ইমাম আবু হানীফা (রহিঃ)-এর আক্বীদা বনাম হানাফীদের আক্বীদা

-আব্দুল আলীম ইবনে কাওছার মাদানী
বি,এ ( অনার্স) উচ্চতর ডিপ্লোমা, এম.এ এবং এম.ফিল,
মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সউদী আরব,
অধ্যক্ষ, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, রুপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ।

(পর্ব-৯)

হানাফীরা কত ধরনের?:

আমরা আগেই দেখে এসেছি, আক্বীদা ও আমল উভয় দিক থেকে ইমাম আবু হানীফা (রহিঃ) ছিলেন আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের যোগ্য দিশারী। আক্বীদার ২/১টা বিষয় নিয়ে কথা থাকলেও বিখ্যাত অন্যান্য তিন ইমামের মত তিনিও ছিলেন আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের ইমাম। পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের নির্যাস বিশুদ্ধ আক্বীদার যে শিক্ষা রাসূল (ছাঃ) ছাহাবায়ে কেরামকে দিয়েছিলেন, ইমাম চতুষ্টয় সেই বিশুদ্ধ আক্বীদাই লালন করতেন, তারা এরই ধারক ও বাহক ছিলেন।

যাহোক, সারা পৃথিবীজুড়ে অগণিত মুসলিম ইমাম আবু হানীফা (রহিঃ)-এর দিকে নিজেদেরকে সম্বন্ধিত করে নিজেদের ‘হানাফী’ দাবী করে। কিন্তু সব হানাফী কি সমান? নিশ্চয়ই না, বরং তাদের কেউ কেউ আক্বীদা-আমল উভয় ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানীফা (রহিঃ)-এর অনুসরণ করেছে। আবার কেউ কেউ তাকে শাখা-প্রশাখাগত মাসআলা-মাসায়েলে ইমাম মানলেও আক্বীদার ক্ষেত্রে মানতে পারেনি; বরং ভিন্ন কোনো আক্বীদা গ্রহণ করে বিভ্রান্ত হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বিভ্রান্ত হানাফীরা নিজেদেরকে যেমন ইমাম আবু হানীফা (রহিঃ)-কে অনুসরণের মিথ্যা দাবী করেছে, তেমনি ভ্রান্ত আক্বীদাগুলো তার দিকে সম্বন্ধিত করে তার উপর মিথ্যারোপ করেছে, তার প্রতি যুলুম করেছে। বিখ্যাত হানাফী মনীষী আব্দুল হাই লাক্ষ্মৌবী (রহিঃ) হানাফীদের দল-উপদল নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন,

وَتَوْضِيْحُهُ أَنَّ الْحَنَفِيَّةَ عِبَارَةٌ عَنْ فِرْقَةٍ تُقَلِّدُ الْإِمَامَ أَبَا حَنِيْفَةَ فِي الْمسَائِلِ الْفَرْعِيَّةِ… سَوَاءً وَافَقَتْهُ فِيْ أُصُوْلِ الْعَقَائِدِ أَمْ خَالَفَتْهُ فَإِنْ وَافَقَتْهُ يُقَالُ لَهُ الْحَنَفِيَّةُ الْكَامِلَةُ وَإِنْ لَمْ تُوَافِقْهُ يُقَالُ لَهَا الْحَنَفِيَّةُ مَعَ قَيْدٍ، … فَكَمْ مِنْ حَنَفِيٍّ حَنَفِيٌّ فِي الْفُرُوْعِ، مُعْتَزِلِيٌّ عَقِيْدَةً… وَكَمْ مِنْ حَنَفِيٍّ حَنَفِيٌّ فَرْعاً، مُرْجِئٌ أَوْ زَيْدِيٌّ أَصْلًا وَبِالْجُمْلَةِ فَالْحَنَفِيَّةُ لَهَا فُرُوْعٌ بِاعْتِبَارِ اخْتِلَافِ الْعَقِيْدَةِ فَمِنْهُمْ الشِّيْعَةُ وَمِنْهُمُ الْمُعْتَزِلَةُ وَمِنْهُمُ الْمُرْجِئَةُ

