ইমাম আবু হানীফা (রাহিঃ) -এর আক্বীদা বনাম হানাফীদের আক্বীদা

আব্দুল আলীম ইবনে কাওছার মাদানী

(পর্ব-১৩)

মাতুরীদী আক্বীদার সারা পৃথিবীতে বিস্তৃতি লাভের কারণ:

১. রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা: মাতুরীদীদের সারা পৃথিবীতে বিস্তৃতি লাভ করার মূল কারণ হচ্ছে, রাজা-বাদশাগণ হানাফী মাযহাব গ্রহণ করেছিলেন। এ কারণে পৃথিবীর পূর্ব দিগন্ত থেকে পশ্চিম দিগন্ত পর্যন্ত আরব-অনারব, পারস্য-রোমান সবার মাঝে দাপটের সাথে হানাফী মাযহাব বিস্তার লাভ করে। আর হানাফী মাযহাব বিস্তার লাভ করায় মাতুরীদী মাযহাবও বিস্তার লাভ করে। কারণ মাতুরীদীরা হানাফী মাযহাবের প্রতিনিধিত্ব করতো।

কোনো রাষ্ট্র যখন কোনো আক্বীদা ও চিন্তাচেতনা লালন করবে এবং পৃষ্ঠপোষকতা করবে, তখন সেই আক্বীদা বিস্তার লাভ করবে- এ কথা খুবই স্বাভাবিক। কারণ রাষ্ট্রযন্ত্র তখন সেই চিন্তাচেতনার সব পথ সহজ করে দেয়। বিচার, ফতওয়া, নেতৃত্ব, খুৎবা, লেখালেখি, পাঠদান ইত্যাদি কাজে রাষ্ট্র তার নিজস্ব চিন্তাধারার মানুষকেই নিয়োগ দেয়, যারা রাষ্ট্রের ক্রীড়নক হয়ে কাজ করতে পারে। ফলে খুব সহজেই যে কোনো চিন্তাচেতনা জনমনে প্রবেশ করানো যায়। শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবী (রাহি.)  বলেন, ‘যে কোনো মাযহাবের ধ্বজাধারীরা যদি বিখ্যাত হন, তাদের কাছে বিচারিক কার্যক্রম ও ফতওয়ার দায়িত্ব ন্যাস্ত থাকে, তাদের লেখনী মানুষের মধ্যে প্রসিদ্ধি লাভ করে এবং তারা ব্যাপক হারে পাঠদানের কাজ করে, তাহলে সে মাযহাব দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে বিস্তৃতি লাভ করে। পক্ষান্তরে কোনো মাযহাবের ধ্বজাধারীরা যদি অখ্যাত হন, বিচার ও ফতওয়ার দায়িত্ব তারা না পান এবং জনগণ তাদের ব্যাপারে আগ্রহী না হন, তাহলে সেই মাযহাব কিছুকাল পরে বিলীন হয়ে যায়’।[1]

২. মাতুরীদী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান: মাতুরীদী আক্বীদা প্রসারে এই ঘরানার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বড় ভূমিকা রয়েছে। মাতুরীদী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাব নেই, এগুলোর প্রসিদ্ধতম দৃষ্টান্ত হচ্ছে, দারুল উলূম, দেওবন্দ। যুগ যুগ ধরে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইলমুল কালাম ও মানতিক্ব শেখানো হয়; সেখানে সালাফে ছালেহীনের আক্বীদার কোনো বই পড়ানো হয় না। সেকারণে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লক্ষ লক্ষ ছাত্র পড়ালেখা করে তারাই এক সময় মাতুরীদী আক্বীদা প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।

৩. কালামশাস্ত্রে ব্যাপক লেখনী: লেখনীর জগতে বিশেষ করে ইলমুল কালাম বা কালামশাস্ত্রে লেখনীর ময়দানে মাতুরীদীদের ব্যাপক পদচারণা লক্ষ্য করা যায়। এসব লেখনী ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীজুড়ে। এগুলোর পঠনপাঠনও চলে বিস্তৃতরূপে। এভাবে খুব সহজে মাতুরীদী আক্বীদা জনমনে প্রবেশ করে।

