আহলেহাদীছদের উপর মিথ্যা অপবাদ ও তার জবাব
-মূল (উর্দূ) : আবু যায়েদ যামীর
অনুবাদ : আখতারুজ্জামান বিন মতিউর রহমান*


ভুল ধারণা-৪ : আহলেহাদীছগণ আল্লাহর ওলীদের অস্বীকার করে :

অনেক মানুষ ধারণা করে যে, আহলেহাদীছগণ ওলীউল্লাহ (আল্লাহর প্রিয় বান্দা)-কে অস্বীকার করেন। কিছু নামসর্বস্ব বক্তা এই কথাকে বিভিন্ন নতুন নতুন মিথ্যা কথা দ্বারা সাজিয়ে আহলেহাদীছদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে ক্ষেপিয়ে তোলার অপচেষ্টায় লিপ্ত। বাস্তবতা হচ্ছে, আহলেহাদীছগণ ‘আল্লাহর বন্ধুত্ব’ বিষয়টিকে বিশ্বাস করেন। এমনকি কিয়ামত পর্যন্ত কিছু মানুষ আল্লাহর ওলী থাকবেন, তাও বিশ্বাস করেন।

১. আহলেহাদীছদের মতে আল্লাহর ওলী কারা? : এই মর্মে মহান আল্লাহ বলেন,أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ ‘মনে রেখো! যারা আল্লাহর বন্ধু, (পরকালে) তাদের না কোনো ভয়-ভীতি আছে আর না তারা বিষণ্ন হবে। তারা হচ্ছে সেই সকল মানুষ, যারা ঈমান এনেছে এবং ভয় তথা সাবধানতা অবলম্বন করতে থাকে’ (ইউনুস, ১০/৬২)

কুরআনে কারীমের অনেক আয়াতে এই বক্তব্য সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, অনেক মানুষকে ঈমানের পূর্ণতা এবং তাক্বওয়ার উপর ভিত্তি করে আল্লাহ তাআলা নিজের পক্ষ হতে বিশেষ ভালোবাসার আসন দান করবেন। তাদেরকে তাঁর বিশেষ এবং নিকটবর্তী বান্দা হিসাবে স্বীকৃতি দান করবেন। এই বক্তব্যকে অস্বীকার করা মূলত সরাসরি কুরআনে কারীম এবং ছহীহ হাদীছকে অস্বীকার করার নামান্তর। আহলেহাদীছগণ এই সকল দলীলের উপর পূর্ণ বিশ্বাস রেখে আল্লাহর ওলীদের মর্যাদাকে স্বীকৃতি দান করেন।

কিন্তু উল্লিখিত কুরআনের আয়াতে যেখানে আল্লাহর ওলীদের মর্যাদা এবং তাদের জন্য আল্লাহর প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানেই তাদের গুণাগুণের কথাও বর্ণনা করা হয়েছে, যার উপর ভিত্তি করে আল্লাহর ওলীদের এই মর্যাদা লাভ হয়েছে। সেই গুণাগুণগুলো কী? আর তা হচ্ছে দুইটি জিনিস- ১. পূর্ণ ঈমান এবং ২. পূর্ণ তাক্বওয়া বা আল্লাহভীতি। এই ক্ষেত্রে আহলেহাদীছদের আক্বীদা হচ্ছে, জীবনে পরিপূর্ণ ও মযবূত ঈমান এবং পাপ হতে সাবধানতা ব্যতীত মানুষ আল্লাহর প্রকৃত ওলী (বন্ধু) হতে পারে না। ঐ ব্যক্তিই আল্লাহ তাআলার বন্ধু হওয়ার হক্বদার যার আক্বীদা-বিশ্বাস ও জীবন তাক্বওয়া দ্বারা সুসজ্জিত।

