ইছলাহ হোক আল্লাহর জন্যে 
আকরাম হোসেন*


‘ইছলাহ’ (إِصْلَاح) শব্দটি আরবী। অর্থ: শুদ্ধি, সংশোধন, মেরামত, ঠিককরণ, শান্তি-স্থাপন, উন্নতিসাধন ইত্যাদি।[1] যা সাধারণত কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর অবস্থার উন্নতিকরণ, শুদ্ধিকরণ, মীমাংসা, বিশেষত সংষ্কার বা সংশোধন অর্থে ব্যবহৃত হয়। নিম্নে এ বিষয়ে আমরা সংক্ষিপ্ত আলোচনা করার প্রায়াস পাব।

মানুষ সামাজিক জীব। সামাজিক জীব হিসেবে মানুষকে একত্রিত হয়ে সমাজে বসবাস ও মেলামেশা করতে হয়। জীবনের প্রয়োজনে এই মেলামেশায়, চলাফেরায়, কথাবার্তায় দুনিয়াবী ও শারঈ বিষয়ে প্রায়ই মানুষই কম-বেশি ভুলত্রুটি করে থাকে। আর উত্তম সে ব্যক্তি, যে এই ভুলের সংশোধন করে দেয় এবং যে ভুলকারী তা সংশোধন করে নেয়। শারঈ বিষয়ে ভুল সংশোধনকারী (তওবাকারী) সম্পর্কে রাসূলূল্লাহ a বলেন, كُلُّ بَنِي آدَمَ خَطَّاءٌ وَخَيْرُ الْخَطَّائِينَ التَّوَّابُونَ ‘প্রত্যেক আদম সন্তান ত্রুটিশীল ও অপরাধী, আর অপরাধীদের মধ্যে উত্তম লোক তারা, যারা তওবা করে’।[2]

তবে ভুল ধরতে বা সংশোধন করতে গিয়ে বাড়াবাড়ি করা, তাকে হেয়, অপমান, অপদস্থ বা লাঞ্ছিত করা যাবে না। রূঢ়, কর্কশ ও কঠিন ভাষাও ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। বরং ইছলাহ (সংশোধন) করতে হবে হিকমতের সহিত, ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার চেতনায়। পবিত্র কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তাআলা বলেন,﴿ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ﴾ ‘তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করো হিকমত ও সদুপদেশ দ্বারা’ (আন-নাহল, ১৬/১২৫)। অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেন,﴿لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ﴾ ‘নিশ্চয় তোমাদের জন্য রয়েছে রাসূল a-এর মধ্যে উত্তম আদর্শ’ (আলআহযাব, ৩৩/২১)

সমাজে অনেক এমন লোক বাস করে, যারা কথায় কথায় মানুষের ভুল ধরে থাকে, অবশ্য এটা স্বভাবও বটে। এদেরকে বলা হয় পরচ্ছিদ্রান্বেষী। পরের ভুল ধরে এরা বেশ মজা পেয়ে থাকে। আবার এ ভুল তারা লোকালয়ে প্রকাশ করে আনন্দ লাভ করে। যদিও সে আনন্দ কখনই নির্মল অথবা মার্জিত নয়। দোষে-গুণে মানুষ। কথায় আছে- মানুষ মাত্রই ভুল করে। এটা ঠিক নয় যে, সব সময় অন্যের ভুল ধরা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হবে। এতে সৎগুণের পরিচয় মিলে না। হ্যাঁ, অন্যের ভুল ধরা যেতে পারে যদি তা সংশোধনের উদ্দেশ্যে হয়। একজন মুসলিম হিসেবে প্রত্যেকের উচিত হবে অপরের সাহায্য করা, তার সুখ-দুঃখে পাশে এসে দাঁড়ানো, ভুল করলে সংশোধন করা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ﴿وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ﴾  ‘আর সৎকর্ম ও আল্লাহভীতিতে একে অন্যের সাহায্য করো। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না। আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা কঠোর শাস্তিদাতা’ (আল-মায়েদা, ৫/২)

