ইসলামের দৃষ্টিতে ছবি-মূর্তি ও ভাস্কর্য

-শহীদুল্লাহ বিন রহমাতুল্লাহ*


পৃথিবীতে ছবি-মূর্তি ও ভাস্কর্যকে কেন্দ্র করে সর্বপ্রথম শিরকের সূচনা হয়েছে। মানুষের ঈমান, আমল ও চরিত্র বিধ্বংসী যতগুলো মাধ্যম রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ছবি-মূর্তি ও ভাস্কর্য। মানুষের অন্তর সাধারণত অদৃশ্য বিষয়ের চেয়ে দৃশ্যমান বস্তুর দ্বারা বেশি প্রভাবিত হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষেরা বিশ্বচরাচরের প্রতিপালক আল্লাহকে বাদ দিয়ে ছবি-মূর্তি ও ভাস্কর্য পূজা বা ইবাদত শুরু করেছে, যা সম্পূর্ণ হারাম ও শিরক। নিম্নে ছবি-মূর্তি ও ভাস্কর্যের শরীআতের বিধান শীর্ষক বিষয়ে নাতিদীর্ঘ আলোচনা করা হলো।

ছবি-মূর্তি ও ভাস্কর্য তৈরির ইতিহাস :

আদম (আলাইহিস সালাম)-এর জীবদ্দশায় কেউ মূর্তি-ভাস্কর্য পূজায় লিপ্ত হয়নি। তার মৃত্যুর পরে নূহ (আলাইহিস সালাম)-এর আমলে মানুষেরা মূর্তি-ভাস্কর্য পূজার মতো শিরকী কাজে লিপ্ত হয়েছে।

عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ  kصَارَتْ الْأَوْثَانُ الَّتِيْ كَانَتْ فِيْ قَوْمِ نُوْحٍ فِي الْعَرَبِ بَعْدُ أَمَّا وَدٌّ كَانَتْ لِكَلْبٍ بِدَوْمَةِ الْجَنْدَلِ وَأَمَّا سُوَاعٌ كَانَتْ لِهُذَيْلٍ وَأَمَّا يَغُوْثُ فَكَانَتْ لِمُرَادٍ ثُمَّ لِبَنِيْ غُطَيْفٍ بِالْجَوْفِ عِنْدَ سَبَإٍ وَأَمَّا يَعُوْقُ فَكَانَتْ لِهَمْدَانَ وَأَمَّا نَسْرٌ فَكَانَتْ لِحِمْيَرَ لِآلِ ذِي الْكَلَاعِ أَسْمَاءُ رِجَالٍ صَالِحِيْنَ مِنْ قَوْمِ نُوْحٍ فَلَمَّا هَلَكُوْا أَوْحَى الشَّيْطَانُ إِلَى قَوْمِهِمْ أَنْ انْصِبُوْا إِلَى مَجَالِسِهِمْ الَّتِيْ كَانُوْا يَجْلِسُوْنَ أَنْصَابًا وَسَمُّوْهَا بِأَسْمَائِهِمْ فَفَعَلُوْا فَلَمْ تُعْبَدْ حَتَّى إِذَا هَلَكَ أُوْلَئِكَ وَتَنَسَّخَ الْعِلْمُ عُبِدَتْ

ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যে প্রতিমার পূজা নূহ (আলাইহিস সালাম)-এর ক্বওমের মাঝে চালু ছিল, পরবর্তী সময়ে আরবদের মাঝেও তার পূজা প্রচলিত হয়েছিল। ‘দুমাতুল জান্দাল’ নামক জায়গার কালব গোত্রের একটি দেবমূর্তির নাম হচ্ছে ওয়াদ, সূওয়াআ হলো হুযায়ল গোত্রের একটি দেবমূর্তি এবং ইয়াগূছ ছিল মুরাদ গোত্রের, অবশ্য পরবর্তীতে তা গুতায়ফ গোত্রের হয়ে যায়। এর আস্তানা ছিল ক্বওমে সাবার নিকটবর্তী ‘জাওফ’ নামক স্থান। ইয়াঊক ছিল হামাদান গোত্রের দেবমূর্তি, নাসর ছিল যুলকালা গোত্রের হিময়ার শাখার মূর্তি। এগুলো ছিল নূহ (আলাইহিস সালাম)-এর সম্প্রদায়ের কয়েকজন সৎ ব্যক্তি। তারা মারা গেলে শয়তান তাদের ক্বওমের লোকদের অন্তরে এই চিন্তার উদ্রেক করল যে, তারা যেখানে বসে মজলিস করত, সেখানে তোমরা কতিপয় মূর্তি স্থাপন করো এবং ঐ সমস্ত পুণ্যবান লোকের নামেই এগুলোর নামকরণ করো। তারা তাই করল। কিন্তু তখনোও ওই সব মূর্তির পূজা করা হতো না। অতঃপর যখন মূর্তি স্থাপনকারী ওই লোকগুলো মারা গেল এবং মূর্তিগুলোর প্রকৃত বাস্তবতার ধারণা বিলুপ্ত হয়ে গেল, তখন লোকজন তাদের পূজা আরম্ভ করে দেয়।[1]

ছবি-মূর্তি ও ভাস্কর্য সম্পর্কে ব্যবহৃত পরিভাষাসমূহ : কুরআনে মূর্তি ও ভাস্কর্য সম্পর্কে ৪টি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। যথা-

ক. ছানাম (الصنم) : মূর্তি, প্রতিমা, প্রতিমূর্তি।[2]

কাঠ, মাটি, স্বর্ণ, রৌপ্য, ব্রোঞ্জ প্রভৃতি দ্বারা বানানো কোনো কিছুর প্রতিকৃতি বা মূর্তি, যা পূজা করা হয় তাকে ছানাম বলে। বাংলায় বলে মূর্তি। ইংরেজিতে Idol.[3] কুরআনে কয়েকটি জায়গায় ছানাম শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন- মহান আল্লাহ ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর দু‘আ সম্পর্কে বলেন,رَبِّ اجْعَلْ هَذَا الْبَلَدَ آَمِنًا وَاجْنُبْنِي وَبَنِيَّ أَنْ نَعْبُدَ الْأَصْنَامَ ‘যখন ইবরাহীম বললেন, হে আমার পালনকর্তা! এ শহরকে শান্তিময় করে দিন এবং আমাকে ও আমার সন্তান-সন্ততিকে মূর্তি (ছানাম) পূজা থেকে দূরে রাখুন’ (ইবরাহীম, ১৪/৩৫)। 

খ. তিমছাল (التمثال) : মূর্তি, প্রতিমা, প্রতিচ্ছবি, আকৃতি।[4]

মানুষ অথবা পশুর আকৃতির অনুকরণে যা কিছু তৈরি করা হয়, তাকে তিমছাল বলে।  ইংরেজিতে Bust.[5] কুরআনে তিমছাল শব্দটিও ব্যবহৃত হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন,إِذْ قَالَ لِأَبِيهِ وَقَوْمِهِ مَا هَذِهِ التَّمَاثِيلُ الَّتِي أَنْتُمْ لَهَا عَاكِفُونَ ‘যখন তিনি তার পিতা ও তার সম্প্রদায়কে বললেন, এই মূর্তিগুলো (তিমছাল) কী, যাদের তোমরা পূজারী হয়ে বসে আছো’ (আল-আম্বিয়া, ২১/৫২)

গ. অছান (الوثن) : প্রতিমা, মূর্তি, পুতুল।[6]

কোনো কিছুর চেহারা থাকুক বা না থাকুক সকল ইবাদতকৃত জিনিসকে অছান বলা হয়। ইংরেজিতে Fetish.[7] মানুষের প্রতিকৃতি, পশুর মূর্তি, কবর, গাছ, পাথর প্রভৃতি। এই আলোকে ছানাম-তিমছালও অছানের অন্তর্ভুক্ত। মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে অছান শব্দটিও ব্যবহৃত হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, إِنَّمَا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَوْثَانًا وَتَخْلُقُونَ إِفْكًا ‘তোমরা তো আল্লাহকে বাদ দিয়ে কেবল প্রতিমারই (অছান) পূজা এবং মিথ্যা উদ্ভাবন করছ’ (আল-আনকাবুত, ২৯/১৭)

