আল-কুরআন সংকলনের ইতিহাস
মহিউদ্দিন বিন জুবায়েদ*


আল-কুরআন মানবজাতির হেদায়াতের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ, সর্বশেষ ও পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। ইসলামী জীবন ব্যবস্থার একমাত্র সোপান এ গ্রন্থ  আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে জিবরীল e-এর মাধ্যমে সময়ের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী মানুষের সার্বিক কল্যাণে সুদীর্ঘ ২৩ বছরে মহানবী a-এর উপর অবতীর্ণ হয়।

পরিচিতি : আল-কুরআন মানবীয় সকল কর্মকাণ্ডকে ঘিরে এক অনন্য জীবনবিধান। কুরআনের পরিচয় দিতে গিয়ে আল্লামা আবুল বারাকাত p বলেন,

القرآن هو الكتاب المنزّل على الرّسول صلّى الله عليه وسلّم ‌المكتوب ‌في ‌المصاحف ‌المنقول ‌عنه ‌نقلا ‌متواترا ‌بلا ‌شبهة ‌لها ‘আল-কুরআন হলো আসমানী কিতাব, যা  মুহাম্মদ a-এর ওপর নাযিল করা হয়েছে। এটি মুছহাফে লিখিত এবং সন্দেহাতীত পদ্ধতিতে মুতাওয়াতির সূত্রে বর্ণিত হয়েছে’।[1]

কুরআনের তাৎপর্য মূল্যায়ন করতে গিয়ে জনৈক ফরাসি পণ্ডিত বলেছেন,  কুরআন বিজ্ঞানীদের জন্য একটি বিজ্ঞান সংস্থা, ভাষাবিদদের জন্য একটি শব্দকোষ, বৈয়াকরণদের জন্য একটি ব্যাকরণ গ্রন্থ এবং আইনজ্ঞদের জন্য একটি বিশ্বকোষ।

এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, আল-কুরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত আসমানী কিতাব। আর এ কিতাবের সার্বিক সংরক্ষণের দায়িত্ব সর্বোপরি আল্লাহ নিজ হাতে তুলে নিয়েছেন। এ ব্যাপারে কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,﴿إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ﴾ ‘আমিই কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই এর সংরক্ষণকারী’ (আল-হিজর, ১৫/৯)

মহানবী aএর যুগে কুরআন সংকলন : কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার সাথে সাথে মহানবী a কুরআন সংরক্ষণার্থে তা হিফয করার জন্য দ্রুত আবৃতি করতেন। যার প্রেক্ষিতে আল্লাহ বলেন,﴿لَا تُحَرِّكْ بِهِ لِسَانَكَ لِتَعْجَلَ بِهِ – إِنَّ عَلَيْنَا جَمْعَهُ وَقُرْآنَهُ – فَإِذَا قَرَأْنَاهُ فَاتَّبِعْ قُرْآنَهُ – ثُمَّ إِنَّ عَلَيْنَا بَيَانَهُ﴾ ‘হে রাসূল!

তাড়াতাড়ি অহী আয়ত্ত করার জন্য তুমি তোমার জিহ্বা ওর সাথে দ্রুত সঞ্চালন করো না। তার সংরক্ষণ ও পাঠ করাবার দায়িত্ব আমারই। সুতরাং যখন আমি তা (জিবরীল e-এর মাধ্যমে) পাঠ করি, তুমি তখন সেই পাঠের অনুসরণ করো। অতঃপর এর বিশদ ব্যাখ্যার দায়িত্ব আমারই’ (আল-ক্বিয়ামাহ, ৭৫/১৬-১৯)

এ ঘোষণার প্রেক্ষিতে নবী কারীম a-এর সিনা মোবারক এমন সংরক্ষিত ভাণ্ডারে পরিণত হলো, যাতে কুরআন সংরক্ষণে সামান্যতম বিচ্যুতি না ঘটে।

