আল্লাহর ভালোবাসা
-আবু রায়হান বিন জাহিদুল ইসলাম*



আমরা দুনীয়াবী বিষয় নিয়ে ব্যস্ত। পরকালীন জীবনের ভাবনা আমাদের নেই বললেই চলে। আমাদের মধ্যে যারা আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়ার চেষ্টা করেন, তাদের সংখ্যা নিতান্তই কম। দুনিয়ার জীবনে মানুষের সামান্য ভালোবাসা পাওয়ার জন্য আমরা কি না করে থাকি! মানুষের ভালোবাসা প্রাপ্তির আশায় কত মিথ্যা পন্থাই না আমরা অবলম্বন করি! অথচ আল্লাহর ভালোবাসার সুধা পান করার সৌভাগ্য যাদের হবে, তাদের কীভাবে আপ্যায়ন করানো হবে তার বর্ণনা দিয়ে আল্লাহ বলেন,

إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ كَانَتْ لَهُمْ جَنَّاتُ الْفِرْدَوْسِ نُزُلًا -خَالِدِينَ فِيهَا لَا يَبْغُونَ عَنْهَا حِوَل.

‘নিশ্চয় যারা ঈমান আনে ও সৎকর্মসমূহ সম্পাদন করে, তাদের আপ্যায়নের জন্য জান্নাতুল ফিরদাউস প্রস্তুত করা আছে। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে এবং সেখান থেকে অন্যত্র স্থানান্তরিত হতে চাইবে না’ (আল-কাহফ, ১৮/১০৭-১০৮)

উক্ত আয়াত থেকে বুঝা যায়, যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে ও সৎকর্ম সম্পাদন করে, আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন। তাদের ভালোবেসে আপ্যায়নের ব্যবস্থা করেন। তা হলো জান্নাতুল ফিরদাউস। জান্নাতের যে স্তর রয়েছে তার মধ্যে সর্বোত্তম জান্নাত এটি, যা আল্লাহর আরশের নিচে অবস্থিত।

عَن مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ يَقُولُ قَالَ اللَّهُ تَعَالَى وَجَبَتْ مَحَبَّتِي لِلْمُتَحَابِّينَ فِيَّ وَالْمُتَجَالِسِينَ فِيَّ وَالْمُتَزَاوِرِينَ فِيَّ وَالْمُتَبَاذِلِينَ فِيَّ.

মুআয ইবনু জাবাল (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আমি রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘যারা আমার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে পরস্পরকে ভালোবাসে, আমার উদ্দেশ্যে সমাবেশে মিলিত হয়, আমার উদ্দেশ্যে পরস্পরে সাক্ষাৎ করে এবং আমার উদ্দেশ্যেই নিজেদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে, আমার ভালোবাসা তাদের জন্য অবধারিত’।[1]

উক্ত হাদীছ থেকে বুঝা যায়, যে কাজ করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন, সেই কাজগুলো শুধু তার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে করলেই তার ভালোবাসা পাওয়া যাবে। আর আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন, তার জান্নাতে যেতে কোনো বাধা থাকবে না।

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ إِنَّ اللَّهَ إِذَا أَحَبَّ عَبْدًا دَعَا جِبْرِيلَ فَقَالَ إِنِّي أُحِبُّ فُلَانًا فَأَحِبَّهُ قَالَ فَيُحِبُّهُ جِبْرِيلُ ثُمَّ يُنَادِي فِي السَّمَاءِ فَيَقُولُ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ فُلَانًا فَأَحِبُّوهُ فَيُحِبُّهُ أَهْلُ السَّمَاءِ ثُمَّ يُوضَعُ لَهُ الْقَبُولُ فِي الْأَرْضِ وَإِذَا أَبْغَضَ عَبْدًا دَعَا جِبْرِيلَ فَيَقُولُ إِنِّي أُبْغِضُ فُلَانًا فَأَبْغِضْهُ فَيُبْغِضُهُ جِبْرِيلُ ثُمَّ يُنَادِي فِي أَهْلِ السَّمَاءِ إِنَّ اللَّهَ يُبْغِضُ فَلَانَا فَأَبْغِضُوهُ قَالَ فَيُبْغِضُونَهُ ثُمَّ يُوضَعُ لَهُ الْبَغْضَاءُ فِي الْأَرْضِ.