ঘ. নাহাত (النحت) : ভাস্কর্য, ভাস্কর্য তৈরি, রূপ প্রদান, কর্তন।[8]

খোদাইকৃত চিত্র শিল্পকে আরবিতে نحت বলা হয়। যাকে বাংলায় বলা হয় ভাস্কর্য। ইংরেজিতে একে Sculpture.[9] পবিত্র কুরআনে এসেছে, قَالَ أَتَعْبُدُونَ مَا تَنْحِتُونَ  ‘সে বলল, তোমরা স্বহস্তে নির্মিত পাথরের (মূর্তি-ভাস্কর্য) পূজা করো কেন?’ (আস-সাফফাত, ৩৭/৯৫)

মূর্তি ও ভাস্কর্য কি ভিন্ন জিনিস?

আজ কতিপয় জ্ঞানপাপী দাবি করছে যে, ভাস্কর্য ও মূর্তি এক জিনিস নয়। যার উপাসনা করা হয় তা মূর্তি। আর যা স্রেফ সম্মানের জন্য তৈরি করা হয় তার নাম ভাস্কর্য। তাই মূর্তি তৈরি করা হারাম ও পাপের কাজ হলেও ভাস্কর্য তৈরি করা জায়েয। এটা শরীআতের উপর চরম মিথ্যাচার। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ঘরের দরজার সামনে মানুষের প্রতিকৃতি (ভাস্কর্য) এবং ঘরের ভিতরে পাতলা লাল পর্দায় কিছু প্রতিকৃতি নকশা থাকায় জিবরীল সেই ঘরে প্রবেশ করেননি। বরং দরজার সামনে থাকা ভাস্কর্যটির মাথা কেটে ফেলে গাছের মতো করে দিতে এবং পর্দাটি ছিঁড়ে ফেলে অসম্মানজনক ব্যবহারের জন্য দু’টো গদি বানাতে নির্দেশ দেন।[10] যে সকল জ্ঞানপাপীরা মা আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)–এর শৈশবকালের খেলনার পুতুল ও ঘোড়া দিয়ে ভাস্কর্যের বৈধতা প্রমাণের হীন প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, এই হাদীছগুলো তাদের পদলেহনের রঙ্গিন চশমা ভেদ করে দৃষ্টিগোচর হয় না?

মূর্তি ও ভাস্কর্য নির্মাণকারীর বিধান :

মূর্তি ও ভাস্কর্য নির্মাণকারীকে ক্বিয়ামতের দিন কঠিন শাস্তি প্রদান করা হবে। আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, أَشَدُّ النَّاسِ عَذَابًا عِنْدَ اللَّهِ الْمُصَوِّرُونَ ‘(ক্বিয়ামতের দিন) আল্লাহ তাআলার নিকট সবচেয়ে কঠিন আযাব হবে ছবি প্রস্তুতকারীদের’।[11] এমনকি যেখানে মূর্তি-ভাস্কর্য থাকে সেখানে রহমতের ফেরেশতা পর্যন্ত প্রবেশ করে না। আবূ ত্বালহা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, لَا تَدْخُلُ الْمَلَائِكَةُ بَيْتًا فِيهِ كَلْبٌ وَلَاتَصَاوِيرُ ‘(রহমতের) ফেরেশতাগণ সে ঘরে প্রবেশ করেন না যাতে কুকুর রয়েছে এবং সে ঘরেও না যাতে আছে (প্রাণীর) ছবি’।[12] তবে গযব কিংবা মৃত্যুর ফেরেশতা সবখানেই প্রবেশ করে। কারণ তারা প্রাপ্ত দায়িত্ব পালনে সদা প্রস্তুত (আত-তাহরীম, ৬৬/৬)। তবে প্রাকৃতিক পরিবেশ, গাছ-পালা, পাহাড়-পর্বত, নদী-নালা, ফুল-ফলের ছবি তোলা ও নির্মাণ করা বৈধ।[13]