‘এর ব্যাখ্যা হচ্ছে, হানাফীরা একটি দলের নাম, যারা শাখা-প্রশাখাগত মাসআলা-মাসায়েলে ইমাম আবু হানীফার তাক্বলীদ করে…আক্বীদার মূল বিষয়গুলোতে তার পক্ষে থাক বা বিপক্ষে যাক। যদি (আক্বীদার মূল বিষয়গুলোতে) তার পক্ষে থাকে, তাহলে তাকে ‘পূর্ণাঙ্গ হানাফী’ বলে। আর বিপক্ষে গেলে তাকে ‘শর্তসাপেক্ষে হানাফী’ বলে।… কত হানাফী আছে, যারা শাখা-প্রশাখাগত মাসআলা-মাসায়েলে হানাফী হলেও আক্বীদায় মু‘তাযিলী।…কত হানাফী আছে, যারা শাখা-প্রশাখাগত মাসআলা-মাসায়েলে হানাফী হলেও আসলে মুরজিঈ, নয় তো যায়দী। মোটকথা আক্বীদার ভিন্নতায় হানাফীদের অনেক শাখা-প্রশাখা আছে। তাদের কেউ কেউ শী‘আ, কেউ কেউ মু‘তাযিলা, আবার কেউ কেউ মুরজিআহ’।[1]  এভাবে হানাফীদের বহু দল-উপদল রয়েছে। তাদের কয়েকটি দল হচ্ছে:

১. পূর্ণাঙ্গ হানাফী: যারা আক্বীদা-আমল উভয় ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানীফা (রহিঃ)-কে সমর্থন করতে পেরেছে, তারাই পরিপূর্ণ হানাফী। তাদেরকে সুন্নী হানাফী, সালাফী হানাফীও বলা হয়। তারা ছাড়া আর কেউ ইমাম আবু হানীফা (রহিঃ)-এর পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ করে না। ইমাম যুফার, আবু ইউসুফ, মুহাম্মাদ, ত্বহাবী (রহিঃ) প্রমুখ বিদ্বান এ শ্রেণীর হানাফীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। ইমাম ত্বহাবী (রহিঃ) জনগণের সামনে ইমাম আবু হানীফা (রহিঃ)-এর আক্বীদা তুলে ধরেছেন, বই লিখেছেন। আর তার কথা গ্রহণযোগ্য। কারণ- (১) তিনি বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি। (২) তার আক্বীদা সবাই সাদরে গ্রহণ করেছেন। (৩) ইমাম ত্বহাবী (রহিঃ) আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের যে আক্বীদা পেশ করেছেন, তার বেশীরভাগ ইমাম আবু হানীফা (রহিঃ)-এর দিকে সম্বন্ধিত বই-পুস্তকে বর্ণিত আক্বীদার সাথে মিলে যায়।[2]

২. শীআ হানাফী: অনেক হানাফী শী‘আ-রাফেযীদের বিভ্রান্ত আক্বীদায় বিশ্বাস করে; কিন্তু যখনই তারা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের ভয় পায়, তখনই নিজেদেরকে হানাফী হিসাবে পরিচয় দেয়। যেসব হানাফী শী‘আদের বিধ্বংসী আক্বীদায় বিশ্বাসী, তারাই শী‘আ হানাফী।

৩. যাইদিয়্যা হানাফী: শী‘আদের একটি গ্রুপের নাম যাইদিয়্যা, তবে তারা শী‘আদের অন্যান্য গ্রুপের তুলনায় কম ভয়ঙ্কর এবং আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের নিকটতর। হানাফীদের মধ্যে কতক এই গ্রুপের।