৪. আরো কিছু বিষয় আছে, যেগুলোর সমষ্টি মাতুরীদী আক্বীদা প্রসারে সহায়ক ভূমিকা রাখে। সেগুলোর কয়েকটি হচ্ছে-

(ক) নিজেরা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ভান ধরা ও দাবী করা; বরং আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের প্রতিনিধিত্ব করার দুঃসাহস দেখানো।

(খ) যারা খাঁটি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের মানুষ ও আহলেহাদীছ, তাদেরকে ‘মুজাসসিমাহ’[2] , ‘মুশাববিহাহ’[3]   ইত্যাদি অপবাদে অভিযুক্ত করা। এর মাধ্যমে তারা সাধারণ জনগণের চোখে ধুলো দিয়ে তাদের মধ্যে মাতুরীদী আক্বীদা প্রবেশ করায় এবং তাদেরকে প্রকৃত হক্বপন্থীদের থেকে দূরে সরানোর চেষ্টা করে।

(গ) নিজেদেরকে সালাফে ছালেহীন, বিশেষ করে আবু হানীফা, শাফেঈ ও আশ‘আরী (রাহি.)-এর দিকে সম্বন্ধিত করা। এর মাধ্যমে তারা জনগণের ভক্তি ও দুর্বলতার জায়গাকে কাজে লাগাতে চেষ্টা করে।

(ঘ) অন্য বিদ‘আতীদের নিকট যতবেশি বাতিল আছে, সেই তুলনায় মাতুরীদীদের কাছে হক্ব বেশি আছে। এটাকে তারা পুঁজি বানাতে পেরেছে।

(ঙ) জাহমিয়্যাহ, মু‘তাযিলাহ, খারেজী ও শী‘আ-রাফেযীদের মতো বাতিল ফিরক্বার বিরুদ্ধে তারা কথা বলেছে, যা তাদেরকে হক্বপন্থী হিসাবে পরিচয় দিতে সাহায্য করেছে।

(চ) খাঁটি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের নানা দুর্বলতার সুযোগ তারা গ্রহণ করেছে এবং মাতুরীদী আক্বীদা প্রচার করেছে।[4]

মাতুরীদী আক্বীদার ক্রমবিকাশ:

মাতুরীদী আক্বীদার নামকরণ যেহেতু আবু মানছূর মাতুরীদীর দিকে সম্বন্ধিত করে, সেহেতু ২৫৮ হিজরী সনের আগে মাতুরীদী নামে কোনো ফেরক্বার কোনোই অস্তিত্ব ছিলো না এবং কোনো বিবেকবান ব্যক্তি এ ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করতে পারেন না। কেননা ২৫৮ হিজরী আবু মানছূর মাতুরীদীর সম্ভাব্য জন্মসাল। তবে মাতুরীদী ফেরক্বার আত্মপ্রকাশ কবে ঘটে, তা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। আবু মানছূর মাতুরীদীর জীবদ্দশায় এর আত্মপ্রকাশ ঘটে নাকি তার মৃত্যুর পরে, তাও নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। অবশ্য একথা বলা যায় যে, আবু মানছূর মাতুরীদী হানাফীদের মধ্যে ব্যাপকহারে তার আমদানীকৃত আক্বীদা ঢুকিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। সেকারণে বলা চলে, প্রত্যেকটা মাতুরীদী হানাফী, কিন্তু প্রত্যেকটা হানাফী মাতুরীদী নয়। কারণ কোনো কোনো হানাফী সালাফী, কেউ কেউ মু‘তাযিলী, আবার কেউ কেউ অন্য মতাবলম্বী। হানাফীরা কত ধরনের সে বিষয়ে আমরা আগেই দেখে এসেছি।

মাতুরীদী আক্বীদা বেশ কতগুলো স্তর, যুগ ও পর্যায় অতিক্রম করে, যেগুলোতে কালামশাস্ত্রীয় এ আক্বীদার ধ্বজাধারীরা এর প্রচার ও প্রসারে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। সেসব স্তরের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নীচে তুলে ধরা হলো:

