ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ)-এর আক্বীদা বনাম হানাফীদের আক্বীদা
আব্দুল আলীম ইবনে কাওছার মাদানী*



(জানুয়ারি’২১ সংখ্যায় প্রকাশিতের পর)
(পর্ব-১৯)

পরকাল : পরকালের ইস্যুতে অন্যান্য মুসলিমের মতো মাতুরীদীরাও একই আক্বীদা পোষণ করে। কবরের আযাব বা শান্তি, পুনরুত্থান, হাশর-নাশর, হিসাব-নিকাশ, দাঁড়িপাল্লা, পুলছিরাত, শাফাআত, জান্নাত, জাহান্নাম ইত্যাদি বিষয়ে তারাও বিশুদ্ধ আক্বীদা পোষণ করেছে আল-হামদুলিল্লাহ।[1]

ছাহাবী ও ইমামত : ছাহাবায়ে কেরামের ব্যাপারেও মাতুরীদীরা সঠিক আক্বীদা পোষণ করেছে। নবী-রাসূলগণ (আলাইহিস সালাম)-এর পরে সর্বোত্তম মানুষ ছাহাবায়ে কেরাম। তাদের মধ্যে সর্বোত্তম হচ্ছেন, আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু), তারপর উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু), তারপর উছমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) এবং তারপর আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)। ছাহাবায়ে কেরাম (রাযিয়াল্লাহু আনহুম)-এর মাঝে যেসব দাঙ্গা হয়েছিল, সেগুলো ছিল তাদের ইজতিহাদগত ভুলের কারণে। সুতরাং তাদের ব্যাপারে এসব ক্ষেত্রে নিজের হাত ও যবানকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। তাদের ব্যাপারে বাজে মন্তব্য করলে অবস্থা অনুযায়ী কখনো কুফরী, কখনো বিদ‘আতী এবং কখনো ফাসেক্বী আচরণ হয়ে যাবে।[2]

এখানে ইমামত বলতে রাষ্ট্র পরিচালনা ও ছালাতের ইমামতি দুটিই উদ্দেশ্য। মুসলিমদের অবশ্যই একজন শাসক লাগবে, যিনি শরীআতের বিধিবিধান, দণ্ডবিধি কার্যকর করবেন। দেশরক্ষার কাজ করবেন। যাকাত উঠাবেন ও বণ্টন করবেন। দুষ্টের দমন করবেন। বিচার-ফয়সালা করবেন। সারা বিশ্বের একক খলীফা হলে তিনি কুরাইশ বংশ থেকে হবেন। তবে তারা মা‘ছূম হওয়া শর্ত নয়। ফাসেক্বের পেছনেও ছালাত আদায় করা জায়েয। শাসক যালেম হলেও তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করা জায়েয নেই। এসব ক্ষেত্রে মাতুরীদীরাও সঠিক আক্বীদা পোষণ করে থাকে।[3]  বুঝা গেল, ইমামতের ব্যাপারে তাদের আক্বীদা মোটামুটি ঠিক আছে।

বহুল প্রচলিত কিছু আক্বীদা, যেগুলো ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ)-এর আক্বীদা মনে করা হয়, অথচ ব্যাপারটা সম্পূর্ণ উল্টো :

প্রিয় পাঠক! এখানে আক্বীদাগত বেশকিছু ইস্যু নিয়ে কথা বলব, যেগুলো আমাদের দেশে বহুল প্রচলিত আক্বীদা এবং এগুলোকে হানাফী আক্বীদা বলে মনে করা হয়। আর এই মনে করার পেছনে মৌলিক কারণ হলো, দল-মত নির্বিশেষে আমাদের দেশের বেশিরভাগ হানাফী ভাই-বোন এই আক্বীদা ধারণ ও লালন করে থাকেন। ফলে ব্যাপক অনুশীলনের কারণে জনগণের নিকট সেগুলো ‘হানাফী আক্বীদা’ বলে পরিচিতি পেয়েছে। কিন্তু আসলে কি ব্যাপারটা তাই? এই উত্তরটাই আমরা খোঁজার চেষ্টা করব নিচের আলোচনার মাধ্যমে।

(১) আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান :

দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশের অধিকাংশ মুসলিমের আক্বীদা-বিশ্বাস ও ঈমান হলো, মহান আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান। আরো দুঃখজনক হলো, বেশিরভাগ মানুষ এই আক্বীদাকে ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ)-এর আক্বীদা বলে মনে করে। নিদেনপক্ষে এটা মনে করা হয় যে, এটা হানাফী আক্বীদা। অথচ ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ) যেমন ছিলেন এই আক্বীদার সম্পূর্ণ উল্টো, তেমনি প্রকৃত হানাফী আক্বীদার সাথেও এর কোনো প্রকার সম্পর্ক নেই। চলুন, আমরা কুরআন, হাদীছ ও ইমামগণের বক্তব্যের আলোকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বিষয়টি সংক্ষেপে বিশ্লেষণ করি।

মহান আল্লাহ আসমানে আরশের উপর সমুন্নত। মহান আল্লাহ বলেন, ﴾الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى﴿ ‘পরম দয়াময় (আল্লাহ) আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন’ (ত্ব-হা, ২০/৫)। পবিত্র কুরআনের নিচের আয়াতগুলোতেও মহান আল্লাহর আরশে আযীমে সমুন্নত হওয়ার ব্যাপারটি প্রমাণিত— আল-আ‘রাফ, ৭/৫৪; ইউনুস, ১০/৩; আর-রা‘দ, ১৩/২; আল-ফুরক্বান, ২৫/৫৯; আস-সাজদাহ, ৩২/৪; আল-হাদীদ, ৫৭/৪।[4] 

মহান আল্লাহ আরো বলেন,

 ﴾وَقَالَ فِرْعَوْنُ يَا هَامَانُ ابْنِ لِي صَرْحًا لَعَلِّي أَبْلُغُ الْأَسْبَابَ – أَسْبَابَ السَّمَاوَاتِ فَأَطَّلِعَ إِلَى إِلَهِ مُوسَى﴿

‘আর ফেরাউন বলল, হে হামান! তুমি আমার জন্য এক সুউচ্চ প্রাসাদ তৈরি করো, যাতে আমি আসমানে আরোহণের অবলম্বন পাই, যেন আমি দেখতে পাই মূসার ইলাহকে’ (আল-মুমিন, ৪০/৩৬-৩৭)

নিম্নে এ সম্পর্কে কয়েকটি হাদীছ পেশ করা হলো :

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ قَالَ لَمَّا قَضَى اللَّهُ الخَلْقَ كَتَبَ كِتَابًا عِنْدَهُ غَلَبَتْ أَوْ قَالَ سَبَقَتْ رَحْمَتِي غَضَبِي فَهُوَ عِنْدَهُ فَوْقَ العَرْشِ.

আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘আল্লাহ যখন মাখলূক্ব সৃষ্টি করলেন, তখন তার নিকটে আরশের উপর রক্ষিত কিতাবে লিপিবদ্ধ করেন, নিশ্চয় আমার দয়া আমার ক্রোধের উপর জয়লাভ করেছে’।[5]

মুআবিয়া ইবনুল হাকাম আস-সুলামী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন,

كَانَتْ لِي جَارِيَةٌ تَرْعَى غَنَمًا لِي قِبَلَ أُحُدٍ وَالْجَوَّانِيَّةِ فَاطَّلَعْتُ ذَاتَ يَوْمٍ فَإِذَا الذِّيبُ قَدْ ذَهَبَ بِشَاةٍ مِنْ غَنَمِهَا وَأَنَا رَجُلٌ مِنْ بَنِي آدَمَ آسَفُ كَمَا يَأْسَفُونَ لَكِنِّي صَكَكْتُهَا صَكَّةً فَأَتَيْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ فَعَظَّمَ ذَلِكَ عَلَيَّ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللهِ أَفَلَا أُعْتِقُهَا قَالَ ائْتِنِي بِهَا فَأَتَيْتُهُ بِهَا فَقَالَ لَهَا أَيْنَ اللهُ قَالَتْ فِي السَّمَاءِ قَالَ مَنْ أَنَا قَالَتْ أَنْتَ رَسُولُ اللهِ قَالَ أَعْتِقْهَا، فَإِنَّهَا مُؤْمِنَةٌ.

