ইসলামে সুন্নাহর মর্যাদা
মূল : আল্লামা নাছিরুদ্দীন আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ)



অনুবাদ : আব্দুর রহমান বিন লুতফুল হক ভারতী*
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

 যারা শুধু কুরআনের অনুসরণই যথেষ্ট মনে করে, তাদের ভ্রষ্টতা : দুঃখের বিষয় হলো, এক শ্রেণির মুফাসসির এবং বর্তমান যুগের কিছু লেখক তারা শুধু কুরআনের উপর ভরসা করে হিংস্র জন্তুর গোশত খাওয়া এবং স্বর্ণ ও রেশম পরিধান করা বৈধ মনে করে! শুধু তাই নয়, বরং বর্তমান যুগে একটি নতুন দলের আবির্ভাব হয়, যারা নিজেদেরকে ‘আহলে কুরআন’ বলে দাবি করে। তারা ছহীহ হাদীছের সাহায্য না নিয়েই ইচ্ছামতো কুরআনের ব্যাখ্যা করে থাকে। সুন্নাহর ব্যাপারে তারা তাদের প্রবৃত্তি ও খেয়াল-খুশীকেই বিচারক বানিয়ে নিয়েছে। কোনো হাদীছ মনঃপূত হলে তা গ্রহণ করে এবং কোনো হাদীছ নিজের মর্জি-বিরুদ্ধ পেলে তা প্রত্যাখ্যান করে। সম্ভবত নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একটি ছহীহ হাদীছে এদের ব্যাপারেই ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি যেন তোমাদের কাউকে এরূপ না দেখি যে, সে তার গদীতে হেলান দিয়ে বসে থাকবে, তার নিকট আমার কোনো আদেশ বা নিষেধ পৌঁছলে সে বলবে, আমি এসব কিছু জানি না। আমরা যা আল্লাহর কিতাবে পাব, শুধু তারই অনুসরণ করব’। এটি ইমাম তিরমিযী বর্ণনা করেন।[1]  অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, ‘আমরা কুরআনে যা হারাম পাব, তা মেনে নিব। জেনে রেখো! আমাকে কুরআন এবং তার সাথে তার মতো আরো একটি জিনিস দেয়া হয়েছে’।[2] অন্য আরেকটি বর্ণনায় এভাবে এসেছে, ‘জেনে রেখো, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)ও কিছু বস্তু হারাম করেছেন, যেমন আল্লাহ তাআলা হারাম করেছেন’।[3]

দুঃখের বিষয় যে, একজন সম্মানিত লেখক শরীআতের আহকাম ও ইসলামী আক্বীদা বিষয়ে বই লেখেন। গ্রন্থটির ভূমিকায় উল্লেখ করেন, তাঁর এ গ্রন্থের তথ্যসূত্র শুধু কুরআন ছিল!  

উক্ত ছহীহ হাদীছটি অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, ইসলামী শরীআত শুধু কুরআন অনুসরণ করার নাম নয়, বরং কুরআন ও হাদীছ উভয়টাকেই অনুসরণ করার নাম হচ্ছে ইসলাম। অনুসরণের ক্ষেত্রে কোনোটিকেই বাদ দেওয়া যাবে না। কেননা কুরআন ও সুন্নাহ দুটোই একে অপরকে আঁকড়ে ধরে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন, ﴾مَنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ﴿ ‘যে ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য করল, সে আল্লাহরই আনুগত্য করল’ (আন-নিসা, ৪/৮০)। আল্লাহ তাআলা আরো বলেন,

﴾فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا﴿

‘আপনার রবের শপথ, তারা মুমিন হতে পারে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা নিজেদের বিবাদীয় বিষয়সমূহে আপনাকেই একমাত্র সমাধানকারী গ্রহণ না করবে। অতঃপর আপনার মীমাংসা সম্পর্কে তাদের মনে কোনো দ্বিধা না থাকে এবং সর্বান্তকরণে তা মেনে নেয়’ (আন-নিসা, ৪/৬৫)। তিনি আরো বলেন,

