আয়িম্মায়ে কেরামের দৃষ্টিতে রাফঊল ইয়াদায়েন
-আহমাদুল্লাহ*

ভূমিকা :

আসল দলীল হলো কুরআন ও হাদীছ। আমরা যদি কুরআন ও হাদীছ দিয়ে দলীল পেশ করি, তখন কিছু ভাই ইমামদের দোহাই দিয়ে তা বাতিল করে থাকেন। সেজন্যই সম্মানিত ইমামদের উক্তিসমূহ ও সালাফে ছালেহীনের বুঝগুলো সাক্ষীস্বরূপ পেশ করা যাচ্ছে। যেন তাদের উপর এই বিষয়টি প্রমাণ করা যায় যে, ছহীহ হাদীছের উপরে আমল করতে গিয়ে সম্মানিত ইমামগণও রাফঊল ইয়াদায়েন করতেন।

(১) ইমাম মালেক ইবনে আনাস (রহি.):

১. আব্দল্লাহ ইবনে ওয়াহ্ব বলেছেন,

رَأَيْتُ مَالِكَ بْنَ أَنَسٍ يَرْفَعُ يَدَيْهِ إِذَا افْتَتَحَ الصَّلَاةَ وَإِذَا رَكَعَ وَإِذَا رَفَعَ مِنَ الرُّكُوْعِ

‘আমি ইমাম মালেক ইবনে আনাসকে দেখেছি যে, তিনি ছালাতের শুরুতে, রুকূ‘র আগে ও রুকূ‘ হতে মাথা উঠানোর সময় রাফঊল ইয়াদায়েন করতেন’।[1]   

২. ফক্বীহ আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে জাবের ইবনে হাম্মাদ আল-মারওয়াযী বলেছেন, আমি মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল হাকাম হতে এই বিষয়টি উল্লেখ করলাম। তখন তিনি বলেছেন,

هَذَا قَوْلُ مَالِكٍ وَفِعْلُهُ اَلّذِي مَاتَ عَلَيْهِ وَهُوَ السُّنَّةُ وَأَنَا عَلَيْهِ وَكَانَ حَرْمَلَةُ عَلَى هَذَا

‘এটা ইমাম মালেকের সর্বশেষ বক্তব্য ও আমল। যার উপরে অটল থাকাবস্থায় তিনি মারা যান এবং এটাই সুন্নাত। আমি এর উপরে রয়েছি (রাফঊল ইয়াদায়েন করি)। আর হারমালাহ (ইবনে ইয়াহ্ইয়া)-এর উপরই আমল করতেন’।[2] 

প্রতীয়মান হলো যে, ইমাম মালেক আমৃত্যু রুকূর‘ আগে এবং পরে রাফঊল ইয়াদায়েন করতেন।[3] আল্লাহ তার উপর রহমত করুন।

ইমাম খাত্ত্বাবী এবং ইমাম বাগাবী বলেছেন, ইমাম মালেকের শেষ আমল ছিল রাফঊল ইয়াদায়েন করা।  বরং আবুল আব্বাস আল-কুরতুবী বলেছেন,

أَنَّ الرَّفْعَ فِي الْمَوَاطِنِ الثَّلَاثَةِ هُوَ آخِرُ أَقْوَالِهِ وَأَصَحُّهَا

‘উক্ত তিন স্থানে রাফঊল ইয়াদায়েন করা ইমাম মালেকের শেষ এবং সবচেয়ে বিশুদ্ধ বক্তব্য ছিল’।[4]

এছাড়াও নিম্নোক্ত গ্রন্থগুলোতে ইমাম মালেকের রাফঊল ইয়াদায়েনের প্রমাণ পাওয়া যায়-

১. তিরমিযী।[5]
২. ইরাক্বী।[6]  
৩. ইবনে আব্দুল বার।[7]
৪. ইবনুল জাওযী।[8]
৫. আল-ইসতিযকার।[9]
৬. নববী।[10]  
৭. আল-মাজমূ‘ শারহুল মুহাযযাব।[11]  
৮. ইবনে কুদামা, আল-মুগনী।[12]
৯. ইবনে রুশ্দ, বিদায়াতুল মুজতাহিদ।[13]  
১০. নায়লুল আওত্বার।[14]  
১১. খাত্ত্বাবী।[15]  
১২. বাগাবী।[16]  
১৩. ইবনে হাযম।[17]
১৪. কুরতুবী।[18]  
(২) ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ইদরীস আশ-শাফেঈ (রহি.):
ইমাম শাফেঈ থেকে রাফঊল ইয়াদায়েন ‘মুতাওয়াতির’রূপে প্রমাণিত আছে। কয়েকটি দলীল নিম্নরূপ-

১. মুসনাদে শাফেঈ।[19]
২. জামে‘ আত-তিরমিযী।[20]
৩. নববী।[21]  
৪. ইবনে দাক্বীক্ব আল-ঈদ।[22]

(৩) ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহি.) :

১. ইমাম আবুদাঊদ বলেছেন, ‘আমি ইমাম আহমাদকে দেখেছি যে, তিনি রুকূ‘র আগে ও পরে ছালাত শুরু করার ন্যায় কান বরাবর রাফঊল ইয়াদায়েন করতেন। আর কতিপয় সময়ে ছালাত শুরু করার সময়ে কিছুটা নিম্নে হাত উত্তোলন করতেন। আমি ইমাম আহমাদকে বলতে শুনেছি, যখন তাকে বলা হলো যে, একজন ব্যক্তি রাফঊল ইয়াদায়েন করা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ছা.)-এর হাদীছ শ্রবণ করে, তবুও রাফঊল ইয়াদায়েন করে না, তাহলে তার ছালাত পরিপূর্ণ হবে কি? তখন তিনি বললেন, পুরো ছালাত হওয়ার ব্যাপারে আমার জানা নেই। তবে তার ছালাত ত্রুটিপূর্ণ হবে’।[23]   