‘আমার একজন দাসী ছিল। উহুদ ও জাওয়ানিয়্যাহ অঞ্চলে সে আমার ছাগল চরাতো। একদিন জানতে পারলাম, নেকড়ে একটি ছাগল ধরে নিয়ে গেছে। আমি একজন সাধারণ আদম সন্তান হিসাবে রেগে যাই, যেভাবে তারা রেগে যায়। আমি তাকে একটা থাপ্পড় মারি। অতঃপর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে আসলে তিনি একে আমার জন্য সাংঘাতিক কাজ বলে গণ্য করেন। ফলে আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি কি তাকে মুক্ত করে দিব না? তিনি বললেন, তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো। আমি তাকে তার কাছে নিয়ে আসলে তিনি তাকে বললেন, আল্লাহ কোথায়? সে বলল, আসমানে। তিনি বললেন, আমি কে? সে বলল, আপনি আল্লাহর রাসূল। তিনি বললেন, তাকে তুমি মুক্ত করে দাও; কারণ সে মুমিন নারী’।[6]

আনাস ইবনে মালেক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন,

كَانَتْ زَيْنَبُ تَفْخَرُ عَلَى أَزْوَاجِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تَقُولُ: زَوَّجَكُنَّ أَهَالِيكُنَّ، وَزَوَّجَنِي اللَّهُ تَعَالَى مِنْ فَوْقِ سَبْعِ سَمَوَاتٍ

‘যায়নাব (রাযিয়াল্লাহু আনহা) নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অন্যান্য স্ত্রীর উপর গর্ব করে বলতেন, তোমাদের বিয়ে দিয়েছেন তোমাদের পরিবার। আর আমার বিয়ে দিয়েছেন মহান আল্লাহ সাত আসমানের উপর থেকে’।[7]

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ t أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ قَالَ يَنْزِلُ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالَى كُلَّ لَيْلَةٍ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا حِينَ يَبْقَى ثُلُثُ اللَّيْلِ الآخِرُ يَقُولُ مَنْ يَدْعُونِي فَأَسْتَجِيبَ لَهُ مَنْ يَسْأَلُنِي فَأُعْطِيَهُ مَنْ يَسْتَغْفِرُنِي فَأَغْفِرَ لَهُ.

আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘আমাদের রব প্রতি রাতের শেষ-তৃতীয়াংশে দুনিয়ার আকাশে নেমে এসে বলেন, কে আছ যে আমাকে ডাকবে আর আমি তার ডাকে সাড়া দিব? কে আছ যে আমার কাছে কিছু চাইবে আর আমি তাকে তা দিব? কে আছ যে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে আর আমি তাকে ক্ষমা করে দিব?’[8] আল্লাহ উপরে না থাকলে নিচে নেমে আসার কথা বলা হলো কেন?

অতএব, মহান আল্লাহ সত্তাগতভাবে তাঁর সৃষ্টির সাথে নেই। তবে তাঁর জ্ঞান, ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি দ্বারা তিনি তাঁর সৃষ্টির সাথে আছেন। এরশাদ হচ্ছে,

﴾إِذْ هُمَا فِي الْغَارِ إِذْ يَقُولُ لِصَاحِبِهِ لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا﴿

‘যখন তারা দু’জন গুহার মধ্যে ছিলেন, যখন তিনি তার সঙ্গীকে বলছিলেন, চিন্তা করো না, আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছে’ (আত-তওবা, ৯/৪০)। অন্যত্র আল্লাহ বলেন,

أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ مَا يَكُونُ مِنْ نَجْوَى ثَلَاثَةٍ إِلَّا هُوَ رَابِعُهُمْ وَلَا خَمْسَةٍ إِلَّا هُوَ سَادِسُهُمْ وَلَا أَدْنَى مِنْ ذَلِكَ وَلَا أَكْثَرَ إِلَّا هُوَ مَعَهُمْ أَيْنَ مَا كَانُوا

‘তুমি কি জানো না যে, যা আকাশে আছে আর যা যমীনে আছে আল্লাহ সব জানেন। তিন জনের মধ্যে এমন কোনো গোপন পরামর্শ হয় না, যাতে চতুর্থ জন আল্লাহ হন না, আর পাঁচ জনেও হয় না, ষষ্ঠ জন তিনি ছাড়া, এর কম  সংখ্যকেও হয় না আর বেশি সংখ্যকেও হয় না, তিনি তাদের সাথে থাকা ব্যতীত। তারা যেখানেই থাকুক না কেন’ (আল-মুজাদিলাহ, ৫৮/৭)

যুগে যুগে পূর্বসূরী আলেম-উলামাও ঠিক একথাই বলেছেন। চলুন, আমরা এখানে শুধু প্রসিদ্ধ চার ইমামের বক্তব্য দেখে আসি।

ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

مَنْ قَالَ لَا أَعْرِفُ رَبِّيْ فِي السَّمَاءِ أَوْ فِي الْأَرْضِ فَقَدْ كَفَرَ، وَكَذَا مَنْ قَالَ إِنَّهُ عَلَى الْعَرْشِ وَلَا أَدْرِي الْعَرْشَ أَفِي السَّمَاءِ أَوْ فِي الْأَرْضِ

‘যে ব্যক্তি বলে, আামর রব আসমানে না পৃথিবীতে, তা আমি জানি না, তবে সে কাফের হয়ে যাবে। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি বলে, তিনি আরশের উপর, কিন্তু আরশ আসমানে না যমীনে? তা আমি জানি না, তবে সেও অনুরূপ কাফের’।[9]

প্রিয় দ্বীনী ভাই! দেখলেন তো, আপনার ইমামের আক্বীদা কী আর আপনার আক্বীদা কী! কতই-না ভালো হতো, যদি আপনি আপনার ইমামের আক্বীদাটা গ্রহণ করতেন! আচ্ছা, কারো আক্বীদা ভালো না লাগলে তার অনুসরণের দাবি করেন কী করে! সে যাহোক, এবার চলুন, বাকী তিন ইমামের আক্বীদা দেখে আসি।

ইমাম মালেক (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

اللَّهُ فِي السَّمَاءِ وَعِلْمُهُ فِي كُلِّ مَكَانٍ لَا يَخْلُو مِنْ عِلْمِهِ مَكَانٌ

‘আল্লাহ আসমানে, কিন্তু তাঁর ইলম সর্বত্র। কোনো জায়গাই তাঁর ইলমের বাইরে নয়’।[10] তিনি অন্যত্র বলেন,

اللَّهُ فِي السَّمَاءِ وَعِلْمُهُ فِي كُلِّ مَكَانٍ لَا يَخْلُو مِنْهُ شَيْءٌ

‘আল্লাহ আসমানে, কিন্তু তাঁর ইলম সর্বত্র। কোনো কিছুই তাঁর ইলমের বাইরে নয়’।[11]

ইমাম শাফেঈ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

الْقَوْلُ فِي السُّنَّةِ الَّتِي أَنَا عَلَيْهَا وَرَأَيْتُ عَلَيْهَا الَّذِينَ رَأَيْتُهُمْ مِثْلَ سُفْيَانَ وَمَالِكٍ وَغَيْرِهِمَا إِقْرَارٌ بِشَهَادَةِ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ وَأَنَّ اللَّهَ تَعَالَى عَلَى عَرْشِهِ فِي سَمَائِهِ يَقْرُبُ مِنْ خَلْقِهِ كَيْفَ شَاءَ وَيَنْزِلُ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا كَيْفَ شَاءَ

‘সুন্নাহ সম্পর্কে আমার ও আমি সুফিয়ান, মালেক প্রমুখের মতো যেসব আহলেহাদীছ বিদ্বানকে দেখেছি, তাদের বক্তব্য হলো, একথার সাক্ষ্য দিতে হবে যে, নিশ্চয় আল্লাহ ছাড়া কোনো হক্ব মা‘বূদ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। আর আল্লাহ তাআলা আকাশে তাঁর আরশের উপর সমুন্নত। তিনি যেভাবে ইচ্ছা তাঁর সৃষ্টির নিকটবর্তী হন এবং যেভাবে ইচ্ছা নিচের আসমানে অবতরণ করেন’।[12]

ইমামু আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামাআহ ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল (রাহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আল্লাহ তাঁর সৃষ্টি থেকে আলাদা সপ্তম আকাশের উপরে তাঁর আরশে সমুন্নত। তাঁর ক্ষমতা ও জ্ঞান সর্বত্র বিস্তৃত। তাই নয় কি? উত্তরে তিনি বলেছিলেন,

نَعَمْ هُوَ عَلَى عَرْشِهِ وَلَا يَخْلُو شَيْءٌ مِنْ عِلْمِهِ

‘হ্যাঁ, তিনি আরশের উপর সমুন্নত এবং তাঁর ইলমের বাইরে কোনো কিছুই নেই’।[13]

ইমাম ইবনু খুযায়মা (রাহিমাহুল্লাহ)-এর বক্তব্য দিয়ে এ আলোচনাটি শেষ করতে চাই। তিনি বলেছেন,

