আহলেহাদীছদের উপর মিথ্যা অপবাদ ও তার জবাব


মূল (উর্দূ) : আবু যায়েদ যামীর
অনুবাদ : আখতারুজ্জামান বিন মতিউর রহমান*
(শেষ পর্ব)


ভুল ধারণা-১০ : আহলেহাদীছগণ মুসলিমদের কুফরীর (কাফের) ফতওয়া দেয় :

কাউকে কাফের বলা, তার ব্যাপারে কুফরীর ফতওয়া দেওয়াকে তাকফীর বলা হয়। তাকফীর একটি সূক্ষ্ম এবং বড় যিম্মাদারীর বিষয়। কখনো এমনটি করা জরুরী হয়ে যায়। কিন্তু এটি এত বড় জটিল বিষয় যে, এই ব্যাপারে ব্যক্তিগত স্বার্থ অথবা অসর্তকতা এবং মূর্খতার উপর ভিত্তি করে কৃত ফয়সালা তাকফীরকারীকে (অন্যকে কাফের স্বীকৃতিদানকারীকে) আল্লাহর নিকট অপরাধী করে দেয়।

১. আহলেহাদীছদের মতে তাহক্বীক্ব ব্যতীত কাউকে কুফরীর ফতওয়া দেওয়া হারাম : আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,

أَيُّمَا رَجُلٍ قَالَ لأَخِيهِ يَا كَافِرُ فَقَدْ بَاءَ بِهَا أَحَدُهُمَا

‘যে ব্যক্তি তার ভাইকে কাফের বলবে, তাদের দুজনের একজনের উপর তা বর্তাবে’।[1] ছহীহ মুসলিমের বর্ণনায় রয়েছে, إِنْ كَانَ كَمَا قَالَ وَإِلاَّ رَجَعَتْ عَلَيْهِ ‘যাকে কাফের বলা হয়েছে, যদি সে কাফের হয় তো হলোই, নতুবা কথাটি বক্তার উপরই ফিরে আসবে’।[2] ইবনু হিব্বানের বর্ণনায় রয়েছে,إَنْ كَانَ كَافِرًا وَإِلَّا كَفَرَ بِتَكْفِيْرِهِ  ‘যাকে কাফের বলা হয়েছে, সে যদি কাফের হয় তো হলোই, নতুবা সে এই কাফের বলার কারণে নিজেই কাফের হয়ে যাবে’।[3]

বুঝা গেল যে, বাস্তবেই যদি ওই ব্যক্তি কাফের হয়, তাকফীরকারী নিজ যিম্মাদারী থেকে মুক্তি পাবে, কিন্তু বিষয়টি যদি তার উল্টো হয়, তাহলে অন্যকে কাফের বলার মাধ্যমে নিজেই কাফের হয়ে যাবে।

কখনো কখনো অজ্ঞতাবসত একজন মানুষ এমন আমল করে বসে, যা মূলত কুফর বা শিরক, কিন্তু সে তা না জানার কারণে করে থাকে। সে কুফরী এবং শিরক করা বৈধ মনে করে না; বরং এই আমলটি কুফরী বা শিরক তা তার কিঞ্চিৎ পরিমাণও জানা নেই। এমন অবস্থায় আলেমের দায়িত্ব হলো, তাকে এই বিষয়ে অবগত করানো; তাকে কাফের ফতওয়া না দেওয়া। এর বর্ণনা নবী (ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-এর একটি ঘটনা দ্বারা প্রমাণিত হয়।

২. আমলের উপর বিধান কার্যকর করা এবং আমলকারীর উপর বিধান কার্যকর করা ভিন্ন ভিন্ন বিষয় : আবূ ওয়াক্বিদ আল-লায়ছী c বলেন,

خَرَجْنَا مَعَ رَسُوْلِ اللهِ إِلَى حُنَيْنٍ وَنَحْنُ حَدِيْثُوْ عَهْدٍ بِكُفْرٍ وَكَانُوْا أَسْلَمُوْا يَوْمِ الْفَتْحِ قَالَ فَمَرَرْنَا بِشَجَرَةٍ فَقُلْنَا يَا رَسُوْلَ اللهِ اجْعَلْ لَنَا ذَاتَ أَنْوَاطٍ كَمَا لَهُمْ ذَاتُ أَنْوَاطٍ وَكَانَ لِلْكُفَّارُ سِدْرَةٌ يَعْكُفُوْنَ حَوْلَهَا وَيُعَلِّقُوْنَ بِهَا أَسْلِحَتَهُمْ يَدْعُوْنَهَا ذَاتَ أَنْوَاطٍ فَلَمَّا قُلْنَا ذَلِكَ لِلنَّبِيِّ قَالَ اَللهُ أَكْبَرُ وَقُلْتُمْ وَالَّذِيْ نَفْسِيْ بِيَدِهِ كَمَا قَالَتْ بَنُوْ إِسْرَائِيْلَ لِمُوْسَى اجْعَلْ لَنَا إِلَهًا كَمَا لَهُمْ آلِهَةٌ قَالَ إِنَّكُمْ قَوْمٌ تَجْهَلُوْنَ لَتَرْكَبُنَّ سَنَنَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ.