১. প্রতিষ্ঠাকাল (২৫৮-৩৩৩ হি.):  আবু মানছূর মাতুরীদীর জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সময়টাকে প্রতিষ্ঠাকাল হিসাবে ধরা হচ্ছে। কারণ এই সময়ের মধ্যেই নিশ্চিতভাবে এ ফেরক্বার চিন্তাচেতনার বীজ অঙ্কুরিত হয়, এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। এই স্তরের একটি বিশেষ দিক হলো, এ সময় মাতুরীদী ও মু‘তাযিলাদের মধ্যে প্রচণ্ড গালাগালি ও তর্কবিতর্ক হয়।

২. সংগঠিত হওয়ার যুগ (৩৩৩-৪০০ হি.): আবু মানছূর মাতুরীদীর ছাত্র, ছাত্রের ছাত্র এবং যারা তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলো, তাদের স্তরকে গঠিত হওয়ার স্তর হিসাবে গণ্য করা যায়। মূলত এ স্তরেই  কালামশাস্ত্রীয় মাতুরীদী আক্বীদা একটি ফেরক্বা হিসাবে গঠিত হয় এবং পৃথিবীর বুকে আত্মপ্রকাশ করে। ফেরক্বা হিসাবে সর্বপ্রথম সমরখন্দে এর আত্মপ্রকাশ ঘটে। আবু মানছূর মাতুরীদীর ছাত্র ও অনুসারীরা তাদের গুরুর চিন্তাচেতনা প্রচার-প্রসারে আত্মনিয়োগ করে। এ যুগে মাতুরীদী আক্বীদার উপর অনেক লেখালেখি হয়। এ যুগের দু’জন প্রসিদ্ধতম ব্যক্তি হচ্ছেন আবুল কাসেম ইসহাক ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাঈল সামারকান্দী (মৃত্যু: ৩৪২ হি.) ও আবু মুহাম্মাদ আব্দুল কারীম ইবনে মূসা ইবনে ঈসা বাযদাবী (মৃত্যু: ৩৯০ হি.)।

৩. বাযদাবী যুগ (৪০০-৫০০ হি.): মাতুরীদী আক্বীদা প্রচার-প্রসারে ও এর উপর লেখালেখিতে এ যুগও আগের যুগের মতোই। এ যুগের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হলেন আবুল ইউসর আল-বাযদাবী (মৃত্যু: ৪৯৩ হি.), যিনি ফাখরুল ইসলাম (মৃত্যু: ৪৮২ হি.)-এর ভাই। এই বাযদাবীর দিকে সম্বন্ধিত করেই এ যুগকে বাযদাবী যুগ বলা হয়। বাযদাবী ছিলেন কট্টরপন্থী মাতুরীদী। এমনকি তিনি এ ফতওয়া দেন যে, শাফেঈর পেছনে হানাফীর ইক্বতেদা জায়েয নেই। তিনি আরো বলেন, রুকূ করার সময় এবং রুকূ থেকে উঠার সময় রফ‘উল ইয়াদাইন করলে ছালাত নষ্ট হয়ে যাবে। তবে, আব্দুল হাই লাক্ষ্নৌবী তার কঠোর জবাব দেন।[5]

৪. নাসাফী যুগ (৫০০-৭০০ হি.): এই যুগে আগের চেয়ে মাতুরীদী আক্বীদার উপর বেশি লেখালেখি হয় এবং এ আক্বীদার দলীল-প্রমাণ সঙ্কলন করা হয়। আর এভাবে আল্লাহর ছিফাতের ক্ষেত্রে সালাফী আক্বীদাকে তছনছ করে দেয়ার অপচেষ্টা করা হয়। এ যুগে মাতুরীদী আক্বীদার অন্যতম ধারক-বাহক হলেন আবুল মু‘ঈন নাসাফী (মৃত্যু: ৫০৮ হি.), নাজমুদ্দীন উমার নাসাফী (মৃত্যু: ৫৩৭ হি.) ও হাফিযুদ্দীন আব্দুল্লাহ নাসাফী (মৃত্যু: ৭১০ হি.)। আবুল মু‘ঈন নাসাফী বিরচিত ‘তাবছিরাতুল আদিল্লাহ’ বইটি মাতুরীদী আক্বীদার সবচেয়ে প্রশস্ত বই, যা এই যুগেই লেখা হয়।