৪. মুতাযিলা হানাফী: ওয়াছিল ইবনে আতার আক্বীদা পোষণকারীদের মু‘তাযিলা বলা হয়। এদের ৫টি ভ্রান্ত মূলনীতি আছে। তা হচ্ছে, (১) তাওহীদ: মু‘তাযিলাদের নিকট তাওহীদ হচ্ছে আল্লাহর গুণাবলিকে অস্বীকার করা এবং আল্লাহর নাম এমনভাবে সাব্যস্ত করা যে, এগুলোর কোনো অর্থ নেই। (২) আদল: তাদের নিকট আদল হচ্ছে, সৃষ্টির উপর আল্লাহর ক্ষমতা এবং ইচ্ছা অস্বীকার করা। তাদের বিশ্বাস মতে, বান্দা নিজেই তার কর্মের স্রষ্টা। এ কারণে তাদেরকে এই উম্মতের মাজূস বা অগ্নিপূজক বলা হয় (مجوس هذه الأمة)। তাক্বদীর অস্বীকার করার কারণে তাদেরকে ক্বাদারিয়্যাও বলা হয়। অবশ্য তারা নিজেদেরকে ‘আহলুল আদল ওয়াত তাওহীদ’ মনে করে। (৩) ইনফাযুল ওয়াঈদ বা শাস্তির বাস্তবায়ন: তা হচ্ছে, তাদের নিকট কাবীরা গোনাহগার তওবা না করলে চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামে থাকবে। (৪) আল-মানযিলা বায়নাল মানযিলাতাইনবা দুই স্তরের মধ্যবর্তী স্তর: তারা বলে, ফাসেককে দুনিয়াতে মুমিনও বলা যাবে না, কাফেরও বলা যাবে না। (৫) আল-আমরু বিল মারূফ ওয়ান-নাহি আনিল মুনকারবা ভালো কাজের আদেশ ও মন্দ কাজে নিষেধ : মু‘তাযিলাদের নিকট সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা এবং তরবারী দ্বারা তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা জায়েয এবং তা ভালো কাজের আদেশ ও মন্দ কাজে নিষেধের আওতাভুক্ত।[3] অনেক হানাফীর মধ্যে এই ভ্রান্ত ও ভয়ঙ্কর আক্বীদাগুলো প্রবেশ করেছে আর তাদেরকে মু‘তাযিলা হানাফী বলে। এমনকি ইমাম আবু হানীফার পরিবারেও এই রোগ ঢুকেছিলো। তার পৌত্র ইসমাঈল ইবনে হাম্মাদ ইবনে আবু হানীফা ‘কুরআন সৃষ্টি’ বলে বিশ্বাস করতেন এবং মানুষকে এ পথে আহ্বান জানাতেন।[4]

৫. মুরজিআ হানাফী: যারা আমলকে ঈমানের অন্তর্ভুক্ত গণ্য করে না, তারা মুরজিআ। তারা আরো বলে, ঈমান থাকলে পাপ কোনো ক্ষতি করতে পারে না, যেমনিভাবে কুফরী থাকলে আনুগত্য কোনো উপকার করতে পারে না।[5]   মুরজিআদের প্রসিদ্ধ ৪টি গ্রুপ রয়েছে। (১) মুরজিআহ জাহমিয়্যাহ: এরা চরম সীমালঙ্ঘনকারী। তাদের নিকট ‘শুধুমাত্র অন্তরের বিশ্বাসই ঈমান’, যদিও মুখে কুফরী প্রকাশ করে। অতএব, শয়তান, ফিরআউন, ক্বারূন, হামান এবং তাদের মত যারা আছে, তারা সবাই তাদের মুমিন। (২) মুরজিআহ কাররামিয়্যাহ: এরাও সীমালঙ্ঘনকারী। তাদের নিকট ‘শুধুমাত্র মুখের স্বীকৃতির নাম ঈমান’। এই হিসাবে তাদের নিকট দুনিয়াতে মুনাফিক্বও মুমিন। কিন্তু পরকালে সে চিরস্থায়ী জাহান্নামী। (৩) মুরজিআহ মাতুরিদিয়্যাহ ও আশআরিয়্যাহ: এদের নিকটও বাড়াবাড়ি আছে। তাদের নিকট ‘শুধুমাত্র অন্তরের বিশ্বাসের নাম ঈমান। মুখের স্বীকৃতি ও আমল ঈমানের শর্তও নয়, অংশও নয়’। তবে দুনিয়াতে কারো প্রতি হুকুম দেওয়ার ক্ষেত্রে মুখের স্বীকৃতি শর্ত। অতএব, যে ব্যক্তি অন্তরে বিশ্বাস করে, কিন্তু মুখে স্বীকার না করে, সে মুমিন ও নাজাতপ্রাপ্ত। (৪) মুরজিআতুল ফুক্বাহা: এ ব্যাপারে আলোচনা গত হয়ে গেছে।[6]