‘রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-এর সাথে আমরা হুনাইনের উদ্দেশ্যে বের হলাম। তখন আমরা সবে মুসলিম হয়েছি। (বর্ণনাকারী বলেন) এই লোকগুলো মক্কা বিজয়ের দিন মুসলিম হয়েছিলেন। তারা বললেন, আমরা একটি গাছের পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! মুশরিকদের যেমন যাতু আনওয়াত আছে, আমাদের জন্যও একটি যাতু আনওয়াত নির্ধারণ করে দিন। যাতু আনওয়াত কাফেরদের একটি গাছ ছিল, যার আশপাশে তারা একত্রিত হতো এবং যুদ্ধে বিজয় লাভ করার উদ্দেশ্যে তারা তাদের তরবারীগুলো ঐ গাছে ঝুলিয়ে রাখত। আর এই গাছটিকে তারা যাতু আনওয়াত নামকরণ করেছিল। ছাহাবীগণ বলেন, এই কথা যখন নবী (ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-কে বললাম, তিনি বললেন, আল্লাহু আকবার! ঐ সত্তার কসম, যার হাতে আমার জীবন! তোমরা সেই কথাই বললে, যে কথা বানু ইসরাঈল মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে বলেছিল, ‘আমাদের জন্য একটা দেবতা গড়ে দিন, যেমন ওদের অনেক দেবতা রয়েছে!’ মূসা বলেছিলেন, ‘তোমরা মূর্খ জাতি।’ অবশ্যই তোমরা একটা একটা করে তোমাদের পূর্ববর্তী (জাতির) পথ অনুসরণ করবে।[4]

উক্ত ঘটনায় লক্ষ্য করার বিষয় হলো, আল্লাহর নবী (ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) ছাহাবীগণের যাতু আনওয়াত কামনা করাকে বানু ইসরাঈলের বাতিল উপাস্য কামনার সাথে তুলনা করেছেন। যেহেতু এই সকল মানুষ নতুন ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং তাদের অনেক বিষয় অজানা ছিল। এজন্যই মূলত রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) তাদের কাফের বলেননি। বরং তাদের আমলের উপর তাদেরকে সতর্ক করে বলেছেন যে, তাদের এই কাজ কতটা দণ্ডনীয় অপরাধ। সুতরাং অজ্ঞতাবসত কুফরী বাক্য বলে দিলে তাকে কাফের অ্যাখ্যা না দিয়ে তাকে সংশোধন করার চেষ্টা করতে হবে।

৩. আহলেহাদীছদের মতে ঐ ব্যক্তি অপরাধী, যে সত্য স্পষ্ট হওয়ার পরও তা অস্বীকার করে : কখনো কখনো গবেষণা বা বুঝের ভুলের কারণে জ্ঞানী মানুষদের থেকেও এমন কোনো কথা বা কর্ম সংঘটিত হয়ে যায়, যার উপর কুফরীর হুকুম সাব্যস্ত করা যায়। তথাপি তার উপর কুফরীর হুকুম দেওয়া যাবে না। বরং ভুলকারী হিসাবে উল্লেখ করা হবে। ইবনু তায়মিয়্যা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

وَأَمَّا التَّكْفِيْرُ فَالصَّوَابُ أَنَّهُ مَنِ اجْتَهَدَ مِنْ أُمَّةِ مُحَمَّدٍ وَقَصَدَ الْحَقَّ فَأَخْطَأَ لَمْ يُكَفَّرْ بَلْ يُغْفَرُ لَهُ خَطَؤُهُ وَمَنْ تَبَيَّنَ لَهُ مَا جَاءَ بِهِ الرَّسُوْلُ فَشَاقَّ الرَسُوْلَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدٰى وَاتَّبَعَ غَيْرَ سَبِيْلِ الْمُؤْمِنِيْنَ فَهُوَ كَافِرٌ وَمَنِ اتَّبَعَ هَوَاهُ وَقَصَرَ فِيْ طَلَبِ الْحَقِّ وَتَكَلَّمَ بِلَا عِلْمٌ فَهُوَ عَاصٍ مُذْنِبٌ.

‘তাকফীরের ব্যাপারে সঠিক কথা হলো, উম্মাতে মুহাম্মাদীর মধ্য হতে কোনো ব্যক্তি সঠিক বিষয় গবেষণা করতে গিয়ে যদি ভুল করে ফেলে, তাহলে তাকে এই ভুলের কারণে কাফের বলা যাবে না’। বরং আল্লাহ তাআলাও তার পাপ ক্ষমা করে দিবেন। পক্ষান্তরে, কোনও ব্যক্তির নিকট রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-এর কথা এবং হেদায়াত স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পরও যদি সে রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-এর বিরোধিতা করে এবং ঈমানদারদের পথ বাদ দিয়ে অন্য পথে চলে, তাহলে এমন ব্যক্তি কাফের হয়ে যায়। আর যে ব্যক্তি নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং সত্য অন্বেষণের ক্ষেত্রে অলসতা প্রদর্শন করে আর অজ্ঞতার কারণে কিছু বলে দেয়; তাহলে এমন ব্যক্তি পাপী হিসাবে গণ্য হবে (কাফের নয়)।

