আহলেহাদীছদের উপর মিথ্যা অপবাদ ও তার জবাব
-মূল (উর্দূ) : আবু যায়েদ যামীর
অনুবাদ : আখতারুজ্জান বিন মতিউর রহমান*


(পর্ব-৩)

ভুল ধারণা-৩ : আহলেহাদীছগণ ছাহাবীগণকে অমান্য করে এবং তাদের মানহানি করে :

আহলেহাদীছদের প্রতি তৃতীয় ভুল ধারণা হলো, আহলেহাদীছগণ ছাহাবীগণকে মানে না। তারা ছাহাবীদের কথা অস্বীকার করে এবং তারা তাঁদেরকে বিভিন্নভাবে অপমান করে থাকে।

বাস্তবতা হচ্ছে, আহলেহাদীছদের নিকট ছহাবীগণ আক্বীদা এবং আমল উভয় ক্ষেত্রে আদর্শ ও দলীল।

১. আহলেহাদীছদের নিকট সৎপথ প্রাপ্ত আহলে হক্ব তারাই, যারা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং ছাহাবীদের পথে চলে : আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,

وَتَفْتَرِقُ أُمَّتِي عَلَى ثَلَاثٍ وَسَبْعِينَ مِلَّةً، كُلُّهُمْ فِي النَّارِ إِلَّا مِلَّةً وَاحِدَةً ” قَالُوا: مَنْ هِيَ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: مَا أَنَا عَلَيْهِ وَأَصْحَابِي.

‘আমার উম্মত ৭৩ দলে বিভক্ত হবে। একটি দল ব্যতীত সকল দল জাহান্নামে যাবে’। ছাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! সেটি কোন দল? নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)উত্তর দিলেন, ‘যে দলটি আমি এবং আমার ছাহাবীগণের আদর্শে অবিচল থাকবে’।[1]

আহলেহাদীছদের মতে নবী ও ছাহাবীগণ (আলাইহিস সালাম)-এর যুগের পরবর্তী মতানৈক্যের ব্যাপারে সময়ের সঠিক সমাধান এবং সত্যপন্থিদের পরিচয় লাভের মানদণ্ড হলো ছাহাবীগণ। যে ব্যক্তি নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাহ এবং মানহাজের অনুসারী, তারাই মূলত আহলেহাদীছদের নিকটে সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। যে সকল ওলামায়ে কেরাম কুরআন এবং সুন্নাহর মূল বক্তব্যকে নিজের ইচ্ছামতো ব্যাখ্যা প্রদান করে দলীল হিসাবে সাব্যস্ত করে মুসলিম উম্মাহর মাঝে নানা ধরনের বিদআত, অপসংস্কৃতি তৈরি করে, তাদের বক্তব্যকে প্রতিবাদ করার ক্ষেত্রেও আহলেহাদীছগণ ছাহাবীদের পদ্ধতি এবং মূলনীতিকে দলীল হিসাবে উপস্থাপন করেন। এ সকল দলীল বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও শুধু জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে এক শ্রেণির মানুষ সর্বদা আহলেহাদীছদের প্রতি মিথ্যা অভিযোগ ও অপবাদ দিয়ে থাকে। কিন্তু দলীলবিহীন মিথ্যা অপবাদ নিজের গোঁড়ামির পক্ষেই দলীল হিসাবে যথেষ্ট।

২. ছাহাবীগণের ব্যাপারে হানিকর বক্তব্য দানকারী নবী (আলাইহিস সালাম)-এর অভিশাপপ্রাপ্ত : আহলেহাদীছদের নিকটে ছাহাবীগণকে গাল-মন্দকারী, তাদের মর্যাদাহানিকারী, তাদের উপর থেকে উম্মতের নির্ভরতা হননকারী আল্লাহর অভিশাপের অধিকারী। কেননা আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এমন ব্যক্তিকে অভিশপ্ত হিসাবে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহর নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,

