আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে করণীয়
-মুহাম্মদ মুস্তফা কামাল*


عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ قَالَ مَنْ عَادَى لِى وَلِيًّا فَقَدْ آذَنْتُهُ بِالْحَرْبِ وَمَا تَقَرَّبَ إِلَىَّ عَبْدِى بِشَىْءٍ أَحَبَّ إِلَىَّ مِمَّا افْتَرَضْتُ عَلَيْهِ وَمَا يَزَالُ عَبْدِى يَتَقَرَّبُ إِلَىَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أُحِبَّهُ فَإِذَا أَحْبَبْتُهُ كُنْتُ سَمْعَهُ الَّذِى يَسْمَعُ بِهِ وَبَصَرَهُ الَّذِى يُبْصِرُ بِهِ وَيَدَهُ الَّتِى يَبْطُشُ بِهَا وَرِجْلَهُ الَّتِى يَمْشِى بِهَا وَإِنْ سَأَلَنِى لأُعْطِيَنَّهُ وَلَئِنِ اسْتَعَاذَنِى لأُعِيذَنَّهُ.

সরল অনুবাদ : আবূ হুরায়রা c হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ a বলেছেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা বলেছেন, যে আমার ওলী (বন্ধু) এর সাথে শত্রুতা পোষণ করবে, আমি তার বিরুদ্ধে ‍যুদ্ধ ঘোষণা করলাম। আমার বান্দার উপর আমি যে বিধান ফরয করেছি, তার মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জন করা আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয় বিষয়। আমার বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকলে আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি। যখন আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি, তখন আমি তার সে কান হয়ে যাই, যে কান দিয়ে সে শোনে; আমি তার সে চোখ হয়ে যাই, যে চোখ দিয়ে সে দেখে; আমি তার সে হাত হয়ে যাই, যে হাত দিয়ে সে ধরে এবং আমি সে পা হয়ে যাই, যে পা দিয়ে সে হাঁটে। সে আমার নিকট কোনো কিছু চাইলে আমি অবশ্যই তা তাকে দান করি আর আমার নিকট জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি চাইলে তাকে মুক্ত করে দিই’।[1]

ব্যাখ্যা : এই হাদীছে রাসূল a ঐ সমস্ত মানুষকে নিয়ে কথা বলেছেন, যাদেরকে আল্লাহ তাআলা গভীর ভালোবাসা দিয়ে বাছাই করেছেন, স্বীয় অনুগ্রহ ও দয়া দ্বারা যাদেরকে নৈকট্য দান করেছেন। যারা সৌভাগ্য ও সাফল্যের উপকরণকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করেছেন, আল্লাহর সন্তুষ্টি ও বিজয় লাভের জন্য নিজের আত্মাকে সম্পূর্ণরূপে নিয়োজিত করেছেন এবং সব ধরনের পাপ ও পঙ্কিলতা থেকে নিজের আত্মাকে পবিত্র করেছেন। দীর্ঘ সময় আল্লাহ তাআলার ইবাদতে মগ্ন থাকতে তাদের দেহ কখনই কষ্ট পায় না। ফলে তিনি তাদেরকে আধ্যাত্মিক নূরের আলোয় আলোকিত করেন এবং এমন মর্যাদা দান করেন, যা অন্য কাউকে করেন না। সাহায্য ও সমর্থন দিয়ে তিনি তাদেরকে প্রকৃত ওলী (বন্ধু) এর জায়গায় অধিষ্ঠিত করেন। প্রকৃত অর্থে এরাই হলেন আল্লাহ তাআলার আওলিয়া বা সবচেয়ে নিকটতম বান্দা।

