ইমাম আবু হানীফা (রহি.)-এর আক্বীদা বনাম হানাফীদের আক্বীদা

-আব্দুল আলীম ইবনে কাওছার মাদানী
বি. এ. (অনার্স), উচ্চতর ডিপ্লোমা, এম. এ. এবং এম.ফিল.,
মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব;
অধ্যক্ষ, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ।

(পর্ব-১৫)

আল্লাহর অস্তিত্ব প্রমাণে আবু হানীফা (রহি.)  ও আবু মানছূর:

 শুরুতে একটি কথা বলে রাখা ভালো, তা হচ্ছে- সর্বাবস্থায় আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত তথা ছাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর পথই বিশুদ্ধ ও খাঁটি এবং এর বাইরে যেসব পথ ও মত আছে, তার সবই বিদ‘আত ও ভ্রান্ত। মহান আল্লাহ এরশাদ করেন,

فَإِنْ آمَنُوا بِمِثْلِ مَا آمَنْتُمْ بِهِ فَقَدِ اهْتَدَوْا وَإِنْ تَوَلَّوْا فَإِنَّمَا هُمْ فِي شِقَاقٍ

‘অতএব যদি তারা ঈমান আনে, তোমরা যেরূপে তার প্রতি ঈমান এনেছো, তবে অবশ্যই তারা  হেদায়াতপ্রাপ্ত হবে। আর যদি তারা বিমুখ হয়, তাহলে তারা রয়েছে কেবল বিরোধিতায়’ (আল-বাক্বারাহ, ২/১৩৭)। এ আয়াতটিতে আল্লাহ তা‘আলা রাসূল (ছা.) ও তার ছাহাবীগণের ঈমানের মতো ঈমান আনার সাথে একজন মুমিনের হেদায়াতপ্রাপ্তিকে শর্তযুক্ত করেছেন। আর নিঃসন্দেহে তাদের সেই ঈমান ছিলো অহির সঠিক ও সূক্ষ্ম বুঝের ফল। সেকারণেই তো রাসূল (ছা.)  বলেছেন,

خَيْرُ النَّاسِ قَرْنِي، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ

‘সর্বোত্তম মানুষ আমার যুগের মানুষ, এরপর তৎপরবর্তী যুগের মানুষ, তারপর তৎপরবর্তীযুগের মানুষ’।[1]  ইবনুল ক্বাইয়িম (রহি.)  বলেন,

وَذَلِكَ يَقْتَضِي تَقْدِيمَهُمْ فِي كُلِّ بَابٍ مِنْ أَبْوَابِ الْخَيْرِ

‘একথার দাবী হচ্ছে, কল্যাণের সবক্ষেত্রে তাদেরকে অগ্রাধিকার দিতে হবে’।[2]  ইবনে ওমর ও ইবনে মাসঊদ (রা.) বলেন,

مَنْ كَانَ مُسْتَنًّا فَلْيَسْتَنَّ بِمَنْ قَدْ مَاتَ، أُولَئِكَ أَصْحَابُ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ

كَانُوا خَيْرَ هَذِهِ الْأُمَّةِ

‘তোমাদের মধ্যে যে পদাঙ্ক অনুসরণ করতে চায়, সে যেন তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে, যারা ইতোমধ্যে মারা গেছেন। তারা হচ্ছেন, মুহাম্মাদ (ছা.)-এর ছাহাবীবর্গ, যারা ছিলেন এই উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ…’। [3]

এরপর মনে রাখতে হবে, মু‘তাযিলাদের জন্ম ওয়াছেল ইবনে আতা (মৃত্যু: ১৩১ হি.)-এর পরে, আশ‘আরীদের জন্ম আবুল হাসান আশ‘আরী (মৃত্যু: ৩২৪ হি.)-এর পরে, মাতুরীদীদের জন্য আবু মানছূর মাতুরীদী (মৃত্যু: ৩৩৩ হি.)-এর পরে।[4]   তার মানে- এসব ফেরক্বার জন্ম মূল সালাফে ছালেহীন ছাহাবায়ে কেরামের বহু পরে। শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া (রহি.)  বলেন,

