ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ)-এর আক্বীদা বনাম হানাফীদের আক্বীদা
আব্দুল আলীম ইবনে কাওছার মাদানী*



(পর্ব-২০)

(২) রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নূরের সৃষ্টি : আমাদের সমাজের বহুল প্রচলিত আরেকটি আক্বীদা হচ্ছে, নবী মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নূরের সৃষ্টি। পরিতাপের বিষয় হলো, আমাদের দেশের বহু সংখ্যক মুসলিমের আক্বীদা-বিশ্বাস এটাই। আরো দুঃখের বিষয় হলো, একশ্রেণির নামধারী আলেম এই ভ্রান্ত আক্বীদা প্রচার ও প্রসারের ফেরিওয়ালা সেজেছে; যারা এ মতের পক্ষে কুরআনের কিছু আয়াতের অপব্যাখ্যা করছে এবং কিছু জাল হাদীছকে দলীল হিসেবে পেশ করছে। যাহোক, এই আক্বীদা পোষণকারীদের বেশিরভাগই নিজেদের হানাফী পরিচয় দেওয়ায় একে ‘হানাফী আক্বীদা’ বলে ধারণা করা হয়। যদিও ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ)-এর আক্বীদার সাথে এর দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই। সম্পর্ক থাকবেই-বা কী করে! যে আক্বীদা কুরআন ও হাদীছের সরাসরি বিরোধী, তার সাথে কি ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ)-এর সম্পর্ক থাকতে পারে?! কখনই না; বরং এর সাথে কোনো মুসলিমের সম্পর্ক থাকতে পারে না। ‘নবী মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নূরের তৈরি’— এ আক্বীদা ‘হানাফী আক্বীদা’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার আরেকটি উল্লেখযোগ্য কারণ হচ্ছে, হানাফী মাযহাব অনুসরণের দাবীদার বিভ্রান্ত ব্রেলবীরা উক্ত আক্বীদা মনেপ্রাণে ধারণ করে। বরং তাদের মাধ্যমেই এ আক্বীদা ভাইরাসের মতো ছড়িয়েছে। আর তারা আমাদের সমাজের সাথে মিশে থেকে এই আক্বীদার প্রচার-প্রসার চালায় বিধায় সাধারণ জনগণ এটাকে ‘হানাফী আক্বীদা’ বলে মনে করে ও বিশ্বাস করে। কারণ তারা প্রায় সবাই হানাফী। উল্লেখ্য, মুসলিমদের দু’টি প্রসিদ্ধ নাম হচ্ছে ‘আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআত’ ও ‘সুন্নী’; আমাদের সমাজের ব্রেলবীরা নিজেদের ক্ষেত্রে এই নাম দু’টি ব্যবহার করে পর্দার পেছনে নিজেদের ভ্রান্ত আক্বীদা লুকিয়ে রাখে এবং এই অপকৌশলের মাধ্যমে জনগণকে প্রতারিত করাও সহজ হয়। তারা রেজভী নামেও পরিচিত। নিজেদের ছূফী পরিচয়দানকারী কিছু ব্যক্তি-গোষ্ঠীও উক্ত আক্বীদা প্রচার করে থাকে।

আশ্চর্য ব্যাপার হলো, যুগে যুগে মানবগোষ্ঠীর মধ্য থেকে নবী-রাসূলগণ (আলাইহিমুস সালাম) আগমন করায় তাঁদের সম্প্রদায় তাঁদেরকে মেনে নিতে পারেনি। তাদের অস্বীকারের কারণ ছিল, নবী-রাসূল কেন মানুষ হবেন?! তাদের তো ফেরেশতা হওয়া উচিত ছিল! মহান আল্লাহ এ চরম সত্য তুলে ধরেছেন এভাবে,

وَمَا مَنَعَ النَّاسَ أَنْ يُؤْمِنُوا إِذْ جَاءَهُمُ الْهُدَى إِلَّا أَنْ قَالُوا أَبَعَثَ اللَّهُ بَشَرًا رَسُولًا

‘যখন তাদের নিকট হেদায়াত এসেছিল, তখন মানুষদেরকে এই উক্তিই ঈমান আনা থেকে বিরত রেখেছিল যে, আল্লাহ কি মানুষকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন?’ (বানু ইসরাঈল, ১৭/৯৪)। অথচ সেই বেঈমান সম্প্রদায়গুলোর এই আক্বীদাটাও মুসলিম নামধারী এই মানুষগুলো গ্রহণ করতে পারছে না! অন্য দিক দিয়ে বলা যায়, সেই সব কাফের যেমন মানুষ নবী-রাসূলকে গ্রহণ করতে পারেনি, এরাও তেমনি মানুষ মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে রাসূল হিসেবে গ্রহণ করতে পারছে না!

রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদের মতো মাটির তৈরি মানুষ ছিলেন। তিনি রক্ত, গোশত, হাড় ইত্যাদি দ্বারা সৃষ্ট মানুষ ছিলেন। তিনি খানাপিনা করতেন। তার স্ত্রী, পুত্র, পরিজন ছিল। তিনি হাটে-বাজারে যেতেন। অন্যান্য মানুষের মতো তারও রোগ-ব্যাধি, দুঃখ-কষ্ট, ক্লান্তি, ঘুম, হাঁচি, হাই, পেশাব-পায়খানা ইত্যাদি হতো। এগুলো কি মানবীয় গুণ নয়? তিনি যে মাটির মানুষ ছিলেন, তার পক্ষে কুরআন, হাদীছ ও উলামায়ে কেরামের অসংখ্য বক্তব্য পেশ করে কলেবর বৃদ্ধি করতে চাই না। দুয়েকটি বক্তব্য পেশ করে প্রসঙ্গটির যবনিকাপাত টানতে চাই। মহান আল্লাহ বলেন,

قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يُوحَى إِلَيَّ أَنَّمَا إِلَهُكُمْ إِلَهٌ وَاحِدٌ

‘বলে দাও, আমি তো তোমাদের মতোই একজন মানুষ, আমার প্রতি অহী হয় যে, তোমাদের মা‘বূদ একজন’ (আল-কাহফ, ১৮/১১০; হা-মীম আস-সাজদাহ, ৪১/৬)। রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন,

إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ، أَنْسَى كَمَا تَنْسَوْنَ، فَإِذَا نَسِيتُ فَذَكِّرُونِي

‘আমি তো কেবল তোমাদের মতোই একজন মানুষ। আমি ভুলে যাই, যেমনভাবে তোমরা ভুলে যাও। অতএব, আমি ভুলে গেলে তোমরা আমাকে স্মরণ করিয়ে দিও’।[1]

ইবনু হাযম আল-আন্দালুসী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

وَأَنَّ جَمِيعَ النَّبِيِّينَ وَعِيسَى وَمُحَمَّدًا – عَلَيْهِمْ السَّلَامُ – عَبِيدًا لِلَّهِ تَعَالَى مَخْلُوقُونَ؛ نَاسٌ كَسَائِرِ النَّاسِ؛ مَوْلُودُونَ مِنْ ذَكَرٍ وَأُنْثَى؛ إلَّا آدَمَ وَعِيسَى

‘সকল নবী, ঈসা ও মুহাম্মাদ (আলাইহিমুস সালাম) আল্লাহর বান্দা ও সৃষ্টি। তাঁরা অন্যান্য মানুষের মতোই মানুষ। পুরুষ-নারীর ঔরশে ভূমিষ্ট— আদম ও ঈসা ছাড়া (এ দু’জন পুরুষ-নারীর ঔরশে ভূমিষ্ট নন)’।[2] শায়খ উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি বিশ্বাস করবে যে, নবী (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহর পক্ষ থেকে নূর, তিনি মানুষ নন, তিনি গায়েব জানেন, সে ব্যক্তি আল্লাহ ও তার রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ব্যাপারে কাফের। সে আল্লাহ ও তার রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর দুশমন। সে আল্লাহ ও তার রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর অলী নয়। কারণ তার এ বক্তব্যের মাধ্যমে আল্লাহ ও তার রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হয়। আর যে আল্লাহ ও তার রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, সে কাফের…’।[3]

অতএব, এ কুফরী আক্বীদা ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ)-এর আক্বীদা হতে পারে না— সমাজে যতই তা প্রচারিত ও প্রচলিত হোক না কেন এবং যেই তা প্রচার করুক না কেন।

(৩) রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) গায়েব জানেন : শুধু কি রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) গায়েব জানেন? বরং অনেক অলী-আউলিয়াও গায়েব জানেন!— এই হচ্ছে আমাদের দেশের একশ্রেণির মানুষের বিশ্বাস! আর এই আক্বীদা-বিশ্বাস পোষণকারীর একটি বড় অংশ হানাফী হওয়ায় এটাকে মানুষ ‘হানাফী আক্বীদা’ বলে জানে। অথচ কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী এই আক্বীদা কস্মিনকালেও ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ)-এর আক্বীদা হতে পারে না। আল-ফিক্বহুল আকবার গ্রন্থের ব্যাখ্যায় এসেছে,

