ইমাম আবু হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ)-এর আক্বীদা বনাম হানাফীদের আক্বীদা

আব্দুল আলীম ইবনে কাওছার মাদানী*
নভেম্বর’২০ সংখ্যায় প্রকাশিতের পর)


(পর্ব-১৮)

ঈমান :

সম্মানিত পাঠক! চলুন বরাবরের মতো প্রথমে দেখে আসি, ঈমানের সঠিক সংজ্ঞা ও ব্যাখ্যা কী? পরবর্তী আলোচনা সহজে বুঝার জন্য আমরা এখানে সংক্ষিপ্ত আকারে বিষয়টি দেখব। কারণ এর আগে আমরা এ ব্যাপারে অপেক্ষাকৃত বিস্তারিত জেনে এসেছি।

‘আল-ঈমান’ (اَلْإِيْمَانُ) শব্দটি বাবে إِفْعَالٌ-এর মাছদার। অভিধানিক অর্থ- اَلتَّصْدِيْقُ ‘আন্তরিক বিশ্বাস’, اَلْإِقْرَار وَالطَّمَأْنِيْنَةُ ‘স্বীকৃতি ও প্রশান্তি’। শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যা (রাহিমাহুল্লাহ) শেষোক্ত অর্থটাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। কেননা হৃদয়ে যখন আন্তরিক বিশ্বাস ও বশ্যতা স্থান পায়, তখনই কেবল স্বীকৃতি ও প্রশান্তি অর্জিত হয়।[1] শরীআতের পরিভাষায়,

تَصْدِيْقٌ بِالْجِنَانِ وَقَوْلٌ بِاللِّسَانِ وَعَمَلٌ بِالْجَوَارِحِ وَالْأَرَكَانِ يَزِيْدُ بِالطَّاعَةِ وَيَنْقُصُ بِالْمَعْصِيَةِ.

‘অন্তরে বিশ্বাস, মুখে স্বীকৃতি, আমলে বাস্তবায়নের নাম ঈমান, যা পুণ্য দ্বারা বৃদ্ধি পায় এবং পাপ দ্বারা হ্রাস পায়’।[2]

আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের নিকট, কথা ও কাজের নাম ঈমান। এর ভূরি ভূরি দলীল মিলে। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,

اَلْإِيْمَانُ بِضْعٌ وَسَبْعُوْنَ أَوْ بِضْعٌ وَسِتُّوْنَ شُعْبَةً فَأَفْضَلُهَا قَوْلُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَأَدْنَاهَا إِمَاطَةُ الْأَذَى عَنِ الطَّرِيْقِ وَالْحَيَاءُ شُعْبَةٌ مِنَ الْإِيْمَانِ.

‘ঈমানের ৭০ বা ৬০টিরও উপরে শাখা রয়েছে। এর সর্বোত্তম হলো, ‘লা ইলা-হা ইল্লাল্লাহ’ বলা এবং সর্বনিম্নটি হলো, রাস্তা হতে কষ্টদায়ক বস্তু দূর করা। আর লজ্জাও ঈমানের একটি শাখা’।[3] হাদীছটিতে ‘রাস্তা হতে কষ্টদায়ক বস্তু দূর করা’-কে ঈমানের একটি শাখা হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। ‘রাস্তা হতে কষ্টদায়ক বস্তু দূর করা’ কাজ নয় কি? ইবনু আবিল ইয আল-হানাফী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

فَإِذَا كَانَ الْإِيْمَانُ أَصْلًا لَهُ شُعَبٌ مُتَعَدِّدَةٌ وَكُلُّ شُعْبَة مِنْهَا تُسَمَّى إِيمَانًا فَالصَّلَاة مِنَ الْإِيمَانِ وَكَذَلِكَ الزَّكَاة وَالصَّوْمُ وَالْحَجُّ وَالْأَعْمَالُ الْبَاطِنَة، كَالْحَيَاءِ وَالتَّوَكُّلِ وَالْخَشْيَة مِنَ اللهِ وَالْإِنَابَة إِلَيْهِ، حَتَّى تَنْتَهِي هَذِهِ الشُّعَبُ إِلَى إِمَاطَة الْأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ فَإِنَّهُ مِنْ شُعَبِ الْإِيمَانِ.

