আল-কুরআন : আঁধারের মাঝে এক দীপ্তি
সাব্বির আহমাদ*


আল-কুরআন। সেই হেরা গুহায় মুহাম্মাদ a-এর উপর নাযিল হওয়া এক আলোকরশ্মি। হেরার এ আলোকরশ্মি নিয়ে তিনি বেরিয়ে পড়লেন জনসম্মুখে। তারপর এ রশ্মি আলোকিত করল সবাইকে। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে চারদিক থেকে দলে দলে মানুষ প্রবেশ করতে লাগল একত্বের বলয়ে। এ যেন দিশেহারা পথিকের দিশা আর তীরহারা নাবিকের তীর। এ যেন আঁধারের মাঝে এক দীপ্তি। মেঘের কোলে উঁকি মারা একটুখানি রোদ। বাহারি রকম সমস্যা-সমাধানের সমাহার। মানুষের জন্য এক ঝুলি হেদায়াত। সত্য-মিথ্যার মাঝে প্রভেদ করার এক অনন্য উপকরণ।

যার কাছে গেলে খুঁজে পাব জীবনের ছন্দ। যার ছোঁয়া পেলে জ্বলে উঠতে পারে নিভু নিভু হওয়া জীবন-প্রদীপ। জীবন যখন রাতের ঘনঘোর তমসায় ভ্রান্তির মায়াজালে আটকে পড়ে, তখন সেই মায়াজাল ভেদ করে সে তার প্রদীপ জ্বালিয়ে জীবন তরিটিকে কূলে ফিরে আনতে পারে। জীবন-সাগরে যখন উথালপাতাল তরঙ্গের মাঝে হারিয়ে ফেলব কিনারা, তখন সে এনে দিতে পারে সমুদ্রতট। জীবনকে রাঙিয়ে দিতে পারে নতুন ভোরের সোনারাঙা রোদে।

ফুযাইল ইবনু আয়ায। প্রখ্যাত একজন তাবেঈ। যিনি কিনা অতিশয় পাপী এবং সাংঘাতিক রকমের একজন ডাকাত ছিলেন। তিনি পড়শির এক রূপবতী মেয়েকে ভালোবাসতেন। এক রাতে ওই মেয়ের বাড়িতে ঢোকার জন্য দেওয়াল টপকাতে যাবেন, ওমনি কোথা থেকে যেন তার কানে একটি সুমধুর সুর ভেসে আসে। সেই সুর, সেই লহরি পাগলপারা করে দেয় ফুযাইলের মন। হৃদয়-কাননে বয়ে দেয় খুশির কল্লোল। ঘুরিয়ে দেয় তার জীবনের মোড়।

আমেরিকায় একটা কনফারেন্স হয়েছিল। সেখানে প্রতিটা ধর্মগ্রন্থের ১০ মিনিটের আবৃত্তি শোনাতে হবে। ওখানে গিয়েছে গীতা, বাইবেল, ত্রিপিটক, বেদ, রামায়ণ, তিখানিকায়া, টালমার্ডসহ পবিত্র আল-কুরআনও। উদ্দেশ্য হলো, কোন গ্রন্থের আবৃত্তি বেশি সুমধুর লাগে? সব ধর্মগ্রন্থের গুরুরা/ক্বারীরা নির্দিষ্ট স্থানে উপবেশন করেছে। বিচারকের সম্মুখে দুটো বাটন আছে। একটা গ্রিন বাটন আরেকটা রেড বাটন। গ্রিন বাটনে চাপ দিলে আবৃত্তি আরম্ভ আর রেড বাটনে চাপ দিলে আবৃত্তি সমাপ্তি। অগ্রে ডাকা হলো গীতা, সে ১০ মিনিট আবৃত্তি করে চলে গেল। তারপর ডাকা হলো ত্রিপিটক, সে ১০ মিনিট আবৃত্তি করে চলে গেল। এবার ডাকা হলো ভেটিকেন সিটির ধর্মগুরুকে তার বাইবেল আবৃত্তি করার জন্য, সেও রীতিমতো ১০ মিনিট আবৃত্তি করে চলে গেল। এভাবে একে একে শেষ হলো সকলের আবৃত্তি।

সবশেষে মুসলিমদের ধর্মগ্রন্থ আল-কুরআন আবৃত্তির জন্য ঘোষণা করা হলো মিশরের ক্বারী আব্দুল বাসেতে ইবনে আব্দুছ ছামাদের নাম। সরু একটা চাদর আর জুব্বা গায়ে মাইকের সামনে এসে أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ বলে একটা টান দিলেন। তিনি সূরা ফাতেহা পড়তেই সময় নিয়েছিলেন ১৩ মিনিট। কিন্তু বিচারক রেড বাটন চাপে না। এই ফুরসতে তিনি সূরা আর-রহমান তেলাওয়াত শুরু করলেন।

১৫ মিনিট হয়ে যায় ২০, ২৫, ৩০ মিনিট হয়ে যায়। কিন্তু বিচারক রেড বাটন চাপে না। এদিকে অর্গানাইজিং কমিটির প্রধান চেয়ার থেকে উঠে এসে বিচারককে ধাক্কা দিয়ে বলতে লাগল, WHAT ARE YOU DOING IN HERE? WHAT’S WRONG WITH YOU? WHY AREN’T YOU PRESSING THE RED BATTON? ওনাকে দেখেই বিচারক ভূত দেখার মতো ঝলকানি দিয়ে উঠলেন। কিহ! রেড বাটন! তিনি আবার যখন আব্দুল বাসেতের তেলাওয়াতের দিকে দৃষ্টিপাত করে আবার তন্ময় হয়ে যান।

কোন সে জিয়নকাঠি? যার অনুপম স্পর্শে প্রাণ ফিরে পেয়েছিল ফুযাইলের মৃত অন্তর। বদলে গিয়েছিল তার জীবন। যার অমীয় সুধায় ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল কনফারেন্সের সেই বিচারকের অন্তর। হৃদয়ের অন্দরমহলে শুরু হয়েছিল মহাসাইক্লোন। যার তেলাওয়াতে মুগ্ধ হয়ে এক আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছিল জিনদের সেই দল। সেটা হলো আল-কুরআন।

তোমার মনে কি একবারও অদম্য কৌতূহল জাগে না? একটুও কি ইচ্ছে করে না, কী আছে এই বইয়ে? যেটা ফুযাইলের জীবনে বসন্ত এনে দিয়েছিল। জিনদের সেই দলকে ইসলামের সুধা পান করিয়েছিল। হতবাক করে দিয়েছিল কনফারেন্সের সেই বিচারককে। তাহলে, চলো! আজ তবে খুলে দেখা যাক সেই মহাগ্রন্থ…।

* অধ্যয়নরত, ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতি ইন্সটিটিউট, উত্তরা, ঢাকা।