৫. ছাবূনী যুগ: পূর্বে উল্লেখিত যুগের শুরুর দিকে আরেকটি স্তর দেখা দেয়, যাকে ছাবূনী যুগ বলা হয়। এ যুগে মাতুরীদী ও আশ‘আরীদের মধ্যে প্রচুর বাহাছ-মুনাযারা সঙ্ঘটিত হয়। এ যুগের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হচ্ছেন আবু মুহাম্মাদ নূরুদ্দীন আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ ছাবূনী (মৃত্যু: ৫৮০ হি.)।

৬. উছমানী যুগ (৭০০-১৩০০ হি.): উছমানী খিলাফতের দিকে সম্বন্ধিত করে এ যুগকে উছমানী যুগ বলা হয়। এ যুগের অধীনে বেশ কয়েকটি স্তর পাওয়া যায়। সেগুলোর মধ্যে কয়েকটি হলো:

ক. ছদরুশ শারী‘আহ উবাইদুল্লাহ ইবনে মাস‘ঊদের যুগ (?-৭৪৭ হি.)।

খ. তাফতাযানীর যুগ (৭১২-৭৯২ হি.)।

গ. জুরজানীর যুগ (৭৪০-৮১৬ হি.)।

ঘ. কামাল ইবনুল হুমামের যুগ (৭৯০-৮৬১ হি.)।

এসবগুলো যুগ মিলেই উছমানী যুগ। মাতুরীদী আক্বীদার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুগ হচ্ছে উছমানী যুগ। কারণ উছমানী খিলাফত ছিলো শাখা-প্রশাখাগত মাসআলা-মাসায়েলে হানাফী এবং আক্বীদায় মাতুরীদী। সেকারণে উছমানী খলীফাগণ এবং তাদের রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের প্রায় সবাই মাতুরীদী আক্বীদা প্রচার ও প্রসারের কাজে বড় ভূমিকা রাখেন। বেশিরভাগ বিচারক, মুফতী, খত্বীব ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান মাতুরীদী দেখে দেখে নিয়োগ দেয়া হয়। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে যা হওয়ার তাই হয়েছে; দেখা গেছে, পৃথিবীর যে বিশাল ভূখণ্ড পর্যন্ত উছমানী খিলাফতের বিস্তৃতি ছিলো, সে পর্যন্ত এ আক্বীদাও বিস্তৃতি লাভ করে।

আরেকটি দিক বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, এ যুগে মাতুরীদী আক্বীদার উপর প্রচুর লেখালেখি হওয়ার পাশাপাশি মাতুরীদী ও আশ‘আরীদের মাঝে এক ধরনের মিল-মহব্বত তৈরী হয়। এসব কারণে উছমানী যুগে পূর্ব দিগন্ত থেকে পশ্চিম দিগন্ত পর্যন্ত মাতুরীদী আক্বীদা ছড়িয়ে পড়ে। ভারত, তুরস্ক, পারস্য, রোম, আরব-অনারব কোথাও এ আক্বীদা ঢুকতে বাদ রাখেনি।

৭. দেওবন্দী যুগ (১২৮৩ হি.-চলমান): শায়খ মুহাম্মাদ কাসেম নানুতুবী (মৃত্যু: ১২৯৭ হি.) কর্তৃক ১২৮৩ হিজরীতে প্রতিষ্ঠিত দারুল উলূম দেওবন্দের দিকে সম্বন্ধিত করে এ যুগের নাম দেওবন্দী যুগ। এ যুগে বিশেষ করে হাদীছ শাস্ত্রের উপর প্রচুর লেখালেখি হয়। দেওবন্দী আলেমগণ ইসলামের খিদমত করেছেন এবং শিরক-বিদ‘আতের বিরুদ্ধেও কিছু কিছু ভূমিকা রেখেছেন। তবে তারা খুব গোঁড়া ও কট্টরপন্থী হানাফী এবং মাতুরীদী আক্বীদার শক্ত ধারক-বাহক। একারণে তারা কুরআন-হাদীছের বহু বক্তব্যের অপব্যাখ্যা পর্যন্ত করেছেন। তাদের আরেকটা বড় সমস্যা হচ্ছে, তারা খাঁটি হানাফী তথা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের চরম বিরুদ্ধাচরণ করেন। এমনকি তাদেরকে বিভিন্ন মন্দ নামে ডাকে ও গালিগালাজ করেন।