২. যে ব্যক্তি রাফঊল ইয়াদায়েন করে না, তার ছালাতকে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল ত্রুটিযুক্ত বলেছেন।[24] এছাড়াও দেখুন-
১. সুনানে তিরমিযী।[25]
২. মাসায়েলে ইমাম আহমাদ।[26]  
৩. আল-ইসতিযকার।[27]  
৪. যিকরু মিহনাতিল ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল ইবনে ইসহাক্ব।[28]   

(৪) ইমাম আওযাঈ (রাহি.) :

ইমাম আবু আমর আব্দুর রহমান ইবনে আমর আল-আওযাঈ (ফক্বীহ, ছিক্বাহ ও জালীলুল ক্বদর ছিলেন) বলেছেন, ‘আমাদের কাছে এই বক্তব্য পৌঁছেছে যে, যে সুন্নাতের উপরে হেজায, বাছরা এবং সিরিয়ার আলেমগণ ঐকমত্য হয়েছেন, তা হলো, ছালাতের শুরুতে, রুকূ‘ করার সময়, তাকবীর বলার সময়, সিজদার জন্য ঝুঁকে যাবার সময় (এখানে রুকূ‘কেই উদ্দেশ্য করেছেন। কারণ তার পরে রুকূ‘ থেকে মাথা উঠানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে) এবং রুকূ‘ থেকে মাথা উঠানোর সময় রাফঊল ইয়াদায়েন করা। শুধুমাত্র কূফীগণ এই মাসআলাতে উম্মাতে মুসলিমার (ইজমা‘র) বিরোধিতা করেছেন। আওযাঈকে বলা হলো যে, যদি রফঊল ইয়াদায়েন হতে কিছু কম করে? তখন তিনি বললেন, এটা তার ছালাতের ঘাটতি।[29]   

উপসংহার :

উপরিউক্ত আলোচনা দ্বারা প্রতীয়মান হলো যে, ইমামগণও রাফঊল ইয়াদায়েনের পক্ষে ফৎওয়া দিয়েছেন এবং আমল করেছেন। সুতরাং যারা ইমামদের অনুসরণ করেন বলে দাবী করেন, তাদের উচিত রাসূল (ছা.)-এর উক্ত হাদীছের ভিত্তিতে ইমামদের ফৎওয়াগুলো মেনে নিয়ে ছালাতে রাফঊল ইয়াদায়েন করা। আল্লাহ আমাদের সকলকে বুঝার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন।

* সৈয়দপুর, নীলফামারী।

[1]. ইবনে আসাকির, তারীখে দিমাশক্ব, ৫৫/১৩৪, সনদ হাসান।

[2]. তারীখে দিমাশক্ব, ৫৫/১৩৪, সনদ হাসান।

[3]. মা‘আলিমুস সুনান, ১/১৬৭, হা/২৩৬-এর আলোচনা দ্রষ্টব্য; শারহে সুন্নাহ, ৩/২৩, হা/৫৬১।

[4]. তরহুত তাছরীব, ১/২৫৪, শব্দগুলো তার; আল-মুফহিম, ২/১৯।

[5]. আরেযাতুল আহওয়াযী, ২/৫৭; জামে‘ তিরমিযী, আহমাদ শাকেরের তাখরীজ, ২/৩৭, হা/২৫৬।

[6]. তরহুছ্ত তাছরীব, ২/২৫৩, ২৫৪।

[7]. আত-তামহীদ, ৯/২১৩, ২২২, ২২৩।

[8]. আল-মাউযূ‘আত, ২/৯৮।

[9]. ইবনে রুশদ, বিদায়াতুল মুজতাহিদ, ২/১২৪।

[10]. শারহে মুসলিম, ৪/৯৫।

[11]. আল-মাজমূ‘ শারহুল মুহাযযাব, ৩/৩৯৯।

[12]. ইবনে কুদামা, আল-মুগনী, ১/২৯৪।

[13]. ইবনে রুশদ, বিদায়াতুল মুজতাহিদ, ১/১৩৩।

[14]. নায়লুল আওত্বার, ২/১৮০, ৪/১৮০।

[15]. মা‘আলিমুস সুনান, ১/১৯৩।

[16]. শারহে সুন্নাহ, ৩/২৩।

[17]. আল-মুহাল্লা, ৪/৮৭।

[18]. আল-মুফহিম, ২/১৯।

[19]. কিতাবুল উম্ম, ১/১০৪।

[20]. জামে‘ তিরমিযী, ২/৩৭, হা/২৫৬-এর আলোচনা দ্রষ্টব্য।

[21]. শারহে মুসলিম, ৪/৯৫।

[22]. ইহকামুল আহকাম শরহে উমদাতুল আহকাম, ১/২২০।

[23]. মাসায়েলে ইমাম আহমাদ, ইমাম আবুদাঊদের বর্ণনা পৃ. ৩৩।

[24]. আল-মানহাজ আল-আহমাদ, ১/১৫৯।

[25]. সুনানে তিরমিযী, ২/৩৭, হা/২৫৬-এর আলোচনা দ্রষ্টব্য।

[26]. মাসায়েলে ইমাম আহমাদ, পৃ. ৭০।

[27]. আল-ইসতিযকার, ২/১২৬।

[28]. যিকরু মিহনাতিল ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল বিন ইসহাক্ব, পৃ. ১১০, ১১১।

[29]. প্রাগুক্ত; আত্ব-ত্বাবারী, আত-তামহীদ গ্রন্থের বরাতে ৯/২২৬, ইমাম ত্ববারীর সনদটি ছহীহ।