আবু হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন জিবরীল (আলাইহিস সালাম)কে ডেকে বলেন, আমি অমুক ব্যক্তিকে ভালোবাসি, সুতরাং তুমিও তাকে ভালোবাসো। অতঃপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) তাকে ভালোবাসতে থাকেন। তারপর তিনি আকাশবাসীর মধ্যে ঘোষণা করে দেন যে, আল্লাহ অমুক ব্যক্তিকে ভালোবাসেন। অতএব তোমরাও তাকে ভালোবাসো। তখন আকাশবাসী তাকে ভালোবাসতে থাকেন। অতঃপর সে ব্যক্তির জন্য যমীনেও গ্রহনযোগ্যতা রেখে দেওয়া হয়। আর আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে ঘৃণা করেন, তখন জিররীল (আলাইহিস সালাম)কে ডেকে বলেন, আমি অমুক ব্যক্তিকে ঘৃণা করি, অতএব তুমিও তাকে ঘৃণা করো। তখন জিবরীল (আলাইহিস সালাম)ও তাকে ঘৃণা করেন। এরপর আকাশবাসীর মধ্যে ঘোষণা করে দেন যে, আল্লাহ অমুক ব্যক্তিকে ঘৃণা করেন, কাজেই তোমরাও তাকে ঘৃণা করো। তখন আকাশবাসীরা তাকে ঘৃণা করতে থাকে। অতঃপর যমীনের বুকেও তাকে ঘৃণা করা হয়’।[2]

উক্ত হাদীছ থেকে বুঝা যাচ্ছে যে, আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন, তাকে আকাশবাসী ও যমীনবাসী সবাই ভালোবাসেন। আর দুনিয়া ও আখেরাতে তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেওয়া হয়। আল্লাহ যাকে ঘৃণা করেন, আকাশ ও যমীনবাসী সবাই তাকে ঘৃণা করেন। আকাশ ও যমীনবাসীর মনে তার ঘৃণা রেখে দেওয়া হয়।

عَنْ أَبِي مُوسَى قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ مَثَلُ الْجَلِيسِ الصَّالِحِ وَالسَّوْءِ كَحَامِلِ الْمِسْكِ وَنَافِخِ الْكِيرِ فَحَامِلُ الْمِسْكِ إِمَّا أَنْ يُحْذِيَكَ وَإِمَّا أَنْ تبتاعَ مِنْهُ وإِمَّا أَن تجدَ مِنْهُ رِيحًا طَيِّبَةً وَنَافِخُ الْكِيرِ إِمَّا أَنْ يَحْرِقَ ثيابَكَ وإِمَّا أنْ تجدَ مِنْهُ ريحًا خبيثةً.

আবূ মূসা আশআরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘ভালো এবং মন্দ লোকের সাথে বন্ধুত্বের দৃষ্টান্ত যথাক্রমে আতর বিক্রেতা ও কামারের হাঁপরে ফুঁক দানকারীর মতো। আতর বিক্রেতা হয়তো তোমাকে এমনিতেই কিছু আতর দিতে পারে অথবা তুমি তার নিকট থেকে কিছু কিনে নিতে পারো, অন্যথা তুমি তার সুঘ্রাণ পাবেই। আর কামারের হাঁপরের ফুলকি তোমার জামা কাপড় জ্বালিয়ে দিতে পারে। এটা না হলেও তুমি তার ধোঁয়ার গন্ধ পাবেই’।[3]  

অর্থাৎ ভালো ব্যক্তির নৈতিক আচরণের সুফল সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে আতরের ন্যায় আর মন্দ ব্যক্তির অপকর্মের কুফল সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে হাঁপরের গন্ধযুক্ত ধোঁয়ার ন্যায়। 

عَن أبي سعيد أَنَّهُ سَمِعَ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ يَقُولُ لَا تُصَاحِبْ إِلَّا مُؤْمِنًا وَلَا يَأْكُلْ طَعَامَكَ إِلَّا تَقِيٌّ .

