ইমাম আবু হানীফা (রহিঃ) -এর আক্বীদা বনাম হানাফীদের আক্বীদা

আব্দুল আলীম ইবনে কাওছার মাদানী

* বি. এ. (অনার্স), উচ্চতর ডিপ্লোমা, এম. এ এবং এম.ফিল,
মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়,সঊদী আরব;
অধ্যক্ষ, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ। 

(পর্ব-১২)

আবু মানছূর মাতুরীদীর আক্বীদা:

আক্বীদার উৎস:

আক্বীদার উৎস একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ এর উপর কারো আক্বীদা ঠিক নাকি বেঠিক তা নির্ভর করে। আমরা ইতিপূর্বে ইমাম আবু হানীফা (রহিঃ)-এর আক্বীদার উৎস দেখে এসেছি। দেখেছি যে, ইমাম আবু হানীফা (রহিঃ) -এর নিকট সাধারণভাবে দ্বীনের সব বিষয় এবং বিশেষভাবে আক্বীদা সংক্রান্ত বিষয়ে কিতাব ও ছহীহ হাদীছই ছিলো মূল উৎস। তিনি বলেন, ‘আমি আল্লাহর কিতাব ধারণ করি। যা (সেখানে) না পাই, তা  রাসূল (ছাঃ) -এর সুন্নাত থেকে গ্রহণ করি। যা আল্লাহর কিতাব ও রাসূল (ছাঃ) -এর সুন্নাতে না পাই, তা ছাহাবায়ে কেরামের বক্তব্য থেকে গ্রহণ করি। তাদের মধ্যে যার কথা মনে চাই গ্রহণ করি, যার কথা মনে চাই না গ্রহণ করি না। তবে তাদের কথা রেখে অন্য কারো কথা গ্রহণ করি না’।[1] মোদ্দাকথা, ইমাম আবু হানীফা (রহিঃ) -এর নিকট সাধারণভাবে দ্বীনের সব বিষয় এবং বিশেষভাবে আক্বীদা সংক্রান্ত বিষয়ে শারঈ দলীলের ক্রমধারা এরকম: কুরআন মাজীদ, অতঃপর ছহীহ হাদীছ, অতঃপর ছাহাবায়ে কেরামের বক্তব্য। আর ইমাম আবু হানীফা (রহিঃ) -এর ছাহাবায়ে কেরামের বক্তব্য ছেড়ে অন্য দিকে না যাওয়ার পেছনে কারণ হচ্ছে, তারা ছিলেন যাবতীয় বিদ‘আতমুক্ত এবং তাদের অন্তর ও নিয়্যত ছিলো পরিচ্ছন্ন। তাছাড়া তারা অহি অবতীর্ণ হতে দেখেছেন।

কিন্তু মাতুরীদী ও তার অনুসারীদের আক্বীদার উৎস সম্পূর্ণ এর ব্যতিক্রম। তাদের আক্বীদার উৎস ও ইমাম আবু হানীফা (রহিঃ) -এর আক্বীদার উৎসের মধ্যে রয়েছে আকাশপাতাল তফাৎ। মাতুরীদীরা আক্বীদা গ্রহণের ব্যাপারে অহি তথা কিতাব ও সুন্নাহকে ধারণ করেনি। বরং আক্বল (العقل) তথা বুদ্ধি ও যুক্তির উপর নির্ভর করেছে। মাতুরীদীদের নিকট আক্বীদার বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মূল উৎস হচ্ছে, আক্বল (العقل) তথা বুদ্ধি ও যুক্তি। কারণ তাদের নিকট বুদ্ধিবৃত্তিক (العقليات) দলীল হচ্ছে অকাট্য আর কুরআন-হাদীছের বক্তব্য (السمعيات/النقل) হচ্ছে অনুমাননির্ভর। একারণে বুদ্ধিবৃত্তিক (العقليات) দলীল যদি কুরআন-হাদীছের বক্তব্য (السمعيات/النقل)-এর সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে তারা বুদ্ধিবৃত্তিক দলীলকে প্রাধান্য দেয় আর কুরআন-হাদীছের বক্তব্যের হয় অপব্যাখ্যা করে, না হয় তার অর্থ জানার ব্যাপারটি কেবল আল্লাহর দিকে ছেড়ে দেয় (التفويض)।[2]মাতুরীদী নিজেই একথা স্বীকার করে বলেন, أَصْلُ مَا يُعْرَفُ بِهِ الدِّيْنُ وَجْهَانِ: أَحَدُهُمَا السَّمْعُ وَالْآخَرُ العَقْلُ‘যা দিয়ে দ্বীন জানা যায়, তা আসলে দু’টি: (১) আস-সাম‘উ বা কুরআন-হাদীছের বক্তব্য, (২) আল-আক্বলু বা বিবেক-বুদ্ধি’।[3]  আরেকজন মাতুরীদী আলেম মাতুরীদী যাবীদী বলেন, وَهُوَ أَنَّ الشَّرْعَ إِنَّمَا ثَبَتَ بِالْعَقْلِ‘শরী‘আত কেবল আক্বল বা বিবেক দ্বারা সাব্যস্ত হয়’।[4]

