ইমাম আবু হানীফা (রাহি.)-এর আক্বীদা বনাম হানাফীদের আক্বীদা

আব্দুল আলীম ইবনে কাওছার মাদানী
বি. এ. (অনার্স), উচ্চতর ডিপ্লোমা, এম. এ. এবং এম.ফিল.,
মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব;
অধ্যক্ষ, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ।

(পর্ব-১৬)

ইমাম আবু হানীফা (রাহি.) ও আবু মানছূর মাতুরীদীর নিকট তাওহীদ:

কুরআন ও হাদীছে বর্ণিত তাওহীদ [1]:

আভিধানিক অর্থ: ‘তাওহীদ’ (اَلتَّوْحِيْدُ) শব্দটি باب تفعيل বা وَحَّدَ يُوَحِّدُ تَوْحِيْدًا থেকে গৃহীত। কোনো কিছুকে ‘একক’ করে দেওয়ার নাম ‘তাওহীদ’।

পারিভাষিক অর্থ: তাওহীদের পারিভাষিক সংজ্ঞায় ইসলামের নামে সৃষ্ট বিভিন্ন দল ও উপদল বিভ্রান্ত হয়েছে। কিন্তু আল্লাহ নবী-রাসূলগণকে যে তাওহীদ প্রতিষ্ঠার জন্য পাঠিয়েছিলেন, তা হলো, إِفْرَادُ اللهِ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى بِمَا يَخْتَصُّ بِهِ مِنَ الرُّبُوْبِيَّةِ وَالْأُلُوْهِيَّةِ وَالْأَسْمَاءِ وَالصِّفَاتِ ‘রুবূবিয়্যাত, উলূহিয়্যাত এবং আসমা ওয়া ছিফাতের ক্ষেত্রে আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট বিষয়াবলীর ব্যাপারে তাঁকে ‘একক’ গণ্য করাকে ‘তাওহীদ’ বলে’।

তাওহীদ’-এর প্রকারভেদ: কুরআন-হাদীছ গবেষণা করে বিজ্ঞ উলামায়ে কেরাম তাওহীদের তিনটি প্রকার উদ্ঘাটন করেছেন এবং তারা দেখেছেন যে, তাওহীদ সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয় এ তিন প্রকারের বাইরে যায় না। সেগুলো হচ্ছে-

  1. তাওহীদুর রুবূবিয়্যাহ (تَوْحِيْدُ الرُّبُوْبِيَّةِ): هُوَ إِفْرَاد الله سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى بالخلق وَالْملك وَالتَّدْبِير ‘সৃষ্টি, মালিকানা এবং পরিচালনা ও তত্ত্বাবধানের ক্ষেত্রে আল্লাহকে একক গণ্য করাকে তাওহীদুর রুবূবিয়্যাহ বলে। আল্লাহকে সৃষ্টিকর্তা হিসাবে একক জানতে হবে, তিনি ছাড়া কোনো সৃষ্টিকর্তা নেই। আল্লাহ বলেন, هَلْ مِنْ خَالِقٍ غَيْرُ اللَّهِ يَرْزُقُكُمْ مِنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ ‘আল্লাহ ছাড়া কি কোনো স্রষ্টা আছে, যে তোমাদেরকে আসমান ও যমীন থেকে রিযক দান করে? তিনি ব্যতীত কোনো (হক্ব) উপাস্য নেই’ (ফাত্বির, ৩৫/৩)। মহান আল্লাহ কাফের উপাস্যদের অসারতা বর্ণনা করে বলেন, أَفَمَنْ يَخْلُقُ كَمَنْ لَا يَخْلُقُ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ ‘সুতরাং যে সৃষ্টি করে, সে কি তার মতো, যে সৃষ্টি করে না? তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না’ (আন-নাহল, ১৬/১৭)। অতএব, আল্লাহই একক স্রাষ্টা, তিনিই সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। এখানে আল্লাহর সৃষ্টি বলতে সরাসরি তাঁর সৃষ্টি তো আছেই, এমনকি তাঁর সৃষ্টির সৃষ্টিও তাঁর সৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত। সেজন্য, তাক্বদীরের প্রতি ঈমানের পূর্ণতা হচ্ছে, বান্দার কর্মের সৃষ্টিকর্তাও যে মহান আল্লাহ, সেকথার প্রতি ঈমান আনা। আল্লাহ বলেন, وَاللَّهُ خَلَقَكُمْ وَمَا تَعْمَلُونَ ‘প্রকৃত পক্ষে আল্লাহই তোমাদেরকে এবং তোমরা যা করো, তা সৃষ্টি করেছেন’ (আছ-ছফফাত, ৩৭/৯৬)। কারণ বান্দার কর্ম তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য এবং বান্দা আল্লাহর সৃষ্টি। আর যিনি কোনো কিছুর সৃষ্টিকর্তা, তিনি তার বৈশিষ্ট্যেরও সৃষ্টিকর্তা। আরেকটি কারণ হচ্ছে, বান্দার কর্ম তার নিজস্ব ইচ্ছা ও শক্তিতে সংঘটিত হয়। আর বান্দা যেমন আল্লাহর সৃষ্টি, তেমনি তার ইচ্ছা এবং শক্তিও আল্লাহর সৃষ্টি। সুতরাং বান্দার কর্ম আল্লাহর সৃষ্টি।