কিন্তু বড় আফসোসের বিষয় হচ্ছে, অনেক মানুষ আল্লাহ তাআলার বলা এই বাণীর প্রতি দৃষ্টি না দিয়ে নিজের খেয়াল-খুশিমতো যাকে ইচ্ছা তাকে আল্লাহর ওলী বানিয়ে বসে। তাদের জীবন ইমামুল আম্বিয়া মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর শেখানো পদ্ধতির যতই বিপরীত হোক না কেন, তাদের সাথে ঈমান ও আমলের দূরতম সম্পর্ক না থাকলেও; তারা তাদের দ্বারা আশ্চর্য ও অলৌকিক ঘটনা সংঘটিত হওয়াকে আল্লাহর ওলী হওয়ার মূল ভিত্তি বানিয়ে নেয়। এমনকি এর উপর ভিত্তি করে তারা এমন সব ব্যক্তিকে আল্লাহর ওলী বানিয়ে নেয়, যারা ছালাত-ছিয়াম বাদ দিয়ে সর্বদা নেশাগ্রস্ত হয়ে উল্টাপাল্টা কথা বলতে থাকে। মূলত যখন জ্ঞানচক্ষুর উপর অতিরিক্ত মিথ্যা ভালোবাসার চশমা লাগানো হয়, তখন এমনিতেই অনেক অলৌকিক ভ্রান্ত বিশ্বাস মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেই।

২. আহলেহাদীছগণ অলৌকিকতাকে আল্লাহর ওলী হওয়ার দলীল হিসাবে বিশ্বাস করেন না : কিছু নিয়ম বহির্ভূত আশ্চর্য ঘটনা বা অলৌকিক জিনিস কখনো কারও আল্লাহর ওলী হওয়ার দলীল হতে পারে না। বরং আল্লাহর ওলী হওয়ার মূল বিষয় হলো কুরআন এবং সুন্নাহর পরিপূর্ণ অনুসরণ। আসুন! এই বিষয়ে ইমাম শাফেঈ (রাহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত মূলনীতি কী, তা জানার চেষ্টা করি।

ইমাম শাফেঈ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন,

إِذَا رَأَيْتُمُ الرَّجُلَ يَمْشِي عَلَى الْمَاءِ وَيَطِيرُ فِي الْهَوَاءِ فَلَا تَغْتَرُّوا بِهِ حَتَّى تَعْرِضُوا أَمْرَهُ عَلى الْكِتَابِ وَالسُّنَّةِ

‘যখন তোমরা কাউকে দেখ যে, সে পানির উপর চলছে বা বাতাসের উপর উড়ছে, তখন তার এই ঘটনার কারণে সামান্য পরিমাণও ধোঁকা খাবে না, যতক্ষণ না তার এই ঘটনাকে কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা বিচার করো’।[1] অর্থাৎ কেউ যতই কেরামতি দেখাক না কেন, তা দ্বারা ধোঁকা খাওয়া যাবে না।

উক্ত বক্তব্য দ্বারা জানা গেল যে, শুধু কেরামতির উপর ভিত্তি করে কাউকে আল্লাহর প্রিয় বান্দা বা আল্লাহর ওলীর মর্যাদা দেওয়া আহলে ইলম তথা জ্ঞানীদের পদ্ধতি নয়। বরং তাদের নিকট প্রকৃত আল্লাহর ওলী সেই, যার আক্বীদা-আমল এবং ভিতর-বাহির কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণ দ্বারা পরিচালিত। এই কথাই কিবারে তাবে‘ তথা বড় তাবেঈনের একজন ২য় শতাব্দীর প্রসিদ্ধ আলেম খলীল ইবনু আহমাদ আল-ফারাহিদী বলেছেন,إِنْ لَمْ يَكُنْ أَهْلُ الْقُرْآنِ وَالْحَدِيْثِ أَوْلِيَاءَ اللهِ ، فَلَيْسَ لِلّٰهِ فِيْ الْأَرْضِ وَلِيٌّ ‘কুরআন ও হাদীছের অনুসারীগণ যদি আল্লাহর ওলী না হন, তাহলে জমিনের উপর আর কেউ আল্লাহর ওলী নেই’।[2]

৩. আহলেহাদীছদের মতে লাভ-ক্ষতির মালিক একমাত্র আল্লাহ : এখানে একটি কথা লক্ষণীয় যে, আল্লাহর ওলীদের মান্য করা আর তাদের কবরে গিয়ে কোনো কিছু চাওয়া, দুটির মাঝে আসমান-জমিন সমপরিমাণ তফাত রয়েছে। প্রথম বিষয়টি তথা ওলীদের মান্য করা সরাসরি ঈমানের দাবি আর দ্বিতীয়টি তথা কবরে গিয়ে চাওয়া সরাসরি তাওহীদ পরিপন্থি।

