ইমাম আবু হানীফা (রহিঃ)-এর আক্বীদা বনাম হানাফীদের আক্বীদা

আব্দুল আলীম ইবনে কাওছার মাদানী

(মার্চ২০ সংখ্যায় প্রকাশিতের পর)

(পর্ব-১১)

আবু মানছূর আল-মাতুরীদী

সম্মানিত পাঠক! আমরা আবুল হাসান আশ‘আরী (রহিঃ)-এর আক্বীদা সম্পর্কে সংক্ষিপ্তভাবে দেখে আসলাম। এবার আসা যাক আবু মানছূর আল-মাতুরীদী প্রসঙ্গে, যার আক্বীদা ধারণ করে আছে আমাদের প্রায় সব হানাফীই।

অত্যন্ত আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, আহলুল কালাম বা মুতাকাল্লিমদের এতো বড় ইমাম হওয়া সত্ত্বেও আবু মানছূর মাতুরীদীর জীবনীর উপর উল্লেখযোগ্য কোনো তথ্য-উপাত্ত পাওয়া না।

 

নাম ও বংশ : যাহোক, তিনি হচ্ছেন আবূ মানছূর, মুহাম্মাদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে মাহমূদ ইবনে মুহাম্মাদ মাতুরীদী, হানাফী, মুতাকাল্লিম। খোরাসানের সমরখন্দ নগরীর একটি এলাকা ‘মাতুরীদ’-এর দিকে সম্বন্ধ করে তাকে মাতুরীদী বলা হয়। তিনি শাখা-প্রশাখাগত মাসআলা-মাসায়েলে হানাফী মাযহাব অবলম্বী ছিলেন এবং এ ব্যাপারে কোনো দ্বিমত পাওয়া যায় না। ‘ইলমুল কালাম’ [1]-এর একজন ইমাম হওয়ার কারণে তাকে ‘আল-মুতাকাল্লিম’ বলা হয়।[2]

 

জন্ম ও মৃত্যু: আবু মানছূর মাতুরীদীর জন্মসাল পাওয়া যায় না। তবে, তার একজন শিক্ষক নুছাইর ইবনে ইয়াহইয়া বালখী (মৃত্যু: ২৬৮ হি.)-এর মৃত্যুসাল অনুযায়ী তার জন্মসাল ২৫৮ হতে পারে বলে অনুমান করা যায়।[3]

বিশুদ্ধ বক্তব্য অনুযায়ী তিনি ৩৩৩ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন এবং সমরখন্দেই তাকে দাফন করা হয়।[4]

 

শৈশব ও শিক্ষা: আবু মানছূর মাতুরীদী কীভাবে বেড়ে উঠেছেন, কীভাবে জ্ঞানার্জন করেছেন, কার কাছে পড়েছেন, পড়ালেখার জন্য কোনো দেশে ভ্রমণ করেছেন কিনা? এসব বিষয়ে তেমন কিছুই পাওয়া যায় না। তবে, তার কয়েক জন্য শিক্ষক ও ছাত্রের নাম জানা যায়।

 

শিক্ষক: তার শিক্ষকদের মধ্যে কয়েকজন হচ্ছেন, (১) মুহাম্মাদ ইবনে মুকাতিল আর-রাযী (মৃত্যু: ৩৪৮ হি.)। কেউ কেউ তাকে মাতুরীদীর শিক্ষক হিসেবে গণ্য করলেও শিক্ষক হিসেবে তার নাম প্রমাণিত হয়নি। (২) নুছাইর ইবনে ইয়াহইয়া বালখী (মৃত্যু: ২৬৮ হি.)। (৩) আবুবকর আহমাদ ইবনে ইসহাক ইবনে ছুবাইহ জাওযাজানী, বাগদাদী, হানাফী (মৃত্যু: ২০০ হি. আনুমাণিক)। (৪) আবু নাছর, আহমাদ ইবনে আব্বাস ইবনে হুসাইন ইবনে জাবালা সামারকান্দী।