‘ঈমান হচ্ছে মূল, যার বহু শাখা-প্রশাখা রয়েছে। এর প্রত্যেকটি শাখাকে ‘ঈমান’ বলা হয়। ফলে ছালাত, যাকাত, ছওম ও হজ্জ ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। অনুরূপভাবে গোপন আমলও। যেমন লজ্জা, ভরসা, আল্লাহর ভয় ও তাঁর নিকট তওবা। এভাবে ‘রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু দূর করা’ পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়েছে এসব শাখা-প্রশাখা। কেননা সেটাও ঈমানের অন্তর্ভুক্ত’।[4] সেজন্য, ঈমানের পারিভাষিক অর্থে মৌলিকভাবে পাঁচটি বিষয় থাকা জরুরী। যথা- ১. অন্তরের কথা, ২. মুখের স্বীকৃতি, ৩. অন্তরের আমল, ৪. মুখের আমল ও ৫. অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমল।[5] ইমাম আজুর্রী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

بَابُ الْقَوْلِ بِأَنَّ الْإِيْمَانَ تَصْدِيْقٌ بِالْقَلْبِ وَإِقْرَارٌ بِاللِّسَانِ وَعَمَلٌ بِالْجَوَارِحِ لَا يَكُوْنُ مُؤْمِنًا إِلَّا أَنْ تَجْتَمِعَ فِيْهِ هَذِهِ الْخِصَالُ الثَّلَاثُ.

‘অনুচ্ছেদ : ঈমান অন্তরের বিশ্বাস, মৌখিক স্বীকৃতি ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দ্বারা কাজের নাম। কেউ ততক্ষণ মুমিন হবে না, যতক্ষণ না তার মধ্যে এই তিনটি বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় ঘটবে’।[6] এরপর তিনি বলেন,

ثُمَّ اعْلَمُوْا أَنَّهُ لَا تُجْزِئُ الْمَعْرِفَةُ بِالْقَلْبِ وَالتَّصْدِيْق إِلَّا أَنْ يَكُوْنَ مَعَهُ الْإِيْمَانُ بِاللِّسَانِ نُطْقًا وَلَا تُجْزِيءُ مَعْرِفَةٌ بِالْقَلْبِ، وَنُطْقٌ بِاللِّسَانِ، حَتَّى يَكُوْنَ عَمَلٌ بِالْجَوَارِحِ، فَإِذَا كَمُلَتْ فِيْهِ هَذِهِ الثَّلَاثُ الْخِصَالِ كَانَ مُؤْمِنًا دَلَّ عَلَى ذَلِكَ الْقُرْآنُ، وَالسُّنَّةُ، وَقَوْلُ عُلَمَاءُ الْمُسْلِمِيْنَ.

‘অতঃপর জেনে রাখুন, শুধু অন্তরের বিশ্বাস যথেষ্ট হবে না, যতক্ষণ না এর সাথে মৌখিক স্বীকৃতি থাকবে। অনুরূপভাবে অন্তরের বিশ্বাস ও মৌখিক স্বীকৃতি যথেষ্ট হবে না, যতক্ষণ না এর সাথে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমল থাকবে। অতএব কোনো ব্যক্তির মাঝে এই তিনটি বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেলে সে-ই ‘মুমিন’ হিসাবে গণ্য হবে। কুরআন, হাদীছ এবং ওলামায়ে মুসলিমীনের বক্তব্য এ কথারই প্রমাণ বহন করে’।[7]/[8]

অনুরূপভাবে ঈমান বাড়ে ও কমে। মহান আল্লাহ বলেন,

إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ

‘মুমিন তো কেবল তারাই, যাদের সামনে যখন আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়, তখন তাদের অন্তরসমূহ ভীত হয়ে পড়ে। আর যখন তাদের সামনে তার আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করা হয়, তখন তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে দেয় এবং তারা তাদের রবের উপর ভরসা করে’ (আল-আনফাল, ৮/২)। আবু হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেন,

اَلْإِيْمَانُ بِضْعٌ وَسَبْعُوْْنَ أَوْ بِضْعٌ وَسِتُّوْنَ شُعْبَةً فَأَفْضَلُهَا قَوْلُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَأَدْنَاهَا إِمَاطَةُ الْأَذَى عَنِ الطَّرِيْقِ وَالْحَيَاءُ شُعْبَةٌ مِنَ الْإِيْمَانِ.