উল্লেখ্য, মাতুরীদীরা উৎসবিবেচনায় উছূলুদ্দীনকে দুই ভাগে ভাগ করে: (১) আক্বলিয়্যাত (العقليات), (২) সাম‘ইয়্যাত (السمعيات)। যা জানার একমাত্র উপায় হচ্ছে কুরআন, হাদীছ বা আছারে বর্ণিত বক্তব্য এবং যেখানে বুদ্ধি ও যুক্তির কোনো অবকাশ নেই, তাকে সাম‘ইয়্যাত বলে।[5] আর যা জানার মাধ্যম হচ্ছে আক্বল (العقل) তথা বুদ্ধি ও যুক্তি, তাকে আক্বলিয়্যাত বলে।  যেটাকে মাতুরীদীরা আক্বলিয়্যাত বলে, তাদের নিকট সেটার উৎস হচ্ছে, আক্বল (العقل) তথা বুদ্ধি ও যুক্তি আর কুরআন-হাদীছের বক্তব্য (النقل) হচ্ছে, এর অনুগামী। আল্লাহর তাওহীদ ও গুণাবলির বেশিরভাগ আলোচনায় তাদের এই নীতি চলে। আর যাকে তারা সাম‘ইয়্যাত বলে, তাদের নিকট সেটার উৎস হচ্ছে, কুরআন-হাদীছের বক্তব্য (النقل) আর আক্বল (العقل) তথা বুদ্ধি ও যুক্তি হচ্ছে এর অনুগামী। [6]

মাতুরীদীরা আল্লাহর গুণাবলিকে রূপক অর্থে গ্রহণ করে। তাছাড়া তারা ‘খবরে ওয়াহেদ’ বা মুতাওয়াতিরের বাইরের হাদীছকে আক্বীদার ক্ষেত্রে দলীল হিসাবে গ্রহণ করে না।[7]

তাদের নিকট সূত্র হচ্ছে, অহির বক্তব্য যদি সম্ভবপর হয় এবং বিবেকবিরোধী না হয়, তাহলে তার ভিন্ন ব্যাখ্যা করা চলবে না। যেমন- পুনরুত্থান, হাশর-নাশর, জান্নাতের সুখ, জাহান্নামের আযাব। পক্ষান্তরে অহির বক্তব্য যদি অসম্ভব হয় এবং বিবেকবিরোধী হয়, তাহলে অবশ্যই তার ভিন্ন অর্থ করতে হবে। যেমন- ‘উলুউল্লাহ বা আল্লাহর উপরে অবস্থান, তার আরশের উপর সমুন্নত হওয়া, রাতের শেষ-তৃতীয়াংশে দুনিয়ার আসমানে অবতরণ।[8]