আহলেহাদীছদের আক্বীদা-বিশ্বাস হচ্ছে, বিশ্বে একমাত্র আল্লাহর একচ্ছত্র মালিকানা চলে। মানুষের উপর শান্তি-স্বস্তি, দুঃখ-কষ্ট যা কিছু আসে, সব আল্লাহর হুকুমেই এসে থাকে। আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত না কেউ কাউকে কিছু দিতে সক্ষম, না কারও কাছ থেকে কিছু ছিনিয়ে নিতে সক্ষম। যেহেতু পুরো বিশ্বে একমাত্র আল্লাহর ইচ্ছায় সবকিছু হয়ে থাকে, তাই একজন মুসলিমের জন্য উচিত, সকল ক্ষেত্রে একমাত্র আল্লাহর নিকট সাহায্য-সহযোগিতা চাওয়া। মহান আল্লাহ বলেন,وَإِنْ يَمْسَسْكَ اللَّهُ بِضُرٍّ فَلَا كَاشِفَ لَهُ إِلَّا هُوَ وَإِنْ يُرِدْكَ بِخَيْرٍ فَلَا رَادَّ لِفَضْلِهِ يُصِيبُ بِهِ مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَهُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ ‘যদি আল্লাহ তোমাকে কোনো কষ্টে নিপতিত করেন, তবে তিনি ছাড়া কেউ তো মোচনকারী নেই। আর যদি তিনি তোমার প্রতি কোনো কল্যাণ চান, তবে তাঁর অনুগ্রহের কোনো অপসরণকারী নেই; তিনি স্বীয় অনুগ্রহ বান্দাদের মধ্য হতে যাকে চান, দান করেন। আর তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, অতিশয় দয়ালু’ (ইউনুস, ১০/১০৭)

৪. আহলেহাদীছদের মতে কবরপূজা এবং কবরকে সেজদার স্থান বানানো হারাম : আহলেহাদীছদের মতে আল্লাহর ওলী এমনকি কোনো মুসলিমের কবরকে অসম্মান করা গুনাহের কাজ। কিন্তু আল্লাহর ওলীদের কবরের নিকট নিজের ইচ্ছা ও উদ্দেশ্য পূরণের জন্য প্রার্থনা করা, তাঁদের কবরের চতুর্পাশে ত্বাওয়াফ করা, তাদের কবরে সেজদা করা, তারা আমাদের সকল সমস্যার সমাধান দিতে পারে এমন আক্বীদা পোষণ করা, কবরবাসীর সন্তান ও রোগমুক্তি দান, এমনকি তাদের কবরের মাটি ও মাটির উপরে রাখা পাত্রে সফলতা এবং মুক্তি প্রদানের ক্ষমতা এ সকল আক্বীদা ও আমল মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর শিক্ষা এবং তাঁর ছাহাবীগণের আমলের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। এসব বিশ্বাস সেই তাওহীদ পরিপন্থি, যেই তাওহীদ প্রতিষ্ঠার জন্য রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে পাঠানো হয়েছিল।

আহলেহাদীছগণ আল্লাহর ওলীদের সম্মান করেন, তবে তাদেরকে আল্লাহর তওহীদ- রুবুবিয়্যাত ও উলূহিয়্যাতের মধ্যে শরীক করেন না। অর্থাৎ আহলেহাদীছগণ তাদের কবরের যথাযথ সম্মান প্রদান করেন, কিন্তু তাদের কবরকে রব এবং মা‘বূদ (প্রতিপালক, উপাস্য) বা রবের সহায়ক হিসাবে স্বীকৃতি দেন না।