‘ঈমানের ৭০ বা ৬০টিরও উপরে শাখা রয়েছে। এর সর্বোত্তম হলো, ‘লা ইলা-হা ইল্লাল্লাহ বলা’ এবং সর্বনিম্নটি হলো, রাস্তা হতে কষ্টদায়ক বস্তু দূর করা। আর লজ্জাও ঈমানের একটি শাখা’।[9] হাদীছটি ঈমান হ্রাস-বৃদ্ধির উৎকৃষ্ট দলীল। নবাব ছিদ্দীক্ব হাসান খান ভূপালী (রাহিমাহুল্লাহ) হাদীছটি উল্লেখপূর্বক বলেন,

وَفِيْ هَذَا دَلِيْلٌ عَلَى أَنَّ الْإِيْمَانَ فِيْهِ أَعْلَى وَأَدْنَى وَإِذَا كَانَ كَذَلكَ كَانَ قَابِلاً لِلزِّيَادَةِ وَالنُّقْصَانِ.

‘ঈমানের যে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন স্তর রয়েছে, তার দলীল এই হাদীছে মিলে। ব্যাপারটি যদি তাই হয়, তাহলে বুঝতে হবে- ঈমানে হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে’।[10]

আমরা আগে দেখে এসেছি যে, ঈমানের মাসআলায় ইমাম আবু হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ)-এর দুটো ভুল হয়ে গেছে। শুধু হৃদয়ের বিশ্বাস ও মুখের স্বীকৃতিকে তিনি ঈমান হিসাবে আখ্যায়িত করতেন; আমলকে ঈমানের অন্তর্ভুক্ত গণ্য করতেন না। তিনি বলেন, اَلْإِيْمَانُ إِقْرَارٌ بِاللِّسَانِ، وَتَصْدِيْقٌ بِالْجِنَانِ ‘মুখের স্বীকৃতি ও অন্তরের বিশ্বাস হচ্ছে ঈমান’।[11] এটা তার প্রথম ভুল। তার আরেকটি ভুল হচ্ছে, ‘ঈমান বাড়েও না, কমেও না’।[12] তিনি বলেন, وَالْإِيْمَانُ لَا يَزِيْدُ وَلَا يَنْقُصُ ‘আর ঈমান বাড়েও না, কমেও না’।[13]

এ ব্যাপারে কথা বলতে গিয়ে আমরা প্রমাণ পেয়েছিলাম যে, কারও কারও মতে, ইমাম আবু হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ) তার এই মত থেকে ফিরে এসেছিলেন। তাছাড়া এই ভুল প্রমাণিত হলেও তিনি এর জন্য গোনাহগার হবেন না; বরং ইজতেহাদের জন্য একটি নেকী পাবেন ইনশাআল্লাহ।

সেকারণে ইমাম আবু হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ)-এর ঈমান সম্পর্কিত আক্বীদার সাথে মাতুরীদীদের আক্বীদার কিছু মিল ও অমিল পরিলক্ষিত হয়। যেমন-

মিল : ১. আমলকে ঈমান থেকে বের করে দেওয়া। শুধু সত্যায়নই ঈমান।

২. ঈমান বাড়েও না, কমেও না।

৩. ঈমানে ‘ইস্তিছনা’ হারাম।[14]

৪. কাবীরা গোনাহগারকে কাফের বলা যাবে না। উল্লেখ্য, কাবীরা গোনাহগারের ব্যাপারে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতও এ আক্বীদাই পোষণ করে।

অমিল : ইমাম আবু হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ)-এর নিকট ‘অন্তরের বিশ্বাস ও মুখের স্বীকৃতি’র নাম ঈমান। অর্থাৎ মৌখিক স্বীকৃতি ঈমানের অন্তর্ভুক্ত ও অংশ। কিন্তু আবু মানছূর মাতুরীদী ও তার অধিকাংশ অনুসারী মৌখিক স্বীকৃতিকে ঈমানের স্বরূপের বাইরে গণ্য করে থাকেন। তারা মনে করেন, শুধু অন্তরের বিশ্বাসই ঈমান। তবে, তারা মৌখিক স্বীকৃতিকে দুনিয়াবী হুকুমের শর্ত হিসাবে গণ্য করেন।[15]