কিন্তু মানুষের বিবেক কি কখনও শরী‘আতের মাপকাঠি হতে পারে? এর মাধ্যমে কি কখনও আক্বীদা সাব্যস্ত করা গ্রহণযোগ্য হতে পারে? অবশ্যই না; বরং ‘দ্বীনের সকল বিষয়ের ন্যায় আকীদার ক্ষেত্রেও মূল ভিত্তি হলো কুরআন কারীম, সহীহ হাদীস এবং এরপর সাহাবীগণের মত। আকীদা ও ফিকহের মৌলিক পার্থক্য হলো, ফিকহের ক্ষেত্রে ইজতিহাদ, কিয়াস, যুক্তি বা আকলী দলীলের প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু আকীদার ক্ষেত্রে এর কোনো সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে কুরআন, সুন্নাহ ও সাহাবীগণের অনুসরণই একমাত্র করণীয়। কারণ ফিকহের বিষয়বস্তু পরিবর্তনশীল। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বা সাহাবীগণের যুগে ছিল না এমন কোনো নতুন বিষয়ে ফিকহী মত জানার প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু আকীদার বিষয়বস্তু মহান আল্লাহর সত্তা, গুণাবলি, নবী-রাসূলগণ… ইত্যাদি। এগুলো অপরিবর্তনীয়। এক্ষেত্রে মুমিনের একমাত্র দায়িত্ব রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)  ও সাহাবীগণের আকীদা জানা ও মানা’।[9]

আবুল মুযাফফর আস-সাম‘আনী (রহিঃ) বলেন, ‘জেনে রাখুন, আমাদের মধ্যে ও বিদ‘আতীদের মধ্যে পার্থক্যকারী বিষয় হলো, আক্বল বা বিবেক সম্পর্কিত বিষয়। তারা তাদের দ্বীনকে আক্বলের উপর প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং কুরআন-হাদীছের বক্তব্য ও তার অনুসরণকে বিবেকের অনুগামী করেছে। কিন্তু আহলুস সুন্নাহ বলে, দ্বীনের মূল হচ্ছে অনুসরণ আর বিবেক তার অনুগামী। দ্বীনের মূল ভিত্তি যদি বিবেকের উপর প্রতিষ্ঠিত হতো, তবে মানুষের অহি ও নবী-রাসূলগণ (আঃ)-এর প্রয়োজন পড়তো না, শরী‘আতের আদেশ-নিষেধ অকেজো হয়ে যেতো এবং যার যা ইচ্ছা সে তাই বলতো।[10]

ইমাম শাত্বেবী (রহিঃ) বলেন, ‘শরী‘আত স্পষ্ট বর্ণনা করেছে যে, নবী-রাসূলগণ (আঃ)-এর যবানীতে আল্লাহ দ্বীনের ব্যাপারে যে বিধিবিধান দিয়েছেন, তা ছাড়া বান্দার উপর আল্লাহর অন্য কোনো হুকুম হতে পারে না। একারণেই মহান আল্লাহ বলেছেন, وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّى نَبْعَثَ رَسُولاً‘আর রাসূল না পাঠানো পর্যন্ত আমি কাউকে শাস্তি দেই না’ (আল-ইসরা, ১৭/১৫)।…কিন্তু এই মূলনীতি থেকে একটি দল বের হয়ে গেছে; তারা মনে করেছে, শরী‘আতের বিধিবিধানে আক্বলের অবকাশ রয়েছে। আক্বল ভালোও বলতে পারে, মন্দও বলতে পারে। এভাবে তারা আল্লাহর দ্বীনের মধ্যে বিদ‘আত সৃষ্টি করে ফেলেছে, যা দ্বীনের ভেতর ছিলো না’।[11]

ইবনু আবিল ইয হানাফী (রহিঃ)  বলেন, ‘কুরআন-হাদীছের দলীল থাকা সত্ত্বেও যারা নিজেদের মন মতো কথা বলে অথবা বিবেক দিয়ে দলীলের বিরুদ্ধাচরণ করে, তারা ইবলীসের সমতুল্য। কারণ সেও তার রবের আদেশের কাছে আত্মসমর্পণ করেনি; বরং বুদ্ধি খাঁটিয়ে বলেছে,أَنَاخَيْرٌمِنْهُخَلَقْتَنِيمِنْنَارٍوَخَلَقْتَهُمِنْطِينٍ‘আমি তার চেয়ে উত্তম। আপনি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন আর তাকে সৃষ্টি করেছেন কাদামাটি থেকে’ (আল-আ‘রাফ, ৭/১২)।…মহান আল্লাহ নিজের কসম করে বলেছেন, তারা ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না তারা তার নবী (ছাঃ)-কে ফায়ছালাকারী মেনে তার ফায়ছালায় সন্তুষ্ট থাকবে ও আত্মসমর্পণ করবে।[12]