মহান আল্লাহ পরিচালক, তত্ত্বাবধায়ক ও নিয়ন্ত্রক হিসাবেও একক। আসমান, যমীন এবং সমগ্র সৃষ্টি তিনিই পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করেন। আল্লাহ বলেন, ‘জেনে রাখো, সৃষ্টি ও নির্দেশ তাঁরই’ (আল-আ‘রাফ, ৭/৫৪)।

ইসলামে ‘তাওহীদুর রুবূবিইয়্যাত’-এর গুরুত্ব অপরিসীম। এর স্বীকৃতি না দেওয়া পর্যন্ত কেউ ঈমানদার হতে পারবে না। তবে শুধু এর স্বীকৃতি কাউকে পরকালের আযাব থেকে মুক্তি দিতে পারবে না, যতক্ষণ না সে এর আবশ্যিক বিষয় ‘তাওহীদুল উলূহিইয়্যাত’ বাস্তবায়ন করবে। মক্কার কাফেরদের অধিকাংশই আল্লাহকে রব, সৃষ্টিকর্তা, রিযক্বদাতা, পরিচালনাকারী হিসাবে স্বীকার করত। মহান আল্লাহ বলেন, , وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ مَنْ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ لَيَقُولُنَّ خَلَقَهُنَّ الْعَزِيزُ الْعَلِيمُ ‘যদি তুমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করো, কে নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল সৃষ্টি করেছেন? তারা অবশ্যই বলবে, এগুলো সৃষ্টি করেছেন পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ আল্লাহ’ (আয-যুখরুফ, ৪৩/৯)। কিন্তু তারা তাঁর সাথে অন্যান্য মূর্তি, দেব-দেবীকে মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করত। মহান আল্লাহ বলেন, وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مِنْ دُونِهِ أَوْلِيَاءَ مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَى ‘আর যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে, তারা বলে, আমরা কেবল এজন্যই তাদের ইবাদত করি যে, তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেবে’ (আয-যুমার, ৩৯/৩)। আর সে কারণেই তারা মুমিন হতে পারেনি। মহান আল্লাহ বলেন, و وَمَا يُؤْمِنُ أَكْثَرُهُمْ بِاللَّهِ إِلَّا وَهُمْ مُشْرِكُونَ ‘তাদের অধিকাংশ আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে, তবে (ইবাদতে) শিরক করা অবস্থায়’ (ইউসুফ, ১২/১০৬)। বরং আল্লাহ তাদেরকে কাফের ও মুশরিক হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন এবং চিরস্থায়ী জাহান্নামের ঘোষণা দিয়েছেন। আর  রাসূল (ছা.)  তাদের রক্ত ও মালকে বৈধ গণ্য করে তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছেন।