কবরকে উপাসনালয় হিসাবে গ্রহণ করা ইয়াহূদী-খ্রিষ্টানদের রীতি। ইয়াহূদী-খ্রিষ্টানদের রীতি-নীতির অনুসরণ ইসলামে সাধারণভাবেই নিষিদ্ধ। কিন্তু ইসলাম ধর্মে কবরপূজা, কবরকে সেজদার স্থান বানানোর বিষয়টি পরিষ্কারভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আল্লাহর নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,أَلاَ وَإِنَّ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ كَانُوا يَتَّخِذُونَ قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ وَصَالِحِيهِمْ مَسَاجِدَ أَلاَ فَلاَ تَتَّخِذُوا الْقُبُورَ مَسَاجِدَ إِنِّى أَنْهَاكُمْ عَنْ ذَلِكَ ‘সাবধান থেকো! তোমাদের পূর্বের যুগের লোকেরা তাদের নবী ও নেককার লোকদের কবরসমূহকে মসজিদ (সেজদার স্থান) হিসাবে গ্রহণ করত। সাবধান! তোমরা কবরসমূহকে সেজদার স্থান বানাবে না। আমি এরূপ করতে তোমাদেরকে নিষেধ করে যাচ্ছি’।[3]

ইসলাম ধর্মে মসজিদ ঐ স্থানকে বলা হয়, যেখানে আল্লাহকে সেজদা করা হয়। সুতরাং যখন কবরকে মসজিদ বানানো বৈধ নয়, তাহলে ঐ কবরগুলোকে কী করে সেজদা করা যায়? সেজদা দেওয়া একটি ইবাদত আর আল্লাহ তাআলা নিষেধ করে দিয়েছেন যে, যেন আমরা আল্লাহ ব্যতীত কাউকে সেজদা না করি। মহান আল্লাহ বলেন,

وَمِنْ آيَاتِهِ اللَّيْلُ وَالنَّهَارُ وَالشَّمْسُ وَالْقَمَرُ لَا تَسْجُدُوا لِلشَّمْسِ وَلَا لِلْقَمَرِ وَاسْجُدُوا لِلَّهِ الَّذِي خَلَقَهُنَّ إِنْ كُنْتُمْ إِيَّاهُ تَعْبُدُونَ

‘তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে- দিবস, রজনী, সূর্য ও চন্দ্র। তোমরা সূর্যকে সেজদা করো না, চন্দ্রকেও না; আল্লাহকে সেজদা করো, যিনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন, যদি তোমরা (নিষ্ঠার সাথে) শুধুমাত্র তাঁরই ইবাদত করো’ (ফুসসিলাত, ৪১/৩৭)

তওহীদের স্বীকৃতি দেওয়ার পর শিরকের পথ অবলম্বন করা মুমিনের নিদর্শন নয়। এজন্যই মূলত আহলেহাদীছগণ আল্লাহর ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহর সাথে কোনো ব্যক্তিকে শরীক করেন না, সে ব্যক্তি যতই বড় হোক না কেন। আহলেহাদীছগণ নিজ প্রয়োজন পূরণের জন্য দাফনকৃত সৎ ব্যক্তিদেরকে আহ্বান করেন না; আহলেহাদীছদের নিকট এমন কাজ করা শিরক। কেননা দু‘আ একটি ইবাদত আর আল্লাহ ব্যতীত কারও নিকট দু‘আ করা তাকে ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহর সাথে শরীক করার নামান্তর।

৫. সরাসরি আল্লাহর ওলীগণ ঐ সকল ব্যক্তির দুশমন, যারা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও নিকট প্রার্থনা করে : মহান আল্লাহ বলেন,

وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنْ يَدْعُو مِنْ دُونِ اللَّهِ مَنْ لَا يَسْتَجِيبُ لَهُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَهُمْ عَنْ دُعَائِهِمْ غَافِلُونَ وَإِذَا حُشِرَ النَّاسُ كَانُوا لَهُمْ أَعْدَاءً وَكَانُوا بِعِبَادَتِهِمْ كَافِرِينَ

‘সে ব্যক্তি অপেক্ষা অধিক বিভ্রান্ত আর কে হতে পারে, যে আল্লাহর পরিবর্তে এমন কাউকে ডাকে, যারা কিয়ামত দিবস পর্যন্তও তার ডাকে সাড়া দিতে পারবে না? আর তারা তাদের ডাক সম্বন্ধে অবহিত নয়। যখন মানুষকে হাশরে একত্রিত করা হবে, তখন তারা তাদের শত্রু হবে এবং তাদের ইবাদত অস্বীকার করবে’ (আল-আহকাফ, ৪৬/৫-৬)