হানাফীদের মধ্যে এই বিশ্বাসের বহু মানুষ আছে, যাদেরকে মুরজিআ হানাফী বলে।

৬. জাহমিয়াহ হানাফী: আল্লাহর গুণাবলি অস্বীকারকারী দলের নাম জাহমিয়্যাহ। তাদের নেতা জাহ্ম ইবনে ছফওয়ানের নামানুসারে তাদেরকে জাহমিয়্যাহ বলা হয়। তাদের অপর নাম মু‘আত্তিলা।[7]  হানাফীদের মধ্যে যারা জাহমের মত আল্লাহর গুণাবলি অস্বীকার করে, তারা হচ্ছে জাহমিয়্যাহ হানাফী।

৭. কাররামিয়্যা-মুশাব্বিহা হানাফী: চরমপন্থী মুরজিআদের একটি দল হচ্ছে কাররামিয়্যা-মুশাব্বিহা, যাদের ইমাম হচ্ছে মুহাম্মাদ ইবনে কাররাম সিজিস্তানী (মৃত্যু: ২৫৫ হি.)। তাদেরকে মুজাসসিমাও বলা হয়। কারণ তারা বলে, আল্লাহ শরীরসমূহের মধ্য থেকে একটি শরীর (الأجسام جسم من)। তারা আল্লাহকে সৃষ্টির সাথে তুলনা করে থাকে।[8]   কাররামিয়্যারা সবাই মুজাসসিমা এবং সবাই হানাফী। তাদের কবি আবুল ফাতহ বুসতী (মৃত্যু: ৪০১ হি.) বলেন,

اَلرَّأْيُ رَأْيُ أَبِيْ حَنِيْفَةَ وَحْدَهُ … وَالدِّيْنُ دِيْنُ مُحَمَّدِ بْنِ كَرَّام

‘অভিমত কেবল আবু হানীফার অভিমত আর দ্বীন কেবল মুহাম্মাদ ইবনে কাররামের দ্বীন’।[9]

৮. মুরাইসিয়্যাহ হানাফী: বিশর আল-মুরাইসির অনুসারীদেরকে মুরাইসিয়্যাহ বলে। এরা মুরজিআহ ও মু‘তাযিলাহ। যেসব হানাফী এই আক্বীদায় বিশ্বাসী, তারা মুরাইসিয়্যা হানাফী।

৯. ছূফী হানাফী: ছূফীদের বেশীরভাগই হানাফী। ছূফীদের প্রসিদ্ধ ৪ তরীক্বা ক. ক্বাদেরিয়্যাহ, খ. চিশতিয়্যাহ, গ. সোহরাওয়ার্দিয়্যাহ, ঘ. নক্বশাবন্দিয়্যাহ ছূফী হানাফীর অন্তর্ভুক্ত। ছূফী হানাফীর আরো দু’টি ভয়ঙ্কর গ্রুপ হচ্ছে, হুলূলিয়্যাহ ও ইত্তিহাদিয়্যাহ[10][11]