প্রিয় পাঠক! ঈমানের সংজ্ঞা, হ্রাস-বৃদ্ধি ও ইস্তিছনার ব্যাপারে মাতুরীদীদের এই আক্বীদা প্রমাণে তারা কিছু যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপন করে থাকেন। কিন্তু সঠিক বিচার-বিশ্লেষণের নিরিখে ও সালাফে ছালেহীনের মূলনীতির আলোকে সেগুলো মোটেও টিকে না। কলেবর বৃদ্ধির আশঙ্কায় সেগুলো এখানে বিশ্লেষণ করা হলো না।

যাহোক, ঈমানের যে সংজ্ঞা ও ব্যাখ্যা আমরা ইতোপূর্বে দেখে এসেছি, সেটাই কুরআন-হাদীছে বর্ণিত এবং সালাফে ছালেহীনের গৃহীত ও অনুসৃত ঈমান। ফলে সেই ঈমানই আমাদেরকে ধারণ করতে হবে।

তাক্বদীর : তাক্বদীর ঈমানের ছয়টি স্তম্ভের অন্যতম একটি স্তম্ভ। প্রকৃত মুমিন হতে হলে অবশ্যই তাক্বদীরে বিশ্বাস করতে হবে, তাক্বদীরে বিশ্বাস স্থাপন ছাড়া কেউ মুমিন হতে পারবে না। পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছে তাক্বদীর সম্পর্কিত অসংখ্য বর্ণনা এসেছে। সেজন্য ইসলামে এর গুরুত্ব অপরিসীম। বিষয়টি সরাসরি আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত হওয়ার কারণে এর গুরুত্ব এবং তাৎপর্য যারপর নেই বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণ আল্লাহর কতিপয় নাম ও ছিফাতের (গুণ) সাথে এর সরাসরি সম্পর্ক।[16]

আল-হামদুলিল্লাহ তাক্বদীরের ক্ষেত্রে মাতুরীদীরা সালাফে ছালেহীনের নীতি থেকে সরে যাননি। বরং ইমাম আবু হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ)সহ অন্যান্য সালাফে ছালেহীন তাক্বদীরের ব্যাপারে যে আক্বীদা পোষণ করতেন, মাতুরীদীরাও সেই আক্বীদাই পোষণ করেন। তারা মনে করেন, তাক্বদীরের ৪টি স্তর রয়েছে। কল্যাণ-অকল্যাণ সবকিছুই মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়ে থাকে। মহাবিশ্বের কোনো কিছুই তার বিনা ইচ্ছায় হয় না। বান্দার ভালো-মন্দ কর্মও মূলত আল্লাহরই সৃষ্টি। বান্দা তার কর্মের ব্যাপারে স্বাধীন ও তার শক্তি রয়েছে। সে কোনো কিছু করতে বাধ্য নয়। সে তার ইচ্ছা ও শক্তি প্রয়োগ করেই কল্যাণ-অকল্যাণ সবকিছুই করে থাকে, যে ইচ্ছা ও শক্তি মহান আল্লাহই তাকে দান করেছেন।[17]

নবুঅত : নবুঅত নিয়ে ইমাম আবু হানীফা ও হানাফীদের মধ্যে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করতে গেলে আসলে দুটি বিষয় উঠে আসে। (ক) নবী-রাসূলগণ (আলাইহিমুস সালাম)-এর নবুঅত ও রিসালাতের দায়িত্ব প্রাপ্তির সত্যতা প্রমাণিত হবে কীভাবে? (খ) নবী-রাসূলগণ (আলাইহিমুস সালাম)-এর কর্তৃক ভুল-ত্রুটি হতে পারে কিনা?