 

  1. তাওহীদুল উলূহিয়্যাহ (تَوْحِيْدُ الأُلُوْهِيَّةِ): إِفْرَادُ اللهِ تَعَالَى بِالْعِبَادَةِ ‘ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহর একত্ব স্বীকার করে নেওয়ার নাম ‘তাওহীদুল উলূহিয়্যাহ’। অর্থাৎ বান্দাকে নিশ্চিত জানতে হবে যে, বাস্তবপক্ষে একক মা‘বূদ শুধু আল্লাহ। মহান আল্লাহই একক হক্ব ইলাহ ও মা‘বূদ, যার কোনো শরীক নেই। অতএব, গাছ, পাথর ইত্যাদি জড়পদার্থ এবং সাধারণ মানুষ ও জিন তো বহু দূরের ব্যাপার, এমনকি আল্লাহর নিকটতম কোনো ফেরেশতা, নবী-রাসূল বা অলি-আউলিয়ার জন্য কোনো প্রকার ইবাদত নিবেদন করা শিরক। মহান আল্লাহ বলেন, وَإِلَهُكُمْ إِلَهٌ وَاحِدٌ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الرَّحْمَنُ الرَّحِيمُ ‘আর তোমাদের ইলাহ এক ইলাহ। তিনি ছাড়া কোনো (সত্য) ইলাহ নেই। তিনি অতি দয়াময়, পরম দয়ালু’ (আল-বাক্বারাহ, ২/১৬৩)।

তাওহীদের এই প্রকারেই মুশরিকরা বিভ্রান্ত হয়েছিল, যাদের বিরুদ্ধে  রাসূল (ছা.) যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। নবী-রাসূলগণ এই প্রকার তাওহীদ নিয়েই বেশি শ্রম দিয়েছেন। সেকারণে প্রত্যেক নবী ও রাসূল তাঁর ক্বওমকে বলেছিলেন, اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلَهٍ غَيْرُهُ ‘তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো মা‘বূদই নেই’ (আল-আ‘রাফ, ৭/৫৯, ৬৫, ৭৩ ও ৮৫; হূদ, ১১/৫০, ৬১ ও ৮৪; আল-মুমিনূন, ২৩/২৩ ও ৩২)।

কেউ তাওহীদুল উলূহিয়্যাহকে না মেনে চললে সে মুশরিক ও কাফের হিসাবেই গণ্য হবে, যদিও সে তাওহীদুর রুবূবিয়্যাহ ও তাওহীদুল আসমা-ই ওয়াছ-ছিফাতকে মেনে নেয়। যদি কেউ আল্লাহকে একক সৃষ্টিকর্তা, মালিক ও কর্তৃত্বের অধিকারী বলে বিশ্বাস করে এবং তাওহীদুল আসমা-ই ওয়াছ-ছিফাতের ক্ষেত্রে সঠিক বিশ্বাস পোষণ করে, কিন্তু সে আল্লাহর সাথে অন্যের ইবাদত করে, তাহলে তার ঐ বিশ্বাস তার কোনো কাজে আসবে না। ধরে নেওয়া যাক, কেউ উক্ত দুই প্রকার তাওহীদ মেনে চলে, কিন্তু সে মাযারে গিয়ে কবরবাসীর ইবাদত করে, সেখানে সেজদা করে, দেওয়াল-কাপড় ইত্যাদি ঘষাষষি, চাটাচাটি করে, তাহলে সে কাফের-মুশরিক হিসাবেই গণ্য হবে এবং সে চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে। ঠিক যেমনটি মক্কার মুশরিকরা তাওহীদুর রুবূবিয়্যাত মেনে নেওয়া সত্ত্বেও মুমিন হতে পারেনি; বরং মুশরিকই রয়ে গিয়েছিল।