১০. কবরপূজারী হানাফী: কবর ও মাযারপূজারীদের অধিকাংশই হানাফী। কবর ও মাযারকে ঘিরে এদের কুফর, শিরক ও বিদ‘আতের অভাব নেই। কবরপূজারী হানাফীদের দু’টি প্রসিদ্ধ গ্রুপ হচ্ছে, ক. ব্রেলভী ও খ. কাওছারী। কিছু কিছু দেওবন্দী হানাফীও কবরপূজারী হানাফীর অন্তর্ভুক্ত।

১১. মাতুরিদিয়্যাহ হানাফী: এই হানাফীরা আবু মানছূর মাতুরিদীর অনুসারী। তারা আল্লাহর কেবল ৮টি ছিফাত সাব্যস্ত করে। আশ‘আরীদের সাথে তাদের অনেক মূলনীতিতে মিল আছে।[12]

অন্যভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইমাম আবু হানীফা (রহিঃ)-এর অনুসরণের ব্যাপারে মানুষের দুই ধরনের অবস্থান লক্ষ্য করা যায়। ইবনু আবিল ইয (রহিঃ) বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে,

وَقَدِ انْحَرَفَ فِيْ شَأْنِ أَبِيْ حَنِيْفَةَ رَحِمَهُ اللهُ طَائِفَتَانِ، فَطَائِفَةٌ قَدْ غَلَتْ فِيْ تَقْلِيْدِهِ فَلَمْ تَتْرُكْ لَهُ قَوْلًا، وَأَنْزَلُوْهُ مَنْزِلَةَ الرَّسُوْلِ صلى الله عَلَيْهِ وَسلم، وَإِنْ أُوْرِدَ عَلَيْهِمْ نَصٌّ مُخَالِفٌ قَوْلَهُ تَأَوَّلُوْهُ عَلَى غَيْرِ تَأْوِيْلِهِ لِيَدْفَعُوْهُ عَنْهُمْ وَلَمْ يَكُنْ أَصْحَابُهُ مَعَهُ كَذَلِكَ بَلْ رَجَعُوْا عَنْ كَثِيْرٍ مِمَّا كَانُوْا قَلَّدُوْهُ فِيْهِ لِمَا ظَهَرَ لَهُمْ فِيْهِ الدَّلِيْلُ عَلَى خِلَافِ قَوْلِهِ. وَطَائِفَةٌ تَنَقَّصَتْهُ وَادَّعَتْ أَنَّهُ أَخَذَ بِالرَّأْيِ وَتَرَكَ النَّصَّ هُوَ وَأَصْحَابُهُ، وَسَمُّوْهُمْ أَصْحَابَ الرَّأْيِ وَهُمْ مَا بَيْنَ مُسْتَقِلٍّ فِيْ ذَلِكَ مِنَ الطَّرْفَيْنِ وَمُسْتَكْثِرٍ فَتَرَاهُمْ مَا بَيْنَ قَادِحٍ تَارَةً بِحَقٍّ وَتَارَةً بِبَاطِلٍ وَاللهُ يَغْفِرُ لَنَا وَلَهُمْ.