মাথাবিহীন প্রাণীর ছবি :

যে কোনো ধরনের প্রাণীর পূর্ণ ছবি অঙ্কন কিংবা নির্মাণ করা হারাম। তবে মাথাবিহীন প্রাণীর ছবি তৈরি করা বা রাখা যাবে।[14]

মুসলিমের জন্য মূর্তি ও ভাস্কর্য পাহারা দেওয়ার বিধান :

একজন মুসলিমের জন্য ছবি-মূর্তি ও ভাস্কর্য পাহারা দেওয়া হারাম। তৈরি, ক্রয়-বিক্রয়, বাজারজাত করা তো বহু দূরের কথা।[15] অনুরূপভাবে মন্দির, গীর্জা ইত্যাদি পাহারা দেওয়াও হারাম। কেননা আল্লাহ পাপ ও আল্লাহদ্রোহিতার কাজে সহযোগিতা করতে নিষেধ করেছেন (আল মায়েদা, ৫/২)। এমনকি কেউ যদি মনে করে মূর্তি-ভাস্কর্য পাহারা দেওয়া ঈমানী দায়িত্ব, তাহলে তার ঈমান নষ্ট হয়ে যাবে (আস-সাজদাহ, ৩২/২২)। এক্ষেত্রে তাকে পুনরায় তওবা করে কালেমা পাঠ করতে হবে।

শেষকথা :

ইসলামী শরীআতে ছবি-মূর্তি ও ভাস্কর্য তৈরি, ক্রয়-বিক্রয় কিংবা এতে সহযোগিতা করা স্পষ্ট শিরক। অতএব রাষ্ট্রীয়ভাবে অশ্লীল ছবি এবং সব ধরনের মূর্তি ও ভাস্কর্য নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি এর ক্ষতিকর দিকগুলো জাতির সম্মুখে বারংবার উপস্থাপন করে জনগণকে সচেতন করার ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের নিকট অনুরোধ রইল। হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে ছবি-মূর্তি ও ভাস্কর্য থেকে হেফাযত করে তাওহীদভিত্তিক জীবনযাপন করার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!


* কুল্লিয়া (শেষ বর্ষ), আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, রাজশাহী।

[1]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৯২০, আ.প্র., ৪৫৫১, ই.ফা., ৪৫৫৫।

[2]. আল-মু‘জামুল ওয়াফী (৮ম সংস্করণ, মে ২০১১), পৃ. ৬৩৬।

[3]. Oxford Advanced Learners Dictionary (Third Edition : January 2014), P. 430.

[4]. আল-মু‘জামুল ওয়াফী (৮ম সংস্করণ, মে ২০১১), পৃ. ৩২০।

[5]. Oxford Advanced Learners Dictionary (Third Edition), p. 127.

[6]. আল-মু‘জামুল ওয়াফী (৮ম সংস্করণ, মে ২০১১), পৃ. ১১১৯।

[7]. Oxford Advanced Learners Dictionary (Third Edition), p. 335.

[8]. আল-মু‘জামুল ওয়াফী (৮ম সংস্করণ, মে ২০১১), পৃ. ১০৫৮।

[9]. Oxford Advanced Learners Dictionary (Third Edition), p. 710.

[10]. তিরমিযী (আল মাদানী প্রকাশনী), হা/২৮০৬।

[11]. ছহীহ বুখারী, হা/৬১০৯; ছহীহ মুসলিম, হা/২১০৯; মিশকাত, হা/৪৪৯৭।

[12]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৯৪৯; ছহীহ মুসলিম, হা/৫৬৩৬।

[13]. ছহীহ বুখারী, হা/২২২৫; আহমাদ, হা/৩৩৯৪।

[14]. তিরমিযী (আল মাদানী প্রকাশনী), হা/২৮০৬।

[15]. সূরা আল-কাফিরূন, ১০৯/৭; ছহীহ বুখারী, হা/৫৯৬১।