আসলেই কি সাত যমীনে সাত জন নবী?

আহমাদুল্লাহ*


উপক্রমণিকা :

জনৈক প্রসিদ্ধ ইসলামী ব্যক্তিত্ব দাবী করেছেন যে, সাতটি যমীনে তথা সাতটি পৃথিবীতে সাত জন মুহাম্মাদ রয়েছেন। তিনি তার দাবীর পক্ষে একটি হাদীছও পেশ করেছেন। এ ক্ষেত্রে জনমনে ভ্রান্তির অবতারণা হওয়ায় নিম্নে হাদীছটি তাহক্বীক্বসহ আলোচনা করা হলো—

أَخْبَرَنَا أَحْمَدُ بْنُ يَعْقُوبَ الثَّقَفِيُّ، ثنا عُبَيْدُ بْنُ غَنَّامٍ النَّخَعِيُّ، أَنْبَأَ عَلِيُّ بْنُ حَكِيمٍ، ثنا شَرِيكٌ، عَنْ عَطَاءِ بْنِ السَّائِبِ، عَنْ أَبِي الضُّحَى، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا، أَنَّهُ قَالَ سَبْعَ أَرَضِينَ فِي كُلِّ أَرْضٍ نَبِيٌّ كَنَبِيِّكُمْ وَآدَمُ كآدمَ، وَنُوحٌ كَنُوحٍ، وَإِبْرَاهِيمُ كَإِبْرَاهِيمَ، وَعِيسَى كَعِيسَى

ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)  বলেন, ‘সাত যমীনের প্রত্যেকটি যমীনে তোমাদের নবীর মতো নবী রয়েছেন। আদম (আলাইহিস সালাম)-এর মতো (আরও ছয় জন) আদম (আলাইহিস সালাম) আছেন। নূহ (আলাইহিস সালাম)-এর মতো (আরও ছয় জন) নূহ আছেন। ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর মতো ইবরাহীম আছেন এবং ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এর মতো ঈসা রয়েছেন’।[1]

তাহক্বীক্ব : হাদীছটি ছহীহ নয়। ইমাম বায়হাক্বী বর্ণনা করে নিজেই একে ‘শায’ বলেছেন।[2] আর শায হাদীছ বাতিল হাদীছ বলে গণ্য হয়। হাদীছটিকে যে সকল ইমাম ত্রুটিযুক্ত বলেছেন-

(১) যাকারিয়া ইবনু মুহাম্মাদ আনছারী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, لم يثبت ‘হাদীছটি প্রমাণিত নয়’।[3]

(২) মোল্লা আলী কারী (রাহিমাহুল্লাহ) একে জাল হাদীছের গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।[4]

(৩) আহমাদ আমিরী (রাহিমাহুল্লাহ) একে ‘হাদীছ নয়’ বলেছেন।[5]

(৪) ইমাম হাকেম (রাহিমাহুল্লাহ) এ হাদীছটিকে ছহীহ বলায় ইমাম সুয়ূতী (রাহিমাহুল্লাহ) খুবই আশ্চর্য হয়েছেন। অর্থাৎ একে ছহীহ বলা তিনি গ্রহণ করেননি।[6]

(৫) তাহের ইবনু ছালেহ আল-জাযায়িরী (রাহিমাহুল্লাহ) একে ‘শায’-এর আলোচনায় উদাহরণ হিসেবে পেশ করেছেন।[7] অর্থাৎ এটি শায হাদীছ। আর শায হাদীছ দলিলের ক্ষেত্রে বাতিল হয়ে থাকে।

(৬) আল্লামা আব্দুর রহমান ইবনু ইয়াহইয়া আল-মুআল্লিমী আল-ইয়ামানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ليس سنده صحيح ‘এ হাদীছটির সনদ ছহীহ নয়’।[8]

(৭) ইবনু কাছীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘অনেকে মনে করেন, সাত যমীন অর্থ সাতটি রাজ্য। এটা তাদের মনগড়া কথা, যা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য এবং কুরআন-হাদীছ পরিপন্থী’।[9]

অর্থাৎ, সাতটি যমীনের নিচে সাতটি রাজ্য আছে, সেখানে মানুষেরা বসবাস করে, এমনটা বলা কুরআন-হাদীছের বিরোধী।

যে সকল রাবীর কারণে হাদীছটি যঈফ হয়েছে :