وَمَذْهَبُ أَهْلِ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ مَذْهَبٌ قَدِيمٌ مَعْرُوفٌ قَبْلَ أَنْ يَخْلُقَ اللَّهُ أَبَا حَنِيفَةَ وَمَالِكًا وَالشَّافِعِيَّ وَأَحْمَدَ، فَإِنَّهُ مَذْهَبُ الصَّحَابَةِ الَّذِينَ تَلَقَّوْهُ عَنْ نَبِيِّهِمْ، وَمَنْ خَالَفَ ذَلِكَ كَانَ مُبْتَدِعًا عِنْدَ أَهْلِ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ

‘আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের মাযহাব পুরনো ও প্রসিদ্ধ মাযহাব। আল্লাহ আবু হানীফা, মালেক, শাফেঈ ও আহমাদকে সৃষ্টি করার আগে থেকেই এ মাযহাব ছিলো। কারণ এটাই হচ্ছে ছাহাবীগণের মাযহাব, যারা এ মাযহাবকে তাদের নবী (ছা.)-এর কাছ থেকে গ্রহণ করেছেন। সুতরাং যে এই মাযহাবের বিরোধিতা করবে, সে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের নিকট বিদ‘আতী হিসাবে গণ্য হবে’।[5]

সংক্ষিপ্ত ভূমিকার পরে এবার আলোচ্য বিষয়ে আসা যাক, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত উলামায়ে কেরামকে আল্লাহর অস্তিত্ব প্রমাণ করতে ততো বেশি মনোযোগী হতে দেখা যায়নি। এটাকে ততো বেশি গুরুত্বের সাথে তারা নেননি। কারণ এটা মানুষের ফেতরাত বা স্বভাবজাত বিষয়। মহান আল্লাহর অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য বেশি কিছুর প্রয়োজন পড়ে না। বরং মানুষ তার স্বাভাবিক ফেতরাত বা স্বভাব ও বোধশক্তি কাজে লাগালেই তার সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহকে চিনতে পারে। মানুষ নিজেকে এবং আসমান-যমীন সৃষ্টির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে আল্লাহর অস্তিত্ব বুঝতে পারে। ‘কেননা এই বিশাল সৃষ্টির অবশ্যই একজন না একজন স্রষ্টা থাকতেই হবে। কারণ এই সৃষ্টি নিজে নিজেকে যেমন সৃষ্টি করতে পারে না, তেমনি তা এমনি এমনি সৃষ্টি হওয়াও সম্ভব নয়। এই সৃষ্টি নিজে নিজেকে সৃষ্টি করতে পারে না একারণে যে, কোনো কিছুই তার নিজেকে সৃষ্টি করতে পারে না। তাছাড়া কোনো কিছু সৃষ্ট হওয়ার আগে সে তো অস্তিত্বহীন থাকে, তাহলে সে নিজে স্রষ্টা হয় কী করে?! অনুরূপভাবে এমনি এমনিও এই সৃষ্টির অস্তিত্ব সম্ভব নয়। কেননা সঙ্ঘটিত সবকিছুর অবশ্যই একজন না একজন সঙ্ঘটক লাগবেই। তাছাড়া এই সুপরিকল্পিত সৃষ্টি কখনই এমনি এমনি সৃষ্টি হতে পারে না। অতএব এই সৃষ্টি যেহেতু নিজে নিজেকে সৃষ্টি করেনি এবং এমনি এমনিও সৃষ্টি হয়নি, সেহেতু প্রমাণিত হলো, এর একজন স্রষ্টা অবশ্যই আছেন। তিনি আর কেউ নন, তিনি হচ্ছেন আল্লাহ রব্বুল আলামীন।… উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কেউ যদি আপনাকে একটি সুরম্য অট্টালিকার গল্প শুনায়, যার চারপাশ ঘিরে আছে বাগ-বাগিচা, প্রবাহিত হয়েছে নদী আর ঝরনা, যার অভ্যন্তরে গালিচা, খাঁট ইত্যাদি লাগানো হয়েছে, সাজানো হয়েছে নানা সজ্জায়, আর সে আপনাকে বলে যে, এই অট্টালিকাটি এবং এর সবকিছু নিজেরাই নিজেদেরকে সৃষ্টি করেছে বা কোনো অস্তিত্বদানকারী ছাড়াই এমনি এমনি অস্তিত্ব পেয়েছে, তাহলে আপনি সরাসরি তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করবেন এবং তার কথাকে পাগলের প্রলাপ হিসাবে গণ্য করবেন। তা হলে যমীন, আসমান, গ্রহ-উপগ্রহ-নক্ষত্র সংবলিত এবং অসাধারণ নিয়মে নিয়ন্ত্রিত এই বিশাল পৃথিবী কি নিজেকে সৃষ্টি করতে পারে অথবা স্রষ্টা ছাড়া এমনি এমনি সৃষ্টি হতে পারে?!’ [6]   সেজন্য ইসলাম আল্লাহর অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য মানুষের নিজেকে ও আসমান-যমীনকে নিয়ে ভাবতে বলেছে। মহান আল্লাহ বলেন,