কিন্তু তার মানে এই নয় যে, ইসলাম বিবেক (العقل)-কে অবজ্ঞা করেছে। কখনই নয়; বরং এর দ্বারা ইলম ও আমল পূর্ণতা পায়। তবে কস্মিনকালেও বিবেক (শরী‘আতের ক্ষেত্রে) স্বতন্ত্র হতে পারে না।[13]  সাফফারীনী (রহিঃ) বলেন, হক্ব ও এর বিধিবিধান সম্পর্কে জানার ব্যাপারে বিবেক যদি স্বতন্ত্র হতো, তবে রাসূলগণ (আঃ)–কে পাঠানো ও কিতাবসমূহ নাযিল করার পূর্বেই মানুষের উপর দলীল বিদ্যমান থাকতো। অথচ মহান আল্লাহ বলছেন,وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّى نَبْعَثَ رَسُولاً ‘আর রাসূল না পাঠানো পর্যন্ত আমি কাউকে শাস্তি দেই না’ (আল-ইসরা, ১৭/১৫)।[14]  সেজন্য আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত আক্বলকে প্রত্যাখ্যান করেনি। বরং গায়েবী বিষয় ছাড়া অন্য বিষয়ে তারা একে ব্যবহার করেছে এবং তাদের এই ব্যবহারের পরিধি সংকীর্ণ। তাছাড়া তারা আক্বল দিয়ে শরী‘আতের কোনো হুকুম সাব্যস্ত করেনি।[15]  মনে রাখতে হবে, কুরআন, হাদীছ ও ইজমায় এমন কিছু নেই, যা সুস্থ বিবেকের বিরোধী হতে পারে।[16]

আবু মানুছূর মাতুরীদী কি আবুল হাসান আশআরীর কাছ থেকে আক্বীদা নিয়েছেন?

আমরা আগে দেখে এসেছি যে, আশ‘আরী-মাতুরিদীরা আক্বীদা ও মানহাজের ক্ষেত্রে প্রায় একই। বলা চলে, তারা একই মুদ্রার এপিঠ ও ওপিঠ। তাহলে কি আবু মানছূর মাতুরীদী আবুল হাসান আশ‘আরী (রহিঃ) -এর কাছ থেকে আক্বীদা নিয়েছেন? এর জবাব হচ্ছে, না, নেননি। কারণ-

১. কোনো বই-পুস্তকে পাওয়া যায়া না যে, মাতুরীদী বাগদাদে গিয়েছেন, বা আশ‘আরীর সাথে যোগাযোগ করেছেন, বা তার কাছে আশ‘আরীর কোনো বই পৌঁছেছে, অথবা আশ‘আরীর কোনো ছাত্র মাতুরীদীর সাথে যোগাযোগ করেছেন।

২. ৩৮০ হিজরীর আগে আশ‘আরী (মৃত্যু: ৩২৪ হি.)-এর আক্বীদা বিস্তার লাভ করেনি, এমনকি ইরাকেও নয়। এরপরে ইরাক সহ বিভিন্ন জায়গায় তার আক্বীদা ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে বানু আইয়ূব তাদের শাসনামলে মানুষদেরকে এ আক্বীদা গ্রহণে বাধ্য করলে এর বিস্তার ঘটে বেশি। যাহোক, ৩৮০ হিজরীর আগে আশ‘আরী আক্বীদা যদি খোদ ইরাকেই বিস্তৃতি লাভ না করে, তাহলে এটা কল্পনাতীত যে, তা ঐ সময় সমরখন্দ পৌঁছেছে এবং মাতুরীদী (মৃত্যু: ৩৩৩ হি.) তা গ্রহণ করেছেন।

৩. মাতুরীদীরা তাদের বিভিন্ন বই-পুস্তকে স্পষ্টভাবে বলেছে যে, আবু মানছূর মাতুরীদী আবুল হাসান আশ‘আরী (রহিঃ) -এর অনুসারী নয়।[17]

তবে কি ইবনে কুল্লাবের কাছ থেকে নিয়েছেন?