﴾وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُبِينًا﴿

‘কোনো মুমিন পুরুষ ও নারীর পক্ষে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো বিষয়ের ফয়সালা দিলে সে বিষয়ে তাদের নিজে ফয়সালা করার কোনো অধিকার নেই। আর যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নাফরমানী করবে, সে সুস্পষ্টভাবে গোমরাহ হবে’ (আল-আহযাব, ৩৩/৩৬)। আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ﴾وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا﴿ ‘রাসূল তোমাদের যা দিয়েছেন, তোমরা তা গ্রহণ করো। আর যা থেকে তিনি তোমাদেরকে নিষেধ করেছেন, তোমরা তা পরিত্যাগ করো’ (আল-হাশর, ৫৯/৭)

এই আয়াতের প্রেক্ষাপটে ইবনু মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে প্রমাণিত বর্ণনাটি পেশ করা খুবই উপযুক্ত মনে হচ্ছে। বর্ণনাটি হচ্ছে, জনৈকা মহিলা ইবনু মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে বললেন, আপনি নাকি বলেন, যে সমস্ত নারীরা শরীরে উল্কি অঙ্কন করে এবং যারা উল্কি অঙ্কন করায়, যারা সৌন্দর্যের জন্য ভুরু-চুল উপড়িয়ে ফেলে ও দাঁতের মাঝে ফাঁক সৃষ্টি করে, এদের সবাইকে আল্লাহ লা‘নত করেছেন? ইবনু মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, আমি কেন তার উপর অভিশাপ করব না, যাকে নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অভিশাপ করেছেন? অথচ তা আল্লাহর কিতাবে রয়েছে। অতঃপর মহিলাটি বললেন, আমি কুরআন প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পড়েছি, কিন্তু কোথাও তো একথা পাইনি। তিনি বললেন, তুমি (ভালোভাবে) পড়লে অবশ্যই তা পেয়ে যেতে। তুমি কি এ আয়াতটি পড়োনি, ‘রাসূল তোমাদের যা দিয়েছেন তোমরা তা গ্রহণ করো। আর যা থেকে তিনি তোমাদেরকে নিষেধ করেছেন, তোমরা তা পরিত্যাগ করো’।[4]

কুরআন বুঝার জন্য শুধু আরবী ভাষা যথেষ্ট নয় : উপরে উল্লেখিত দৃষ্টান্তগুলো থেকে আমাদের নিকট এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, কোনো ব্যক্তি আরবী ভাষায় যতই পারদর্শী হোক না কেন, হাদীছের ব্যাখ্যা ব্যতীত তার জন্য কুরআন বুঝা কোনো মতেই সম্ভব নয়। কেননা, সে আরবী ভাষায় যতই দক্ষতা রাখুক না কেন, ছাহাবীগণের চেয়ে আরবী ভাষায় বেশি দক্ষ হতে পারে না। কারণ কুরআন তাঁদেরই ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছিল এবং তখন পর্যন্ত আরবী ভাষায় অনারবদের মিশ্রণ ঘটেনি। তা সত্ত্বেও তাঁরা যখন শুধু ভাষার উপর নির্ভর করে উপরে উল্লেখিত আয়াতের অর্থ বুঝতে চেয়েছিলেন, তাঁদের দ্বারাও ভুল হয়েছিল।

তাই এটাই প্রকৃত সত্য, যে ব্যক্তি হাদীছশাস্ত্রে যত গভীর জ্ঞানের অধিকারী হবে, সে ব্যক্তি কুরআনের অর্থ বুঝতে এবং তা হতে মাসআলা-মাসায়েল বের করতে বেশি দক্ষ হবে ঐ ব্যক্তির অপেক্ষায়, যে মোটেই সুন্নাহর জ্ঞান রাখে না। তাহলে ভেবে দেখুন! যে ব্যক্তি আগাগোড়া সুন্নাহ অস্বীকার করে তার কী অবস্থা হতে পারে? তাই আহলে ইলমের নিকট কুরআন সঠিকভাবে বুঝার সর্বস্বীকৃত নিয়ম-নীতি ও পদ্ধতি হচ্ছে, কুরআনের তাফসীর প্রথমত কুরআন ও সুন্নাহ দিয়ে করতে হবেতারপর ছাহাবীগণের বক্তব্যের মাধ্যমে করতে হবে।

