ইমাম আবু হানীফা (রহিঃ)-এর আক্বীদা বনাম হানাফীদের আক্বীদা

আব্দুল আলীম ইবনে কাওছার মাদানী

(পর্ব-১০)

আশ‘আরী-মাতুরিদীরা কি ইমাম আবু হানীফা (রহিঃ)-এর অনুসারী?

ইমাম আবু হানীফা (রহিঃ)-এর অনুসারীদের একটা বড় অংশ আশ‘আরী-মাতুরিদী আক্বীদায় বিশ্বাসী। বরং আমাদের দেশের প্রায় সব হানাফীই এ মতাদর্শে বিশ্বাস করে। এ মতাদর্শ সম্পর্কে জানতে হলে আমাদেরকে অবশ্যই আবুল হাসান আশ‘আরী ও আবু মানছূর আল-মাতুরিদীর আক্বীদা সম্পর্কে জানতে হবে। উল্লেখ্য, আশ‘আরী-মাতুরিদীরা আক্বীদা ও মানহাজের ক্ষেত্রে প্রায় একই। তারা একই মুদ্রার এপিঠ ও ওপিঠ।

আবুল হাসান আলী ইবনে ইসমাঈল আশ‘আরী (২৬০-৩২৪ হিজরী) আক্বীদার ক্ষেত্রে ৩টি পর্ব অতিক্রম করেন। সবশেষে তৃতীয় পর্বে এসে দৃঢ়পদ হন। আক্বীদার এই পর্বগুলো এবং তার সর্বশেষ সিদ্ধান্তটা জানা খুবই যরূরী। কারণ আবুল হাসান আশ‘আরীর আক্বীদা কী আর আশ‘আরীদের আক্বীদা কী, তা জানতে হলে এ পর্বগুলো সম্পর্কে জ্ঞান থাকা আবশ্যক। পর্বগুলো হচ্ছে-