৩. তাওহীদুল আসমা-ই ওয়াছ-ছিফাত (تَوْحِيْدُ الْأَسْمَاءِ وَالصِّفَاتِ):

إِفْرَادُ اللهِ تَعَالَى بِمَا سَمَّى اللهَ بِهِ نَفْسَهُ وَوَصَفَ بِهِ نَفْسَهُ فِيْ كِتَابِهِ أَوْ عَلَى لِسَانِ رَسُوْلِهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَذَلِكَ بِإِثْبَاتِ مَا أَثْبَتَهُ مِنْ غَيْرِ تَحْرِيْفٍ وَلَا تَعْطِيْلٍ، وَمِنْ غَيْرِ تَكْيِيْفٍ وَلَا تَمْثِيْلٍ

‘মহান আল্লাহ তাঁর কিতাবে বা তাঁর রাসূল (ছা.)-এর যবানীতে হাদীছে নিজের জন্য যেসব নাম ও গুণ সাব্যস্ত করেছেন, সেগুলোর ক্ষেত্রে তাঁকে একক বলে বিশ্বাস করাকে ‘তাওহীদুল আসমা-ই ওয়াছ-ছিফাত’ বলে। এসব সাব্যস্ত করতে গিয়ে কোনোরূপ পরিবর্তন-পরিবর্ধন, অস্বীকার, কল্পিত আকৃতি স্থির ও সাদৃশ্য প্রদান করা চলবে না। এসব নাম ও গুণকে এমনভাবে সাব্যস্ত করতে হবে, যেমনভাবে সাব্যস্ত করলে তাঁর শানে মানায়। সাথে সাথে সেগুলোর প্রতি পরিপূর্ণ ও দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। পক্ষান্তরে যেসব নাম ও গুণ তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন, সেগুলোকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। আল্লাহর নামসমূহ ও গুণাবলির ক্ষেত্রে কোনোরূপ পরিবর্তন-পরিবর্ধন, অস্বীকার, কল্পিত আকৃতি স্থির ও সাদৃশ্য প্রদান করা চলবে না। যেমন: আল্লাহ তাঁর নিজের এক নাম দিয়েছেন আস-সামী‘ (اَلسَّمِيْعُ) বা ‘সর্বশ্রোতা’। এখন আস-সামী‘কে আল্লাহর একটি নাম হিসাবে বিশ্বাস করা আমাদের উপর ওয়াজিব। অনুরূপভাবে আস-সাম‘উ (اَلسَّمْعُ) বা ‘শ্রবণ’ গুণটিকে আল্লাহর একটি গুণ হিসাবে বিশ্বাস করাও আমাদের উপর ওয়াজিব। এটাই এই নামের দাবী। কেননা ‘শ্রবণ’ ছাড়া ‘শ্রোতা’ হতে পারে না। আরেকটি উদাহরণ- আল্লাহ বলেন, بَلْ يَدَاهُ مَبْسُوطَتَانِ ‘বরং তাঁর দু’হাত প্রসারিত’ (আল-মায়েদাহ, ৫/৬৪)। এখানে আল্লাহ নিজের জন্য দুই হাত সাব্যস্ত করলেন, যা প্রসারিত; অর্থাৎ খুব বেশি দিয়ে থাকেন। অতএব, আমাদের উপর এ বিশ্বাস করা ওয়াজিব যে, খুব বেশি প্রদান করার গুণে গুণান্বিত দু’টি হাত আল্লাহ তা‘আলার রয়েছে। কিন্তু হাত দু’খানার কল্পিত কোনো আকৃতি যেমন আমরা হৃদয়ে কল্পনা করব না, তেমনি মুখেও বলব না। অনুরূপভাবে কোনো সৃষ্টির হাতের সাথেও সে দু’টোর কোনো সাদৃশ্য দেব না। মহান আল্লাহ বলেন, لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ ‘কোন কিছুই তাঁর সদৃশ নয়, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা’ (আশ-শূরা, ৪২/১১)। অতএব, কেউ আল্লাহর হাত দু’খানাকে কোনো সৃষ্টির হাতের সাথে সাদৃশ্য দিলে সে উক্ত আয়াতকে মিথ্যা প্রতিপন্নকারী হিসাবে গণ্য হবে।