প্রথম বিষয়টির ব্যাপারে আবু মানছূর মাতুরীদী মনে করেন, নবী-রাসূলগণ (আলাইহিমুস সালাম) নবুঅত ও রিসালাতের দায়িত্ব প্রাপ্তির আগে এবং পরে তাদের নবী বা রাসূল হওয়ার সত্যতা তাদের সৃষ্টিগত ও আদর্শগত বৈশিষ্ট্য দ্বারা সাব্যস্ত হয়। অনুরূপভাবে মু‘জিযা দ্বারাও সাব্যস্ত হয়।[18] কিন্তু অধিকাংশ মাতুরীদী মনে করেন, নবুঅত ও রিসালাতের দায়িত্ব প্রাপ্তির সত্যতা প্রমাণিত হওয়ার জন্য মু‘জিযা ছাড়া অন্য কোনো দলীল নেই। কারণ তাদের মতে, নবী-রাসূলগণ (আলাইহিমুস সালাম)-এর নবুঅত ও রিসালাতের দায়িত্ব প্রাপ্তির ব্যাপারটা প্রমাণের জন্য কেবলমাত্র মু‘জিযা নিশ্চিত জ্ঞানের (اَلْعِلْمُ الْيَقِيْنِيُّ) ফায়েদা দেয়।[19] বাযদাবী বলেন, وَلَا يُتَصَوَّرُ ثُبُوْتُ الرِّسَالَةِ بِلَا دَلِيْلٍ؛ فَيَكُوْنُ الثُّبُوْتُ بِالدَّلَائِلِ، وَلَيْسَتْ تِلْكَ الدَّلَائِلُ إَلاَّ الْمُعْجِزَات ‘দলীল ছাড়া রিসালাত সাব্যস্ত হওয়ার ব্যাপারটা ভাবাও যায় না। সুতরাং দলীল দ্বারাই তা সাব্যস্ত হতে হবে। আর সেই দলীল মু‘জিযা ছাড়া আর কিছুই নয়’।[20]

কোনো সন্দেহ নেই যে, নবুঅত ও রিসালাত সাব্যস্ত হওয়ার জন্য মু‘জিযা বিশুদ্ধ দলীল। কিন্তু মু‘জিযা ছাড়া নবুঅত ও রিসালাত সাব্যস্ত হয় না- একথা মোটেও ঠিক নয়। বরং আরও বিভিন্নভাবেও নবুঅত ও রিসালাত সাব্যস্ত হয়। সত্য বলতে মাতুরীদীরা এ ব্যাপারে মু‘তাযিলীদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছে।[21]

উল্লেখ্য, নবুঅত সাব্যস্ত হওয়ার বিস্তারিত পদ্ধতির ব্যাপারে ইমাম আবু হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ)-এর পক্ষ থেকে তেমন কোনো বক্তব্য পাওয়া যায় না।[22]

এবার আসা যাক দ্বিতীয় বিষয়টিতে; নবী-রাসূলগণ (আলাইহিমুস সালাম)-এর কর্তৃক ভুল-ত্রুটি হতে পারে কিনা? গোটা মুসলিম উম্মাহ একমত হয়েছেন যে, নবী-রাসূলগণ (আলাইহিস সালাম) অহি পৌঁছে দেওয়ার ব্যাপারে মা‘ছূম। এক্ষেত্রে তারা ভুলেও যান না, উদাসীনও হন না। আমাদের নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ব্যাপারে মহান আল্লাহ এমন ঘোষণাই দিয়েছেন। অন্যান্য নবী-রাসূল (আলাইহিমুস সালাম)-এর বেলায়ও ব্যাপারটা সেরকমই। মহান আল্লাহ বলেন, سَنُقْرِئُكَ فَلَا تَنْسَى ‘আমি তোমাকে পড়িয়ে দেবো, যার ফলে তুমি ভুলে যাবে না’ (আল-আ‘লা, ৮৭/৬)। অহি পৌঁছানোর বাইরে অন্য ব্যাপারগুলোতে সালাফে ছালেহীনের বক্তব্য হলো, নবী-রাসূলগণ (আলাইহিমুস সালাম)ও মানুষ। ফলে সমস্ত মানুষের যা হতে পারে, তাদেরও তাই হতে পারে। তবে মহান আল্লাহ তাদেরকে কাবীরা গোনাহ থেকে রক্ষা করেছেন এবং রক্ষা করেছেন এমন ছাগীরা গোনাহ থেকে, যা হীন প্রকৃতির প্রতি ইঙ্গিত করে। কারণ তাদের মর্যাদার সাথে এমন ছাগীরা গোনাহ যায় না। তবে যেসব ছাগীরা গোনাহ ব্যক্তির হীনতা প্রমাণ করে না, সেগুলো নবী-রাসূল (আলাইহিমুস সালাম) কর্তৃক ঘটা সম্ভব বলে সালাফে ছালেহীন মনে করেন। অবশ্য মহান আল্লাহ তাদেরকে সেই ছাগীরা গোনাহর উপর রেখে দেন না; বরং দ্রুততম সময়ের মধ্যে অহি নাযিল করে তাদের সংশোধন করে দেন। নবী-রাসূলগণ (আলাইহিমুস সালাম)-এর এজাতীয় কিছু ঘটনার কথা মহান আল্লাহ আমাদেরকে বলেছেন, যার কারণে তিনি তাদেরকে ভর্ৎসনাও করেছেন এবং সংশোধনও করে দিয়েছেন। যেমন- আব্দুল্লাহ ইবনু উম্মে মাকতূম (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর ঘটনা, যিনি নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে হেদায়াতপ্রাপ্তির জন্য এসেছিলেন; কিন্তু নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কুরাইশ নেতাদের দাওয়াতী কাজে ব্যস্ত থাকায় তার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। পরে নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে ভর্ৎসনা করে আল্লাহ এ আয়াত অবতীর্ণ করেন-

