আসক্তির বেড়াজালে

আব্দুর রাযযাক বিন মাসির*


ফরহাদ নামে ১৬ বছর বয়সী ছেলেটি এখন ঢাকা শহরে পড়ালেখা করে। সাথে বাবা-মাও থাকেন। এত বড় হয়ে গেলেও সে এখনও মোবাইলে আসক্ত নয়।

এই বছরেই সে ঢাকা এসেছে। নতুন ক্লাসে ভর্তি হয়েছে। নতুন বন্ধুও হয়েছে তার। তারা মিরপুরের আট তলাবিশিষ্ট বিল্ডিং-এর চার তলার একটা ইউনিট ভাড়া নিয়েছে। আর ক্লাসের কিছু বন্ধু পাঁচ তলায় থাকে। একই বিল্ডিং-এ থাকে বলে তাদের সাথে বেশ ভালো সম্পর্ক ফরহাদের। প্রায়ই তাদের রুমে যাওয়া-আসা করত। ক্লাসের সবাই তাকে ভালো ছাত্র হিসেবেই জানে। কারণ সে নিয়মিত পড়ালেখা করে যায়। তাই সব শিক্ষকের কাছে সে অল্প দিনেই পরিচিত হয়ে যায় এবং তাদের কাছে অনেক ভালোবাসা পায়। তার লোখাপড়া বেশ ভালোই চলছিল। মাঝেমধ্যেই পুরস্কার এনে মায়ের হাতে তুলে দিত। মাও খুব খুশি হতেন। এসব মিলিয়ে খুব ভালোই কাটছিল তার দিন।

কিন্তু কে জানত? এমন সাজানো একটি জীবনে সবকিছু এলোমেলো করতে কালবৈশাখের ঝড় অপেক্ষা করছে।

উপরের তলায় থাকা বন্ধুরা সবাই অনলাইন গেমে আসক্ত ছিল। আর যখনই সে তাদের সাথে দেখা করতে যেত, তখনই তারা খেলত। ফরহাদ এই ধরনের গেম একদম পছন্দ করত না। কখনো এগুলো খেলার কথা তার মাথায় আসেনি। কিন্তু তাদের প্রতিনিয়ত খেলতে দেখে, তারও সেটা ভালো লাগতে লাগল। হঠাৎ একদিন সে তাদের সাথে দেখা করতে এসে দেখে যে, তারা সবাই গল্প করছে। ফোনগুলো পাশেই পড়ে আছে। সে তাদের সাথে তাল মিলিয়ে গল্প করতে লাগল। একপর্যায়ে কথা বলা শেষ হলে ফরহাদ তার এক বন্ধুকে বলে, তোর ফোনটা একটু দে তো, আমিও একটু গেম খেলি। তার বন্ধু তাকে ফোনটা দিলে সে খেলতে শুরু করল।

এই যে শুরু হলো তার জীবনের ভয়াবহ সময়। এভাবে প্রতিদিন একটু খেলতে খেলতে সেও অনেক আসক্ত হয়ে যায়। এমনকি তার মায়ের ফোনেও লুকিয়ে গেমটা নামিয়ে ফেলে। তার মা ফোন বিষয়ে খুব একটা না জানার কারণে তিনি জানতেও পারেন না যে, তার ছেলে এসব গেম খেলছে। ধীরে ধীরে ফরহাদ গেমের প্রতি অনেকটা আসক্ত হয়ে যায়। ঠিক এই রকম একটা সময়ে তার বাবা ঢাকা ছেড়ে রাজশাহী বদলি হয়ে যায়। এখানে এসে সে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হয়।

তার বয়স এখন ১৭। মাদরাসায় আবাসিকে ভর্তি হয়েছে। মা-বাবাকে না জানিয়েই একটা ফোন কিনেছে শুধু গেম খেলার জন্য।

সে খেলার প্রতি এতোটা আসক্ত হয়েছিল যে, পড়ার জন্য বইটাও খুলে দেখত না। আর এদিকে আবার মাদরাসায় ফোন ব্যবহার নিষেধ। শিক্ষকের চোখ ফাঁকি দিয়ে গেম খেলত। তারপরও শিক্ষকগণ সবাই তাকে ভালোবাসতেন। কারণ সে ক্লাসের পড়া ক্লাসেই করে নিতে পারত। কেউ তাকে কখনো সন্দেহ পর্যন্ত করত না।

একদিন প্রচণ্ডভাবে শয়তানের কুমন্ত্রণায় পড়ে গেমের পিছনে টাকা খরচ করবে বলে চিন্তা করল। যেই ভাবনা সেই কাজ। তার রুমের বড় ভাই নাইমের কাছে গিয়ে বিকাশে টাকা নিল। নাইম তাকে জিজ্ঞেস করল, টাকা নিয়ে তুমি কী করবে? সে তার বড় ভাইকে কিছুই বলল না। শুধু বলল, দরকার আছে। এই পর্যন্তই রাতের কাহিনি শেষ। পরদিন সকালে ক্লাস গেল সে। ঠিক দুপুর বেলা ক্লাস ছুটি হলো। রুমে ঢুকতেই নাইম তাকে বলল, তাড়াতাড়ি আসো, তোমার বিচার আছে। তুমি এতোটা খারাপ! আমি আগে ভাবতেই পারিনি।

ফরহাদ তার কথা শুনে নিশ্চুপ হয়ে গেল। তার গলা শুকিয়ে গেল। ভয়ে ভয়ে ফরহাদ বলল, ভাই, কী হয়েছে? আমি আবার কী করলাম।

নাইম বলল, কাল রাতে টাকাটা তুমি কি করেছ?

এতক্ষণে সে বুঝতে পেরেছে যে, নাইম জেনে গেছে বিষয়টা। তাই সে আর কিছু না লুকিয়ে বলল, ভাই গেমে খরচ করেছি।

একথা শুনে নাইম তাকে বেশ কিছু উপদেশ দিল। কিছু বিদ্বানের উক্তি শোনালো। আর বলল, এখন তুমি জানো তুমি কী করবে। আগত সময়গুলো তোমারই হাতে। কাল কিয়ামতের দিন সময় বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হলে কী উত্তর দিবে?

কথাগুলো শুনে ফরহাদ অনেক লজ্জিত হলো, অনেক আফসোস করল। ভাবল, যে সময়গুলো সে এর পিছনে ব্যয় করেছে, যদি সেই সময়গুলে সে পড়ার পিছনে ব্যয় করত! তাহলে সে কত কিছুই না করতে পারত!

হায় আফসোস! আমি যদি আমার আগের বন্ধুদের সাথে দেখা না করতাম। হায়! যদি আমি আমার বন্ধুর কাছে খেলতে না চাইতাম! এখন আমি কীভাবে এই বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসব! কীভাবে এত পাপ নিয়ে আমি আল্লাহর সামনে দাঁড়াব! এই রকম কিছু কথা কথা ভাবতে ভাবতে সে কান্না জুড়ে দিল।

সুধী পাঠক! জীবন চলার পথে সঙ্গীর খুব প্রয়োজন। কিন্তু সেই সঙ্গীটা সৎ হওয়া খুবই জরুরী। যে সবসময় সৎ পথের রাস্তায় চলতে সাহায্য করবে। অপরদিকে অসৎ বন্ধু থেকে বেঁচে থাকতে হবে। তা না হলে আমাদের অবস্থা এই ফরহাদের মতোই হবে।

এজন্যই তো বিদ্বানগণ বলেছেন, ‘সৎ সঙ্গে স্বর্গ বাস, আর অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ’।


* নবম শ্রেণি, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, রাজশাহী।