কুল্লাবিয়্যারা কালামশাস্ত্রনির্ভর সিনিয়র ফিরক্বা হিসাবে এবং তাদের আক্বীদার সাথে মাতুরীদীদের কিছু আক্বীদার মিল থাকায় এই প্রশ্নের অবতারণা। এর জবাব হচ্ছে, মাতুরীদী ইবনে কুল্লাবের কাছ থেকে সরাসরি কিছু নেননি। কারণ ইবনে কুল্লাব মাতুরীদীর জন্মের (জন্ম: ২৫৮ হি.) প্রায় ১৮ বছর আগে ২৪০ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। তবে কি মাতুরীদী ইবনে কুল্লাবের ছাত্রের কাছ থেকে নিয়েছেন, বা তার কোনো বই থেকে উপকৃত হয়েছেন, বা মাতুরীদীর উস্তাদগণ কি ইবনে কুল্লাবের কাছ থেকে নিয়েছেন? এর জবাব হচ্ছে, কিছু কিছু আক্বীদা অবশ্যই মাতুরীদী ইবনে কুল্লাবের কাছ থেকে নিয়েছেন, সেটা যে পদ্ধতিতেই হোক না কেন। যেমন- “আল্লাহর কালাম আত্মিক কালাম (كلامنفسي), যার কোনো আওয়াজ নেই, অক্ষর নেই”[18] – এ ভ্রান্ত আক্বীদার উদ্ভাবক হলেন ইবনে কুল্লাব আর এটা মাতুরীদের মধ্যেও পাওয়া যায়।[19]

তাহলে আবু মানছূর মাতুরীদী আক্বীদা নিয়েছেন কার কাছ থেকে?

মাতুরীদীরা সহ কালামশাস্ত্রনির্ভর যতো ফিরক্বা ও দল রয়েছে, তারা গ্রীকদর্শন ও দার্শনিক দ্বারা রীতিমতো প্রভাবিত হয়েছে। তাদের কাছ থেকে তাদের কিছু সূত্র ও মূলনীতি গ্রহণ করেছে। কালাম ও মানতিক্বশাস্ত্রের নিয়মকানুন তাদের কাছ থেকেই নিয়েছে এবং এর মাধ্যমে আক্বীদার মাসআলা-মাসায়েল সাব্যস্ত করেছে। হাফেয যাহাবী (রহিঃ)-এর ভাষায়, ‘তারা গায়েবী অনেক বিষয়কে বিকৃতির ক্ষেত্রে (পৌত্তলিক) দার্শনিকদের অংশীদার হয়েছে। সেজন্য আপনি কালামশাস্ত্রের বিভিন্ন ফিরক্বার বই-পুস্তকে আক্বীদার ছহীহ দলীলভিত্তিক কোনো মাসআলা-মাসায়েল পাবেন না। ‘আল্লাহ বলেছেন’, ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন’, ‘ছাহাবীগণ বলেছেন’-এসব কথা শোনা বা পড়ার পরিবর্তে তাদের বই-পুস্তকে আপনি কেবল পাবেন- ‘বুযুর্গরা বলেছেন’, ‘জ্ঞানীরা বলেছেন’, ‘বিজ্ঞরা বলেছেন’। তাদের নিকট এসব বুযুর্গ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, গ্রীক পৌত্তলিক দার্শনিক। আল্লাহর কালাম ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর কালাম ছেড়ে এমন মানুষের কালাম গ্রহণ করা তাদের জন্য কীভাবে বৈধ হতে পারে, যারা না আল্লাহকে চিনে, না তাঁর রাসূল (ছাঃ) -এর প্রতি ঈমান রাখে?! সত্যি বলতে, যারা কালামশাস্ত্রের ধ্বজাধারীদের বই-পুস্তক পড়েছেন, তারা দেখেছেন যে, এসব বই-পুস্তক মুসলিম উম্মাহর জন্য কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি বয়ে এনেছে। কারণ এসব বই-পুস্তক মানুষকে বিশুদ্ধভাবে আল্লাহ, তাঁর রাসূল (ছাঃ)  ও তাঁর দ্বীন সম্পর্কে জানার ক্ষেত্রে অন্তরায় সৃষ্টি করেছে’।[20]  আব্বাসীয় শাসক মামূনের শাসনামলে গ্রীকদর্শন ও জ্ঞান-বিজ্ঞান অনূদিত হয়ে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে প্রবেশ করে এবং মুসলিমদের মধ্যে ফেতনা সৃষ্টি হয়।[21]