এ যুগের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, দেওবন্দীদের অধিকাংশই শাখা-প্রশাখাগত মাসআলা-মাসায়েলে হানাফী ও আক্বীদায় মাতুরীদী হওয়ার পাশাপাশি খাঁটি ছূফী। এমনকি তাদের অনেকের মধ্যে কবর সম্পর্কিত শিরক-বিদ‘আতও বিদ্যমান। অন্যতম দেওবন্দী আলেম শায়খ খলীল আহমাদ সাহারানপুরী রচিত ‘আল-মুহান্নাদ আলাল মুফান্নাদ’ কিতাবটি একথার সাক্ষ্য বহন করে। কিছু বড় বড় দেওবন্দী আলেমের মধ্যে উলামায়ে কেরামকে গালিগালাজের চিত্রও দেখা যায়।

দেওবন্দীদের দুটি শাখা: (ক) তা‘লীম ও (খ) তাবলীগ। শেষোক্ত শাখাটি ‘তাবলীগ জামা‘আত’ নামে পরিচিত। আমলের দিক বিবেচনায় এই জামা‘আতের অনেকগুলো ভালো দিক আছে, কিন্তু সেই তুলনায় কবর-মাযার সম্পর্কিত ও ছূফী তান্ত্রিক অনৈসলামিক কর্মকা- কম নেই। এই জামা‘আত এমন গোপনে ও ধীরে ধীরে জনগণের মধ্যে ছূফীবাদী চিন্তাচেতনা ও মাতুরীদী আক্বীদা ছড়িয়ে দিয়ে থাকে যে, অনেক সময় সালাফী আক্বীদায় বিশ্বাসী মানুষও তাদের দ্বারা প্রতারিত হয়ে যায়। যদিও হক্ব ও বাস্তব জিনিসটা এক সময় প্রকাশিত হয়ই। একজন ব্রেলভী লেখক আরশাদ ক্বাদেরী ‘আয-যালযালাহ’ নামে একটি বই রচনা করেছেন। এই বইয়ে লেখক কিছু বড় বড় দেওবন্দী আলেমের বক্তব্য তুলে ধরেছেন, যেসব বক্তব্যে কবর-মাযার সম্পর্কিত বিদ‘আত, কুসংস্কার, এমনকি স্পষ্ট শিরকও রয়েছে। একজন বড় দেওবন্দী লেখক ও দেওবন্দের ‘আত-তাজাল্লী’ পবিত্রকার প্রধান শায়খ আমের উছমানী এই ব্যাপারটিকে স্বীকার করে নিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট বলেছেন যে, দেওবন্দীদের মধ্যে যত বিদ‘আত ও কুসংস্কার, সব এসেছে ছূফীবাদের হাত ধরে।

৮. ব্রেলবী যুগ (১২৭২ হি.-চলমান): ব্রেলবীদের গুরু আহমাদ রেযা খান আফগানীর দিকে সম্বন্ধিত করে এ যুগের নামকরণ করা হয়েছে। যিনি ছিলেন মাতুরীদী হানাফী ও কবরপূজারী ছূফী। তার উপনাম ছিলো আব্দুল মুছতফা। ১৩৪০ হিজরীতে তার মৃত্যু হয়। এ যুগের বিশেষ লক্ষণীয় দিক হচ্ছে, স্পষ্ট শিরক ও কবরপূজা। ব্রেলবীরা একটি খাঁটি কবরপূজারী ফেরক্বা। দেওবন্দীদের সাথে তাদের রয়েছে প্রচণ্ড শত্রুতা। ব্রেলবীরা সাধারণ আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের লোকদেরকে তো কাফের বলে বলেই, এমনকি দেওবন্দীদেরকেও কাফের বলে। আহমাদ রেযা খান ও তার অনুসারীরাও মাতুরীদী আক্বীদা পোষণ করে এবং এর প্রচার ও প্রসারে ভূমিকা রাখে।

