাকে। আর সেই লক্ষ্য হচ্ছে, আল্লাহ তা‘আলার দাসত্ব এবং একমাত্র তার জন্যই যাবতীয় ইবাদত নিবেদন।

আল্লাহর দিকে দাওয়াতও ঠিক এরকমই। সেটিও হৃদয়গহীনে আল্লাহর দাসত্ব প্রতিষ্ঠার এবং মানুষের মাঝে তা ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যম। সাথে সাথে সেটি একটি ইবাদতও বটে।

আর সকল ইবাদতের ক্ষেত্রে একটি মূলনীতি হচ্ছে, কোনো ইবাদতের নির্দেশনাসম্বলিত দলীল না পাওয়া পর্যন্ত স্থগিত থাকতে হবে এবং সেই ইবাদতটি বাতিল বলে গণ্য হবে। এ সংক্রান্ত বই-পুস্তকে মূলনীতিটি সাব্যস্ত রয়েছে।[10]

অতএব, এখানে ব্যক্তিগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর কোনো অবকাশ নেই, নেই কোনো ইজতেহাদের সুযোগ।… বরং ক্ষেত্রটি সর্বদা ইবাদতের ক্ষেত্র, যেখানে ক্বিয়াস করা ও ব্যক্তিঅভিমত ব্যক্ত করার কোনো জায়গাই আসলে নেই। ফলে আল্লাহর দিকে দাওয়াত ‘লক্ষ্যের দিক থেকে মর্যাদার এবং মাধ্যমের দিক থেকে পুতপবিত্র’।[11] ‘অতএব, কোনো অবস্থাতেই আমাদের জন্য সমীচীন নয় যে, আমরা আল্লাহর দিকে দাওয়াতকে বহিরাগত কোনো সাংগঠনিক পোশাক করাবো এবং তার পেছনে সকল প্রচেষ্টা ব্যয় করব, যা আল্লাহর দিকে দাওয়াতের মূলনীতি ও মূল কাঠামো ধ্বংস করে ছাড়ে এবং বিভক্তি সৃষ্টি করে।

বুঝা গেল, মাধ্যম ও লক্ষ্য দুইয়ে মিলেই হচ্ছে দাওয়াত। দাওয়াতের রূপরেখা একটি প্রতিষ্ঠিত বিষয়, সময়-স্থান[12]-অবস্থাভেদে যার নড়চড় হয় না। অনুরূপভাবে দাওয়াত প্রচারের মাধ্যমের ক্ষেত্রেও মূলনীতি হচ্ছে, নবুঅতী পদ্ধতির উপর অবিচল থাকতে হবে।[13] কেননা, মহান আল্লাহ তার বান্দাদের যেসব মাধ্যম অবলম্বনের কথা বলেছেন, তার সবই ইবাদত’।[14]

দাওয়াতের যেসব মাধ্যম বর্তমান যুগে আছে, আগে ছিল এবং ভবিষ্যতে থাকবে, সেগুলো দাওয়াতের এমন মাধ্যম হওয়া একান্ত জরুরী, যেগুলো দিয়ে নবী aকে প্রেরণ করা হয়েছিল এবং যেগুলোর মাধ্যমে তিনি কাঙ্ক্ষিত দাওয়াত পৌঁছে দিয়েছিলেন। কতিপয় দিক ছাড়া মাধ্যমগুলো আমাদের যুগে ভিন্ন কিছু হবে না, যে দিকগুলোর নিবিড় সম্পর্ক থাকবে মূল মাধ্যমগুলোর সাথে

তবে এই ভিন্নতা শরী‘আতের খাঁচায় বন্দী হতে হবে এবং কিতাব ও সুন্নাতের ওযনে মিলতে হবে। যখনই তেমনটা হবে না, তখনই সেই মাধ্যমকে দূরে সরিয়ে দেওয়া এবং সেখান থেকে বিরত হওয়া আবশ্যক।

পূজা করা হয় এমন নতুন নতুন মাধ্যম[15] চলবে না’।[16] কারণ ‘দাওয়াতের পথ একটাই। যে পথে আগে রাসূলুল্লাহ a ও তার ছাহাবীগণ চলেছেন, চলেছেন অন্য দাঈগণও এবং তাদের পরে সে পথে আল্লাহর তাওফীক্বে আমরাও চলব। সেই পথ হচ্ছে, ঈমান, আমল, ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বের পথ।… রাসূলুল্লাহ a তাদেরকে ঈমান ও আমলের দিকে দাওয়াত দিয়েছেন। অতঃপর ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে তাদেরকে আবদ্ধ করেছেন।… ফলে আক্বীদার শক্তি ঐক্যের শক্তির সাথে মিশে তাদের জামা‘আতটা মডেল জামা‘আতে পরিণত হয়েছে। যে জামা‘আতের কালেমা বুলন্দ হবেই, যার দাওয়াত বিজয়ী হবেই- যদিও সারা পৃথিবীবাসী বিরোধিতা করে’।[17]

