اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ وَحْدَهُ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلٰى مَنْ لَّا نَبِيَّ بَعْدَهُ

আশূরা: শী‘আদের খপ্পরে সুন্নীরা

 হিজরী সনের প্রথম মাস মুহাররমের ১০ তারিখ আশূরা হিসাবে পরিচিত। এর ইতিহাস হাজার হাজার বছরের পুরনো। কিন্তু যে কারণে আশূরা পরিচিত, তা আমাদের দেশের জনগণের নিকট অপরিচিত। আশূরার পুরনো সেই ইতিহাস নতুন এক ইতিহাসের নিচে চাপা পড়ে গেছে মুসলিম নামধারী একটি ভ্রান্ত ফেরক্বার প্রোপাগান্ডায়। বিশেষ করে ৩৫২ হিজরীর ১০ মুহাররমে শী‘আ আমীর মুইযযুদ্দৌলাহ কর্তৃক এ দিনটিকে শোক দিবস ঘোষণার মধ্য দিয়ে নতুন ইতিহাস মাথাচাড়া দিতে শুরু করে। মহান আল্লাহ কর্তৃক আল্লাহদ্রোহী দাম্ভিক ফির‘আউনকে ডুবিয়ে মারা এবং  মূসা (আ.) ও তার মুমিন সঙ্গীসাথীগণকে মুক্তিদানের যে ইতিহাস, সেটাই আশূরার মূল ইতিহাস। মূলত এ ইতিহাসের সূত্র ধরেই আশূরা হাজার হাজার বছর ধরে বেঁচে আছে। আমাদের নবী মুহাম্মাদ (ছা.)-এর ছিয়াম রেখেছেন এবং উম্মতকে রাখার নির্দেশনা ও উৎসাহ দিয়েছেন। এমনকি ইয়াহূদীরাও নাজাতে মূসা (আ.)-এর শুকরিয়াস্বরূপ এ ছিয়াম রাখতো। ইসলামপূর্ব জাহিলী যুগের লোকেরাও এ ছিয়াম রাখতো।

কিন্তু ৬১ হিজরীর আশূরার দিনে কাকতালীয়ভাবে ঘটে যায় একটি বিয়োগান্ত ঘটনা। এদিন নবী (ছা.)-এর প্রিয় নাতি হুসাইন ইবনে আলী (রা.) কারবালার প্রান্তরে নির্মম হত্যার শিকার হন। আশূরা যে কারণে স্মৃতিবিজড়িত, তা আসলে আনন্দের, যার বহিঃপ্রকাশ হবে আল্লাহর  শুকরিয়াস্বরূপ ছিয়াম পালনের মাধ্যমে। কিন্তু মূল বিষয়টা উল্টে গিয়ে আশূরা এখন হয়ে গেছে শোকের। সেকারণে আশূরা এলেই নেমে আসে শোকের ছায়া। এতে শী‘আ-সুন্নী একাকার হয়ে যায়। সুন্নীরা না বুঝেই শী‘আদের খপ্পরে পড়ে যায়, তাদের পাতানো ফাঁদে পা দেয়। অথচ নবী (ছা.)-এর মৃত্যুর ৫০ বছর পরে ঘটে যাওয়া কারবালার ঘটনার সাথে আশূরার মূল ইতিহাসের কোনোই সম্পর্ক নেই। এর মূল কারণ ইতিহাস বিকৃতি, বিষাদ সিন্ধুর মতো কল্পকাহিনী ও সাহিত্যের কুপ্রভাব, শী‘আদের অতিরঞ্জন, অতিভক্তি ও অপপ্রচার, আধুনিক মিডিয়ার কুপ্রভাব, সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা এবং সর্বোপরি শারঈ নির্দেশনা না মানার প্রবণতা। বঙ্গদেশে শী‘আদের বহু দিন ক্ষমতায় থাকাও আশূরার ঘটনাকে পর্দার পেছনে পাঠাতে সাহায্য করে। এর মানে এই নয় যে, কারবালার বিয়োগান্ত ঘটনা আমাদেরকে পীড়া দেয় না। বরং এ ঘটনা আমাদের পীড়া দেয় এবং হুসাইন (রা.)-এর শহীদ হওয়ার ব্যাপারে আমরা বলি, তিনি অবশ্যই নির্যাতিত হয়ে শহীদ হয়েছেন। যারা তাকে হত্যা করেছে, তারা নিঃসন্দেহে যালেম ও সীমালঙ্ঘনকারী (জামি‘উল মাসায়েল, ৬/২৫৯)। আমরাও হুসাইন (রা.)-কে সম্মান করি, তাকে ভালোবাসি। কিন্তু কারো ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করি না, জাহিলী কর্মকাণ্ড সমর্থন করি না। মাতম করা, বুক চাপড়ানো ইত্যাদি ইসলাম কঠোরভাবে নিষেধ করেছে (বুখারী, হা/১২৯৪)। এর বিপরীতে যারা নাছেবী হিসাবে খ্যাত, তাদেরকেও আমরা কখনোই সমর্থন করি না। এরা হুসাইন ও তার পরিবারের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে এবং আশূরার দিন উল্লাসে ফেটে পড়ে! নিঃসন্দেহে এটা কোনো মুমিনের কাজ হতে পারে না।