এখানে আরো একটি দিক হচ্ছে, আবু মানছূর মাতুরীদী ও তার অনুসারী মাতুরীদীদের আক্বীদায় কিছু হক্বও আছে, কিছু বাতিলও আছে। ইতিপূর্বে আমরা দেখে এসেছি যে, হানাফীরা এক ধরনের নয়; বরং তাদের মধ্যে দশের অধিক মূল দল রয়েছে। এদের মধ্যে কেবল একটিমাত্র দল ইমাম আবু হানীফা (রহিঃ)-কে আক্বীদাতেও ইমাম হিসাবে গ্রহণ করেছে, যাদেরকে পূর্ণাঙ্গ, খাঁটি, প্রকৃত বা সালাফী হানাফী বলে। তাদের সংখ্যা ছিলো নিতান্তই কম এবং জাহমিয়্যাহ-মু‘তাযিলার মতো বিদ‘আতী হানাফীর দাপটে ন্যুব্জ হয়ে পড়ে। একটা পর্যায়ে কারা প্রকৃত হানাফী আর কারা বিদ‘আতী হানাফী, তা পার্থক্য করা খুবই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। সেকারণে হানাফী সমাজ ঐসব বিদ‘আতী হানাফী দ্বারা মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় আবু মানছূর মাতুরীদী জাহমিয়্যাহ হানাফী দ্বারা প্রভাবিত হন; কারণ এটাকেই তিনি আহলুস সুন্নহ ওয়াল জামা‘আতের আক্বীদা মনে করেন। এভাবে মাতুরীদীদের মধ্যে জাহমিয়্যাহ হানাফীর আক্বীদা প্রবেশ করে। অতএব মাতুরীদীদের মধ্যে যে হক্ব রয়েছে, তা পূর্ণাঙ্গ হানাফী ও অন্যান্য খাঁটি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের কাছ থেকে গৃহীত। আর তাদের মধ্যে যে বাতিল রয়েছে, তা অন্যান্য বিভ্রান্ত হানাফীর কাছ থেকে গৃহীত। এভাবে জাহমিয়্যাহ হানাফীরা যেমন আবু মানছূর মাতুরীদীর ক্ষতি করেছে, তেমনি আবু মানছূরও মাতুরীদীদের ক্ষতি করেছে।[22]

উপরের সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণের পর নির্দ্বিধায় বলা যায়, মাতুরীদীদের আক্বীদা কোনোভাবেই ইমাম আবু হানীফা (রহিঃ)-এর আক্বীদা নয়। আর এটা প্রমাণ করার জন্য আক্বীদার উৎস শীর্ষক এই একটি পয়েন্টের আলোচনাই যথেষ্ট নয় কি?

অতএব আমাদের উপর আবশ্যক হচ্ছে, মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ) যা বলেছেন, সেটাকেই মূল ও অবলম্বন হিসাবে গ্রহণ করা। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ) -এর বক্তব্যের কাছেই আমাদেরকে আত্মসমর্পণ করতে হবে। কোনোভাবেই ও কোনো অযুহাতেই এর বিরুদ্ধাচরণ করা যাবে না। আবুল মুযাফফর আস-সাম‘আনী (রহিঃ) বলেন, ‘যা আমাদের ব্রেনে ধরে, তা ঈমান ও বিশ্বাসের সাথে গ্রহণ করা আমাদের উপর আবশ্যক। আর যা আমাদের ব্রেনে ধরে না, তা আত্মসমর্পণের সাথে গ্রহণ করা আবশ্যক। আহলুস সুন্নাহর কারো কারো নিম্ন বর্ণিত বক্তব্যের অর্থ কিন্তু এটাই: ইসলাম হচ্ছে একটি পুল, যা আত্মসমর্পণ ছাড়া পাড়ি দেয়া যায় না’। [23]