مَنْ سَبَّ أَصْحَابِي فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ

‘যারা আমার ছাহাবীগণকে গালিগালাজ করে, তার উপর আল্লাহর, ফেরেশতাদের এবং সকল মানুষের লা‘নত’।[2]

৩. ছাহাবীগণ নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বিপরীতে খুলাফায়ে রাশেদীনের বক্তব্যকে প্রত্যাখ্যান করতেন : সকল ছাহাবীর মর্যাদার স্থান এবং সম্মান স্বীকৃত। কিন্তু বড় হতে বড় ব্যক্তিও দলীলের ঊর্ধ্বে নয়। দলীলের প্রাধান্য সর্বদা ব্যক্তির উপরে হয়ে থাকে।

ছাহাবীগণের নিকট খুলাফায়ে রাশেদীন সর্বদা সম্মানের অধিকারী ছিলেন। তারা তাদের আদেশ ও বিচার-ফয়সালা মান্য করতেন। কিন্তু ছাহাবীগণ নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বক্তব্যের বিপরীতে বড় হতে বড় ব্যক্তিত্বের কথা গ্রহণ করতে অস্বীকার করতেন। তারা আকাবিরদের (বড়দের) অসম্মান করতেন না; কিন্তু তারা তাদের সম্মানের দোহায় দিয়ে তাদের বক্তব্যকে কুরআন ও সুন্নাহর উপর প্রাধান্য দান করতেন না।

উক্ত দলীলের উপর এক চমৎকার বর্ণনা আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর একটি বিচার-ফয়সালা এবং তার বিচার-ফয়সালার উপর আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর বক্তব্য হতে সুস্পষ্ট হয়ে যায়। ইকরিমা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

أُتِىَ عَلِىٌّ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ بِزَنَادِقَةٍ فَأَحْرَقَهُمْ فَبَلَغَ ذَلِكَ ابْنَ عَبَّاسٍ فَقَالَ لَوْ كُنْتُ أَنَا لَمْ أُحْرِقْهُمْ لِنَهْىِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ وَلَقَتَلْتُهُمْ لِقَوْلِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ مَنْ بَدَّلَ دِينَهُ فَاقْتُلُوهُ.

‘একদা আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর নিকট কিছু ইসলাম ত্যাগকারী মুরতাদকে উপস্থিত করা হলো। আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তাদের সকলকে আগুন দ্বারা জ্বালিয়ে দিলেন। পরবর্তীতে যখন এই সংবাদ ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর নিকট পৌঁছল, তখন তিনি বললেন,  আমি যদি (আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর স্থানে) হতাম, আমি তাদের আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়ার আদেশ করতাম না। কেননা আল্লাহর নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এইভাবে আগুনে পুড়াতে নিষেধ করেছেন। বরং আমি তাদেরকে আগুনে জ্বালানোর পরিবর্তে হত্যা করার আদেশ করতাম। কেননা আল্লাহর নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিজের দ্বীন পরিবর্তন করল, তাকে হত্যা করো’।[3] ভিন্ন এক বর্ণনায় রয়েছে, فَبَلَغَ ذَلِكَ عَلِيًّا فَقَالَ صَدَقَ ابْنُ عَبَّاسٍ  ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর এই বক্তব্য আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর কাছে পৌঁছলে তিনি বলেন, ‘ইবনু আব্বাস সত্য বলেছেন’।[4]

উক্ত ঘটনার মধ্যে এক দিকে যেমন ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর সত্য বলার সাহসিকতার প্রমাণ রয়েছে, অপরদিকে আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর সত্যকে অকপটে স্বীকার করা বা মেনে নেওয়ার উদাহরণ রয়েছে। ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর ফয়সালার বিপরীতে নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর হাদীছ বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন, যদি আমি হতাম, তাহলে এইরূপ বিচার করতাম না। ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) একথা বলেননি যে, আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) যা করেছেন, সে ব্যাপারে তার নিকট কোনো না কোনো দলীল তো আছেই। বরং যে সত্য তার নিকট ছিল, তার আলোকেই তিনি আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর ফয়সালায় নিজের মত প্রকাশ করেছেন। আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)ও তার এই কর্মপদ্ধতিকে ভুল, পথভ্রষ্টতা বা বেয়াদবী হিসাবে উল্লেখ করেননি। বরং পরিষ্কার ভাষায় তিনি ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর কথাকে সাদরে সত্যায়ন করেছেন।