উক্ত আয়াতে প্রত্যেক ঐ সকল ব্যক্তিকে পথভ্রষ্ট হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যারা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও নিকট প্রার্থনা করে। আর আয়াতের শেষাংশে একথা প্রমাণিত হচ্ছে যে, আল্লাহ ব্যতীত কারও নিকট দু‘আ করা মূলত তার ইবাদত করার নামান্তর। এজন্যই আহলেহাদীছদের মতে আল্লাহ ব্যতীত কবরের নিকট বা কবরবাসীর নিকট নিজ প্রয়োজন তুলে ধরে প্রার্থনা করা শিরক। এ ধরনের আমল কুরআন-হাদীছের কোথাও নেই এবং ছাহাবীগণ হতেও প্রমাণিত নয়। বাস্তবেই যদি এমন কোনো আমল ইসলামে থাকত, তাহলে ছাহাবীগণ নবী কারীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কবরের পাশে গিয়ে দ্বীন-দুনিয়ার সমস্যার সমাধান ও সকল প্রয়োজন পূরণের জন্য প্রার্থনা করতেন।

৬. আহলেহাদীছগণ আল্লাহর ওলীদের ইবাদত করাকে আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছার অসীলা হিসাবে গ্রহণ করেন না : আহলেহাদীছদের আক্বীদা হলো, আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য আল্লাহর বান্দাদের মাধ্যম বা অসীলা বানিয়ে আল্লাহর ইবাদতে তাদের শরীক বানানো হারাম। সকল ইবাদত আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট। সুতরাং আল্লাহর ওলীদের অসীলা বানানো আর এর জন্য তাদের নামে মানত করে তাদের নামে প্রাণী যবেহ করা অথবা তাদের নৈকট্য লাভের জন্য প্রাণী যবেহ করা, তাদের কবর ত্বাওয়াফ করা, তাদের কবরের উপর সেজদা করা ইত্যাদি সকল কাজ হারাম। বরং এসব কাজ সরাসরি নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগের শিরক, যা তৎকালীন আরবের মুশরিকরা করত। এসব কাজ সরাসরি ঐ মুশরিকদের শিরকের ন্যায়, যা বাতিল ঘোষণা করার জন্য কুরআনের আয়াত নাযিল হয়েছিল। মহান আল্লাহ বলেন,

وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مِنْ دُونِهِ أَوْلِيَاءَ مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَى إِنَّ اللَّهَ يَحْكُمُ بَيْنَهُمْ فِي مَا هُمْ فِيهِ يَخْتَلِفُونَ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي مَنْ هُوَ كَاذِبٌ كَفَّارٌ

‘আর যারা আল্লাহ ব্যতীত অন্যকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে এবং বলে যে, আমরা তাদের ইবাদত এ জন্যই করি, যেন তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেয়। নিশ্চয় আল্লাহ তাদের মধ্যে তাদের পারস্পরিক বিরোধপূর্ণ বিষয়ের ফয়সালা করে দিবেন। নিশ্চয় আল্লাহ মিথ্যাবাদী অবিশ্বসীকে সৎপথে পরিচালিত করেন না (আয-যুমার, ৩৯/৩)। আরবের মুশরিকরা তাদের মূর্তির ইবাদত করত আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য। তাদের মূল উদ্দেশ্য আল্লাহকে পাওয়া ছিল, কিন্তু এর জন্য তারা যে পথ অবলম্বন করেছিল, তা ভুল ছিল। আল্লাহকে পেতে শয়তান তাদের জন্য এমন রাস্তা বের করে দিয়েছিল, যা তাদেরকে আল্লাহ হতে অনেক দূরে নিক্ষেপ করেছিল। যার ফলশ্রুতিতে তারা আল্লাহর উপর মিথ্যা রটানোর অপরাধে অপরাধী ও কাফের হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

আহলেহাদীছদের বিশ্বাস হলো, সফলতা লাভের জন্য শুধু উদ্দেশ্য ভালো হওয়াটা যথেষ্ট নয়, বরং উক্ত উদ্দেশ্যকে অর্জন করার জন্য উপকরণ হিসাবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আনীত বিধি-বিধান অনুযায়ী হওয়াটাও আবশ্যক।

(চলবে)


* শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, পবা, রাজশাহী।

[1]. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১৩/২১৭।

[2]. শারফু আসহাবিল হাদীছ, ১/৯৬।

[3]. ছহীহ মুসলিম, হা/১২১৬।