سَنُرِيهِمْ آيَاتِنَا فِي الْآفَاقِ وَفِي أَنْفُسِهِمْ حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُ الْحَقُّ

‘বিশ্বজগতে ও তাদের নিজেদের মধ্যে আমি তাদেরকে আমার নিদর্শনাবলী দেখাবো, যাতে তাদের কাছে সুস্পষ্ট হয় যে, এটি (কুরআন) সত্য’ (ফুছছিলাত, ৪১/৫৩)। তিনি অন্যত্র বলেন, وَفِي أَنْفُسِكُمْ أَفَلَا تُبْصِرُونَ ‘আর (নিদর্শন আছে) তোমাদের নিজেদের মধ্যেও। তোমরা কি দেখো না?’ (আয-যারিয়াত, ৫১/২১)। অন্যত্র আল্লাহ বলেন,

  فَلْيَنْظُرِ الْإِنْسَانُ مِمَّ خُلِقَ – خُلِقَ مِنْ مَاءٍ دَافِقٍ – يَخْرُجُ مِنْ بَيْنِ الصُّلْبِ وَالتَّرَائِب

‘অতএব মানুষের চিন্তা করে দেখা উচিত, তাকে কী থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে? তাকে সৃষ্টি করা করা হয়েছে দ্রুতবেগে নির্গত পানি থেকে, যা বের হয় মেরুদণ্ড ও বুকের হাড়ের মধ্য থেকে’ (আত-ত্বরিক, ৮৬/৫-৭)। এজাতীয় বহু বক্তব্য কুরআন-হাদীছে রয়েছে, যেগুলো প্রমাণ করে, সৃষ্টিকে নিয়ে ভেবে সৃষ্টিকর্তাকে চেনা মানুষের স্বভাবজাত ব্যাপার এবং এটাই ইলাহী নির্দেশনা ও নবী-রাসূলগণের অনুসৃত নীতি। সেকারণেই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত এ পথই ধরেছেন। ইমাম আবু হানীফা (রহি.) ও তার পূর্বসূরী আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের পথ থেকে বিচ্যুত হবেন না, সেকথা খুবই স্বাভাবিক। ফলে সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহর অস্তিত্ব প্রমাণে ইমাম আবু হানীফা (রহি.) কুরআন-হাদীছ নির্দেশিত ও নবী-রাসূলগণের অনুসৃত পরিচিত পথই অবলম্বন করেছেন। সেকারণে ইমাম আবু হানীফা (রহি.) ও আল্লাহর অস্তিত্ব প্রমাণের পেছনে অতো বেশি সময়-শ্রম ব্যয় করেননি। মোল্লা আলী ক্বারী হানাফী (রহি.)  বলেন, “ইমাম (আবু হানীফা) আল্লাহর অস্তিত্ব খোঁজার ব্যাপারটাকে উপেক্ষা করেছেন। কারণ এ ব্যাপারটা স্পষ্ট ও দৃশ্যমান। তাই তো পবিত্র কুরআনে এসেছে,

قَالَتْ رُسُلُهُمْ أَفِي اللَّهِ شَكٌّ فَاطِرِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ

‘তাদের রাসূলগণ বলেছিল, আল্লাহর ব্যাপারেও কি সন্দেহ, যিনি আসমানসমূহ ও যমীনের সৃষ্টিকর্তা?’ (ইবরাহীম, ১৪/১০)।

وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ مَنْ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ لَيَقُولُنَّ اللَّهُ

‘আর যদি তুমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করো, কে আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন? তারা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ’ (লুক্বমান, ৩১/২৫)। বুঝা গেলো, আল্লাহর অস্তিত্ব মানুষের স্বভাবেই গ্রোথিত, যেমন আল্লাহ বলেন, فِطْرَتَ اللَّهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا ‘আল্লাহর প্রকৃতির অনুসরণ করো, যে প্রকৃতি অনুযায়ী তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন’ (আর-রূম, ৩০/৩০)। এদিকে ইশারা করেই হাদীছে এসেছে, كُلُّ مَوْلُودٍ يُولَدُ عَلَى الفِطْرَةِ ‘প্রত্যেক নবজাতক ফেতরাতের উপর জন্মগ্রহণ করে’।[7]  আসলে নবীগণ (আ.)-এর আগমনই হয়েছিলো তাওহীদ বর্ণনার জন্য। সেজন্য তারা সবাই ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বাণীর উপর ঐকমত্য ছিলেন। তাদের উম্মতকে ‘আল্লাহ বিদ্যমান’-একথা বলার নির্দেশনা তাদেরকে দেয়া হয়নি। বরং আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো মা‘বূদ যে নেই- সে কথা স্পষ্ট করাই তাদের লক্ষ্য ছিলো। তারা তাদের উম্মতের এই ধারণা নস্যাৎ করতে চেয়েছিলেন- وَيَقُولُونَ هَؤُلَاءِ شُفَعَاؤُنَا عِنْدَ اللَّهِ ‘আর তারা বলে, এরা আল্লাহর নিকট আমাদের সুপারিশকারী’ (ইউনুস, ১০/১৮), مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَى ‘আমরা কেবল এজন্যই তাদের ইবাদত করি যে, তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেবে’ (আয-যুমার, ৩৯/৩)। উল্লেখ্য, তাওহীদ জোরালোভাবে আল্লাহর অস্তিত্ব প্রমাণ করে। এরপর কথা হচ্ছে, আক্বীদা শরী‘আত থেকে নেয়া যরূরী, কারণ শরী‘আতই আসল”।[8]   অবশ্য এই ফেতরাতী বিষয়ে কারো পদস্খলন ঘটে গেলে নবী-রাসূলগণ (আ.) ও তাদের অনুসারীরা যুগে যুগে সেই বিভ্রান্ত মানুষগুলোকে সোজা করার প্রয়াস চালিয়েছেন। ইমাম আবু হানীফা (রহি.) ও তাই করেছেন। তার সাথে ঘটে যাওয়া নাস্তিকদের প্রসিদ্ধ ঘটনাটি সেকথারই প্রমাণ বহন করে। বাতিলপন্থীদের একটি দল একদা ইমাম আবু হানীফা (রহি.) -এর সাথে আল্লাহর অস্তিত্ব নিয়ে বাহাছ-মুনাযারা করতে আসলে তিনি তাদেরকে বলেন, ‘এই মাসআলা নিয়ে আলোচনার পূর্বে আপনারা দজলা নদীর একটি জাহাজের কথা শুনুন, যা কারো নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা ছাড়া একাই যায় এবং খাদ্য-সামগ্রী ও অন্যান্য জিনিসপত্র নিয়ে ফিরে আসে, অতঃপর একাই নোঙ্গর করে মালামাল নামিয়ে আবার ফিরে যায়?!’ তারা বলল, ‘অসম্ভব, কস্মিনকালেও এরকম হতে পারে না’। অতঃপর তিনি তাদেরকে বললেন, ‘এটা সামান্য একটি জাহাজের ক্ষেত্রে যদি অসম্ভব হয়, তাহলে গোটা বিশ্বের ক্ষেত্রে কিভাবে সম্ভব হতে পারে!’ [9]