আল্লাহর সুন্দরতম নামসমূহ ও গুণাবলি সাব্যস্ত করা এবং সেগুলোর প্রতি ঈমানের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় অবশ্যই খেয়াল করতে হবে :

ক. যেসব নাম ও গুণ পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছে সাব্যস্ত হয়েছে, সেগুলোতে কোনোরূপ ‘তাহরীফ’ (اَلتَّحْرِيْفُ) বা পরিবর্তন-পরিবর্ধন করা যাবে না।

খ. আল্লাহর নামসমূহ ও গুণাবলিকে ‘তা‘ত্বীল’ (اَلتَّعْطِيْلُ) বা অকেজো গণ্য করা যাবে না।

গ. আল্লাহর কোনো গুণের ‘তাকঈফ’ (اَلتَّكْيِيْفُ) বা কল্পিত আকৃতি স্থির করা চলবে না।

ঘ. আল্লাহর কোনো গুণকে অন্য কারো গুণের সাথে ‘তাশবীহ’ (اَلتَّشْبِيْهُ) বা সাদৃশ্য দেওয়া যাবে না। অতএব আল্লাহর নামসমূহ ও গুণাবলির ক্ষেত্রে কোনোরূপ পরিবর্তন-পরিবর্ধন, অস্বীকার, কল্পিত আকৃতি স্থির ও সাদৃশ্য প্রদান করা চলবে না। মহান আল্লাহ বলেন, وَلِلَّهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى فَادْعُوهُ بِهَا وَذَرُوا الَّذِينَ يُلْحِدُونَ فِي أَسْمَائِهِ سَيُجْزَوْنَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ ‘আর আল্লাহর জন্যই রয়েছে সুন্দরতম নামসমূহ। সুতরাং তোমরা তাঁকে সেসব নামেই ডাকো। আর  তাদেরকে বর্জন করো, যারা তাঁর নামে বিকৃতি ঘটায়। তারা যা করত, অচিরেই তাদেরকে তার প্রতিফল দেওয়া হবে’ (আল-আ‘রাফ, ৭/১৮০)। সেজন্যই ইমাম মালেক (রাহি.)-কে যখন আল্লাহ কর্তৃক আরশের উপর সমুন্নত হওয়ার ধরন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তখন তিনি বলেছিলেন, اَلِاسْتِوَاءُ مَعْلُوْمٌ وَالْكَيْفُ مَجْهُوْلٌ وَالسُّؤَالُ عَنْهُ بِدْعَةٌ وَأَرَاكَ صَاحِبَ بِدْعَةٍ ‘এর অর্থ জানা আছে। তবে তার ধরন জানা নেই। এর প্রতি ঈমান রাখা ওয়াজিব এবং ধরন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা বিদ‘আত। আমি তোমাকে বিদ‘আতী দেখতে পাচ্ছি’। অতঃপর তিনি প্রশ্নকারীকে সেখান থেকে বের করে দেয়ার আদেশ করেছিলেন।[2]