عَبَسَ وَتَوَلَّى – أَنْ جَاءَهُ الْأَعْمَى – وَمَا يُدْرِيكَ لَعَلَّهُ يَزَّكَّى – أَوْ يَذَّكَّرُ فَتَنْفَعَهُ الذِّكْرَى – أَمَّا مَنِ اسْتَغْنَى – فَأَنْتَ لَهُ تَصَدَّى – وَمَا عَلَيْكَ أَلَّا يَزَّكَّى – وَأَمَّا مَنْ جَاءَكَ يَسْعَى – وَهُوَ يَخْشَى – فَأَنْتَ عَنْهُ تَلَهَّى

‘সে মুখ ভার করল এবং মুখ ঘুরিয়ে নিলো। কারণ তার কাছে এক অন্ধ ব্যক্তি আসল।   (হে নবী!) তুমি কি জানো, সে হয়তো পরিশুদ্ধ হতো। কিংবা উপদেশ গ্রহণ করত, ফলে উপদেশ তার উপকারে লাগত। পক্ষান্তরে যে পরোয়া করে না, তুমি তার প্রতি মনোযোগ দিচ্ছ। সে পরিশুদ্ধ না হলে তোমার উপর কোনো দোষ নেই। পক্ষান্তরে যে লোক তোমার কাছে ছুটে আসল আর সে ভয়ও করে, তুমি তার প্রতি অমনোযোগী হলে’ (আবাসা, ৮০/১-১০)। এরকম আরও উদাহরণ আছে।

উল্লেখ্য, এই ভুল তাদের অনুসরণের উপর কোনো প্রভাব ফেলবে না। বরং তাদের অনুসরণ অপরিহার্য। মহান আল্লাহ বলেন, أُولَئِكَ الَّذِينَ هَدَى اللَّهُ فَبِهُدَاهُمُ اقْتَدِهْ ‘ওরা হলো তারা, যাদেরকে আল্লাহ হেদায়াত দান করেছিলেন। ফলে তুমি তাদের পথ অনুসরণ করো’ (আল-আনআম, ৬/৯০)। কারণ সেই ভুল আল্লাহ সংশোধন করে দিয়েছিলেন।

যদি বলা হয়, তাদের সামান্য ভুল হতে পারে, কিন্তু কেন? এর পেছনে কী-বা হিকমাহ ও প্রজ্ঞা রয়েছে? জবাব হচ্ছে, এর মাধ্যমে আল্লাহ তাদের প্রতি রহমত করেছেন। কারণ আল্লাহ তাওবার মতো একটি প্রিয় ইবাদত থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করতে চাননি। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘আমি প্রতিদিন ৭০ বারের বেশি আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাই ও তওবা করি’।[23]