শায়খ শামসুদ্দীন আফগানী[5] (মৃত্যু: ১৪২০ হি.) বলেন, আমার কাছে প্রমাণিত হয়েছে, মাতুরীদীর কিছু শিক্ষক ‘যঈফ’, কিছু ‘মাজহূল’ এবং কিছু আল্লাহভীরু ও ফক্বীহ হওয়া সত্ত্বেও কট্টরপন্থী মুকাল্লিদ। আমার কাছে আরো স্পষ্ট হয়েছে যে, তার শিক্ষকম-লীর হাদীছ ও মুহাদ্দিছগণের সাথে কোনো সম্পর্ক ছিলো না। আর এটা খুব স্বতঃসিদ্ধ কথা যে, শিক্ষকদের প্রভাব ছাত্রদের উপর পড়েই। আবু মানছূর মাতুরীদীর বেলায়ও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি।[6]

ছাত্র: আবু মানছূর মাতুরীদীর ছাত্রদের মধ্যে কয়েকজন হচ্ছেন, (১) আবুল কাসেম, ইসহাক ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাঈল ইবনে ইবরাহীম আস-সামারকান্দী (মৃত্যু: ৩৪২ হি.)। (২) আবু মুহাম্মাদ, আব্দুল কারীম ইবনে মূসা ইবনে ঈসা আল-বাযদাবী (মৃত্যু: ৩৯০ হি.)। (৩) আবুল হাসান আলী ইবনে সাঈদ আর-রুসতুগফানী। (৪) আবু ইছমাত ইবনে আবুল লায়ছ আল-বুখারী।

শায়খ শামসুদ্দীন আফগানী বলেন, মাতুরীদীর ছাত্রদের জীবনী বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাদের কেউ কেউ ‘মাজহূল’, কেউ কেউ বড় বড় আহলুল কালাম ও ফক্বীহ, কেউ কেউ আহলুল কালাম ও ছূফী। তাদের উস্তাদ আবু মানছূর মাতুরীদীর মতো হাদীছ ও মুহাদ্দিছগণের সাথে তাদের কোনো যোগসূত্র ছিলো না। মূলতঃ এভাবেই ‘কালাম শাস্ত্র’ তার ধারক-বাহকদের নিয়ে খেলে থাকে। যাহোক, মাতুরীদীর এসব ছাত্র তাদের উস্তাদের আক্বীদা ধারণ করেন, লালন করেন, এর প্রচার ও প্রসার ঘটান এবং এর উপর বই-পুস্তক রচনা করেন। ফলে ঐসব অঞ্চলে মাতুরীদী আক্বীদা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।[7]

ইলমী দক্ষতা: আবু মানছূর মাতুরীদী প্রখর মেধার অধিকারী ছিলেন। বাহাছ-মুনাযারায় ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ। এতে দলীল ও যুক্তি যা পেশ করতেন, তার বেশীরভাগ থাকতো বিভ্রাট। তাফসীর, ফিক্বহ, উছূলে ফিক্বহ, ইলমুল কালাম সহ ইলমের বিভিন্ন শাখায় তার পদচারণা ছিলো। আরবী ভাষা ও সাহিত্যেও তিনি ছিলেন অনেক দক্ষ। তবে, ইলমুল কালাম বা কালাম শাস্ত্রে তার পাণ্ডিত্য ছিলো সবচেয়ে বেশী। সেকারণে তার সব লেখনীতে এর গন্ধ পাওয়া যায়। এমনকি তার প্রণীত তাফসীর দেখেও মনে হবে যে, এটা ইলমুল কালামের বই; তাফসীরের নয়।

ইলমে হাদীছ বা হাদীছ শাস্ত্রের সাথে তার কোনো সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায় না। সেকারণে আল্লাহর ছিফাত বা গুণাবলি, ঈমান সহ আক্বীদার বহু বিষয়ে তিনি সালাফে ছালেহীনের পথ পাননি। বরং ইমাম আবু হানীফা (রহিঃ) সহ অন্যান্য সালাফে ছালেহীনের পথ থেকে তিনি ছিলেন বিচ্যুত। সেকারণে আল্লাহর অনেক ছিফাতকে তিনি অস্বীকার করেছেন এবং ছিফাত সংশ্লিষ্ট অনেক আয়াত-হাদীছের অপব্যাখ্যা করেছেন।