মাতুরীদীদের ও তাদের পক্ষাবলম্বনকারীদের উপর আবশ্যক হচ্ছে, নিজেদের ও সাধারণ মুসলিম জনগণের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করা এবং আক্বীদাকে তার যথার্থ উৎস থেকে গ্রহণ করা। এই উম্মতের সালাফে ছালেহীন আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূল (ছাঃ) -এর সুন্নাত আঁকড়ে ধরার যে নীতির উপর ছিলেন, সেই নীতিতে ফিরে যাওয়া। যাবতীয় কল্যাণ সালাফে ছালেহীনের অনুসরণের মধ্যেই নিহিত রয়েছে আর পরবর্তীদের অনুসরণের মধ্যে রয়েছে যাবতীয় অকল্যাণ। ইমাম মালেক (রহিঃ) বলেন, لَنْيُصْلِحَآخِرَهَذِهِالْأُمَّةِإِلَّامَاأَصْلَحَأَوَّلَهَا‘ ‘যা এই উম্মতের প্রথম মানুষগুলোকে সংশোধিত করেছিলো, তা ছাড়া অন্য কিছু শেষের মানুষগুলোকে সংশোধিত করতে পারবে না’।[24]  মহান আল্লাহ ইমাম আবু হানীফা (রহিঃ)-এর উপর রহমত বর্ষণ করুন, কারণ তিনি বলেছেন, مَا الْأَمْرُ إِلَّا مَا جَاءَ بِهِ الْقُرْآنُ وَدَعَا إِلَيْهِ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم وَكَانَ عَلَيْهِ أَصْحَابُهُ رضي الله عنهم…، فَأَمَّا مَا سِوَى ذَلِكَ فَمُبْتَدَعٌ مُحْدَثٌ ‘কুরআন যা নিয়ে এসেছে, নবী (ছাঃ)  যার দাওয়াত দিয়েছেন এবং তার ছাহাবীগণ (রাঃ) যে নীতির উপর ছিলেন, তা ছাড়া আর কিছুই নেই। এর বাইরে যা আছে, তা নবাবিষ্কৃত বিদ‘আত’।[25]  তাকে মানবসৃষ্ট কালামশাস্ত্র বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে বলেন, مَقَالَاتُ الْفَلَاسِفَةِ. عَلَيْكَ بِالْأَثَرِ وَطَرِيْقَةِ السَّلَفِ. وَإِيَّاكَ وَكُلَّ مُحْدَثَةٍ فَإِنَّهَا بِدْعَةٌ ‘(এগুলো) দার্শনিকদের উক্তি। তোমার উপর কুরআন-হাদীছের বক্তব্য মেনে নেয়া ও সালাফের পথ ধরা আবশ্যক। প্রতিটা নবাবিষ্কৃত বিষয় থেকে সাবধান থাকবে। কারণ সেগুলো বিদ‘আত’।[26]

মহান আল্লাহ আমাদেরকে সর্বাবস্থায় সালাফে ছালেহীনের বুঝ অনুযায়ী কুরআন-হাদীছ বুঝার ও মানার তাওফীক্ব দান করুন।

(চলবে)

[1]. আল-ইনতিক্বা, পৃ. ১৪২।

[2]. মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুররহমান আল-খুমাইয়্যিস, মানহাজু মাতুরীদিয়্যাহ ফিল আক্বীদাহ, (রিয়াদ: দারুলওয়াতান, ১মপ্রকাশ: ১৪১৩হি.), পৃ. ১৩-১৪।

[3]. আবু মানছূর মাতুরীদী, কিতাবুত তাওহীদ, (পাকিস্তান: আল-মাকতাবাতুশ শাযলিয়্যাহ, তা. বি.), পৃ. ৬৬।

[4]. মুরতাযা যাবীদী, ইতহাফুস সাদাতিল মুতক্বিনীন বিশারহি এহইয়াই উলূমিদ্দীন, ২/১০৫-১০৬, ভায়া: উছূলুদ্দীন ইনদাল ইমাম আবী হানীফা, পৃ. ৫৭৮।

[5]. সাফফারীনী, লাওয়ামি‘উল আনওয়ারিল বাহিয়্যাহ, (দিমাশক: মুওয়াসসাসাতুল খাফিক্বীন, ২য় প্রকাশ: ১৪০২হি./১৯৮২খৃ.), ২/৩।

[6]. উছূলুদ্দীন ইনদাল ইমাম আবী হানীফা, পৃ. ৫৭৭, টীকা নং৩।

[7]. নাছের ইবনে আব্দুল কারীম আল-আক্বল, আল-ফিরাকুল কালামিয়্যাহ, (রিয়াদ: দারুল ওয়াত্বান, ১ম প্রকাশ: ১৪২২হি./২০০১খৃ.), পৃ. ১৭৯।