১. মু‘তাযিলা পর্ব: আবুল হাসান আশ‘আরীর বাল্যাবস্থায় তার পিতা ইসমাঈল ইবনে ইসহাক মারা যান। তার পিতা ছিলেন আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত বা আহলে হাদীছের অন্তর্ভুক্ত। সেকারণে মৃত্যুর সময় তিনি তৎকালীন সময়ের বিখ্যাত মুহাদ্দিছ ইমাম যাকারিয়া ইবনে ইয়াহইয়া আস-সাজী (রহিঃ)-এর কাছে তদীয় পুত্র আবুল হাসান আশ‘আরীকে দেকভালের অছিয়ত করে যান। কিন্তু তার পিতার মৃত্যুর পর তার মা মু‘তাযিলাদের গুরু আবু আলী আল-জুব্বাঈর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ফলে তিনি এই ছোট বাচ্চা আবুল হাসান আশ‘আরীকে তার মতো করে তার চিন্তাচেতনায় গড়ে তোলেন। আবুল হাসান আশ‘আরী পুরোদস্তুর মু‘তাযিলী বনে যান। ৪০ বছর যাবৎ তিনি এই মু‘তাযিলা মতবাদ লালন করেন। আবুল হাসান আশ‘আরীর আক্বীদার এই পর্বের ব্যাপারে উলামায়ে কেরামের মধ্যে কোনো দ্বিমত পাওয়া যায় না।[1]  উল্লেখ্য, উমাইয়্যা শাসনামলের শেষের দিকে ওয়াছেল ইবনে আতার হাত ধরে মু‘তাযিলাদের জন্ম হয় এবং আব্বাসীয় শাসনামলে তাদের বিকাল ঘটে। দর্শনশাস্ত্র দ্বারা তারা প্রভাবিত হয় এবং আক্বীদার ক্ষেত্রে কুরআন-হাদীছের বক্তব্যের উপর বিবেককে প্রাধান্য দেয়। তারা সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় বহু মানুষকে বিভ্রান্ত করে। মু‘তাযিলাদের আরো কয়েকটি নাম হচ্ছে, ক্বদারিয়্যাহ, আদলিয়্যাহ, মুক্বতাছিদাহ, ওয়াঈদিয়্যাহ। মু‘তাযিলারা ৫টি মূলনীতিতে বিশ্বাসী: ১. তাওহীদ: তাদের নিকট তাওহীদের গোড়ার কথা হচ্ছে, আল্লাহর গুণাবলিকে অস্বীকার করা। ২. আদল: এর অন্তরালে তারা তাক্বদীর অস্বীকার করে। তারা বলে, বান্দা নিজেই নিজের কাজের স্রষ্টা; আল্লাহ নন। ৩. আল-মানযিলা বায়নাল মানযিলাতাইন: মু‘তাযিলীদের নিকট ফাসেক্ব ব্যক্তি না মুমিন হিসাবে গণ্য হয়, না কাফের হিসাবে; বরং সে ‘ফী মানযিলাতিন বায়নাল মানযিলাতাইন (في منزلة بين المنزلتين)’ বা উভয় শ্রেণীর মধ্যবর্তী এক শ্রেণীতে অবস্থান গ্রহণ করে। ৪. আল-ওয়া‘দ ওয়াল ওয়াঈদ: তাদের নিকট এর অর্থ হলো, কাবীরা গুনাহগার ব্যক্তিরা কাফের, ইসলাম থেকে । তারা পরকালে চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে; তাদের ব্যাপারে কারো সুপারিশ কবুল করা হবে না। ৫. আল-আমরু বিল মা‘রূফ ওয়ান নাহি আনিল মুনকার: এর অন্তরালে তারা ফাসেক্বীর কারণে অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও অস্ত্রধারণ বৈধ মনে করে। তাদের আরো কিছু ভ্রান্ত আক্বীদা হচ্ছে, ক. তারা আল্লাহর দর্শন অস্বীকার করে। খ. তারা কুরআন মাখলূক্ব বা সৃষ্ট মনে করে। গ. তারা আল্লাহর ঊর্ধ্বে অবস্থান অস্বীকার করে। ঘ. কাবীরা গুনাহগারদের জন্য নবী (ছাঃ)-এর শাফা‘আতকে তারা মেনে নেয় না। ঙ. তারা কারামাতে আউলিয়ায় বিশ্বাস করে না।[2]

তবে আশার কথা হচ্ছে, আবুল হাসান আশ‘আরী আল্লাহর কাছে তওবা করে এই বিভ্রান্ত আক্বীদা থেকে ফিরে আসেন।[3]

২. কুল্লাবিয়্যা পর্ব: আবুল হাসান আশ‘আরী মু‘তাযিলা পর্ব থেকে ফিরে এসে সরাসরি সালাফী পর্বে প্রবেশ করতে পেরেছিলেন নাকি মাঝখানে আর কোনো পর্বে ফেঁসে গিয়েছিলেন তা নিয়ে মতভেদ আছে। কারো কারো মতে, তিনি মু‘তাযিলা ও সালাফী পর্বের মাঝখানে কুল্লাবিয়্যা পর্বে প্রবেশ করেছিলেন।[4] এ পর্বে তিনি মু‘তাযিলাদের বিরুদ্ধাচরণ করেন এবং তাদের বিভ্রান্তির জবাবে এ বইটি রচনা করেন, ‘আল-লুমা‘ ফির রদ্দি আলা আহলিয যায়গি ওয়াল বিদা’ (اللمع في الرد على أهل الزيغ والبدع)।[5]  মু‘তাযিলাদের বিরুদ্ধাচরণ করলেও তার মধ্যে কুল্লাবিয়্যার বিভ্রান্ত আক্বীদা প্রবেশ করে। আব্দুল্লাহ ইবনে সাঈদ ইবনে কুল্লাবের হাতে তৃতীয় হিজরীতে কুল্লাবিয়্যা মতবাদের জন্ম হয়। প্রতিষ্ঠাতার দাদা কুল্লাবের দিকে সম্বন্ধিত করে তাদেরকে কুল্লাবিয়্যা বলা হয়। তারা আল্লাহর কিছু ছিফাত বা গুণ অস্বীকার করে। তারা বলে, অন্তরের বিশ্বাস ও মুখের স্বীকৃতির নাম ঈমান, যা বাড়েও না, কমেও না। তারা কাবীরা গোনাহগারকে পূর্ণাঙ্গ মুমিন মনে করে।[6]