আবু মানছূর মাতুরীদী প্রণীত গ্রন্থসমূহ : প্রিয় পাঠক! আবু মানছূর মাতুরীদী বিভিন্ন শাস্ত্রে বহু গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন। কিন্তু তার জীবনী নিয়ে আমরা যেমন অবহেলা-অবজ্ঞা ও অনাদর দেখে এসেছি, তেমনি তার বই-পুস্তকের ব্যাপারেও যথেষ্ট অনাদর-অবজ্ঞা পরিলক্ষিত হয়। সেকারণে তার বহু গ্রন্থের মধ্যে কেবল দু’টি গ্রন্থ ছাপা হয়েছে: ‘আত-তাওহীদ’ গ্রন্থটি এবং তাফসীর গ্রন্থটির অংশবিশেষ। আবুল মুঈন নাসাফী ‘তাবছিরাতুল আদিল্লাহ’ বইয়ে তার ১৩ টি গ্রন্থের তালিকা পেশ করেছেন। সেগুলো হচ্ছে-

ইলমুল কালাম বা কালাম শাস্ত্রে: ১. ‘আত-তাওহীদ’, ২. ‘আল-মাক্বালাত’।

বিভিন্ন ফিরক্বার জবাবে: ৩. ‘রদ্দু আওয়াইলিল আদিল্লাহ লিল কা‘বী’, ৪. ‘রদ্দু তাহযীবিল জাদাল লিল কা‘বী’, ৫. ‘রদ্দু ওয়াঈদিল ফুসসাক্ব লিল কা‘বী’, ৬. ‘রদ্দুল উছূলিল খামসাহ লিআবী উমার আল-বাহিলী’, ৭. ‘বায়ানু ওয়াহমিল মু‘তাযিলাহ’, ৮. ‘রদ্দুল ইমামাহ লিবা‘যির রওয়াফিয’, ৯. ‘আর-রদ্দু আলা উছূলি মাযহাবিল ক্বরামিতাহ’, ১০. ‘আর-রদ্দু আলা ফুরূঈ মাযহাবিল ক্বরামিতাহ’।

তাফসীর শাস্ত্রে: ১১. ‘তা’বীলাতু আহলিস সুন্নাহ’ বা ‘তা’বীলাতুল কুরআন’।

উছূলে ফিক্বহে: ১২. ‘মাআখিযুশ শারঈ’, ১৩. ‘কিতাবুল জাদাল’।

মুদ্রিত বই দুটির সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ : আমরা একটু আগেই দেখে আসলাম, আবু মানছূর মাতুরীদীর মাত্র দু’টি গ্রন্থ ছাপা হয়েয়ে: ১. ‘আত-তাওহীদ’ ও ২. ‘তা’বীলাতু আহলিস সুন্নাহ’।

‘আত-তাওহীদ’ কিতাবটি ১৯৭৯ খৃস্টাব্দে ড. ফাতহুল্লাহর তাহক্বীক্বে ছাপা হয়। অনেক সময় নামের মধ্যে পরিচয় পাওয়া যায় না। ‘আত-তাওহীদ’ গ্রন্থটির ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। এ বইটির বেশীর ভাগ অংশ জুড়ে রয়েছে তাওহীদুর রুবূবিয়্যাহর আলোচনা। সাথে তাওহীদুল আসমা ওয়াছ-ছিফাত নিয়ে সামান্য কিছু কথাও এসেছে। তবে, উক্ত দুই প্রকার তাওহীদ সহ যে তাওহীদের জন্য নবী-রাসূলগণ (আঃ)-এর আগমন, যার জন্য আসমানী কিতাবসমূহের অবতরণ, যে তাওহীদের জন্য মানব ও জিন জাতির সৃজন, সেই তাওহীদুল উলূহিয়্যাহ নিয়ে এখানে কোনো আলোচনাই নেই। বরং এতে আল্লাহর বহু ছিফাতকে অকেজো করার এবং ছিফাত সম্পর্কিত অনেক আয়াতের অপব্যাখ্যার অপচেষ্টা করা হয়েছে। তাওহীদের নামে তাওহীদের বাইরের জিনিস ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে তাওহীদের এ বইটিতে। মূলতঃ যুগে যুগে আহলুল কালাম বা কালাম শাস্ত্রের ধারক-বাহকদের এমনই অবস্থা হয়ে থাকে।