এরা এমন শ্রেণির মানুষ যাদেরকে আল্লাহ তাআলা প্রবৃত্তি ও পথভ্রষ্টতার পদস্খলন থেকে সম্পূর্ণরূপে নিরাপদে রেখেছেন। তিনি তাদের জন্য ইহকাল ও পরকালে নিরাপত্তা ও সৌভাগ্যের  সুব্যবস্থা করেছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন,﴿ أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ – الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ ﴾ ‘মনে রেখো! যারা আল্লাহর বন্ধু তাদের সন্ত্রস্ত ও চিন্তিত হওয়র কোনো কারণ নেই। কেননা তারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে এবং ভয় করে’ (ইউনুস, ১০/৬২-৬৩)। যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে এবং ভরসা রাখে, তাদের কি কোনো ভয় থাকতে পারে? ভয় থাকতে পারে না। যারা আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার পূরণ করে, ঈমান তাদের হৃদয়ে সৎকর্মের প্রতি অনুপ্রেরণা, অন্তরে প্রশান্তি ও গভীর আস্থা সৃষ্টি করে। 

মর্যাদা ও সম্মানের বিচারে তারা এমন উচ্চতায় পৌঁছেছেন যে, আল্লাহ তাআলা  তাদের অনিষ্ট কামনা ও ক্ষতিসাধনের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা করেছেন। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে আমার ওলীর সাথে শত্রুতা পোষণ করে আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলাম’।[2]

সুধী পাঠক! লক্ষ্য করুন, কীভাবে আল্লাহ তাআলা তাঁর ওলী ও বন্ধুদের পক্ষ অবলম্বন করেছেন। কীভাবে তিনি স্বীয় সমর্থন ও সাহায্য দ্বারা তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন? অতঃপর লক্ষ্য করুন, তাদের শত্রুদের কীভাবে যুদ্ধের ভয় প্রদর্শন করছেন! যখন আপনি জানতে পারেন তিনি তাদের থেকে দূরে সরে আসেন না কিংবা তাদেরকে শত্রুর শিকার হতে দেন না, তখন আপনি অনুধাবন করবেন তাদের জন্য আল্লাহর অদৃশ্য সাহায্য অবশ্যই আসবে- যদিও তা দেরিতে কিংবা দীর্ঘ অপেক্ষার পর আসে। এই সাহায্য ও সমর্থন আল্লাহ তাআলার শাশ্বত ও সত্য বিধান। কখনও এর পরিবর্তন বা ব্যত্যয় ঘটে না। তাঁর শাশ্বত বিধানের দাবি হলো অত্যাচারীকে সাময়িক অবকাশ দেওয়া তবে উদাসীনতা নয়।

কিন্তু তারা যদি তওবা করে ও অন্যায় থেকে ফিরে আসে এবং সৎকর্মপরায়ণশীলদের প্রতি শত্রুতা পোষণ না করে, তবে তিনি তাদেরকে তওবা করার সুযোগ দান করেন। আর যদি তারা ভ্রান্ত পথে চলতে থাকে আর পথভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত থাকে, তবে তিনি তাদেরকে পর্যায়ক্রমে অবকাশ দিতে থাকেন। এভাবে যখন তারা অবাধ্যতার চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে যায়, তখন তিনি তাদের বিরুদ্ধে ভয়ংকর ক্ষমতা ও অসীম শক্তি দেখান এবং কঠিনভাবে পাকড়াও করেন। এভাবেই আল্লাহ তাআলা তাঁর আওলিয়ার বিজয় দান করেন, তাদের কল্যাণকর পরিণাম নিশ্চিত করেন এবং বিরোধীদের উপর তাদের বিজয়ী করেন।

আওলিয়ার এই স্তরে পৌঁছা বড় সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্ব এবং অফুরন্ত নিয়ামতে ধন্য হওয়ার বিষয়। বান্দাদের মধ্য হতে যাকে ইচ্ছা, তাকে তিনি এই বিরল সম্মানে ভূষিত হওয়ার সুযোগ দান করেন। কোনো পথ অবলম্বন করলে মর্যাদার এই উচ্চ আসনে সমাসীন হওয়া যায়, তা অনুসন্ধানের চেষ্টা করা আমাদের প্রত্যেকের জন্য আবশ্যক।