ইমাম আবু হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ)ও স্বীকার করেছেন যে, নবী-রাসূলগণ (আলাইহিমুস সালাম)-এর ভুল-ত্রুটি হতে পারে। তিনি বলেন,

اَلْأَنْبِيَاءُ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ كُلُّهُمْ مُنَزَّهُوْنَ عَنِ الصَّغَائِرِ وَالْكَبَائِرِ وَالْكُفْرِ وَالْقَبَائِحِ وَقَدْ كَانَتْ مِنْهُمْ زَلَّاتٌ وَخَطَايَا

‘প্রত্যেক নবীই (আলাইহিমুস সালাম) ছাগীরা গোনাহ, কাবীরা গোনাহ, কুফর ও নিকৃষ্ট কাজকর্ম থেকে মুক্ত। তবে তাদের পক্ষ থেকে ভুলত্রুটি হতে পারে’।[24]

কিন্তু আবু মানছূর মাতুরীদী স্পষ্ট বলেছেন যে, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পক্ষ থেকে ভুলত্রুটির কথা জানা যায় না।[25] আর এই বিশ্বাস থেকেই মাতুরীদীরা কুরআন ও হাদীছের যেসব জায়গায় নবী-রাসূলগণ (আলাইহিমুস সালাম)-এর ভুল-ত্রুটি প্রমাণিত, সেগুলো ‘খবরে ওয়াহেদ’ হলে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। আর ‘মুতাওয়াতির’ হলে স্পষ্ট অপব্যাখ্যা করেছে।[26] আল্লাহ আমাদেরকে সর্বদা বিশুদ্ধ বিষয়গুলো বুঝার ও আমলে নেয়ার তাওফীক্ব দান করুন। আমীন!

(চলবে)


* বি. এ. (অনার্স), উচ্চতর ডিপ্লোমা, এম. এ. এবং এম.ফিল., মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব; অধ্যক্ষ, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ।

[1]. দ্রষ্টব্য : আছ-ছরেমুল মাসলূল, প্রকাশক : সঊদী বোর্ডার গার্ড, তা. বি.), পৃ. ৫১৯।

[2]. ইবনু তায়মিয়্যা, আল-আক্বীদাতুল ওয়াসেত্বিইয়াহ, তাহক্বীক্ব : আশরাফ ইবনে আব্দুল মাক্বছূদ (রিয়ায : আযওয়াউস সালাফ, ২য় প্রকাশ, ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.), পৃ. ১১৩; আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল হামীদ আল-আছারী, (আল-ওয়াজীয ফী আক্বীদাতিস সালাফিছ ছলেহ, প্রকাশক : সঊদী ধর্ম মন্ত্রণালয়, প্রথম প্রকাশ : ১৪২২ হি.), পৃ. ১০৩।

[3]. ছহীহ মুসলিম, হা/৫৮।

[4]. ইবনু আবিল ইয, শারহুল আক্বীদাহ আত-ত্বহাবিইয়াহ, তাহক্বীক্ব : আহমাদ শাকের, (সঊদী আরব : ধর্ম, ওয়াকফ, দাওয়াত ও দিক-নির্দেশনা বিষয়ক মন্ত্রণালয়, ১ম প্রকাশ : ১৪১৮ হি.), পৃ. ৩২৩।

[5]. ইবনু তায়মিয়্যা, আল-আক্বীদাতুল ওয়াসেত্বিইয়াহ, পৃ. ১১৩।

[6]. আবুবকর আল-আজুর্রী, আশ-শারীআহ, (রিয়ায : দারুল ওয়াত্বান, ২য় প্রকাশ, ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.), ২/৬১১।

[7]. প্রাগুক্ত।

[8]. ঈমানের পরিচয় সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে পড়ুন : আব্দুল আলীম ইবনে কাওছার মাদানী, ঈমানের মূলনীতি, পৃ. ৯-১৬।

[9]. ছহীহ মুসলিম, হা/৫৮।

[10]. ছিদ্দীক্ব হাসান খান (মৃ. ১৩০৭ হি.), ফাতহুল বায়ান ফী মাক্বাছিদিল কুরআন, (ছয়দা, বৈরূত : আল-মাকতাবাহ আল-আছরিইয়াহ, ১৪১২ হিঃ/১৯৯২ খ্রি.), ৫/১৩১।