রাবী-১ : শারীক আল-কাযী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মাঝে আপত্তিকর বিষয় রয়েছে। যেমন—

(১) ইবনু হাজার (রাহিমাহুল্লাহ), আব্দুল হক্ব ‘আল-আহকাম’ গ্রন্থে তাকে তাদলীসের দিকে সম্বন্ধিত করেছেন। তার পূর্বে দারাকুত্বনী (রাহিমাহুল্লাহ) তাকে মুদাল্লিস হিসেবে উল্লেখ করেছেন।[10] ইবনু হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) নিজেও তাকে মুদাল্লিস রাবীদের গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তবে তিনি তাকে ‘তাদলীস হতে মুক্ত’ বলেছেন। এর ব্যাখ্যায় শায়েখ যুবায়ের আলী যাঈ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, সম্ভবত তিনি ‘তাদলীসুস তাসবিয়া’ হতে মুক্ত ছিলেন।[11]

হাফেয ইবনু হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) অন্যত্র বলেছেন,

شريك ابن عبد الله النخعي الكوفي القاضي بواسط ثم الكوفة أبو عبد الله صدوق يخطىء كثيرا تغير حفظه منذ ولي القضاء بالكوفة وكان عادلا فاضلا عابدا شديدا على أهل البدع من الثامنة

‘শারীক ইবনু আব্দুল্লাহ আন-নাখাঈ আল-কূফী ওয়াসিত্বেরও পরে কূফার কাযী ছিলেন। তিনি সত্যবাদী ছিলেন; অত্যন্ত ভুল করতেন। কূফার কাযীর পদে নিযুক্ত হওয়ার পরে তার স্মৃতি পরিবর্তন হয়ে গিয়েছিল। তিনি ন্যায়পরায়ণ, মর্যাদাবান, ইবাদতগুযার, বিদআতীদের বিরুদ্ধে কঠোর ছিলেন। তিনি নবম স্তরভুক্ত’।[12]

(২) হাফেয যাইলাঈ (রাহিমাহুল্লাহ),[13] ইবনুল ইরাকী (রাহিমাহুল্লাহ),[14] বুরহানুদ্দী হালাবী (রাহিমাহুল্লাহ),[15] জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রাহিমাহুল্লাহ)[16] তাকে মুদাল্লিস রাবী হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

(৩) ইবনে হাযম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, وَهُوَ مُدَلِّسٌ يُدَلِّسُ الْمُنْكَرَاتِ عَنْ الضُّعَفَاءِ إلَى الثِّقَاتِ ‘তিনি মুদাল্লিস রাবী। তিনি যঈফ রাবীদের হতে ছিক্বাহ রাবীদের দিকে সম্বন্ধিত করে মুনকার বর্ণনাসমূহে তাদলীস করতেন’।[17]

(৪) ইবনুল কাত্তান আল-ফাসী (রাহিমাহুল্লাহ) তাকে মুদাল্লিস বলেছেন।[18] তিনি বলেন, وَشريك مَعَ ذَلِك مَشْهُور بالتدليس ‘এতদসত্ত্বেও শারীক তাদলীসের কারণে প্রসিদ্ধ’।[19] 

(৫) ইবনু আব্দুল হাদী হাম্বলী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, وَشريك كثير الْغَلَط وَالوهم ‘শারীক অত্যধিক ভুল করতেন এবং অতিমাত্রায় ভ্রমে পতিত হতেন’।[20]

(৬) ইবনু রজব (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, شريك، وليس بالقوي ‘শারীক শক্তিশালী রাবী নন’।[21]

(৭) নাছিরুদ্দীন আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘শারীক অত্যন্ত দুর্বল স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন’।[22]

উপরিউক্ত আলোচনা দ্বারা প্রতীয়মান হলো যে, শারীক একজন মুদাল্লিস রাবী। এ ছাড়াও তিনি অন্যান্য কারণেও সমালোচিত। সুতরাং তার একক বর্ণনা যঈফ হয়ে থাকে। 

রাবী-২ : আতা ইবনুস সায়েব (রাহিমাহুল্লাহ) যদিও ছিক্বাহ রাবী, কিন্তু শেষ বয়সে তার মস্তিষ্ক বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। হাফেয যাইলাঈ (রাহিমাহুল্লাহ) তাকে মস্তিষ্ক বিকৃত রাবীদের গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।[23] নাছিরুদ্দীন আলবানী বলেন, عطاء بن السائب اختلط آخر عمره ‘আতা ইবনু সায়েব শেষ বয়সে মস্তিষ্ক বিকৃতির শিকার হয়েছিলেন’।[24] 