৯. কাওছারী যুগ (১২৯৬ হি.-চলমান) : সালাফীদের দুশমন মাতুরীদী হানাফী মুহাম্মাদ যাহেদ কাওছারী (মৃত্যু: ১৩৭১ হি.)-এর দিকে সম্বন্ধিত করে এ যুগের নামকরণ। এ যুগে কাওছারী আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের সাথে প্রচণ্ড শত্রুতা পোষণ করেন। তিনি আলেম-উলামার নিন্দা করেন, তাদের উপর অভিশাপ করেন। কাওছারী আলেম-উলামাকে ‘মুজাসসিমা’ ও ‘মুশাব্বিহা’[6]  বানানোর তালে থাকেন। শুধু তাই নয় তিনি তাদেরকে মূর্তিপূজক, মুশরিক ও কাফের হিসাবে গণ্য করেন। তিনি বিশেষ করে আমাদের আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের আক্বীদার বইপুস্তককে কুফরী, শিরকী ও মূর্তিপূজা সম্বন্ধীয় বই হিসাবে উপস্থাপনের অপচেষ্টা করেন। এই যুগে তারা মানুষকে শিরক ও কবরপূজার দিকে আহ্বান করে। তারা অসীলার অন্তরালে কবরের উপর মসজিদ ও গম্বুজ নির্মাণের বৈধতার ফতওয়া দেয়।

কাওছারী মাতুরীদী আক্বীদা ব্যাপক প্রসারে কাজ করেন।

১০. পাঞ্জপীরী যুগ: ১৩৭০ হিজরী থেকে এই যুগের সূচনা হয়। পাকিস্তানের মারদানের একটি গ্রাম ‘পাঞ্জপীর’ অনুসারে এই দলকে পাঞ্জপীরী বলে। দলের নাম হচ্ছে, ‘জামা‘আতু ইশা‘আতিত তাওহীদ ওয়াস সুন্নাহ’। এ দলটি মূলত দেওবন্দী, নক্বশাবন্দী ও ছূফীদের একটি শাখা। পাঞ্জপীরীদের গুরু হচ্ছেন শাইখুল কুরআন মুহাম্মাদ তাহের ইবনে আছেফ (মৃত্যু: ১৪০৭ হি.)। তিনি ছিলেন দেওবন্দী, নক্বশাবন্দী ও মাতুরীদী হানাফী।

পাঞ্জপীরীদের একটি ভালো দিক হলো, কুরআনে কারীম অনুবাদে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাছাড়া তারা শিরক ও কবর সম্বন্ধীয় নানা বিদ‘আতের বিরুদ্ধে কাজ করে এবং পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের বহু স্থানে সুন্নাত পুনরুজ্জীবনে ভূমিকা রাখে। কিন্তু তাদের মূল সমস্যা হচ্ছে, তারা আল্লাহর গুণাবলির ক্ষেত্রে মাতুরীদী আক্বীদায় বিশ্বাসী। তাদের বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে মাতুরীদী আক্বীদার বইপুস্তক পড়ানো হয়। মাতুরীদী আক্বীদাপ্রীতির কারণে তারা আবু মানছূর মাতুরীদীকে ‘ইমামুল হুদা’, ‘ইমামু আহলিস সুন্নাহ’ উপাধিতে ভূষিত করেছে। তারা সালাফে ছালেহীনকে ‘মুফাউয়িযাহ’[7] বানানোর অপচেষ্টা করেছে এবং ‘মুআউয়িলাহ’[8] দেরকে আহলুস সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত গণ্য করেছে। তাছাড়া তারা ফিক্বহী বিষয়ে কট্টরপন্থী হানাফী।

তাক্বলীদের ক্ষেত্রে অতিরঞ্জন করতে গিয়ে তারা হাদীছের অপব্যাখ্যা করতেও পিছপা হয়নি। তাদের গুরু মুহাম্মাদ তাহের ইবনে আছেফ রফ‘উল ইয়াদাইন বা ছালাতে দুই হাত উত্তোলনের হাদীছগুলোর ব্যাপারে বলেন, এগুলো দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে নাভী ও হাঁটুর উপরে হাত উঠানো। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের বহু জায়গার আহলেহাদীছদের সাথে তাদের রয়েছে প্রচণ্ড শত্রুতা; এমনকি আহলেহাদীছদের ব্যাপারে তারা সরাসরি মিথ্যা বলতেও দ্বিধা করে না। পাঞ্জপীরীদের গুরু মুহাম্মাদ তাহের ইবনে আছেফ আহলেহাদীছদের ব্যাপারে মনে করতেন, তারা ক্বাদিয়ানীদের ছোট ভাই!