জিবরীল e-এর তা‘লীম : কুরআন সংরক্ষণে রাসূল a প্রতি রামাযানে পূর্বে নাযিলকৃত অংশগুলো জিবরীল e-কে পড়ে শোনাতেন। ছহীহ বুখারীতে এসেছে, রাসূল a-এর ওফাতের বছর তিনি দুবার সমস্ত কুরআন জিবরীল e-কে শুনান এবং তার থেকেও নিজে শোনেন।[2]

লিখিত সংকলন : কুরআন এক সাথে নাযিল হয়নি বলে রাসূল a-এর  নবুঅতী জীবনে তা গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ করা সম্ভব হয়নি। এ সময় কুরআনের যে অংশ যখনই নাযিল হতো, তখনই রাসূল a অহী লেখকগণের দ্বারা তা লিপিবদ্ধ করিয়ে নিতেন। নির্ধারিত অহী লেখকের দ্বারা লেখানোর ফলে নবী a-এর জীবদ্দশাতেই সম্পূর্ণ কুরআন মাজীদ লিপিবদ্ধ হয়ে যায়। আল্লামা ক্বস্তলানী p-এর মতে, রাসূল a-এর যুগেই সম্পূর্ণ কুরআন মাজীদ লিপিবদ্ধ হয়। এ প্রসঙ্গে কুরআনে এসেছে,﴿رَسُولٌ مِنَ اللَّهِ يَتْلُو صُحُفًا مُطَهَّرَةً – فِيهَا كُتُبٌ قَيِّمَةٌ﴾ ‘আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন রাসূল যিনি পবিত্র ছহীফা পড়ে শুনাবেন। যাতে একেবারে সঠিক কথাগুলো লিখা আছে’ (আল-বাইয়্যিনাহ, ৯৮/২-৩)

ছাহাবীগণের হিফয প্রবণতা : ছাহাবীদের মাঝে হিফয করার প্রবণতাও তখন থেকে শুরু হয়। নবী করীম a ঘোষণা করেছেন, خَيْرُكُمْ مَنْ تَعَلَّمَ الْقُرْآنَ وَعَلَّمَهُ ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম যে নিজে কুরআন শিক্ষা করে ও অন্যকে শিক্ষা দেয়’।[3]

এরপর থেকে ছাহাবীগণের মাঝে কুরআন হিফয করার বিষয়ে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়। মহিলা ছাহাবীগণ এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ফলে রাসূল a-এর নবুঅতী জীবনেই শত শত হাফেযে কুরআন তৈরি হয়। এমনকি বালকদের মাঝেও কুরআন হিফযের প্রবল আগ্রহ দেখা দেয়।

আবূ বকর c-এর যুগ : রাসূল a-এর ইন্তেকালের পর আবূ বকর c-এর খেলাফতকালে ৪ জন ভণ্ড নবীর উদ্ভব হয়। তন্মধ্যে শক্তিশালী ‘মুসায়লামাতুল কাযযাব’-এর বিরুদ্ধে ৬৩৩ খ্রিষ্টাব্দে সংঘটিত হয় ইয়ামামার যুদ্ধ।  আল্লামা ত্ববারী p একে  ‘হাদীক্বাকুল মাউত’ বা The battle of the garden of death বলেছেন।

এ যুদ্ধে বহু হাফেযে কুরআন শহীদ হলে উমার c খলীফা আবূ বকর c-এর নিকট কুরআনের কিয়দংশ বিস্মৃতির আশঙ্কা প্রকাশ করে কুরআনকে একসঙ্গে সংকলিত করার  পরামর্শ দেন। আবূ বকর c
রাসূল a যে কাজ করেননি, তা করতে প্রথমে অনিচ্ছা প্রকাশ করলেও শেষ পর্যন্ত সংকলনের সিদ্ধান্ত নেন।

যায়েদ c-কে দায়িত্ব প্রদান : কুরআন সংকলনের ব্যাপারে নীতিগত ঐকমত্যের পর খলীফা আবূ বকর c এ সুমহান কাজটি করার জন্য যায়েদ ইবনু ছাবিত আনছারী c-এর উপর দায়িত্ব অর্পণ করেন। যায়েদ ইবনু ছাবিত c কুরআন সংকলনের জন্য একদিকে প্রিয়নবী a-এর রেখে যাওয়া লিখিত অংশসমূহ এবং ছাহাবীগণের মধ্যে যার নিকট যতটুকু পাওয়া যায়, তা একত্রিত করলেন।