এক্ষণে কয়েকটি প্রশ্ন হতে পারে: হুসাইন (রা.)-কে হত্যার ব্যাপারে ইয়াযীদ কতটুকু দায়ী? ইয়াযীদ হুসাইন (রা.)-কে হত্যার নির্দেশ দেননি, এ হত্যাকাণ্ডে তিনি খুশিও হননি; বরং হত্যার অপরাধে তিনি ওবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদকে গালি দেন ও অভিশাপ করেন। উপরন্তু তিনি হুসাইন (রা.)-এর পরিবারের জীবিত সদস্যদের সম্মান করেন এবং সসম্মানে মদীনায় পাঠানোর ব্যবস্থা করেন (ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়া, ৩/৪১০-৪১১; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১১/৬৫১; সিয়ার, ৪/৩৭০)। বরং হুসাইন (রা.) হত্যার ব্যাপারে মায়াকান্না প্রদর্শনকারী শী‘আরাই দায়ী। কারণ কূফাবাসী শী‘আরাই তাকে ডেকে অপদস্থ করেছে (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৮/২১৪)। ইয়াযীদের ব্যাপারে আমাদের অবস্থান কেমন হওয়া উচিত? তার ব্যাপারে মানুষের ৩ ধরনের অবস্থান লক্ষ্য করা যায়: (১) তিনি কাফের ও মুনাফিক্ব ছিলেন। হুসাইন (রা.)-কে হত্যার ব্যাপারে তার হাত ছিলো। (২) তিনি ছিলেন সৎ ও ন্যায়পরায়ণ শাসক। তিনি একজন ছাহাবী ছিলেন। নবী (ছা.) তাকে কোলে নিয়েছেন। এই দু’টি অবস্থানই ঠিক নয়। (৩) তিনি একজন মুসলিম শাসক ছিলেন। তার ভালো-মন্দ দু’টোই ছিলো। তিনি ছাহাবী ছিলেন না; বরং তিনি উছমান (রা.)-এর খিলাফতকালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কাফের ছিলেন না। কিন্তু তার কারণে হুসাইন (রা.)-এর নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটে (ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়া, ৪/৪৮২-৪৮৩)। তার ব্যাপারে আমাদের অবস্থান কী? এখানেও মানুষের ৩ ধরনের অবস্থান রয়েছে: (১) কেউ কেউ তাকে অভিশাপ করে। (২) কেউ কেউ মহব্বত করে। (৩) আবার কেউ কেউ গালিও দেয় না, মহব্বতও করে না। শেষের অবস্থানটিই মধ্যমপন্থী অবস্থান (ঐ, ৪/৪৮৩)। সুতরাং আমরা তাকে গালিও দিবো না, ভালোও বাসবো না (সিয়ার, ৪/৩৮)। মনে রাখতে হবে, নবী (ছা.) কর্তৃক রোমকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের ক্ষমাপ্রাপ্তির ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে, যার আওতায় মু‘আবিয়া ও পুত্র ইয়াযীদ পড়ে যায় (বুখারী, হা/২৯২৪; শারহুয যারকানী, ৩/৬৫)।