‘আবু হানীফার ব্যাপারে দু’টি দল বিভ্রান্ত হয়ে গেছে: একটি দল তার তাক্বলীদ করার ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করেছে। তার কোনো কথা ছাড়েনি। তারা তাকে রাসূল (ছাঃ)-এর স্থানে বসিয়েছে। তাদের নিকট তার মতের বিপক্ষে কুরআন-হাদীছের কোনো বক্তব্য পেশ করা হলে তারা না মানার জন্য এর অপব্যাখ্যা করে। কিন্তু তার শাগরেদগণ তার ব্যাপারে এমন অবস্থানে ছিলেন না; বরং তাদের কাছে দলীল স্পষ্ট হওয়ার পর তার মতের বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও তারা তার তাক্বলীদ থেকে ফিরে এসেছিলেন। আরেকটি দল তাকে খাঁটো করেছে। তারা মনে করে, তিনি এবং তার অনুসারীরা কুরআন-হাদীছের বক্তব্য ছেড়ে দিয়ে ব্যক্তিমতকে গ্রহণ করেছে। তারা তাদেরকে ‘আছহাবুর রায়’ বা ব্যক্তিমতের অনুসারী হিসাবে আখ্যায়িত করেছে। এই দুই দলের একদল খাঁটো করেছে, আরেক দল সীমালঙ্ঘন করেছে। এদেরকে আপনি কখনও হক্ব আবার কখনও বাতিল উপায়ে সমালোচনা করতে দেখবেন। আল্লাহ আমাদেরকে এবং তাদেরকে ক্ষমা করুন’।[13]

হানাফীদের বিভ্রান্তির কারণ:

বিপুল সংখ্যক হানাফী সালাফে ছালেহীন, বিশেষ করে ইমাম আবু হানীফা (রহিঃ)-এর পথ থেকে বিভ্রান্ত হয়েছে। এই বিভ্রান্তি ও ভ্রষ্টতার বহু কারণ রয়েছে। সেগুলোর কয়েকটি হচ্ছে:

এক. ইমাম আবু হানীফা (রহিঃ) ‘ইলমুল কালাম’ চর্চা করেন এবং এতে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। হানাফীদের নিকট ব্যাপারটি মুতাওয়াতির।[14]  ইলমুল কালামের অপর নাম ‘ইলমুল মানতিক্ব’। আক্বীদা বা ধর্মবিশ্বাসের ক্ষেত্রে দর্শন বা যুক্তিবিদ্যা ভিত্তিক আলোচনা বা গবেষণাকে ‘ইলমুল কালাম’ বা ‘ইলমুল মানতিক্ব’ বলা হয়। এটা এক ধরনের মন্দ ইলম, যার চর্চা কল্যাণকর নয়। সেকারণে ইমাম আবু হানীফার মত মানুষ এ বিদ্যা চর্চা অব্যাহত রাখবেন না এটাই স্বাভাবিক। তিনি প্রথম জীবনে এরূপ দর্শন ও যুক্তিবিদ্যা নির্ভর বিতর্ক চর্চা করলেও পরবর্তীতে তিনি তা বর্জন করেন। তিনি বলেন,

كُنْتُ أُعْطِيْتُ جَدَلًا فِى الْكَلَامِ … فَلَمَّا مَضَى مُدَّةُ عُمُرِيْ تَفَكَّرْتُ وَقُلْتُ: اَلسَّلَفُ كَانُوْا أَعْلَمَ بِالْحَقَائِقِ وَلَمْ يَنْتَصِبُوْا مُجَادِلِيْنَ بَلْ أَمْسَكُوْا عَنْهُ وَخَاضُوْا فِىْ عِلْمِ الشَّرَائِعِ وَرَغِبُوْا فِيْهِ وَتَعَلَّمُوْا وَعَلَّمُوْا وَتَنَاظَرُوْا عَلَيْهِ فَتَرَكْتُ الْكَلَامَ وَاشْتَغَلْتُ بِالْفِقْهِ وَرَأَيْتُ الْمُشْتَغِلِيْنَ بِالْكَلَامِ لَيْسَ سِيمَاهُمْ سِيْمَاءَ الصَّالِحِيْنَ، قَاسِيَةٌ قُلُوْبُهُمْ غَلِيْظَةٌ أَفْئِدَتُهُمْ، لَا يُبَالُوْنَ بِمُخَالَفَةِ الْكِتَابِ وَالسُّنَّةِ وَلَوْ كَانَ خَيْرًا لَاشْتَغَلَ بِهِ السَّلَفُ الصَّالِحُوْنُ. .