১১. নদবী যুগ: মাতুরীদী আক্বীদা গ্রহণ করার দিক দিয়ে দেওবন্দী ও পাঞ্জপীরীদের চেয়ে নদবী যুগটা খুব বেশি আলাদা নয়। নদবীদের গুরু শায়খ আবুল হাসান নদবী সালাফীদের সাথে থাকার ভান করলেও তিনি আবু মানছূর মাতুরীদী, তার অনুসৃত পথ এবং তার গ্রন্থসমূহের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তিনি মাতুরীদীকে আশ‘আরীর উপর অগ্রাধিকার দিয়েছেন।[9]

সংক্ষেপে এগুলোই হচ্ছে মাতুরীদী আক্বীদা বিস্তৃতি লাভের কারণ ও ক্রমবিকাশের স্তর। মহান আল্লাহ আমাদেরকে এসব কারণ ও প্রেক্ষাপটের খপ্পড়ে পড়ে ইসলাম পরিপন্থী পথ ও মত থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক্ব দিন। আমীন!

(চলবে)

[1]. হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ, (বৈরূত: দারুল জীল, ১ম প্রকাশ: ১৪২৬ হি./২০০৫ খৃ.), ১/২৬০।

[2]. যারা বলে, আল্লাহ একটি শরীর, যার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, গভীরতা, স্বাদ ও গন্ধ রয়েছে, তারা হচ্ছে মুজাসসিমাহ -না‘ঊযুবিল্লাহ- (আব্দুল্লাহ জারবূ, আছারুল ঈমান, ১/১১৪, টীকা নং ২)।

[3]. যারা আল্লাহকে সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ মনে করে, তারা হচ্ছে মুশাববিহাহ (আত-তা‘রীফাত, ২১৬)।

[4]. দ্রষ্টব্য: আদাউল মাতুরীদিয়্যাহ লিলআক্বীদাতিস সালাফিয়্যাহ, ১/২৯৪-৩০১।

[5]. বাযদাবীর জীবনীর এ অংশটুকুর জন্য দেখুন: আদাউল মাতুরীদিয়্যাহ লিলআক্বীদাতিস সালাফিয়্যাহ, ১/৩১০।|

[6]. মুজাসসিমাহ ও মুশাব্বিহার ব্যাখ্যা ইতিপূর্বে গত হয়ে গেছে।

[7]. শব্দের অর্থ না জানার দাবী করে আল্লাহর দিকে এর অর্থ জানার বিষয়টি ঠেলে দিয়ে কেবল শব্দটিকে সাব্যস্ত করার নাম ‘তাফবীয’। আর যারা একাজ করে তাদেরকে ‘মুফাউয়িযাহ’ বলে। এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা গত হয়ে গেছে।

[8]. যারা আল্লাহর গুণাবলি সম্পর্কিত কুরআন-হাদীছের বক্তব্যের প্রকাশ্য অর্থ অস্বীকার করে এবং এর মাধ্যমে তারা মূলত আল্লাহর বিভিন্ন ছিফাত অস্বীকার করে।

[9]. মাতুরীদী আক্বীদার ক্রমবিকাশের এ অংশটির জন্য দেখুন: আদাউল মাতুরীদিয়্যাহ লিলআক্বীদাতিস সালাফিয়্যাহ, ১/২৮৩-২৯৩; আল-মাওসূ‘আতুল মুয়াস্সারাহ ফিল আদইয়ানি ওয়াল ফিরাক্ব, ১/৯৫-৯৯; মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুর রহমান আল-খুমাইয়িস, হিওয়ার মা‘আ আশ‘আরী ওয়াল মাতুরীদিয়্যাহ রবীবাতুল কুল্লাবিয়্যাহ, (রিয়াদ: মাকতাবাতুল মা‘আরেফ, ১ম প্রকাশ: ১৪২৬ হি./২০০৫ খৃ.), পৃ. ১৬৪-১৬৭।|