বুঝা গেল, সত্য ও সঠিক বিষয় স্পষ্ট হওয়ার পরও তা অস্বীকার মানুষকে কাফের বানিয়ে দেয়। সুতরাং এমন ব্যক্তির কুফরী স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পর বিশেষ করে যখন সে তার এই কুফরী চিন্তাকে মুসলিম উম্মাহর মাঝে প্রচার করে, তখন তাকে মুসলিম বলা দ্বীন ইসলামের মর্যাদার দুর্বলতা এবং মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ কামনার ক্ষেত্রে দুর্বলতা প্রদর্শনের নামান্তর। মির্জা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানীর বিষয়টি তার স্পষ্ট উদাহরণ।

সুতরাং মনে রাখতে হবে, কোনো ব্যক্তির নিকট দলীল না পৌঁছার কারণে যদি সত্য ও সঠিক বিষয় অস্পষ্ট থেকে যায় অথবা দলীল বুঝার ক্ষেত্রে ভুল হওয়ার কারণে তার বক্তব্য কুরআন ও সুন্নাহর সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে তার সামনে সত্যকে স্পষ্ট না করে তার উপর কাফের হয়ে যাওয়ার ফতওয়া দেওয়া কল্যাণ কামনা, দয়া, মহানুভবতা এবং বিচক্ষণতার বহির্ভূত বিষয়।

তাকফীরের (কাউকে কাফের বলার ক্ষেত্রে) আহলেহাদীছদের মানহাজ এটিই। কিন্তু যেহেতু অনেক মানুষ এই কথা বুঝার জন্য আহলেহাদীছ আলেমদের নিকট আসে না বা এই বিষয়ে লিখিত কিতাবাদি অধ্যয়ন করে না, সেজন্যই তারা ভুলের মধ্যে থেকে যায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, কোনো ব্যক্তি যখন কোনো আহলেহাদীছের নিকট শোনে এমনটি করা শিরক বা কুফরী, তখন সে বুঝে নেয় যে, আহলেহাদীছরা এই কর্মগুলোর সাথে জড়িতদের প্রত্যেককে কাফের বলে। কিন্তু বাস্তবতা এমনটি নয়। আহলেহাদীছদের মতে অজ্ঞ ব্যক্তির অস্বীকার করা আর জেনে-বুঝে অস্বীকার করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

সর্বশেষ কথা :

গবেষণা, জ্ঞান এবং কর্মের দৃষ্টিকোণ থেকে ন্যায়পরায়ণতা অতি উচ্চ মানের গুণ। যে সকল মানুষ কোনো দল বা কোনো আদর্শিক চিন্তা-ভাবনার সাথে সম্পর্ক রাখে, তারা যদি গোঁড়ামি থেকে বের হয়ে এসে একনিষ্ঠভাবে গবেষণা করে আহলেহাদীছদের মানহাজ (পথ ও মত) বুঝার চেষ্টা করে, তাহলে তাদের নিকট সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়ে যাবে যে, আহলেহাদীছদের মানহাজ কুরআন এবং সুন্নাহর উপর প্রতিষ্ঠিত। ‍কিন্তু যদি কোনো ব্যক্তি চোখ বন্ধ করে এবং আঙুল দ্বারা কান বন্ধ করে নেয় আর তারপর বিচার করতে চায়, তাহলে এমন ব্যক্তি থেকে কীভাবে সত্য ও ইনছাফ আশা করা যায়? (অর্থাৎ এমন ব্যক্তিদের থেকে সঠিক পরামর্শ ও দ্বীনী আমানতের ব্যাপারে ইনছাফের আশা করা যায় না)।

আল্লাহ তাআলার নিকট দুআ করি, তিনি যেন আমাদের প্রজ্ঞা এবং ন্যায়-নিষ্ঠার সাথে বিচার করার তাওফীক্ব দান করেন। তিনি আমাদের দূরদর্শিতাসম্পন্ন জ্ঞানী করেন এবং ঈমান ও আমলের উপর অটল রাখেন। আল্লাহ আমাদের ছিরাতে মুস্তাক্বীম তথা সঠিক পথের উপর মৃত্যু দান করুন- আমীন!

أَقُوْلُ قَوْلِيْ هٰذَا وَ أَسْتَغْفِرُ اللهَ لِيْ وَ لَكُمْ


* শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, পবা, রাজশাহী।

[1]. ছহীহ বুখারী, ‘কিতাবুল আদাব’, হা/৬১০৪; ছহীহ মুসলিম ‘কিতাবুল ঈমান’, হা/৯১।

[2]. ছহীহ মুসলিম, ‘কিতাবুল ঈমান’, হা/৯২।

[3]. ছহীহ ইবনু হিব্বান; ছহীহ আত-তারগীব, হা/২৭৭৫।

[4]. মুসনাদে আহমাদ, তিরমিযী, জিলালুল জান্নাহ, হা/৭৬, ছহীহ।