وَذَكَرَ الْحَنَفِيَّةُ تَصْرِيْحًا بِالتَّكْفِيْرِ بِاعْتِقَادِهِ أَنَّ النَّبِيَّ عَلَيْهِ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ يَعْلَمُ الْغَيْبَ لِمُعَارَضَةِ قَوْلِهِ تَعَالَى: {قُلْ لَا يَعْلَمُ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ}

‘নবী (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) গায়েব জানেন— এই বিশ্বাসকে হানাফীরা স্পষ্টভাবে কুফর আখ্যা দিয়েছেন। কেননা এটা নিম্নবর্ণিত আয়াতের সাথে সাংঘর্ষিক—

قُلْ لَا يَعْلَمُ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ

‘বলে দাও, আসমান ও যমীনে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ গায়েব জানে না’ (আন-নামল, ২৭/৬৫)

তবে গায়েবের বিষয়টা একটু বিশ্লেষণের দাবী রাখে। কারণ কুরআন-হাদীছের কিছু বক্তব্যকে নিজের মতো করে বুঝে তারা উক্ত ভ্রান্ত আক্বীদা লালন করে এবং ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করে। গায়েবের খবরকে দুইভাগে ভাগ করা যেতে পারে :

(ক) গায়েব মুত্বলাক্ব (غَيْبٌ مُطْلَقٌ) : এ প্রকার গায়েবের খবর আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না। একমাত্র তিনিই এর খবর রাখেন। কাউকেই তিনি এ সম্পর্কে অবহিত করেন না। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ এরশাদ করেন,

قُلْ لَا يَعْلَمُ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ

‘বলে দাও, আসমান ও যমীনে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ গায়েব জানে না’ (আন-নামল, ২৭/৬৫)। অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন, وَعِنْدَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ ‘আর তার কাছে রয়েছে গায়েবের চাবিসমূহ, তিনি ছাড়া আর কেউ সে সম্পর্কে জানে না’ (আল-আনআম, ৬/৫৯)। অন্য আয়াতে আরো এসেছে,  وَلِلَّهِ غَيْبُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ  ‘আসমানসমূহ ও যমীনের গায়েবের জ্ঞান কেবল আল্লাহরই রয়েছে’ (হূদ, ১১/১২৩)। এই গায়েবের ব্যাপারে নবী (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর না জানার ব্যাপারটা দ্ব্যর্থহীনভাবে জনগণকে জানিয়ে দিতে মহান আল্লাহ আদেশ দিয়েছেন। এরশাদ হচ্ছে,

قُلْ لَا أَمْلِكُ لِنَفْسِي نَفْعًا وَلَا ضَرًّا إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ وَلَوْ كُنْتُ أَعْلَمُ الْغَيْبَ لَاسْتَكْثَرْتُ مِنَ الْخَيْرِ وَمَا مَسَّنِيَ السُّوءُ

‘বলে দাও, আমি আমার নিজের কোনো উপকার ও ক্ষতির ক্ষমতা রাখি না, তবে আল্লাহ যা চান। আর আমি যদি গায়েব জানতাম, তাহলে অধিক কল্যাণ লাভ করতাম এবং আমাকে কোনো ক্ষতি স্পর্শ করত না’ (আল-আ‘রাফ, ৭/১৮৮)। আয়েশা (রাযিয়াল্লা-হু আনহা) বলেন, مَنْ حَدَّثَكَ أَنَّهُ يَعْلَمُ الغَيْبَ، فَقَدْ كَذَبَ ‘যে ব্যক্তি তোমাকে বলবে যে, তিনি (নবী (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)) গায়েবের খবর জানেন, সে মিথ্যা বলবে’।[4] এরকম আরো বহু আয়াত ও হাদীছ রয়েছে, যেগুলো উল্লেখ করে আলোচনা লম্বা করতে চাই না। তবে যতটুকু উল্লেখ করেছি, ততটুকু এখানকার জন্য যথেষ্ট ইনশা-আল্লাহ।