যে তাওহীদের সংক্ষিপ্ত বিবরণ আমরা এইমাত্র দেখে আসলাম, সেটাই ছিলো ইমাম আবু হানীফা (রাহি.)-এর নিকট তাওহীদ। কেনইবা হবে না! এই তাওহীদই যে কুরআন-হাদীছে বর্ণিত তাওহীদ। এই তাওহীদই যে সালাফে ছালেহীনের অনুসৃত ও গৃহীত তাওহীদ। তাওহীদের এই প্রকার ও ব্যাখ্যার কথা ইমাম আবু হানীফা (রাহি.) সহ কয়েকজন হানাফী বিদ্বানের যবানীতে ফুটে উঠে। ইমাম আবু হানীফা (রাহি.)  বলেন, وَاللهُ تَعَالَى يُدْعَى مِنْ أَعْلَى لَا مِنْ أَسْفَلَ لَيْسَ مِنْ وَصْفِ الرُّبُوْبِيَّةِ وَالْأُلُوْهِيَّةِ فِيْ شَيْءٍ ‘মহান আল্লাহকে উপরে ভেবেই ডাকা হয়; নিচের দিকে ভেবে নয়। কারণ নিম্নে অবস্থান কোনোভাবেই রুবূবিয়্যাত ও উলূহিয়্যাতের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না’।[3]  ইমাম ত্বহাবী (রাহি.)  আবু হানীফা ও তার দুই শিষ্য আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ (রাহি.)-এর মাযহাব অনুযায়ী আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের আক্বীদা বর্ণনা করতে গিয়ে উক্ত আক্বীদাই সাব্যস্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, نَقُولُ فِي تَوْحِيدِ اللَّهِ مُعْتَقِدِينَ بِتَوْفِيقِ اللَّهِ: إِنَّ اللَّهَ وَاحِدٌ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَلَا شَيْءَ مِثْلُهُ، وَلَا شَيْءَ يُعْجِزُهُ، وَلَا إِلَهَ غَيْرُهُ.. ‘আমরা আল্লাহর তাওফীক্বে তার তাওহীদের ব্যাপারে এই আক্বীদা পোষণ করি যে, নিশ্চয় আল্লাহ এক। তার কোনো শরীক নেই। তার মতো কোনো কিছু নেই। তাকে কোনো কিছু অপারগ করতে পারে না। তিনি ছাড়া আর কোনো (হক্ব) ইলাহ নেই’।[4]  তার এই বক্তব্যে তিন প্রকার তাওহীদই ফুটে উঠেছে। ‘তাকে কোনো কিছু অপারগ করতে পারে না’-এটা তাওহীদুর রুবূবিয়্যাহ। ‘তার মতো কোনো কিছু নেই’-এটা তাওহীদুল আসমা ওয়াছ ছিফাত। ‘তিনি ছাড়া আর কোনো (হক্ব) ইলাহ নেই’-এটা তাওহীদুল উলূহিয়্যাহ।[5] ইবনু আবিল ইয (রাহি.) -এর বক্তব্যেও তাওহীদের এ বিশ্লেষণ উঠে এসেছে।[6]  ‘আল-ফিক্বহুল আকবার’-এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মোল্লা আলী ক্বারী (রাহি.)  বলেন,

فَابْتِدَاءُ كَلَامِهِ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى فِي الْفَاتِحَةِ بِالْحَمْدُ للهِ رَبِّ الْعَالِمِيْنَ، يُشِيْرُ إِلَى تَقْرِيْرِ تَوْحِيْدِ الرُّبُوْبِيَّةِ الْمُتَرَتَّبُ عَلَيْهِ تَوْحِيْدُ الْأُلُوْهِيَّةِ الْمُقْتَضِيْ مِنَ الْخَلْقِ تَحْقِيْقَ الْعُبُوْدِيَّةِ.