আল্লাহর নবী নিম্নের বাক্যে আওলিয়ার প্রথম স্তর বর্ণনা করেছেন। তিনি আল্লাহর ভাষায় বলেন, ফরযকৃত বিধানের মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জন করা আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয় কাজ। এই স্তরে পৌঁছা ততক্ষণ সম্ভব নয়, যতক্ষণ না সে উবূদিয়াতের (দাসস্ত) সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে। প্রথমত, যে নির্দেশনা তাকে প্রদান করা হয়েছে, তা যথাযথভাবে পালন করা এবং এমন সীমালঙ্ঘন ও হারাম বর্জন করা, যা এই স্তরে পৌঁছার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হয়।

অতঃপর সে এর থেকে উঁচু ও উন্নততর স্তরে পৌঁছে যায়। আর তা হলো নফল ইবাদত ও আনুগত্যের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করা এবং উভয় জগতে কল্যাণ লাভের আশায় রবের দরবারে বারবার আবেদন করা। সে এ অবস্থায় উন্নতির এমন স্তরে পৌঁছে যায় যে, সে এর সুধা পান করে তৃপ্তি পায় আর আল্লাহর গভীর ভালোবাসায় ধন্য হয় অর্থাৎ সে ইহসানের পর্যায়ে পৌঁছে যায়। যার বিবরণে আল্লাহর রাসূল a বলেছেন, ‘তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করো যেন তুমি তাঁকে দেখছ; যদি তুমি তাঁকে না দেখো তবে এমনটা ভাববে যে, তিনি তোমাকে দেখছেন’।[3]

এই পর্যায়ে একজন মুমিনের অবস্থা দারুণ আবেগময় থাকে। কারণ, তার হৃদয় তার রবের ভালোবাসায় পূর্ণ থাকে, সে তাঁর সাক্ষাতের জন্য চরম উৎসুক থাকে। তাঁর অসন্তুষ্টি ও শাস্তির ভয় তাকে সর্বদা অস্থির ও উদ্বিগ্ন রাখে। তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ত্বের মহিমায় তিনি অবগাহন করেন। তাহলে ঐ ব্যক্তির অবস্থা কেমন হতে পারে, যে তার রবের সামনে অবস্থান করে এবং দিব্যচক্ষে তাঁকে অবলোকন করে? সুতরাং যিনি বিশ্বাসের এই স্তরে পৌঁছেছেন, তার ঈমান কত গভীর তা কেবল তিনিই অনুধাবন করতে পারেন, যিনি উক্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে সক্ষম হন।

যখন কোনো মুমিন ইবাদতের প্রতি মুহূর্তে তার রবের অনুপ্রেরণা লাভ করে, জীবনের প্রত্যেক ক্ষেত্রে তাঁর নির্দেশনায় মুগ্ধ থাকে, তখন তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আল্লাহর আনুগত্য ব্যতীত অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত থাকে না। তাঁর কানে আল্লাহর যিকির ছাড়া অন্য কোনো শব্দ পৌঁছায় না। কল্যাণ ব্যতীত কোথাও তার দৃষ্টি পতিত হয় না। আল্লাহর পছন্দ ছাড়া কোথাও তার পদচারণ হয় না। আল্লাহর নিম্নবক্তব্যে উক্ত মর্মার্থ খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে- ‘যখন আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি, তখন আমি তার সে কান হয়ে যাই, যে কান দিয়ে সে শোনে; আমি তার সে চোখ হয়ে যাই, যে চোখ দিয়ে সে দেখে; আমি তার সে হাত হয়ে যাই, যে হাত দিয়ে সে ধরে এবং আমি তার সে পা হয়ে যাই, যে পা দিয়ে সে হাঁটে’।[4] তাই যে বান্দা উক্ত স্তরে পৌঁছে যায়, আল্লাহ তার দু‘আ সরাসরি কবুল করেন, তার আবেদন তাৎক্ষণিক বাস্তবায়ন করেন। প্রত্যেক ক্ষতিকর অবস্থা থেকে তাকে রক্ষা করেন এবং শত্রুর উপর বিজয় দান করেন।