আবু সাঈদ খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, তিনি রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছেন, ‘ঈমানদার ব্যতীত কাউকেও বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করো না। আর পরহেযগার ব্যতীত কেউ যেন তোমার খাদ্য না খায়’।[4]

ঈমানদার ব্যক্তি ব্যতীত কাউকেও বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না। কেননা মন্দ বা কাফের-মুশরিক ব্যক্তি বন্ধু হলে তার আচার-আচরণের প্রভাব তার মনে পড়বে। সে তাকে তার মতো করে চালাতে চাইবে। একটি প্রবাদ আছে, সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে। লোহা এমনিতে পানিতে ভাসবে না, ডুবে যাবে, আর যদি কাঠের সাথে লাগিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে ভাসবে। তাই ঈমানদার ব্যক্তির সাথে চলাফেরা করতে হবে।

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ إِنَّ اللَّهَ يَقُولُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَيْنَ الْمُتَحَابُّونَ بِجَلَالِي الْيَوْمَ أُظِلُّهُمْ فِي ظِلِّي يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلِّي.

আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন আল্লাহ বলবেন, যারা আমার মহত্মের কারণে পরস্পরে ভালোবাসা স্থাপন করেছে, তারা কোথায়? আজ আমি তাদেরকে আমার বিশেষ ছায়ায় স্থান দিব। আজ এমন দিন, যেই দিন আমার ছায়া ব্যতীত আর কোনো ছায়া নেই’।[5]

অর্থাৎ যারা আল্লাহর মহত্মের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে পরস্পরে ভালোবাসা স্থাপন করবে, কিয়ামতের দিন তারা আল্লাহর বিশেষ ছায়াতলে আশ্রয়প্রাপ্ত সৌভাগ্যবানদের তালিকাভুক্ত হবেন।

সুধী পাঠক! আসুন, দুনিয়া নিয়ে ব্যস্ত না থেকে পরকাল নিয়ে ভাবি। স্বার্থপর, দুনিয়াসক্ত, অর্থলোভী, ক্ষমতাধর মানুষের ভালোবাসা প্রাপ্তির চেষ্টা থেকে নিজেকে বিরত রাখি। আল্লাহর ভালোবাসাকে মানুষের ভালোবাসা লাভের উৎস মনে করি। আল্লাহর ভালোবাসাকে মানুষের ভালোবাসা লাভের উৎস হিসেবে গ্রহণ করলে দুনিয়ার জীবনের যে কোন সমস্যার সমাধান সহজ হয়ে যায়। পরকালীন জীবনের সুখ ও সমৃদ্ধি লাভের আশায় মানুষকে ভালোবাসি। আল্লাহ আমাদেরকে তাওফীক দান করুন- আমীন!


* ডিপ্লোমা ইন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, আর.পি.আই।

[1]. মুওয়াত্ত্বা মালেক, হা/৩৫০৮; মিশকাত, হা/৫০১১।

[2]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৩৭; মিশকাত, হা/৫০০৫।

[3]. ছহীহ বুখারী, হা/২১০১; ছহীহ মুসলিম, হা/২৬২৮; মিশকাত, হা/৫০১০।

[4]. তিরমিযী, হা/২৩৯৫; আবূ দাঊদ, হা/৪৮৩২; মিশকাত, হা/৫০১৮।

[5]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৬৬; মিশকাত, হা/৫০০৬।