আরো একটি বিষয় হচ্ছে, আল্লাহর অস্তিত্বের প্রমাণ যেহেতু মানুষের ফেতরাতী বা স্বভাবজাত বিষয়, সেহেতু দলীল ছাড়াও আল্লাহকে চেনা সম্ভব। অর্থাৎ কেউ যদি নির্জনে জন্মগ্রহণ করে এবং তার ফেতরাত বা স্বভাব-প্রকৃতি পিতা-মাতার কারণে বা পরিবেশের কারণে কোনোভাবেই নষ্ট না হয়, তাহলে তার এই নিষ্কলুষ প্রকৃতি দিয়ে ও আল্লাহর সৃষ্টি সম্পর্কে ব্রেইন খাঁটিয়ে সে আল্লাহকে চিনতে পারবে। সালাফে ছালেহীনের অনেকেই এমনটা বলেছেন। ইমাম আবু হানীফা (রহি.) ও এ মতের পক্ষেই। তিনি বলেন,

لَا عُذْرَ لِأَحَدٍ بِالْجَهْلِ بِخَالِقِهِ لِمَا يَرَى مِنْ خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ،

وَخَلْقِ نَفْسِهِ، وَسَائِرِ خَلْقِ رَبِّهِ

‘কারো জন্য তার সৃষ্টিকর্তাকে না চেনার ওযর পেশ করা সমীচীন নয়। কারণ সে তো আসমান-যমীন সৃষ্টি হওয়াকে এবং তার নিজের সৃষ্টি হওয়া ও তার রবের সবকিছু সৃষ্টি হওয়াকে দেখে’।[10]

শুধু তাই নয় বরং ইমাম আবু হানীফা (রহি.) মহান আল্লাহর উচ্চে অবস্থান প্রমাণেও স্বভাবজাত বা প্রকৃতিগত দলীল গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেছেন,

وَاللهُ تَعَالَى يُدْعَى مِنْ أَعْلَى لَا مِنْ أَسْفَلَ لَيْسَ مِنْ وَصْفِ الرُّبُوْبِيَّةِ وَالْأُلُوْهِيَّةِ فِيْ شَيْءٍ

‘মহান আল্লাহকে ডাকতে হয় উপরের দিকে, নিচের দিকে নয়। কারণ নিচে থাকা রুবূবিয়্যাত ও উলূহিয়্যাতের কোনো বৈশিষ্ট নয়’।[11]   কেননা মানুষের প্রকৃতি বলে যে, মহান আল্লাহ উপরে, নিচে নন। আর ইমাম আবু হানীফা (রহি.) একজন দাসীর জবাবকে দলীল হিসাবে গ্রহণ করেছেন। রাসূল (ছা.) তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, أَيْنَ اللهُ؟ ‘আল্লাহ কোথায়?’ জবাবে তিনি বলেছিলেন, فِي السَّمَاء ‘আসমানে’। এরপর তিনি রাসূল (ছা.) সম্পর্কে সাক্ষ্য দিলে রাসূল (ছা.) তার ঈমানের স্বীকৃতি দিয়ে বলেন, أَعْتِقْهَا، فَإِنَّهَا مُؤْمِنَةٌ ‘তাকে মুক্ত করে দাও। কেননা সে মুমিন নারী’।[12] দাসীটি (রহি.) কিন্তু তার স্বভাব ও প্রকৃতি থেকেই জবাবটা দিয়েছিলেন এবং রাসূল (ছা.) তার ঈমানের স্বীকৃতি দিয়ে তাকে মুক্ত করে দিতে বলেছিলেন। মূলত নিষ্কলুষ আত্মা সবসময়ই এভাবে তার রব ও রবের উপরে অবস্থানের সাক্ষ্য দেয়।