৩. সালাফী পর্ব: আবুল হাসান আশ‘আরী শেষ জীবনে পুরোপুরি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের আক্বীদায় ফিরে আসেন। তিনি তার শেষ জীবনে প্রণীত তিনটি গ্রন্থে বিশুদ্ধ আক্বীদা প্রকাশ করেন। তিনি তার ‘আল-ইবানাহ আন উছূলিদ দিয়ানাহ’ গ্রন্থে বলেন, ‘আমাদের বক্তব্যের সারকথা হচ্ছে,…ঈমান কথা এবং কাজের নাম, যা বাড়ে ও কমে। এ বিষয়ে রাসূল (ছাঃ) থেকে বর্ণিত ছহীহ বর্ণনাগুলো আমরা সাদরে গ্রহণ করি, যেগুলো বিশ্বস্ত ও ন্যায়পরায়ণ রাবীগণ নিরবচ্ছিন্নভাবে রাসূল (ছাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন’।[7]  তিনি তার ‘রিসালাহ ইলা আহলিছ ছাগার বিবাবিল আবওয়াব’ গ্রন্থে বলেন, ‘তারা সবাই ‘ইজমা’ পোষণ করেছেন যে, পুণ্য দ্বারা ঈমান বাড়ে এবং পাপ দ্বারা কমে’।[8]  তিনি তার ‘মাক্বালাতুল ইসলামিইয়ীন’ গ্রন্থে আহলুল হাদীছ ওয়াস-সুন্নাহদের আক্বীদা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, ‘তারা সাব্যস্ত করে যে, কথা ও কাজের নাম ঈমান, যা বাড়ে ও কমে।…তারা যার নির্দেশনা দেয় এবং বিশ্বাস পোষণ করে, তার কয়েকটি হচ্ছে এই। তাদের যেসব কথা আমরা উল্লেখ করলাম, সেগুলোই আমাদেরও বক্তব্য এবং আমাদেরও মাযহাব। আমরা শুধু আল্লাহর কাছেই তাওফীক্ব প্রার্থনা করি। তিনিই আমাদের জন্য যথেষ্ট। তিনি কতই না উত্তম তত্ত্বাবধায়ক। আমরা তাঁর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করি, তাঁর উপরই ভরসা করি এবং তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে’।[9]  এভাবে আক্বীদার অন্যান্য ক্ষেত্রেও তিনি সালাফী মানহাজের সাথে পুরোপুরি সহমত পোষণ করেন।

আবুল হাসান আশ‘আরীর সালাফী মানহাজে ফিরে আসার ব্যাপারে হাফেয যাহাবী (রহিঃ) বলেন, كَانَ مُعْتَزِلِيًّا ثُمَّ تَابَ، وَوَافَقَ أَصْحَابَ الْحَدِيْثِ.. ‘তিনি মু‘তাযিলী ছিলেন। অতঃপর তওবা করেন এবং আছহাবুল হাদীছদের সাথে একমত পোষণ করেন…’। [10]  শায়খ আব্দুল আযীয ইবনে বায (রহিঃ) বলেন, وَأَبُو الْحَسَنِ الْأَشْعَرِيُّ – رحمه الله – لَيْسَ مِنَ الْأَشَاعِرَةِ، وَإِنِ انْتَسَبُوْا إِلَيْهِ لِكَوْنِهِ رَجَعَ عَنْ مَذْهَبِهِمْ وَاعْتَنَقَ مَذْهَبَ أَهْلِ السُّنَّةِ ‘আবুল হাসান আশ‘আরী আশ‘আরীদের অন্তর্ভুক্ত নন, যদিও আশ‘আরীরা তার দিকেই নিজেদেরকে সম্বন্ধিত করে। কারণ তিনি তাদের মাযহাব থেকে ফিরে এসে আহলুস সুন্নাহর মাযহাব গ্রহণ করেন’।[11]  আবুল হাসান আশ‘আরীর সালাফী মানহাজে ফিরে আসার পক্ষে উলামায়ে কেরামের ভূরি ভূরি বক্তব্য পেশ করা সম্ভব।