‘দর্শনভিত্তিক বিতর্কে আমার পারদর্শিতা ছিল … আমার জীবনের কিছু সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর আমি ভাবলাম, সালাফে ছালেহীন (দ্বীনের) প্রকৃত সত্য বিষয়ে অধিক অবগত ছিলেন। অথচ তারা এসব বিষয়ে বিতর্কে লিপ্ত হননি। বরং এসব বিতর্ক তারা পরিহার করতেন। তারা শরী‘আত বা হুকুম-আহকাম বিষয়ে আলোচনা ও অধ্যয়নে লিপ্ত হতেন। তারা এগুলোতে উৎসাহ দিতেন, শিক্ষা করতেন, শিক্ষা দিতেন এবং এ বিষয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করতেন। এজন্য আমি কালাম পরিত্যাগ করে ফিক্বহ চর্চায় মনোনিবেশ করি। আমি দেখলাম, দর্শনভিত্তিক আক্বীদা চর্চায় লিপ্ত মানুষগুলোর বৈশিষ্ট্য নেককার মানুষদের মত নয়। বরং তাদের হৃদয়গুলো কঠিন, মন-মানসিকতা কর্কশ; তারা কুরআন ও হাদীছের বিরোধিতা করতে পরোয়া করে না। কালাম চর্চা যদি কল্যাণকরই হতো, তাহলে অবশ্যই সালাফে ছালেহীন তা চর্চা করতেন’।[15]  ইমাম আবু হানীফার বিখ্যাত ছাত্র মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান (রহিঃ) বলেন, كَانَ أَبُو حَنِيْفَةَ يَحُثُّنَا عَلَى الْفِقْهِ وَيَنْهَانَا عَنِ الْكَلَامِ ‘আবু হানীফা ফিক্বহের প্রতি আমাদেরকে উৎসাহিত করতেন এবং আমাদেরকে কালাম চর্চা করতে নিষেধ করতেন’।[16]

কিন্তু আবু মানছূর মাতুরিদী এবং তার অনুসারীরা ইমাম আবু হানীফার এ নীতি গ্রহণ করতে পারেননি; বরং এই ইলমুল কালামই তাদের পূঁজি। আর দুঃখজনকভাবে আমাদের দেশের অধিকাংশ হানাফীই মাতুরিদী। সেকারণে আমাদের দেশের মাতুরিদীহানাফীদের আক্বীদায় বিশেষ করে আল্লাহর নাম ও গুণাবলির বেলায় বিভ্রান্তির অভাব নেই।

দুই. জাহমিয়্যাহ ও মু‘তাযিলাদের বড় বড় ব্যক্তিগণ হানাফী ছিলেন। ফলে তাদের দ্বারা বেশীরভাগ মানুষ প্রতারিত ও ধোঁকাপ্রাপ্ত হয়ে পথভ্রষ্ট হন। জাহমিয়্যাদের পথ ধরে মাতুরিদী ও আশ‘আরীদের মধ্যে বিভ্রান্তি বাসা বাধে।

তিন. সর্বযুগে অধিকাংশ হানাফীর হাদীছ চর্চা খুব কম। কুরআন-হাদীছ ঘাঁটাঘাটি না করে রায়, ক্বিয়াস ও মাসআলা উৎঘাটনই তাদের মূল কাজ। একারণে বিভিন্ন ধরনের বিভ্রান্ত গ্রুপ তাদেরকে টার্গেট করে এবং তাদের মধ্যে বিভ্রান্তির বীজ বপনের সুযোগ পায়।

(চলবে)

[1]. মুহাম্মাদ আব্দুল হাই লাক্ষ্মৌবী, আর-রফ‘উ ওয়াত তাকমীল ফিল জারহি ওয়াত তা‘দীল, (মাকতাবুল মাতবূ‘আত আল-ইসলাইময়্যাহ, হালাব, ৩য় প্রকাশ: ১৪০৭ হি.), পৃঃ ৩৮৫।