আশূরা উপলক্ষ্যে আমাদের করণীয়: (১) যে ঘটনার জন্য আশূরার পরিচিতি, জনগণের সামনে তার প্রচার-প্রসার বেশি করে ঘটানো। (২) তাদের সামনে আশূরার সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা এবং মিডিয়াকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা। (৩) মূসা (আ.)-এর মুক্তি উপলক্ষে আল্লাহর শুকরিয়াস্বরূপ আশূরার ছিয়াম রাখা এবং জনগণের সামনে এর ফযীলত তুলে ধরে তাদেরকে এ ছিয়াম রাখার প্রতি উৎসাহিত করা। রাসূল (ছা.) এ ছিয়ামের ফযীলত হিসাবে এক বছরের গোনাহসমূহের কাফফারার কথা বলেছেন (মুসলিম, হা/১২৬২)।

(৪) রাসূল (ছা.)-এর নির্দেশনা অনুযায়ী ইয়াহূদীদের বিরুদ্ধাচরণপূর্বক ১০ মুহাররমের ছিয়ামের সাথে ৯ বা ১১ তারিখেও ছিয়াম রাখা (মুসলিম, হা/১১৩৪; ইবনে খুযায়মা, হা/২০৯৫)। (৫) শোক পালনের এসব নোংরা নীতি বর্জন করা এবং এর নামে শিরক, বিদ‘আত ও জাহিলী কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে ও জনগণকে বিরত রাখা। (৬) সরকারী ছুটি ও পৃষ্ঠপোষকতা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা।

এ উপলক্ষে আমাদের বর্জনীয়: (১) মুহাররমকে শোক, মাতম, দুশ্চিন্তা ও দুঃখের মাস মনে করা। (২) নারীদের সৌন্দর্য চর্চা থেকে বিরত থাকা। (৩) হুসাইন (রা.)-এর মৃত্যুতে শোক পালনের উদ্দেশ্যে ছিয়াম রাখা। (৪) হুসাইন (রা.)-এর নামে ভুয়া কবর বানিয়ে তা‘যিয়া মিছিল বের করা। (৫) ঐ কল্পিত কবরে হুসাইন (রা.) আসেন বলে বিশ্বাস করা, সালাম করা, মাথা নত করা, সিজদা করা ও তার কাছে কিছু চাওয়া। (৬) মিথ্যা শোক প্রদর্শন করে বুক চাপড়ানো, জামা ছেঁড়া। (৭) হায় হোসেন! হায় হোসেন! বলে মাতম করা। (৮) লাঠি, তীর, বল্লম নিয়ে যুদ্ধের মহড়া দেয়া। (৯) কালো ব্যাজ ধারণ করা। (১০) হুসাইন (রা.)-এর নামে কেক বানিয়ে বরকতের কেক মনে করা। (১১) আয়েশা (রা.) সহ অন্যান্য ছাহাবীকে গালি দেয়া। (১২) বিভিন্ন অনুষ্ঠানের নামে অজস্র অর্থ নষ্ট করা।

মহান আল্লাহ আমাদেরকে মুহাররমের যাবতীয় করণীয় ও বর্জনীয় সম্পর্কে সচেতন হওয়ার তাওফীক্ব দান করুন। আমীন!