কিন্তু আবু মানছূর মাতুরীদী ও তার অনুসারীরা সালাফে ছালেহীনের অনুসৃত কুরআন-হাদীছের এপথে হাঁটেননি। বরং তারা দুর্বোধ্য ইলমুল কালাম বা দর্শনশাস্ত্রের উপর নির্ভর করেছেন, যার অধিকাংশ গ্রীক দর্শন থেকে গৃহীত। তারা বলে, ‘জগতের সবকিছু (আল্লাহর যাত ও সিফাত ব্যতীত আসমান যমীন ও এতদুভয়ের মধ্যকার সবকিছু) অনিত্য (حادث) বা সৃষ্ট। আর সব অনিত্য বা সৃষ্ট বস্তুর জন্য সৃষ্টিকর্তা (محدث) আবশ্যক। অতএব, জগতের জন্যেও একজন সৃষ্টিকর্তা অবশ্যক। জগতের সবকিছু অনিত্য (حادث) হওয়ার প্রমাণ হলো জগতের যে কোনো বস্তু হয় মূল উপাদান (جوهر) হবে নতুবা অপ্রধান বিষয় (عرض)। যদি অপ্রধান বিষয় হয় তাহলে সেটা অনিত্যই। তন্মধ্যে কোনো কোনোটার অনিত্য হওয়া ইন্দ্রীয়গ্রাহ্য বিষয়, যেমন অন্ধকার চলে যাওয়ার পর আলো আসা, গরমের পর ঠান্ডা আসা ইত্যাদি। আর কোনোটার অনিত্য হওয়া এভাবে প্রমাণিত যে, অপ্রধান বিষয় (عرض) অস্তিত্বহীনতা (عدم) কে গ্রহণ করে অর্থাৎ, তা বিলীন (فاني) হয়ে যায় অথচ নিত্য (قديم) জিনিস কখনও বিলীন (فاني) হয় না। অতএব প্রমাণিত হল যে, অপ্রধান বিষয় (عرض) নিত্য (قديم) নয় বরং অনিত্য (حادث)। আর যদি মূল উপাদান (جوهر) হয়, তাহলে মূল উপাদান সমূহও অনিত্য। কেননা মূল উপাদান (جوهر) হয় শরীর (جسم) হবে নতুবা পরমাণু (جوهر فرد বা الجزء الذي لا يتجزأ) যা-ই হোক, তা গতি/স্থিতি (حركة وسكون) কে গ্রহণ করে থাকে বিধায় তা অনিত্য (حادث)। কারণ গতি/স্থিতি (حركة وسكون) হলো অপ্রধান বিষয় (عرض) আর যার মধ্যে অপ্রধান বিষয় (عرض) বনাম অনিত্যতা (حدوث) পাওয়া যায় তা অনিত্যই হয়ে থাকে। নতুবা অনিত্যকে নিত্য বলা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়াবে। এখন রয়ে গেল প্রত্যেকটা শরীর (جسم) বা পরমাণু (جوهر فرد বা الجزء الذي لا يتجزأ)-এর জন্য গতি/স্থিতি (حركة وسكون) অপরিহার্য হওয়ার বিষয়টি। তা এভাবে যে, শরীর (جسم) বা পরমাণু (جوهر فرد)-এর জন্য একটি স্থান (حيز) থাকা আবশ্যক। এখন এই মুহূর্তের পূর্বে থেকেই যদি সেই স্থানে তার অবস্থান চলে আসতে থাকে, তাহলে বলতে হবে সেটা স্থিতিশীল (ساكن) অর্থাৎ, তার মধ্যে স্থিতি (سكون) বিদ্যমান নতুবা সেটা গতি সম্পন্ন (متحرك) অর্থাৎ, তার মধ্যে গতি (حركة) বিদ্যমান। এই যুক্তির মধ্যে জগতের সবকিছুকে অনিত্য প্রমাণিত করে তার জন্য একজন সৃষ্টিকর্তার আবশ্যতা প্রমাণিত হয়েছে’।[13]