[8]. মানহাজুল মাতুরীদিয়্যাহ ফিল আক্বীদাহ, পৃ. ১৫।

[9]. ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, আল-ফিকহুল আকবার (বঙ্গানুবাদওব্যাখ্যা), (আস-সুন্নাহ পাবলিকেশন্স, প্রকাশকাল: ১৪৩৫হি./২০১৪খৃ.), পৃ. ২৩৮।

[10]. সুয়ূত্বী, ছওনুল মানতিক্ব, (মুজাম্মা‘উল বুহূছিলইল মিয়্যাহ), পৃ. ২৩৫।

[11]. শাত্বেবী, আল-ই‘তিছাম, (সঊদী আরব: দারু ইবনি আফফান, ১ম প্রকাশ: ১৪১২হি./১৯৯৩খৃ.), ২/৫২৬-৫২৭।

[12]. শারহুল আক্বীদাহ আত-ত্বহাবিয়্যাহ, (সঊদী ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়), পৃ. ১৭৬-১৭৭।

[13]. মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়া, ৩/৩৩৯।

[14]. লাওয়ামি‘উল আনওয়ারিল বাহিয়্যাহ, ১/১০৫।

[15]. মানহাজুল মাতুরীদিয়্যাহ ফিল আক্বীদাহ, পৃ. ১৯।

[16]. মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়া, ১১/৪৯০।

[17]. দ্রষ্টব্য: আদাউল মাতুরীদিয়্যাহ লিল আক্বীদাতিল হানাফিয়্যাহ, ১/২৬৩-২৬৬।

[18]. দ্রষ্টব্য: শারহুল আক্বীদাতি তত্বহাবিয়্যাহ, ১/১৯৭-১৯৮; মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুর রহমান আল-খুমাইয়্যিস, ই‘তিক্বাদু আইম্মাতিস সালাফ আহলিল হাদীছ, (কুয়েত: দারু ঈলাফ আদ-দাওলিয়্যাহ, ১ম প্রকাশ: ১৪২০হি./১৯৯৯খৃ.), পৃ. ২৫৮।

[19]. দ্রষ্টব্য: আদাউল মাতুরীদিয়্যাহ লিল আক্বীদাতিল হানাফিয়্যাহ, ১/২৬৭।

[20]. যাহাবী, আল-আরশ, (মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, ২য় প্রকাশ: ১৪২৪হি./২০০৩খৃ.), পৃ. ৪৮।

[21]. লাওয়ামি‘উল আনওয়ার আল-বাহিয়্যাহ, ১/১১।

[22]. দ্রষ্টব্য: আদাউল মাতুরীদিয়্যাহ লিল আক্বীদাতিল হানাফিয়্যাহ, ১/২৬৮-২৬৯।

[23]. ক্বওয়ামুস সুন্নাহ, আল-হুজ্জা ফী বায়ানিল মাহাজ্জাহ, (রিয়াদ: দারুর রায়াহ, ২য় প্রকাশ: ১৪১৯হি./১৯৯৯খৃ.), ১/৩৪৮।|

[24]. সুলাইমান ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব, তাইসীরুল আযীযিল হামীদ, (বৈরূত: আল-মাকতাবুল ইসলামী, ১ম প্রকাশ: ১৪২৩হি./২০০২খৃ.), পৃ. ৩০১।

[25]. আন-নাছিরী, আন-নূরুল লামে‘ (পাণ্ডুলিপি), পৃ. ৭৫, ভায়া: আহমাদ ইবনে আওয়াযুল্লাহ আল-হারবী, আল-মাতুরীদিয়্যাহ: দিরাসাতান ওয়া তাক্ববীমান, (দারুল আছেমা, ১ম প্রকাশ: ১৪১৩হি.), পৃ. ১৪৫-১৪৬।

[26]. আন-নূরুল লামে‘ (পাণ্ডুলিপি), পৃ. ৬৮ও৮১, ভায়া: আল-মাতুরীদিয়্যাহ: দিরাসাতান ওয়া তাক্ববীমান, পৃ. ১৪৬।