মাতুরীদীর তাফসীরগ্রন্থটির নাম ‘তা’বীলাতু আহলিস সুন্নাহ’। এর ১ম খণ্ড ১৩৯১ হিজরীতে কায়রোতে ছাপা হয়। সূরা আল-ফাতিহা ও সূরা আল-বাক্বারার তাফসীর ছাপা হয় বাগদাদে ১৪০৪ হিজরীতে। এর পূর্ণাঙ্গ পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায়। মাতুরীদীরা এই তাফসীরকে চূড়ান্ত মর্যাদা দেয় এবং এর ভূয়সী প্রশংসা করে। নাসাফী বলেন, كِتَابٌ لَا يُوَازِيْهِ فِيْ فَنِّهِ كِتَابٌ، بَلْ لَا يُدَانِيْهِ شَيْءٌ مِنْ تَصَانِيْفِ مَنْ سَبَقَهُ ‘তাফসীরশাস্ত্রে এর মতো কোনো কিতাব নেই। বরং এ শাস্ত্রের এর আগের কোনো বই এর ধারেকাছেও আসতে পারবে না’।[8]

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, আল্লাহর ছিফাত সম্পর্কিত আয়াতগুলোকে জাহমিয়্যারা যেভাবে অকেজো ও অপব্যাখ্যা করেছে, সেই অকেজো-অপব্যাখ্যা এখানেও স্থান পেয়েছে।[9]

 

হানাফী মাতুরীদীদের নিকট আবু মানছূর মাতুরীদীর মর্যাদা : মাতুরীদের নিকট আবু মানছূর মাতুরীদীর সম্মান, মর্যাদা ও অবস্থান অনেক ঊর্ধ্বে। তারা তার প্রশংসা করতে গিয়ে সীমালঙ্ঘন ও অতিরঞ্জন করে ফেলেছে। সত্য বলতে আহলুল কালামের ধ্বজাধারীরা সর্বযুগে তাদের আলেম ও নেতাদের বেলায় বাড়াবাড়ি করে বিরাট বিরাট চটকদার সব উপাধি ব্যবহার করে থাকে। আবু মানছূর মাতুরীদীর ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। তাকে ‘ইমামুল হুদা’ (হেদায়াতের ইমাম), ‘আলামুল হুদা’ (হেদায়াতের ঝাণ্ডা/প্রাণপুরুষ), ‘ইমামুল মুতাকাল্লিমীন’ (মুতাকাল্লিমদের ইমাম), ‘মুছাহহিহু আকাঈদিল মুসলিমীন’ (মুসলিমদের আক্বীদা সংস্কারক), ‘রঈসু আহলিস সুন্নাহ’ (আহলুস সুন্নাতের নেতা), ‘নাছিরুস সুন্নাহ’ (সুন্নাতের রক্ষক), ‘ক্বমি‘উল বিদ‘আহ’ (বিদ‘আত মূলোৎপাটনকারী), ‘মুহয়ুশ শারী‘আহ’ (শরী‘আতের জীবনদানকারী), ‘কুদওয়াতু আহলিস সুন্নাতি ওয়াল ইহতিদা’ (সুন্নাত ও হেদায়াতপ্রাপ্তদের আদর্শ), ‘রফি‘উ আ‘লামিস সুন্নাতি ওয়াল জামা‘আহ’ (আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের ঝা-ণ্ডা উত্তোলনকারী), ‘ক্বলি‘উ আযালীলিল ফিতনাতি ওয়াল বিদ‘আহ’ (ফিতনা ও বিদ‘আতের ভ্রষ্টতা নির্মূলকারী), ‘শায়খুল ইসলাম’, ‘ইমামু আহলিস সুন্নাহ’ (আহলুস সুন্নাতের ইমাম), ‘মাহদিইয়ু হাযিহিল উম্মাহ ফী ওয়াক্তিহী’ (তার সময়ে এই উম্মতের মাহদী) ইত্যাদি উপাধিতে তাকে ভূষিত করা হয়েছে।[10]

এসব উপাধি উল্লেখ করার পর শায়খ শামসুদ্দীন আফগানী (রহিঃ) বলেন, হক্ব কথা বলতেই হবে, হক্ব কথা হচ্ছে, মাতুরীদীর এই উচ্ছ্বসিত প্রশংসা ও অতিরঞ্জিত উপাধিগুলো আসলে বাস্তবতাকে উল্টিয়ে দেওয়ার জন্য। মাতুরীদীর ব্যাপারে বাস্তব ও সর্বোচ্চ যেটা বলা যায়, তা হচ্ছে, তিনি একজন বড় আলেম, ফিক্বহে একজন হানাফী, কট্টরপন্থী মুতাকাল্লিম। আল্লাহর ছিফাত সমূহের ক্ষেত্রে তার মানহাজ ‘তাফবীয’ (التفويض) [11] , ‘তা‘ত্বীল’ (التعطيل) [12]– ও ‘তাহরীফ’ (التحريف) -এর মধ্যে ঘুরপাক খায়। ইলমে হাদীছের সাথে তার সম্পর্ক ছিলো না। আল্লাহর ছিফাত সমূহের ক্ষেত্রে তিনি আহলুস সুন্নাহর পথ থেকে, বিশেষ করে আবু হানীফা (রহিঃ)-এর পথ থেকে তিনি ছিলেন বহু দূরে।