এই ব্যাপারটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর বিশদ বিবরণ অনেক দাঈর নিকট জটিল হয়ে গেছে। অতএব, এ ব্যাপারে সূক্ষ্মতা অবলম্বন করা এবং এর মর্মার্থে তালগোল পাকিয়ে না ফেলা একান্ত জরুরী। কোনো ধরনের স্বার্থ, পক্ষপাতিত্ব, উত্তম বিবেচনা, অভিমত, চর্চা ও প্রবণতার কাছে এটা যেন লুণ্ঠনের শিকার না হয়।

 (চলবে)


[1]. এটা তাদের আধুনিক পরিভাষা অনুযায়ী।

[2]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৪৫।

[3]. হুকমুল ইনতিমা, পৃ. ৭৪-৭৫।

[4]. ইবনুল ক্বাইয়িম, মাদারিজুস সালেকীন, ১/১১৬।

[5]. আব্দুর রহমান আব্দুল খালেক, মাশরূ‘ইয়্যাতুল ‘আমাল আল-জামাঈ, পৃ. ২৭।

[6]. ইবনুল ক্বাইয়িম, এ‘লামুল মুওয়াক্কে‘ঈন, ৩/১৩৬।

[7]. মুহাম্মাদ সুরূর যায়নুল আবেদীন, মানহাজুল আম্বিয়া ফিদ দাওয়াতি ইলাল্লাহ, ১/১৬৮।

[8]. হুকমুল ইনতিমা, পৃ. ১৪৯-১৫০।

[9]. শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া, আল-ইসতেক্বমাহ, ১/৩৭।

[10]. আমার প্রণীত ‘ইলমু উছূলিল বিদা‘ বইয়ে আমি মূলনীতিটির উপর বিস্তারিত কথা বলেছি। সুতরাং সেখান থেকে বিষয়টি দেকে নিতে পারেন।

[11]. আব্দুর রহমান আব্দুল খালেক, ফুছূলুন মিনাস সিয়াসাহ আশ-শার‘ইয়্যাহ, পৃ. ৭৯।

[12]. ‘মাশরূ‘ইয়্যাতুল আমাল আল-জামাঈ’ বইয়ের ৭৯ পৃষ্ঠার বক্তব্যের সাথে তুলনা করে দেখুন।

[13]. ‘আল-মুসলিমূনা ওয়াল আমাল আস-সিয়াসী’ বইয়ের ২৬-২৮ পৃষ্ঠার বক্তব্যের সাথে তুলনা করে দেখুন।

[14]. আল-উবূদিয়্যাহ, পৃ. ৬৬।

[15]. যেমন- মাল-সম্পদকে মানুষ জমায়েত করার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা। ‘দাওয়াত প্রচারের ক্ষেত্রে তারা এমন সব মাকাল ফল সদৃশ পদ্ধতি ব্যবহার করে, খ্রিষ্টান মিশনারী যেগুলোর চর্চা করে থাকে’। মাল কম তো ঈমান কম!! মাল নেই তো চুক্তিও নেই!! এগুলো আমরা চাক্ষুষ দেখেছি এবং এগুলোর হীনতা আমরা হাত দিয়ে স্পর্শ করেছি। আর ‘কোনো সংবাদ শোনা চাক্ষুষ দেখার মতো নয়’।

যাকাতে ‘আল-মুআল্লাফাতু কুলূবুহুম’-এর অংশের সাথে দাওয়াতী কাজে ঢালাওভাবে মালের ব্যবহারকে তুলনা করা একটি আশ্চর্য ব্যাপার। এটি এমন একটি তুলনা, যা উল্লেখ করলেই তার আর জবাব দেওয়া লাগে না (উদ্ধরণ চিহ্নের ভেতরের অংশ ‘মানহাজুদ দাওয়াহ ইলাল্লাহ’ বই থেকে গৃহীত; সেখান থেকেই ‘হুকমুল ইনতিমা’ বইয়ে গৃহীত হয়েছে, পৃ. ১০০)

[16]. আল-উবূদিয়্যাহ, পৃ. ৬৬।

[17]. মুস্তাফা মাশহূর, ত্বরীকুদ-দাওয়াহ, পৃ. ১৩; তার কাছ থেকে সুলায়মান মারযূক ‘আদ-দাওয়াতুল ইসলামিয়্যাহ বায়নাল ফারদিয়্যাহ ওয়াল জামা‘ইয়্যাহ’ বই উল্লেখ করেছেন, পৃ. ৭।