আল্লাহর  বিশেষ সৃষ্টি

নাহরিন বানু এশা

আমাদের সমাজের এক অবহেলিত, নিগৃহীত ও নিষ্পেষিত অংশ হলো হিজড়া। যাদের দেখলেই আমরা ভ্রু কুঁচকাই আর বিরক্তি ভরে দৃষ্টি সরিয়ে নিই। বিনা অপরাধের মহা অপরাধী যেন তারা! যে রব আপনাকে, আমাকে সৃষ্টি করেছেন, সৃষ্টি করেছেন এই মহা বিশ্বগজৎ, সেই মহান রবেরই তো তারা এক অপূর্ব সৃষ্টি। তাদেরকে ঘৃণা করার এই দুঃসাহস আমরা কোথায় পেলাম?

কেন তাদেরকে আমরা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হতে বাধ্য করি? কেন মা-বাবা, ভাই-বোন তাদের কারণে লজ্জিত হবে? লজ্জা করো ঐ মহান রবকে, যার সৃষ্টিকে তোমরা তুচ্ছজ্ঞান করছ।

এমন অনেক পরিবার দেখেছি, যারা তাদের বিকলাঙ্গ শিশুটিকে পরম মমতায় সারা জীবন আগলে রাখে। বোবা, কানা, ল্যাংড়া, প্যারালাইজড, হাবা-গোবা এসব শিশুদের সমস্ত কাজকর্মই তাদের মা-বাবা ভাই-বোনদের করে দিতে হয়। কই তাদের তো দেখলাম না বাচ্চাটিকে বাড়ী থেকে বের করে দিতে। মুখ থেকে সর্বক্ষণ লালাঝরা, আধাপাগল, এক চাচাত ভাই আছে আমার, আমার ফুফুও গত ৪০ বছর যাবৎ ব্রেইনশর্ট, আমার ভাসুরের মেয়েও হাত পা শুকাতে শুকাতে প্যারালাইজড হয়ে বিছানায় অন্ধ অবস্থায় কতদিন পড়ে রইল। আমরা পরিবারে সবাই পরম মমতায় তাদের সেবা করি। ওদের কষ্ট দেখে কষ্ট পাই, কেঁদে-কেঁদে আল্লাহর  কাছে কত দু‘আ করি। এমনই হাজার হাজার ফ্যামিলির কাছে এরা যদি লজ্জা বা ঘৃণার কারণ না হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের সুস্থ-সবল হিজড়া ভাই-বোনেরা কেন আমাদের লজ্জার কারণ হবে? হে অবুঝ বাবা-মায়েরা! তোমরা কীভাবে তোমাদের শরীরের এই অংশটিকে একটি নিকৃষ্ট জীবনের দিকে ঠেলে দাও?

সামাজিক গণমাধ্যমগুলোতে ওদের দুঃখ, ওদের কান্না, সর্বোপরি আমাদের ঘৃণার কারণে যে ধর্মবিমুখতা সৃষ্টি হয় ওদের মধ্যে এসব দেখে সর্বসাধারণের মনে কি একটুও অপরাধবোধ সৃষ্টি হয় না? ওরাও তো ইসলামের সুশীতল ছায়ায় নিজেদের জীবনকে পূত-পবিত্র রেখে মহান আল্লাহর  দেওয়া এই জীবনকে হাসিমুখে মেনে নিয়ে আপনার আমার থেকেও বেশি তাক্বওয়াশীল হয়ে জান্নাতের পথিক হতে পারে। মহান আল্লাহ তাঁর কোনো বান্দার প্রতি এক বিন্দুও যুলুম করেন না। অথচ আমাদের নাক সিটকানোর কারণে তারা মহান আল্লাহকে যালেম ভাবতে শুরু করে। যখনই ট্রেনে ওদের বেহায়াপনা দেখি আমার একটুও রাগ হয় না, বরং প্রচণ্ড দুঃখ লাগে, মনে হয় ওদের হাতটা ধরে পাশে বসিয়ে বলি, মহান সৃষ্টিকর্তা তোমাদের উপর কোনো যুলুম করেননি। বরং এটা তো তোমাদের একটা পরীক্ষা। এই পরীক্ষার উপর সন্তুষ্ট থাক এবং আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা হও। আর মহান আল্লাহ তো ধৈর্যশীলদের পাশেই থাকেন। ওদের এই ধৈর্যই তো ওদের জান্নাতের অধিবাসী বানাবে। জান্নাতে ওরা হয় পুরুষ অথবা মহিলা হবে; হিজড়া তো হবে না। হায়! আমাদের এই ভাই-বোনদের কেউ যদি একটু বুঝিয়ে এভাবে বিপথগামী হওয়া থেকে বাঁচাতো। আল্লাহই সর্বশ্রেষ্ঠ সাহায্যকারী।