(খ) গায়েব নিসবী (غَيْبٌ نِسْبِيٌّ) : যে গায়েবের খবর মহান আল্লাহ নবী, রাসূল, ফেরেশতাসহ তার কোনো কোনো প্রিয় বান্দাকে অবহিত করেন, তা এ প্রকার গায়েবের অন্তর্ভুক্ত। এ প্রকার গায়েব কেউ জানে আবার কেউ জানে না, তাই তো একে গায়েব নিসবী বা আপেক্ষিক গায়েবের জ্ঞান বলে। এ প্রকার গায়েবের জ্ঞান কোনোটা বৈধ আবার কোনোটা হারাম। আবার তা বৈধ বা অবৈধ উভয় পন্থায় অর্জন করা যায়। সেকারণে এ প্রকার গায়েবের জ্ঞানের ধরন ও অর্জনের পদ্ধতি বিশ্লেষণ করে তবেই আমাদেরকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কোনটা গ্রহণ করব আর কোনটা গ্রহণ করব না। তদুপরি এ ব্যাপারে যত ভণ্ডামি আছে, তা থেকে সাবধান থাকতে হবে। যাহোক, এ প্রকার গায়েব সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, عَالِمُ الْغَيْبِ فَلَا يُظْهِرُ عَلَى غَيْبِهِ أَحَدًا – إِلَّا مَنِ ارْتَضَى مِنْ رَسُولٍ ‘তিনি অদৃশ্যের জ্ঞানী। আর তিনি তার অদৃশ্যের জ্ঞান কারো কাছে প্রকাশ করেন না, তবে তার মনোনীত রাসূল ছাড়া’ (আল-জিন, ৭২/২৬-২৭)। অতএব, মহান আল্লাহ তার অদৃশ্য জ্ঞানের মধ্য থেকে সামান্য পরিমাণ যাকে জানান, কেবল তিনি ততটুকু জানেন; এর বাইরে কারো গায়েবের খবর জানা সম্ভব নয়।

(৪) রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জীবিত : রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর মৃত্যুর প্রায় ১৫০০ বছর পরে এসেও ‘রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জীবিত, না-কি মৃত?’ —এমন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়, এ ব্যাপারে তর্ক-বিতর্কে জড়াতে হয়, এর চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে! যে বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে গেছেন খোদ প্রথম খলীফা আবূ বকর ছিদ্দীক্ব (রাযিয়াল্লা-হু আনহু), তা নিয়ে নতুন করে বিতর্কে জড়ানো পরিতাপের বিষয় নয় কি?

ঘটনা হচ্ছে, রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর মৃত্যু ছাহাবায়ে কেরামের জন্য বজ্রপাতের চেয়েও কঠিন ছিল। এ খবরে তারা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন। কেউ-বা শোকে মুহ্যমান হয়ে যান, কেউ-বা অধিক শোকে পাথর হয়ে পড়েন। কেউ আবার প্রথম অবস্থায় রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর মৃত্যু অস্বীকার করেই আয়েশা বসেন। (রাযিয়াল্লা-হু আনহা) বলেন, ‘রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখন মৃত্যুবরণ করেন, তখন আবূ বকর (রাযিয়াল্লা-হু আনহু) (মদীনার) আলিয়া অঞ্চলে ছিলেন। এদিকে উমার (রাযিয়াল্লা-হু আনহু) বলতে থাকেন, আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মারা যাননি। আল্লাহর কসম! সে সময় আমার মনে একথা ছাড়া অন্য কিছু আসছিল না। আমার আরো মনে হচ্ছিল যে, অবশ্যই আল্লাহ তাকে পুনরায় জীবিত করবেন এবং তিনি কিছু মানুষের হাত-পা কেটে ফেলবেন (যারা বলছে যে, তিনি মারা গেছেন)।

এরপর আবূ বকর (রাযিয়াল্লা-হু আনহু) আসলেন এবং রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর মুখমণ্ডলের আবরণ সরিয়ে চুমু খেয়ে বললেন, আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য উৎসর্গিত হোক! ধন্য আপনার জীবন, ধন্য আপনার মৃত্যু। ঐ সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ! আল্লাহ কস্মিনকালেও আপনাকে দু’বার মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করাবেন না। অতঃপর তিনি বেরিয়ে এসে বললেন, হে কসমকারী! শান্ত হও। এরপর আবূ বকর (রাযিয়াল্লা-হু আনহু) যখন কথা শুরু করলেন, তখন উমার (রাযিয়াল্লা-হু আনহু) চুপ হয়ে গেলেন। আবূ বকর (রাযিয়াল্লা-হু আনহু) আল্লাহর প্রশংসা করার পর বললেন, সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, যে ব্যক্তি মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ইবাদত করে, সে জেনে রাখুক যে, মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মৃত্যুবরণ করেছেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ইবাদত করে, সে জেনে রাখুক যে, আল্লাহ চিরঞ্জীব, তিনি মৃত্যুবরণ করবেন না। এরপর আবূ বকর (রাযিয়াল্লা-হু আনহু) এ আয়াতটি পড়লেন, إِنَّكَ مَيِّتٌ وَإِنَّهُمْ مَيِّتُونَ ‘নিশ্চয় তুমি মরণশীল এবং তারাও মরণশীল’ (আয-যুমার, ৩৯/৩০)। তিনি এ আয়াতটিও পাঠ করলেন,

وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ أَفَإِنْ مَاتَ أَوْ قُتُلِ انْقَلَبْتُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ وَمَنْ يَنْقَلِبْ عَلَى عَقِبَيْهِ فَلَنْ يَضُرَّ اللَّهَ شَيْئًا وَسَيَجْزِي اللَّهُ الشَّاكِرِينَ

‘আর মুহাম্মাদ কেবল একজন রাসূল। তার পূর্বে নিশ্চয় অনেক রাসূল বিগত হয়েছে। যদি সে মারা যায় অথবা তাকে হত্যা করা হয়, তবে তোমরা কি তোমাদের পেছনে ফিরে যাবে? আর যে ব্যক্তি পেছনে ফিরে যায়, সে কখনও আল্লাহর কোনো ক্ষতি করতে পারে না। আর অচিরেই আল্লাহ কৃতজ্ঞদের প্রতিদান দেবেন’ (আলে ইমরান, ৩/১৪৪)। এরপর লোকজন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন’।[5] অন্য বর্ণনায় আছে, উমার (রাযিয়াল্লা-হু আনহু) বলেছিলেন, ‘কেউ যদি রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মারা গেছে— এমন কথা বলে, তাহলে আমি আমার এই তরবারী দ্বারা তাকে আঘাত করব’। …উপস্থিত জনগণ আবূ বকর পকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, ‘হে রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সহচর! রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কি মৃত্যুবরণ করেছেন? জবাবে তিনি বলেন, হ্যাঁ।[6] আয়েশা বসেন। (রাযিয়াল্লা-হু আনহা) বলতেন, ‘নবী (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমার বুক ও থুতনির মাঝে মৃত্যুবরণ করেন’।[7]

এরপরও আমাদের দেশের বহু মানুষ বিশ্বাস করে, রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মারা যাননি! একশ্রেণির আলেম ‘হায়াতুন নবী’কে প্রমোট করার প্রাণান্ত চেষ্টা করছেন, বাহাছ-মুনাযারা করছেন! দুঃখ রাখি কোথায়! যাহোক, এই বিশ্বাসে বিশ্বাসী আলেম ও জনগণের প্রায় সবাই হানাফী হওয়ার কারণে মানুষ এটাকে ‘হানাফী আক্বীদা’ বা ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ)-এর আক্বীদা বলে মনে করে। অথচ এটা ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ)-এর আক্বীদা হওয়ার প্রশ্নই আসে না। উপর্যুক্ত অকাট্য দলীল-প্রমাণ রেখে ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ) ঐসব ভ্রান্ত আক্বীদায় বিশ্বাসী হবেন— সেকথা কি ভাবা যায়?!

উল্লেখ্য, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম), অন্য নবী-রাসূলগণ (আলাইহিমুস সালাম) ও শহীদগণের বারযাখী জীবনে জীবিত থাকার কথা কুরআন-হাদীছ দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত। তবে, মনে রাখতে হবে, এ জীবন মাটির নিচের জীবন; মাটির উপরের জীবন নয়। ঐ জীবনের প্রকৃতি ও ধরন আমরা জানি না। তাহলে বারযাখী জীবনকে ইহকালীন জীবনের সাথে তুলনা করে বিভিন্ন বিশ্বাস পোষণ করা ও কার্যকলাপ করা নেহায়েত বোকামি নয় কি?

(চলবে)


* বি. এ. (অনার্স), উচ্চতর ডিপ্লোমা, এম. এ. এবং এম.ফিল., মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব; অধ্যক্ষ, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ।

[1]. ছহীহ বুখারী, হা/৪০১; ছহীহ মুসলিম, হা/৫৭২।

[2]. আল-মুহাল্লা, (দারুল ফিকর, বৈরূত, তা. বি.), ১/২৯।

[3]. মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ইবনে উছাইমীন, ১/৩৩৩।

[4]. ছহীহ বুখারী, হা/৭৩৮০।

[5]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৬৬৭ ও ৩৬৬৮।

[6]. নাসাঈ, সুনানে কুবরা, হা/৭০৮১, ‘ছহীহ’।

[7]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৪৪৬।