[11]. ইমাম আবু হানীফা, কিতাবুল ওয়াছিয়্যাহ, (বৈরূত : দারু ইবনি হাযম, ১ম প্রকাশ : ১৪১৮ হি./১৯৯৭ খ্রি.), পৃ. ২৭-২৮।

[12]. দ্রষ্টব্য : আল-ফারকু বায়নাল ফিরাক্ব ওয়া বায়ানুল ফিরক্বাতিন নাজিয়াহ, পৃ. ১৯১; আল-মিলাল ওয়ান-নিহাল, ১/১৪১।

[13]. আবু হানীফা, কিতাবুল ওয়াছিয়্যাহ, তাহক্বীক্ব : আবু মুআয মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল হাই উওয়াইনা, (বৈরূত : দারু ইবনি হাযম, ১ম প্রকাশ : ১৪১৮ হি./১৯৯৭ খ্রি.), পৃ. ২৯।

[14]. সহজ ভাষায় ‘আমি মুমিন ইনশাআল্লাহ’- এমন কথা বলাকে ‘আল-ইস্তিছনা ফিল ঈমান’ বা ঈমানে ইস্তিছনা বলা হয়। এটি পরবর্তীতে সৃষ্ট একটি মাসআলা। সালাফে ছালেহীনের প্রথম যুগের মানুষদের কাছে এটি পরিচিত ছিল না। যাহোক, মাসআলাটি নিয়ে মতভেদ রয়েছে। (ক) কুল্লাবিয়্যাদের নিকট, ‘আমি মুমিন ইনশাআল্লাহ’ এভাবে বলা ওয়াজিব। (খ) মুরজিআ ও জাহমিয়্যাদের নিকট, এভাবে বলা হারাম। (গ) কিন্তু আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের নিকট, দুটি দিক বিবেচনায় এটি কখনো হারাম আবার কখনো ওয়াজিব (দ্রষ্টব্য : আল-মাতুরীদিয়্যাহ : দিরাসাতান ওয়া তাক্ববীমান, পৃ. ৪৬৮-৪৭১)।

[15]. উছূলুদ্দীন ইনদাল ইমাম আবী হানীফা, পৃ. ৬০৩-৬০৫।

[16]. তাক্বদীরের ব্যাপারে বিস্তারিত ও স্বচ্ছ ধারণা পেতে পড়ুন: আব্দুল আলীম ইবনে কাওছার মাদানী, ‘তাক্বদীর : আল্লাহর এক গোপন রহস্য’।

[17]. দ্রষ্টব্য : মানহাজুল মাতুরীদিয়্যাহ ফিল আক্বীদাহ, পৃ. ৫৩-৫৪; তাক্বদীরের ব্যাপারে স্বচ্ছ ধারণা পেতে পড়ুন : আব্দুল আলীম ইবনে কাওছার মাদানী, ‘তাক্বদীর : আল্লাহর এক গোপন রহস্য’।

[18]. দ্রষ্টব্য: মাতুরীদী, আত-তাওহীদ, পৃ. ১৮৮-১৮৯।

[19]. আল-মাতুরীদিয়্যাহ : দিরাসাতান ও তাক্ববীমান, পৃ. ৩৭৯-৩৮০।

[20]. বাযদাবী, উছূলুদ্দীন, পৃ. ১০১-১০২।

[21]. বিস্তারিত দ্রষ্টব্য : আল-মাতুরীদিয়্যাহ : দিরাসাতান ও তাক্ববীমান, পৃ. ৩৮১-৩৮৭।

[22]. দ্রষ্টব্য : উছূলুদ্দীন ইনদাল ইমাম আবী হানীফা, পৃ. ৫৭৮।

[23]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৩০৭।

[24]. আল-ফিক্বহুল আকবার, পৃ. ৩৭।

[25]. আবু মানছূর মাতুরীদী, আত-তাওহীদ, পৃ. ২০২।

[26]. উছূলুদ্দীন ইনদাল ইমাম আবী হানীফা, পৃ. ৫৭৯।