আমি বিদগ্ধ শায়েখদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলি, দয়া করে এই হিজড়া ভাই-বোনদের স্বপক্ষে মসজিদে খুৎবা, ওয়াজ-মাহফিল, ইন্টারনেট, ফেসবুকে সর্বত্র ওদের আল্লাহমুখী হবার জন্য আপনাদের মূল্যবান বক্তব্য পেশ করুন। আপনাদের মূল্যবান ওয়াজের মাধ্যমে ওদের প্রতি সর্বসাধারণের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের প্রচেষ্টা চালান। সেই সাথে আমাদের ইসলামপ্রিয় মুসলিম ভাই-বোনদের প্রতি অনুরোধ, আপনাদের আশে-পাশে যত হিজড়া রয়েছে, তাদের পরম শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় ইসলামের দাওয়াত দেন। ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরেন তাদের সামনে।

আর ঐসব মা-বাবা, ভাই-বোনদের একান্ত অনুরোধ যাদের ঘরে হিজড়া আছে, দয়া করে ওদের অনাদর করবেন না। দ্বীনশিক্ষার মাধ্যমে ওদের তাক্বওয়াশীল হিসাবে গড়ে তুলেন। হে বাবা-মায়েরা! একদিন আপনার ছেলে বড় হয়ে বিয়ে করে বউ নিয়ে অন্যত্র/কর্মক্ষেত্রে চলে যাবে। নিয়মিত আপনার খোঁজ-খবর নেওয়ার হয়তো সময় থাকবে না তার। এমন ছেলের থেকে কি তাক্বওয়াশীল হিজড়া সন্তানটি আপনার জন্য উত্তম নয়? আবার অনেক মেয়েও মানুষ করতে গিয়ে তারা স্কুল-কলেজ পড়তে পড়তেই পর-পুরুষের হাত ধরে পালিয়ে যায়। তাহলে এমন মেয়ের থেকে কি আপনার দ্বীনদার হিজড়া সন্তানটি উত্তম নয়?

আমাকে লিখতে দেখে আমার মেয়ে প্রশ্ন করছে, আম্মু এবার তোমার লেখার টপিক কী? বললাম, হিজড়া। শুনেই ও বলল, আম্মু তুমি যদি এ বিষয়ে লিখ, তাহলে আমি তোমার লিখা ছিড়ে ফেলব। বললাম, কেন? আমার বান্ধবীরা এটা দেখে হাসবে।

বুঝলাম, সামান্য লিখতেই যদি মানুষের এই প্রতিক্রিয়া, তাহলে যারা এই জীবনটা লীড করছে তারা প্রতিটা মুহূর্তে নিজের মনের সাথে, পরিবারের সাথে, সমাজের সাথে কী পরিমাণ যুদ্ধ করছে!

ওদের ঐ চেহারার পেছনে যে কী পরিমাণ কষ্ট, ব্যথা, বেদনা, অপমান, লাঞ্ছনা, হীনমন্যতা, নিঃস্বতা লুকিয়ে আছে তা নিরূপণ করার ক্ষমতা আমাদের নেই। আমরা একবার আল্লাহকে স্মরণ করে যদি ১০ নেকী পাই, তাহলে তারা যদি একবার স্মরণ করে তাহলে ১০০ গুণ নেকী বেশি পাওয়ার কথা। হে আল্লাহ! তুমি আমাদের হিজড়া ভাই-বোনদের নেকী আমাদের থেকে আরো বহুগুণ বাড়িয়ে দাও। তাদেরকে তোমার সৎপথ চেনার ও মানার তাওফীক্ব দান করো- আমীন!

আমি আমার প্রত্যেক দ্বীনদার ভাই-বোনদের অনুরোধ করছি, আপনাদের আশেপাশের পরিচিত-অপরিচিত সকল হিজড়া ভাইদের ইসলামের সীমাহীন সৌন্দর্যের একটুখানি নেক সহযোগিতা তাদেরকে জান্নাতের পথের পথিক বানাতে পারে। তাদের যন্ত্রণাকাতর জীবন ইসলামের পরশের সমধুর হয়ে উঠুক। ওদের অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবনকে আলোময় করতে আসুন আমরা সবাই হাত বাড়িয়ে দিই। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সবাইকে কবুল করুন- আমীন!