প্রিয় পাঠক! কী বুঝলেন? কিছু বুঝেন আর না বুঝেন, মাতুরীদীদের নিকট এই হচ্ছে আল্লাহর অস্তিত্বের যুক্তিগত প্রমাণ। মহান আল্লাহর অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য এই দুর্বোধ্য যুক্তির আদৌ কোনো প্রয়োজনীয়তা আছে কি?! মহান আল্লাহকে চেনার ইসলাম সমর্থিত যে সহজ-সরল ও কুসুমাস্তীর্ণ পথ, তার সাথে এই দুর্বোধ্য-কণ্টকময় পথের কোনো মিল আছে কি? যে পথে নবী-রাসূলগণ (আ.) ও আমাদের সালাফে ছালেহীন চলেননি, সে পথে চললে পদস্খলন অনিবার্য নয় কি? বিধর্মীদের কাছ থেকে ধার করা পদ্ধতি দিয়ে হেদায়াতপ্রাপ্তির আশা করা যায় কি? বরং আল্লাহর অস্তিত্ব, নাম ও গুণাবলি প্রমাণে এসব দর্শনশাস্ত্রীয় কায়দা-কানুনের মাধ্যমে উল্টো এগুলোকে অস্বীকার করা হয়। মাতুরীদীরা মহান আল্লাহর নাম ও গুণাবলির বড় একটা অংশকে অস্বীকার করে আর জাহমিয়্যারা সবগুলোকে অস্বীকার করে।[14] আল্লাহ আমাদেরকে হেদায়াত দান করুন।

তবে আশার কথা হচ্ছে, মাতুরীদীরা সৃষ্টি জগৎ দ্বারা স্রষ্টার অস্তিত্ব প্রমাণের পথও অবলম্বন করে থাকেন, যা সালাফে ছালেহীনের পদ্ধতির সাথে মিলে যায়।

[1]. ছহীহ বুখারী, হা/২৬৫২।

[2]. এ‘লামুল মুওয়াক্কেঈন, ৪/১০৪।

[3]. হিলইয়াতুল আউলিয়া, ১/৩০৫; জামে‘উ বায়ানিল ইলম, ২/৯৪৭।

[4]. আল-মাতুরীদিয়্যাহ: দিরাসাতান ওয়া তাক্ববীমান, পৃ. ৫৯।

[5]. মিনহাজুস সুন্নাহ আন-নাবাবিয়্যাহ ফী নাক্বযি কালামিশ শী‘আতিল ক্বদারিয়্যাহ, ২/৬০১।

[6]. লেখক প্রণীত ‘ঈমানের মূলনীতি’ শীর্ষক বইটির ৭২-৭৪ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।

[7]. ছহীহ বুখারী, হা/১৩৫৮, ১৩৮৫; ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৫৮।

[8]. মোল্লা আলী ক্বারী, মিনাহুর রওযিল আযহার ফী শারহিল ফিক্বহিল আকবার, (দারুল বাশাইরিল ইসলামিয়্যাহ, ১ম প্রকাশ: ১৪১৯ হি./১৯৯৮ খ্রী.), পৃ. ৪৯-৫০।

[9]. ইবনু আবিল ইয, শারহুল আক্বীদাতিত ত্বহাবিইয়্যাহ, তাহক্বীক্ব : আহমাদ শাকের, (সঊদী আরব: ধর্ম, ওয়াক্বফ, দা‘ওয়াত ও নির্দেশনা বিষয়ক মন্ত্রণালয়, ১ম প্রকাশ: ১৪১৮ হি.), পৃ. ৩৫।

[10]. ইবনু আবিল ইয, শারহুল আক্বীদাতিত ত্বহাবিইয়্যাহ, তাহক্বীক্ব : আহমাদ শাকের, (সঊদী আরব: ধর্ম, ওয়াক্বফ, দা‘ওয়াত ও নির্দেশনা বিষয়ক মন্ত্রণালয়, ১ম প্রকাশ: ১৪১৮ হি.), পৃ. ৩৫।

[11]. আল-ফিক্বহুল আকবার, পৃ. ১৩৫।

[12]. ছহীহ মুসলিম, হা/৫৩৭।

[13]. মাওলানা মুহাম্মাদ হমোয়তেুদ্দীন, ইসলামী আকীদা ও ভ্রান্ত মতবাদ, (ঢাকা: থানভী লাইব্রেরী, তা. বি), পৃ. ৪১ (টীকা সহ)।|

[14]. দ্রষ্টব্য:  আছ-ছওয়া‘ইকুল মুরসালাহ, ৩/৯৮৫-৯৮৬।