বুঝা গেলো, আবুল হাসান আশ‘আরী (রহিঃ) তার বিভ্রান্তি থেকে ফিরে এসে সুন্নী ও সালাফীতে পরিণত হয়েছিলেন। আল্লাহ তাকে পূর্বের বিভ্রান্তির জন্য ক্ষমা করুন। কিন্তু আজও যারা নিজেদেরকে আশ‘আরী পরিচয় দিয়ে তার পূর্বের বিভ্রান্তি ও পদস্খলনের অনুসরণ করে চলেছে, তারা কস্মিনকালেও প্রকৃত আশ‘আরী নয়; বরং তারা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতেই তলিয়ে রয়েছে। প্রকৃত আশ‘আরী তারা, যারা আবুল হাসান আশ‘আরীর হেদায়াতপ্রাপ্তির পরের অবস্থা মেনে চলে। গুরু নিজেকে সংশোধন করলেও শিষ্যরা তা করতে রাযি নয়। সুতরাং প্রচলিত আশ‘আরীরা আদৌ ইমাম আবু হানীফা (রহিঃ)-এর অনুসারী নয়। তাদেরকে আল্লাহ হেদায়াত দান করুন।

চলবে

[1].  ছালেহ ইবনে মুক্ববিল আল-উছায়মী আত-তামীমী, আল-ইমাম আল-আশ‘আরী: হায়াতুহু ওয়া আতওয়ারুহুল আক্বাদিয়্যাহ, (দারুল ফাযীলাহ), পৃঃ ১০৬।

[2]. www.islamweb.net ওয়েবসাইট থেকে সংগৃহীত।

[3]. প্রাগুক্ত।

[4]. মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়া, ৩/২২৮।

[5]. আব্দুর রহমান মাহমূদ, মাওক্বেফু ইবনি তাইমিয়া মিনাল আশা‘এরা, (মাকতাবাতুর রুশদ, রিয়ায, ১ম প্রকাশ: ১৪১৫ হি./১৯৯৫ খৃ.), পৃ: ৩৪৬।

[6]. আব্দুল্লাহ আস-সানাদ, আরাউল মুরজিআ ফী মুছান্নাফাতি শাইখিল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া, (দারুত তাওহীদ, রিয়ায, ১ম প্রকাশ: ১৪২৮ হি./২০০৭ খৃ.), পৃ: ১৪৯-১৫২।

[7]. ইমাম আবুল হাসান আশ-আশ‘আরী, আল-ইবানাহ আন উছূলিদ দিয়ানাহ, তাহক্বীক্ব : ড. ফাওক্বিইয়্যাহ হুসাইন, (কায়রো : দারুল আনছার, ১ম প্রকাশ, ১৩৯৭ হিঃ), পৃঃ ২৭।

[8]. ইমাম আবুল হাসান আশ-আশ‘আরী, রিসালাহ ইলা আহলিছ ছাগার বিবাবিল আবওয়াব তাহক্বীক্ব : আব্দুল্লাহ শাকের আল-জুনাইদী (সঊদী আরব : মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, ১৪১৩ হিঃ), পৃঃ ১৫৫।

[9]. ইমাম আবুল হাসান আশ-আশ‘আরী, মাক্বালাতুল ইসলামিইয়ীন (জার্মানী, দারু ফ্রান্স স্টাইজ, জার্মানী, ৩য় প্রকাশ, ১৪০০ হিঃ/১৯৮০ খৃঃ), পৃঃ ২৯৭।

[10]. যাহাবী, আল-আরশ, (মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, ২য় প্রকাশ: ১৪২৪ হি./২০০৩ খৃ.), ১/৪০০।

[11]. মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ইবনে বায, ৩/৫৩।