অপর দিকে কুরআনের হাফেযদের পূর্ণ সহায়তা নিলেন।  এ তিন প্রকারের সম্মিলিত সাহায্যে ও সাক্ষ্যের ভিত্তিতে পূর্ণ কুরআন মাজীদ গ্রন্থাবদ্ধ করা হয়।

উমার c-এর যুগ : আবূ বকর c-এর নির্দেশে সংকলিত নুসখা বা কপিটি তার নিকটেই সংরক্ষিত ছিল। তাঁর ইন্তেকালের পর এ নুসখা উমার c নিজের হেফাযতে নিয়ে নেন। উমার c-এর ইন্তেকালের সময় নুসখাটি উম্মুল মুমিনীন  হাফছা g-এর নিকট রেখে যান।

মান c-এর যুগ : ইসলামের তৃতীয় খলীফা উছমান c-এর আমলে পৃথিবীর প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইসলামের বিস্তৃতি ঘটলে অধিকৃত অঞ্চলের মুসলিমগণ কুরআন শিক্ষা শুরু করে। এ সময় ক্বেরাআতের বিভিন্নতার কারণে কুরআন পাঠে কিঞ্চিৎ মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়। এ মতপার্থক্য নিরসন কল্পে তিনি একটি সর্বজনগ্রাহ্য নুসখা প্রণয়ন করেন।

উছমান c হাফছা g-এর নিকট রক্ষিত আবূ বকর c কর্তৃক সংকলিত নুসখা চেয়ে আনেন এবং যায়েদ ইবনু ছাবিত, আব্দুল্লাহ ইবনু যুবায়ের, সাঈদ ইবনুল আছ এবং আবদুর রহমান ইবনু হারেছ n-এর সমন্বয়ে গঠিত কমিটির উপর এর কয়েকটি অনুলিপি তৈরির দায়িত্ব প্রদান করেন। সাথে সাথে লিখার ক্ষেত্রে মতবিরোধ সৃষ্টি হলে  কুরায়শী ক্বেরাআত গ্রহণ করেন। তারা সবগুলো সূরাকে ক্রমানুসারে সাজান এবং নুক্বতা ও হরকত ছাড়াই লিখেন, যাতে সব ক্বেরাআতেই পড়া যায়। অতঃপর খলীফার নির্দেশে এ নুসখা ছাড়া অন্যান্য নুসখাসমূহকে একত্রিত করে পুড়িয়ে ফেলা হয়। বর্তমান যুগে সারা পৃথিবীতে পঠিত কুরআন এ মুছহাফে উছমানেরই প্রতিলিপি। এর কোনোরূপ বিকৃতি  বা বিচ্যুতি আজও পরিলক্ষিত হয়নি। কিয়ামত পর্যন্ত হবেও না। প্রকাশ থাকে যে, হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ p-এর আমলে কুরআনে হরকত সংযোজন করা হয়।

পরিশেষে আমরা এ কথা বলতে পারি যে, কুরআনই পৃথিবীতে একমাত্র গ্রন্থ, যা আজও পর্যন্ত অবিকৃত  অবস্থায় আছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত এর কোনো ধরনের বিকৃতি হবে না। কেননা এর হেফাযতের ভার স্বয়ং আল্লাহ তাআলা নিজের হাতে নিয়েছেন। ঘোষণা করেছেন,﴿إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ﴾ ‘আমিই কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই এর সংরক্ষণকারী’ (আলহিজর, ১৫/৯)


* মুহিমনগর, চৈতনখিলা, শেরপুর।

[1]. নাযরাতুন নাঈম ফী মাকারিমি আখলাক্বির রসূলিল কারীম a, ৪/১১৮০।

[2]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৬২৪; সিলসিলা ছহীহা, হা/৩৫২৪।

[3]. ছহীহ বুখারী, হা/৫০২৭।