‘সূরা ফাতিহার শুরুতে মহান আল্লাহর বক্তব্য ‘আল-হামদুলিল্লাহি রব্বিল আলামীন’ তাওহীদুর রুবূবিয়্যাতের দিকে ইঙ্গিত দেয়। যার উপর ভিত্তি করে তাওহীদুল উলূহিয়্যাহ সাব্যস্ত হয় এবং সৃষ্টির কাছ থেকে ইবাদত প্রতিষ্ঠার দাবী করে’।[7]

কিন্তু মাতুরীদীদের নিকট তাওহীদ কী? তাদের নিকটও তাওহীদ তিন প্রকার; তবে তাদের তিন প্রকার তাওহীদ উল্লিখিত তিন প্রকার তাওহীদের মতো নয়। বরং তাদের নিকট তিন প্রকার তাওহীদ হচ্ছে এরকম-

১. ‘তাওহীদুয যাত’ (توحيد الذات) বা আল্লাহর সত্তাগত তাওহীদ: এর মানে হচ্ছে, আল্লাহর কোনো অংশ নেই। অর্থাৎ আল্লাহ খণ্ডে খণ্ডে বিভাজ্য নন।

২. ‘তাওহীদ ফিছ ছিফাত’ (توحيد في الصفات) বা আল্লাহর গুণাবলি সম্পর্কিত তাওহীদ: অর্থাৎ আল্লাহর কোনো সদৃশ নেই।

৩. ‘তাওহীদ ফিল আফ‘আলি ওয়াছ ছুন‘ই’ (توحيد في الأفعال والصنع) বা কর্ম ও সৃষ্টি সম্পর্কিত তাওহীদ: অর্থাৎ সৃষ্টিতে মহান আল্লাহর কোনো শরীক নেই।[8]   

সেজন্যই মোল্লা আলী ক্বারী বলেন,  وَاحِدٌ فِيْ ذَاتِهِ وَاحِدٌ فِيْ صِفَاتِهِ وَخَالِقٌ لِّمَصْنُوْعَاتِهِ ‘তিনি তার সত্তায় একক, গুণাবলিতে একক এবং সৃষ্টিসমূহের স্রষ্টা’।[9]

বাবির্তী (মৃত্যু: ৭৮৬ হি.) বলেন,

وَعَبَّرَ بَعْضُ أَصْحَابِنَا عَنِ التَّوْحِيْدِ فَقَالَ: هُوَ نَفْيُ الشَّرِيْكِ وَالْقَسِيْمِ وَالشَّبِيْهِ، فَاللهُ تَعَالَى وَاحِدٌ فِيْ أَفْعَالِهِ لَا يُشَارِكُهُ أَحَدٌ فِيْ إِيْجَادِ الْمَصْنُوْعَاتِ وَوَاحِدٌ فِيْ ذَاتِهِ لَا قَسِيْمَ لَهُ وَلَا تَرْكِيْبَ فِيْهِ، وَوَاحِدٌ فِيْ صِفَاتِهِ لَا يُشْبِهُ الْخَلْقَ فِيْهَا

‘আমাদের কোনো কোনো অনুসারী তাওহীদের ব্যাখ্যায় বলেন, তাওহীদ হলো, অংশীদার, অংশ ও সদৃশ না থাকা। অর্থাৎ মহান আল্লাহ তার কর্মসমূহে একক, সৃষ্টিসমূহ সৃষ্টিতে তার কোনো অংশীদার নেই। তিনি তার সত্তায় একক, তার কোনো অংশ ও কাঠামো নেই। মাতুরীদীদের তাওহীদের সংজ্ঞা বিশ্লেষণ করলে আমরা যে বিষয়গুলো পাই-

তিনি তার গুণাবলিতে একক, সেগুলোতে তিনি সৃষ্টিজগতের সাথে সদৃশ নন’।[10]

১. মাতুরীদীদের কাছে ‘তাওহীদুল উলূহিয়্যাহ’ নেই, এর গুরুত্বও নেই। অথচ ‘তাওহীদুল উলূহিয়্যাহ’ই মূল, এর জন্যই মানুষ ও জিন জাতির সৃষ্টি। এর জন্যই আসমানী কিতাবসমূহের অবতরণ। এর জন্যই নবী-রাসূলগণ (আ.)-এর আগমন।