[2]. উছূলুদ্দীন ইনদাল ইমাম আবী হানীফা, পৃঃ ৬২৩-৬২৪।

[3]. আবুল হুসাইন ইয়াহইয়া আল-ইয়ামানী, আল-ইনতিছার ফির রদ্দি আলাল মু‘তাযিলাতিল ক্বদারিয়্যাতিল আশরার, (তাহক্বীক্ব: সুঊদ আল-খালাফ, আযওয়াউস সালাফ, রিয়ায, সঊদী আরব, ১ম প্রকাশ: ১৪১৯ হি./১৯৯৯ খৃ.), ১/৬৯।

[4].  উছূলুদ্দীন ইনদাল ইমাম আবী হানীফা, পৃ: ৬২৫-৬২৬।

[5].  মুহাম্মাদ সাফফারীনী, লাওয়ামেউল আনওয়ার, (মাকতাবাতুর রুশদ, রিয়ায, সঊদী আরব, ১ম প্রকাশ: ১৪১৫ হি./১৯৯৪ খৃ.), ২/৩৩১।

[6]. শামসুদ্দীন আফগানী, আদাউল মাতুরিদিয়্যাহ লিল আক্বীদাতিস সালাফিয়্যাহ, (মাকতাবাতুছ ছিদ্দীক্ব, তায়েফ, ২য় প্রকাশ: ১৪১৯ হি./১৯৯৮ খৃ.), ১/১৯৫-১৯৬, টীকা নং ২।

[7].  ইবনু আবী ইয়া‘লা, আল-ই‘তিক্বাদ, (তাহক্বীক্ব: মুহাম্মাদ ইবন আব্দুর রহমান আল-খামীস, দারু আতলাস আল-খযরা, ১ম প্রকাশ: ১৪২৩ হি./২০০২ খৃ.), পৃঃ ৪৬, টীকা নং ১।

[8]. আব্দুল্লাহ জারবূ‘, আছারুল ঈমান, (ইমাদাতুল বাহছিল ইলমী, আল-জামি‘আহ আল-ইসলামিয়্যাহ, মদীনা, সঊদী আরব, ১ম প্রকাশ: ১৪২৩ হি./২০০৩ খৃ.), ১/১৪১, টীকা নং ২।

[9].  সুবকী, ত্ববাকাতুশ শাফিইয়্যাহ, (দারু হাজার, ২য় প্রকাশ: ১৪১৩ হি.), ২/৩০৫।

[10]. হুলূলিয়্যাদের বিশ্বাস, মহান আল্লাহ সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে মিশে গেছেন। আর ইত্তিহাদিয়্যাদের বিশ্বাস, সমগ্র সৃষ্টিই আল্লাহ। এই হিসাবে ইত্তিহাদিয়্যারা হুলূলিয়্যাদের চেয়ে বেশী মারাত্মক (আদাউল মাতুরিদিয়্যাহ লিল আক্বীদাতিস সালাফিয়্যাহ, ১/১৯৭-১৯৮)।

[11]. আদাউল মাতুরিদিয়্যাহ লিল আক্বীদাতিস সালাফিয়্যাহ, ১/১৯৮, টীকা নং ২।

[12]. আহমাদ আসীরী, মানহাজুশ শায়খ আব্দুর রাযযাক আফীফী, (ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে সুঊদ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব, প্রকাশকাল: ১৪৩১ হি.), পৃঃ ৬৪৬।

[13]. ইবনু আবিল ইয, আল-ইত্তিবা, (আলামুল কুতুব, ২য় প্রকাশ: ১৪০৫ হি.), পৃঃ ৩০।

[14]. আদাউল মাতুরিদিয়্যাহ, ১/১৯৯। লেখক একথাটি প্রমাণ করতে গিয়ে অনেকগুলো রেফারেন্স উল্লেখ করেছেন।

[16].যাম্মুল কালাম ওয়া আহলিহি, ৫/২২১, আ/১০২০ ।