৪. ছাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বিপরীতে অন্য কারও বক্তব্যকে দলীল হিসাবে গ্রহণ করতেন না : এক্ষেত্রে আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর মানহাজও একই ছিল। তিনিও ওই একই মূলনীতির অনুসারী ছিলেন। যত বড়ই ব্যক্তিত্ব হোক না কেন, তার কথা ও আমল নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আমলের বিপরীত হলে অগ্রহণযোগ্য বা অনুসরণযোগ্য নয়। তার একটি উদাহরণ ছহীহ বুখারীর একটি বর্ণনায় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ হয়েছে। মারওয়ান ইবনে হাকাম (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন,

شَهِدْتُ عُثْمَانَ وَعَلِيًّا رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا وَعُثْمَانُ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ يَنْهَى عَنِ الْمُتْعَةِ وَأَنْ يُجْمَعَ بَيْنَهُمَا فَلَمَّا رَأَى عَلِىٌّ ، أَهَلَّ بِهِمَا لَبَّيْكَ بِعُمْرَةٍ وَحَجَّةٍ قَالَ مَا كُنْتُ لأَدَعَ سُنَّةَ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ لِقَوْلِ أَحَدٍ .

আমি উছমান ও আলী ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-কে (উসফান নামক স্থানে) দেখেছি, ‘উছমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তামাত্তু‘ হজ্জ ও উমরা একত্রে আদায় করতে নিষেধ করতেন। আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) এ অবস্থা দেখে হজ্জ ও উমরার ইহরাম একত্রে বেঁধে তালবিয়া পাঠ করেন- لَبَّيْكَ بِعُمْرَةٍ وَحَجَّةٍ (হে আল্লাহ! আমি উমরা ও হজ্জের ইহরাম বেঁধে হাযির হলাম) এবং বললেন, শুধু কারও কথায় আমি নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাত বর্জন করতে পারব না।[5]

আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাহর বিপরীতে উছমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর ফয়সালাকে গ্রহণ করেননি। উল্লিখিত দুটি বর্ণনায় ইবনে আব্বাস ও আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহুম)-এর আমল ও অনুসৃত পদ্ধতি দ্বারা একথা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, স্বয়ং ছাহাবীগণ খুলাফায়ে রাশেদীনের নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বক্তব্যের সাথে সাংঘর্ষিক যে কোনো বক্তব্য বর্জন করতেন।

আহলেহাদীছদের মূলনীতি এটাই যে, সাধারণভাবে ছাহাবীগণের অনুসৃত মত দলীল, তবে তাদের কথার মাঝে যদি কখনো মতের ভিন্নতা দেখা যায়, তাহলে সে সময় ওই ছাহাবীর বক্তব্য প্রাধান্য পাবে, যার পক্ষে দলীল রয়েছে। আর কুরআন ও সুন্নাহর বিপরীতে কারও কথাই গ্রহণ করা যাবে না।

উল্লিখিত দুটি ঘটনায় একথাও স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, কখনো কখনো বড় বড় ছাহাবী পর্যন্তও নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কোনো বাণী পৌঁছত না, যার কারণে তাদের বিপরীতে বিভিন্ন মতামত দেখা যেত। ফলে কল্যাণকামী হয়ে অন্য ছাহাবী তাকে সতর্ক করে দিতেন। 

(চলবে)


* শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, পবা, রাজশাহী।

[1]. তিরমিযী, হা/২৬৪১।

  [2]. ছহীহুল জামে‘, হা/৬২৮৫।

[3]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৯২২।

[4]. সুনানে তিরমিযী, হা/১৪৫৮।

[5]. ছহীহ বুখারী, হা/১৫৬৩।