২. তাদের কাছে ‘তাওহীদুর রুবূবিয়্যাহ’-এর গুরুত্বই বেশি। অথচ এটা মানুষের স্বভাবজাত বিষয়, যে বিষয়ে কেউ মতভেদ করেনি। এমনকি আবু জাহলের মতো বিদ্বেষী মুশরিকও তাওহীদুর রুবূবিয়্যাহ-তে বিশ্বাসী ছিলো।

৩. তাওহীদুল আসমা ওয়াছ ছিফাতে তাদের কিছু সঠিক দিক থাকলেও তারা আল্লাহর অনেক ছিফাত বা গুণ অস্বীকার করেছে।

তাওহীদের যে সংজ্ঞায় তাওহীদুল উলূহিয়্যাহ স্থান পায়নি, তা যে কাউকে খুব সহজে নানা ধরনের শিরকে প্রবেশ করাতে পারে। সেকারণেই বোধ হয়, অনেক মাতুরীদীর মধ্যে কবরপূজা, পীরপূজার ছড়াছড়ি লক্ষ্য করা যায়। অতএব প্রমাণিত হলো, কালামশাস্ত্র নির্ভর মাতুরীদীদের তাওহীদের বিশ্লেষণ বাতিল।[11]

(চলবে)

১. তাওহীদের পরিচয়ের এ অংশ নিম্নে বর্ণিত কিতাব থেকে গৃহীত: শায়খ ইবনে বায ও শায়খ উছাইমীন (রহ.), ফাতাওয়া মুহিম্মাহ লি উমূমিল উম্মাহ, তাহক্বীক্ব : ইবরাহীম আল-ফারেস, (দারুল আছেমাহ, রিয়ায, ১ম প্রকাশ: ১৪১৩ হি.), পৃ. ৩-১৪।

২. শাত্বেবী (মৃ. ৭৯০ হি.), আল-ই‘তিছাম, তাহক্বীক্ব : সালীম ইবনে ঈদ আল-হেলালী, (সঊদী আরব : দারু ইবনে আফফান, ১ম প্রকাশ ১৪১২ হি./১৯৯২ খ্রি.), ১ম খণ্ড, পৃ. ১৭৩।

৩. আল-ফিক্বহুল আকবার, পৃ. ১৩৫।

৪. আল-আক্বীদা আত্ব-ত্বহাবিইয়্যাহ, পৃ. ৩১।

৫. উছূলুদ্দীন ‘ইনদাল ইমাম আবী হানীফা, পৃ. ২০১।

৬. দ্রষ্টব্য: ইবনু আবিল ইয, শারহুল আক্বীদা আত্ব-ত্বহাবিইয়্যাহ, পৃ. ৪১।

৭. মোল্লা আলী ক্বারী, মিনাহুর রওযিল আযহার, পৃ. ৪৭।

৮. দ্রষ্টব্য: উছূলুদ্দীন ‘ইনদাল ইমাম আবী হানীফা, পৃ. ৫৯৭; জুহূদু উলামাইল হানাফিয়্যাহ ফী ইবতালি আক্বাইদিল কুবূরিয়্যাহ, ১/৯৫।

৯.মোল্লা আলী ক্বারী, যওউল মা‘আনী আলা মানযূমাতি বাদইল আমালী, (দিমাশক: দারুল বাইরূতী, ১ম প্রকাশ: ১৪২৭ হি./২০০৬ খ্রি.), পৃ. ২৮।

১0. আকমালুদ্দীন আল-বাবির্তী, শারহুল আক্বীদাতিত ত্বহাবিয়্যাহ, (১ম প্রকাশ: ১৪০৯ হি./১৯৮৯ খ্রি.), পৃ. ২৯।

১১.  দ্রষ্টব্য: উছূলুদ্দীন ‘ইনদাল ইমাম আবী হানীফা, পৃ. ৫৯৭-৫৯৮; জুহূদু উলামাইল হানাফিয়্যাহ ফী ইবতালি আক্বাইদিল কুবূরিয়্যাহ, ১/৯৫-৯৬।