রাসূলুল্লাহ a বলেছেন, إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ ‘নিশ্চয় প্রতিটি কাজই নিয়্যতের উপর নির্ভরশীল’।[3] আল্লাহ সকলের অন্তরের খবর জানেন। আল্লাহ জানেন, আসলে সে সংশোধন করার উদ্দেশ্যে ভুল ধরে, না অপদস্থ বা অপমান করার উদ্দেশ্যে ভুল ধরে। মহান আল্লাহ সূরা হূদের ৮৮ নং আয়াতে শু‘আইব e-কে তাঁর সম্পর্কে তাঁর বাণী উল্লেখ করেছেন। তিনি জাতিকে যখন ইসলাম ও ঈমানের দাওয়াত দিচ্ছেলেন- তখন তাদেরকে দাওয়াত দেওয়ার, তাদেরকে আল্লাহর দিকে ডাকার, তাদের যে ভুলত্রুটি ছিল সেগুলোকে তুলে ধরার উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে জাতিকে বলেছিলেন, ﴿إِنْ أُرِيدُ إِلَّا الْإِصْلَاحَ مَا اسْتَطَعْتُ﴾ ‘আমার উদ্দেশ্য হচ্ছে, সাধ্যমতো শুধু ইছলাহ তথা সংশোধন করা’ (হূদ, ১১/৮৮)

অবশ্যই আমাদের এই সংশোধনের উদ্দেশ্য যেন না হয় কারো উপর আক্রমণ করে বা ক্ষতি করে, কারো প্রতি হিংসা, রাগ, অসম্মান, অভক্তি প্রকাশ বা প্রদর্শন করে। যদি ভুলত্রুটি ধরা হয়, তবে তা হতে হবে আন্তরিকতার সহিত সুন্দর ভাষার মাধ্যমে- শুধু দ্বীনের স্বার্থে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে। আর আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কারো ভুল ধরা আমাদের কর্তব্য। শারঈ বিষয়ে ভুলকারীর ক্ষেত্রে এটি শুধু তার ব্যক্তি জীবনের ক্ষতি নয়, হয়তোবা তিনি তার বক্তব্যে বা লিখনীতে এমন কথা উল্লেখ করেছেন, যেগুলো শুনে বা পড়ে মানুষ গোমরাহ ও পথভ্রষ্ট হয়ে যেতে পারে, ভুল পথে পরিচালিত হয়ে জাহান্নামের পথ ধরতে পারে, সেই জন্য মানবজাতিকে সংশোধনের উদ্দেশ্যে ভুল ধরা তখন অত্যাবশ্যক হয়ে যায়।

তবে কথায় কথায় ব্যক্তিজীবন এবং বাহ্যিক বিষয়ে মাত্রাতিরিক্ত ভুলত্রুটি ধরা ঠিক নয়। যেমন: পার্থিব কথাবার্তায়, চালচলনে, ওঠা-বসায়, আচার-আচরণে ইত্যাদির ক্ষেত্রে। নিতান্ত প্রয়োজনে এই ধরনের ভুল ধরিয়ে দিতে চাইলে তা অন্য দশ জনের সামনে বলা উচিত হবে না। এসব ক্ষেত্রে খুবই সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কেননা হয়তো সে এতে মনঃকষ্ট বা লজ্জা পাবে, অপমানিত হবে। আর এমনিভাবে তাকে অপমান করার অর্থ- ইচ্ছা করেই তার মাঝে শত্রুতা সৃষ্টি করা। রাসূলুল্লাহ a বলেছেন, الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ ‘প্রকৃত মুসলিম সে-ই, যার মুখ ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে’।[4] ফুযাইল c বলেন, ‘ঈমানদার লোক দোষ গোপন রাখে ও একান্তে উপদেশ দেয়। আর পাপী লোক মানুষকে অসম্মান করে, ভর্ৎসনা করে ও প্রকাশ্যে লজ্জা দেয়’।[5]

এছাড়া অন্যের ভুল ধরা যদি আপনার নিত্য আচরণ হয়, তাহলে অবশ্যই সেটা হবে আপনার একটি মন্দ স্বভাব। এ জন্য নিশ্চয় আপনি অন্যের বিরাগভাজন ব্যক্তিত্বে পরিণত হবেন। অন্যেরা কখনই আপনাকে ভালো চোখে দেখবে না। আপনার সঙ্গ কামনা করবে না। বরং আপনার সাহচর্য থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করবে। আপনাকে অসৎ, ক্ষতিকারক ও কুস্বভাবের ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করবে।

অবশ্য বেশি ভুল ধরার পেছনে কারো কারো এ মনোবৃত্তি কাজ করে থাকে, তা হচ্ছে নিজের আধিপত্য বিস্তার করা,