উপসংহার :

উপরিউক্ত আলোচনা দ্বারা প্রতীয়মান হলো যে, উক্ত হাদীছটি অত্যন্ত যঈফ। কেননা এখানে একাধিক রাবীর একাধিক ত্রুটি রয়েছে। যদি ছহীহ হতো, তাহলেও এটা ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) নিজের পক্ষ হতে ব্যাখ্যা করেছেন বলে মেনে নিতে হবে। কেননা তিনি এটা কুরআন-হাদীছ তথা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মুখে শুনে বলেননি; বরং নিজস্ব ইজতিহাদ দ্বারা বলেছেন, যা বাতিল।[25] ছাহাবীদের ইজতিহাদ অবশ্যই উঁচু মর্যাদা রাখে। কিন্তু যেহেতু এটি ছহীহ নয় এবং ইজতিহাদ দ্বারা বলাও সম্ভব নয়, সেহেতু এই বাতিল হাদীছের ভিত্তিতে সাতটি পৃথিবীতে সাত জন করে নবী-রাসূল রয়েছেন তথা মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)ও সাত জন রয়েছেন বলে দাবী করা হাস্যকর ও অবাস্তব। মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সাত জন মানলে আবূ জেহেল, আবূ লাহাবকেও সাত জন মানতে হবে; কা‘বা ঘরকেও সাতটি মানতে হবে, যা কোনো বিবেকবান মুসলিম কখনই গ্রহণ করতে সক্ষম হবেন না। উল্লেখ্য, এই হাদীছের কোথাও মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নাম-নিশানাও নেই।


* সৈয়দপুর, নীলফামারী।

[1]. আল-মুসতাদরাক, হা/৩৮২২; বায়হাক্বী, আল-আসমা ওয়াছ ছিফাত, হা/৮৩১।

[2]. প্রগুক্ত, হা/৮৩২।

[3]. আসনাল মাতালিব, হা/৪২৮।

[4]. আল-আসরারুল মারফূআ ফিল আখবার আল-মাওযূআ, হা/৩৮।

[5]. আল-জাদ্দুল হাসীস হুয়া মা লায়সা বি হাদীছ, হা/২৪।

[6]. তাদরীবুর রাবী, ১/২৬৮।

[7]. তাওযীহুন নাযার ইলা উছূলিল আছার, ১/৫১২।

[8]. আল-আনওয়ারুল কাশিফা, ১/১১৭।

[9]. ইবনু কাসীর (ইফাবা), ১১/১৭৩।

[10]. তাবাকাতুল মুদাল্লিসীন,  রাবী নং ৫৬।

[11]. আল-ফাতহুল মুবীন ফী তাহক্বীক্ব তাবাকাতিল মুদাল্লিসীন, রাবী নং ৫৬-এর আলোচনা  দ্র.।

[12]. আত-তাক্বরীব, রাবী নং ২৭৮৭।

[13]. জামেঊত তাহছীল, রাবী নং ২৩।

[14]. আল-মুদাল্লিসীন, রাবী নং ২৮।

[15]. আত-তাবঈন  লি আসমায়িল মুদাল্লিসীন, রাবী নং ৩৩।

[16]. আসমাউল মুদাল্লিসীন, রাবী নং ২৪।

[17]. আল-মুহাল্লা, ৭/১১৮, ১০/১৬১।

[18]. বায়ানুল ওয়াহমি ওয়াল ঈহাম,  হা/১৩১৩।

[19]. বায়ানুল ওয়াহমি  ওয়াল ঈহাম, হা/১৩১৪।

[20]. আল-মুহাররার ফিল হাদীছ, হা/২৪৭।

[21]. ফাতহুল বারী, ৭/২১৫।

[22]. আছলু ছিফাত, ২/৪৪৫।

[23]. আল-মুখতালিতীন, রাবী নং ৩৩; আল-মুনতাখাব মিন ই‘লাল আবূ বকর খাল্লাল, হা/৫৮।

[24]. আছলু ছিফাত, ১/২৭৪।

[25]. আসনাল মাতালিব, হা/৪২৮।