مَنْ لَمْ يُقِرَّ بِأَنَّ اللَّهَ عَلَى عَرْشِهِ اسْتَوَى فَوْقَ سَبْعِ سَمَوَاتِهِ بَائِنٌ مِنْ خَلْقِهِ فَهُوَ كَافِرٌ يُسْتَتَابُ، فَإِنْ تَابَ وَإِلَّا ضُرِبَتْ عُنُقُهُ وَأُلْقِيَ عَلَى مَزْبَلَةٍ لِئَلَّا يَتَأَذَّى بِرَائِحَتِهِ أَهْلُ الْقِبْلَةِ وَأَهْلُ الذِّمَّةِ

‘যে ব্যক্তি স্বীকার করবে না যে, আল্লাহ সাত আসমানের উপর তাঁর আরশের উপর সমুন্নত, তাঁর সৃষ্টি থেকে আলাদা, সে কাফের। তাকে তওবা করাতে হবে। তওবা করলে ভালো কথা। না করলে গর্দান নামিয়ে দিতে হবে এবং তারপর ভাগাড়ে নিক্ষেপ করতে হবে, যাতে তার দুর্গন্ধে ক্বিবলার অনুসারী মুসলিমরা এবং আহলুয যিম্মাহ অমুসলিমরা কষ্ট না পায়’।[14]

বিজ্ঞ পাঠক! তাহলে মহান আল্লাহ কি সর্বত্র বিরাজমান, না-কি আরশে? কোনটা সঠিক আপনারাই নির্ধারণ করুন

(চলবে)


* বি. এ. (অনার্স), উচ্চতর ডিপ্লোমা, এম. এ. এবং এম.ফিল., মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব; অধ্যক্ষ, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ।

[1]. উছূলুদ্দীন ইনদাল ইমাম আবী হানীফা, পৃ. ৬০৮-৬১০।

[2]. প্রাগুক্ত, পৃ. ৬১০।

[3]. প্রাগুক্ত, পৃ. ৬১০।

[4]. ত্ব-হা, ২০/৫; আল-আ‘রাফ, ৭/৫৪; ইউনুস, ১০/৩; আর-রা‘দ, ১৩/২; আল-ফুরক্বান, ২৫/৫৯; আস-সাজদাহ, ৩২/৪; আল-হাদীদ, ৫৭/৪; ছহীহ বুখারী, হা/২৯৬৭; ছহীহ মুসলিম, হা/১০৮২; ইমাম আবূ হানীফা, আল-ফিক্বহুল আকবার, পৃ. ১৩৫ -এরকম আরো অসংখ্য প্রমাণ আছে।

[5]. ছহীহ বুখারী, হা/২৯৬৭, ৬৯১৭, ৬৯৪৫; ছহীহ মুসলিম, হা/৬৭১৮।

[6]. ছহীহ মুসলিম, হা/১০৮২।

[7]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৯১৫।

[8]. ছহীহ বুখারী, হা/১০৭৯; ছহীহ মুসলিম, হা/১৬৪৫।

[9]. আল-ফিক্বহুল আকবার, পৃ. ১৩৫।

[10]. আব্দুল্লাহ ইবনু আহমাদ ইবনু হাম্মাল, আস-সুন্নাহ (দার ইবনিল ক্বাইয়িম, দাম্মাম, ১ম প্রকাশ : ১৪০৬ হি./১৯৮৬ খৃ.), ১/১৭৩।

[11]. প্রাগুক্ত, ১/১৮০।

[12]. ইবনু কুদামা, ইছবাতু ছিফাতিল ‘উলু, (মাকতাবাতুল উলূম ওয়াল হিকাম, মদীনা, ১ম প্রকাশ : ১৪০৯ হি./১৯৮৮ খৃ.), পৃ. ১৮০। অবশ্য হাফেয যাহাবী (রাহিমাহুল্লাহ) এই বর্ণনাটিকে গ্রহণযোগ্য বলেননি; তবে মুহাদ্দিছ আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) বর্ণনাটির ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেননি।

[13]. যাহাবী, আল-‘উলু লিল-‘আলিয়্যিল গফফার, (মাকতাবাত আযওয়াইস সালাফ, রিয়ায, ১ম প্রকাশ : ১৪১৬ হি./১৯৯৫ খৃ.), পৃ. ১৭৬।

[14]. প্রাগুক্ত, পৃ. ২০৭।