অন্যের ভুল ধরে নিজেকে একজন বাহাদুর মনে করা, নিজেকে অধিক জ্ঞানী হিসেবে প্রচার করার চেষ্টা করা। কিন্তু এ ধরনের ধারণা কখনই সত্য হয় না। অন্যকে ছোট করে দেখা কখনই বাহাদুরি হতে পারে না। অন্যকে মূর্খ প্রমাণ করা কখনই জ্ঞানের পরিচয় নয়। বরং তার উল্টোটাই; অর্থাৎ মূর্খরাই অন্যকে মূর্খ ভাবে, আর জ্ঞানহীন ব্যক্তিরাই নিজেদেরকে জ্ঞানী ভাবে। এ ধরনের ব্যক্তিরা পরিবার, সমাজ ও দেশ উভয়ের জন্য ক্ষতিকর। তাছাড়া পরচ্ছিদ্রান্বেষী একটি ‘খুঁত’ বিশেষ। এদেরকে কেউ পছন্দ করে না। আল্লাহ তাআলার সতর্কবাণী, ﴿وَيْلٌ لِكُلِّ هُمَزَةٍ لُمَزَةٍ﴾ ‘ধ্বংস প্রত্যেক ঐ ব্যক্তির জন্য, যারা পশ্চাতে ও সম্মুখে লোকের নিন্দা করে’ (আল-হুমাযাহ, ১০৪/১)

পরিশেষে বলতে চাই, একজন আদর্শবান মানুষ হিসেবে আমাদেরকে অবশ্যই সতর্ক ও সচেতনভাবে চলার চেষ্টা করতে হবে, শালীনতা বজায় রেখে কথাবার্তা বলতে হবে, সর্বোপরি রাসূল a-এর দেখানো পদ্ধতিতে জীবন পরিচালনা করতে হবে। তবেই সফলতা লাভ করা যাবে। রাসূলুল্লাহ a বলেছেন,مَنْ يَضْمَنْ لِي مَا بَيْنَ لَحْيَيْهِ وَمَا بَيْنَ رِجْلَيْهِ أضمنْ لَهُ الجنَّةَ ‘যে ব্যক্তি আমাকে তার দুই চোয়ালের মধ্যস্থিত বস্তু (জিহ্বা) এবং দুই পায়ের মধ্যস্থিত বস্তু (লজ্জাস্থান) হেফাযতের নিশ্চয়তা দিবে, আমি তার জান্নাতের যিম্মাদার হব’।[6]

এছাড়া আমরা সবাই একে অপরের দ্বীনি ভাই।[7] আমাদের উচিত সকল প্রকার হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে ভ্রাতৃত্ববোধ বজায় রেখে একসাথে মিলেমিশে বাস করা। অসৎ উদ্দেশ্যে কারো ভুল ধরা থেকে বিরত থাকা এবং কোনো ব্যক্তি ভুল করলে বা ভুল বললে তাকে নম্রভাবে ও বিনয়ের সাথে বলে সংশোধন করা। কেননা ‘মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই’ (আল-হুজুরাত, ৪৯/১০)

আল্লাহ যেন আমাদেরকে নিজেদের ভুল হলে সংশোধন হওয়ার এবং কেউ ভুল করলে হিকমতের সহিত উত্তম উপায়ে সংশোধন করার তাওফীক্ব দান করেন- আমীন!


* বি.এ (অনার্স), এম.এ, ইতিহাস বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়; শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, পবা, রাজশাহী।

[1]. ড. মুহাম্মদ ফজলুর রহমান, আল-মু‘জামুল ওয়াফী, (২১তম মুদ্রণ: সেপ্টেম্বর, ২০১৬), পৃ. ১০৯।

[2]. তিরমিযী, হা/২৪৯৯; ইবনু মাজাহ, হা/৪২৫১; মিশকাত, হা/২৩৪১, হাদীছ হাসান।

[3]. ছহীহ বুখারী, হা/১; ছহীহ মুসলিম, হা/১৯০৭; মিশকাত, হা/১।

[4]. ছহীহ বুখারী, হা/১০; ছহীহ মুসলিম, হা/৪১; মিশকাত, হা/৬।

[5]. জামেউল উলূম ওয়াল হিকাম, পৃ. ২০৪, হা/৭-এর আলোচনা দ্রষ্টব্য।

[6]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৪৭৪; মিশকাত, হা/৪৮১২।

[7]. ছহীহ বুখারী, হা/২৪৪২; মিশকাত, হা/৪৯৫৮।