সুধী পাঠক! আল্লাহর আওলিয়ার কিছু সত্য ঘটনা, তাদের বাস্তব জীবনের কিছু কাহিনী তুলে ধরা হলো। আলী ইবনু আবি ফোযারাহ p হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার মা ২০ বছর ধরে ল্যাংড়া ছিলেন। হাঁটতে পারতেন না। তিনি একদিন আমাকে আহমাদ ইবনু হাম্বলের নিকট যেতে বললেন, আমি তার বাসায় এসে দরজায় নক করলে তাকে বারান্দায় দেখতে পেলাম। তিনি বললেন, তুমি কে? আমি বললাম, আমি এমন একজন অসুস্থ মায়ের সন্তান, ‍যিনি পায়ের সমস্যার কারণে চলাফেরা করতে পারেন না। তিনি আপনার নিকট দু‘আ চেয়েছেন। আলী ইবনু আবি ফোযারা p বলল, আমি তার কথায় বুঝতে পারলাম, তিনি অত্যন্ত রাগান্বিত। তিনি বললেন, আমরা তোমাদের দু‘আর বেশি মুখাপেক্ষী। আমি তার বাসা থেকে বেরিয়ে গেলাম। তখন এক বৃদ্ধা বের হয়ে বলল, আমি তাকে তোমার মায়ের জন্য দু‘আ করতে দেখলাম। আমি বাসায় এসে দেখি আমার মা পায়ে হেঁটে আমার নিকট বেরিয়ে আসলেন।[5]

উবাইদুল্লাহ ইবনু আবি জা‘ফর p হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা কনস্টান্টিনোপলের যুদ্ধে গিয়েছিলাম। অতঃপর আমাদের নৌকা ভেঙে গেল। সমুদ্র তরঙ্গ আমাদেরকে ভাসমান একটি কাঠের উপর নিক্ষেপ করল। আমরা পাঁচ অথবা সাত জন ছিলাম। আমাদের সংখ্যানুযায়ী আল্লাহ আমাদের জন্য সমুদ্রে উদ্ভিদ জন্ম দিলেন। আমরা ঐ উদ্ভিদের পাতা পেট পূর্ণ করে খেলাম এবং পরিতৃপ্ত হলাম। অতঃপর সন্ধ্যা হলে আল্লাহ আমাদের জন্য সমুদ্রে একটি চর তৈরি করলেন, যেখানে আমরা রাত্রি যাপন করলাম। উল্লিখিত সময়ের মধ্যে আমাদের জলযানটি ঠিক হয়ে গেল এবং আমরা জলযানে বাসায় ফিরে আসলাম।[6]

আল্লাহ তাআলা তাঁর কিতাব আল-কুরআনে আওলিয়ার অবস্থা বর্ণনা করেছেন। ওলীগণ রবের গভীর ভালোবাসায় মুগ্ধ থাকেন। দুনিয়ার জীবনের প্রাপ্তি, সাফল্য, ভোগ কোনো কিছুই তাকে আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে পারে না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, ‘মনে রেখো! যারা আল্লাহর বন্ধু তাদের সন্ত্রস্ত ও চিন্তিত হওয়র কোনো কারণ নেই। কেননা তারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে এবং ভয় করে’ (ইউনুস, ১০/৬২-৬৩)। এখান থেকেই আহলে ইলমদের কেউ কেউ বলেছেন, যে আল্লাহর উপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখে এবং একমাত্র তাকেই ভয় করে, সেই প্রকৃত ওলী হওয়ার যোগ্য।

* প্রভাষক (আরবি), বরিশাল সরকারি মডেল স্কুল এন্ড কলেজ, বরিশাল।


[1]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৫০২।

[2]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৫০২।

[3]. ছহীহ বুখারী, হা/৫০।

[4]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৫০২।

[5]. হাফেয আয-যাহবী, সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১১/২১১।

[6]. মাহমূদ ইবনে আহমাদ, মাগানীল আখয়ার, ৩/৩০৮।