হ্যাঁ, তিনি জাহমিয়্যাহ, মু‘তাযিলার মত কিছু বাতিল ফিরক্বার মতবাদকে খণ্ডন করার চেষ্টা করেছেন; কিন্তু এসব খণ্ডনের বেশীর ভাগ তার নিজের ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে চলে গেছে। কারণ এটা করতে গিয়ে তিনি এবং তার অনুসারীরা আল্লাহর অনেক ছিফাতকে অস্বীকার করে ফেলেছেন। আর ইতিপূর্বে আমরা দেখে এসেছি যে, আল্লাহর অনেক ছিফাতকে অস্বীকারের পাশাপাশি তিনি ছিফাত সংশ্লিষ্ট অনেক আয়াত-হাদীছের অপব্যাখ্যা করেছেন। পরবর্তীতে এর উপর আমি উদাহরণ পেশ করার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।

প্রিয় পাঠক! এই যার অবস্থা তিনি কীভাবে উপর্যুক্ত উপাধিগুলোর জন্য উপযুক্ত বিবেচিত হতে পারেন?! তিনি আহলুল কালামের অনুসারীদের ইমাম হতে পারেন। কিন্তু খাঁটি আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের ইমাম কখনও নন।[13] মহান আল্লাহ আমাদেরকে সব সময় হক্ব বুঝার তাওফীক্ব দান করুন।

(চলবে)

[1]. ইতিপূর্বে আমরা দেখেছি যে, ইলমুল কালামের অপর নাম ‘ইলমুল মানতিক্ব’। আক্বীদা বা ধর্মবিশ্বাসের ক্ষেত্রে দর্শন বা যুক্তিবিদ্যা ভিত্তিক আলোচনা বা গবেষণাকে ‘ইলমুল কালাম’ বা ‘ইলমুল মানতিক্ব’ বলা হয়। এতে কুরআন-সুন্নাহর দলীলের উপর বিবেককে প্রাধান্য দিয়ে আক্বীদা সম্পর্কিত বিষয়াবলি সাব্যস্ত করা হয়। এটা এক ধরনের মন্দ ইলম, যার চর্চা মোটেও কল্যাণকর নয়। আর ইলমুল কালাম অনুযায়ী আক্বীদা-বিশ্বাস পোষণ করলে বিভ্রান্তি সুনিশ্চিত। যে ব্যক্তি ইলমুল কালাম অনুযায়ী আক্বীদা-বিশ্বাস পোষণ করে, তাকে ‘আহলুল কালাম’ বা ‘মুতাকাল্লিম’ বলা হয়।

[2]. বিস্তারিত দ্রষ্টব্য: আদাউল মাতুরিদিয়্যাহ লিল আক্বীদাতিস সালাফিয়্যাহ, ১/২৩৪-২৩৫ (পাদটীকা সহ)।

[3]. প্রাগুক্ত, ১/২৩৭।

[4]. প্রাগুক্ত, ১/২৩৮-২৩৯।

[5].  শায়খ শামসুদ্দীনের নাম ও বংশ এরকম: আবু আব্দিল্লাহ, শামসুদ্দীন ইবনে মুহাম্মাদ আশরাফ ইবনে কায়ছার ইবনে আমীর জামাল আফগানী। তিনি ১৩৭২ হিজরীতে আফগানিস্তানে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলায় তার পিতার কাছেই তার লেখাপড়ার হাতে খড়ি। তার কাছে তিনি কুরআন, নাহু-ছরফ ও হানাফী ফিক্বহ শিখেন। এরপর তিনি আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেন। সবশেষে মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লীসান্স, মাস্টার্স ও পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেন। তিনি ৪০-এর অধিক মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেন। প্রথমে তিনি মাতুরীদী আক্বীদায় বিশ্বাসী থাকলেও পরবর্তীতে সালাফী আক্বীদায় ফিরে আসেন এবং সালাফী দাওয়াতের সৈনিক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। পেশাওয়ারে ‘আল-জামি‘আহ আল-আছারিয়্যাহ’ প্রতিষ্ঠা করেন। মাত্র ৪৮ বছর বয়সে ১৪২০ হিজরীতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন

মাতুরীদী আক্বীদার উপর তার বিস্তর গবেষণা রয়েছে। ‘আদাউল মাতুরীদিয়্যাহ লিলআক্বীদাতিস সালাফিয়্যাহ’ গ্রন্থখানা সেই গবেষণারই একটি নমুনা। গ্রন্থটি মূলত মাস্টার্স গবেষণা অভিসন্দর্ভ, যা ৩ খেণ্ডে ও প্রায় ২০০০ পৃষ্ঠায় সমাপ্ত। আবু মানছূর মাতুরীদীর জীবনী ও আক্বীদা লিখতে গিয়ে তিনি সম্ভাব্য সব রেফারেন্সগ্রন্থ চষে বেড়িয়েছেন। সেকারণে আমি এ ব্যাপারটিতে উপর্যুক্ত গ্রন্থটিকে খুবই বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য মনে করে এখান থেকেই বেশীরভাগ তথ্য নিয়েছি।

[6]. প্রাগুক্ত, ১/২৪৬-২৫০।

[7]. প্রাগুক্ত, ১/২৫১-২৫৫।

[8]. আব্দুল কাদের আল-হানাফী, আল-জাওয়াহিরুল মুযিয়্যাহ ফী ত্ববাক্বাতিল হানাফিয়্যাহ, (মীর মুহাম্মাদ কুতুবখানা, করাচী, তা.বি.), ২/১৩০।

[9]. প্রাগুক্ত, ১/২৫৬-২৬০।

[10]. এসব অতিরঞ্জিত উপাধি তাদেরই বই-পুস্তকে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব রেফারেন্স জানতে দেখুন: আদাউল মাতুরীদিহয়্যাহ, ১/২৬১-২৬২।

[11]. শব্দের অর্থ না জানার দাবী করে আল্লাহর দিকে এর অর্থ জানার বিষয়টি ঠেলে দিয়ে কেবল শব্দটিকে সাব্যস্ত করার নাম ‘তাফবীয’। যেমন- মহান আল্লাহ বলেন,الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى ‘পরম করুণাময় আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন’ (ত্বহা, ২০/৫)। যারা ‘মুফাওবিযাহ’ বা তাফবীযে বিশ্বাসী, তারা বলে, আমরা এর অর্থ জানি না, এর দ্বারা আল্লাহর কী উদ্দেশ্য, তাও জানি না। তাদের একথা মোটেও ঠিক নয়। বরং এর অর্থ উলামায়ে কেরাম জানেন। তবে, তারা যেটা জানেন না, সেটা হচ্ছে এর ‘কাইফিয়্যাহ’ (كيفية) বা ধরন। সুতরাং আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের আক্বীদা হচ্ছে, তারা আল্লাহর ছিফাত সমূহের ধরন জানার দাবী করে না; বরং ধরন জানার বিষয়টি আল্লাহর দিকে ন্যস্ত করে। কিন্তু তারা অর্থ জানে, মানে, মানুষকে বলে। তা না হলে আল্লাহ কেন আমাদেরকে কুরআন গবেষণা করতে বললেন, যদি অর্থই জানা না যাবে?!

[12]. মহান আল্লাহ নিজের জন্য যেসব নাম ও গুণ সাব্যস্ত করেছেন, সেগুলো পুরোপুরি বা আংশিক অস্বীকার করাকে ‘তা‘ত্বীল’ বলে। আর ‘তাহরীফ’ হচ্ছে, সঠিক অর্থকে অস্বীকার করে সেখানে ভুল অর্থ ঢুকিয়ে দেয়া। এদিকে ‘তা‘ত্বীল’ হচ্ছে, ভুল অর্থ না ঢুকিয়ে শুধু সঠিক অর্থকে অস্বীকার করা। এই হলো ‘তাহরীফ’ এবং ‘তা‘ত্বীল’-এর মধ্যে পার্থক্য। দু’টোই আল্লাহর উপর চরম সীমালঙ্ঘন।

[13]. এসব অতিরঞ্জিত উপাধি তাদেরই বই-পুস্তকে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব রেফারেন্স জানতে দেখুন: আদাউল মাতুরীদিহয়্যাহ, ১/২৬১-২৬২।