এখান থেকে আমদের নিকট স্পষ্ট হয় যে, অতীত ও বর্তমান যুগের আহলে কালামদের ভ্রান্তি এবং আক্বীদা ও আহকাম সংক্রান্ত বিষয়ে তাদের সালাফগণের বিরোধিতার মূল কারণ হচ্ছে, সুন্নাহকে অগ্রাহ্য করা এবং ছিফাত ও অন্যান্য বিষয়ের আয়াতমূহের নিজেদের বুদ্ধি-বিবেচনা অনুযায়ী অর্থ নির্ধারণ করা। এ মর্মে ‘শারহুল আক্বীদা আত-ত্বহাবিয়্যাহ’-তে যে বক্তব্য পেশ করা হয়েছে, তা কতই না সুন্দর! এ গ্রন্থের চতুর্থ সংস্করণের ২১২ পৃষ্ঠায় এসেছে, ‘আল্লাহর কিতাব ও রসূলের সুন্নাহ থেকে যারা দ্বীনের মূলনীতি সম্পর্কিত জ্ঞান অর্জন করে না, তারা কিভাবে দ্বীনের মৌলিক বিষয় সম্পর্কে কথা বলে? তারা কেবল অমুক অমুকের কাছ থেকেই দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করে থাকে। তারা কুরআনকে জ্ঞান অর্জনের উৎস মনে করলেও রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর হাদীছ থেকে তারা উহার ব্যাখ্যা গ্রহণ করে না এবং তাতে দৃষ্টিও নিক্ষেপ করে না। এমনকি মুহাদ্দিছগণের দ্বারা চয়নকৃত নির্ভরযোগ্য রাবীদের মাধ্যমে ছাহাবী এবং উত্তমভাবে তাদের অনুসরণকারী তাবেঈদের থেকে যে বর্ণনা এসেছে, তাতেও দৃষ্টিপাত করে না। কারণ এই ছাহাবী ও তাবেঈগণ শুধু কুরআনের শব্দ বর্ণনা করেননি, বরং তাঁরা শব্দ ও অর্থ উভয়ই বর্ণনা করেছেন। শিশুরা যেভাবে কুরআন শিখে তাঁরা সেভাবে কুরআন শিখতেন না, বরং তাঁরা অর্থসহ কুরআন শিখতেন। যে ব্যক্তি ছাহাবীদের পথ অবলম্বন করবে না, সে কুরআনের মনগড়া তাফসীর করবে। আর যে ব্যক্তি কুরআন ও সুন্নাহ থেকে জ্ঞান অর্জন না করেই নিজের মনগড়া কথা বলবে এবং তাকে দ্বীনের অংশ মনে করবে, তার কথা সঠিক হলেও সে গুনাহগার হবে। আর যে ব্যক্তি কুরআন ও সুন্নাহ থেকে জ্ঞান অর্জন করবে, তার কথা ভুল হলেও সে নেকী পাবে। তবে এ ব্যক্তির কথা যদি সঠিক হয়, তাহলে তার নেকী বহুগুণ বৃদ্ধি করা হবে’।

অতঃপর ইমাম ইবনু আবিল ইয বলেন, ‘প্রত্যেক মুসলিমের উপর আবশ্যক হলো, সে রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাহর সামনে নিজেকে সোপর্দ করবে, তার আদেশের সামনে মাথা নত করবে এবং তাঁর সংবাদকে সত্য বলে মেনে নিবে। আমাদের জন্য কোনো অবস্থাতেই বৈধ নয় যে, ভ্রান্ত কল্পনার মাধ্যমে আমরা তাঁর বিরোধিতা করব। ভ্রান্ত কল্পনাকে বিবেক-বুদ্ধির দলীল নাম দিয়ে তাকে শরীআতের দলীলের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো বৈধ নয়। সন্দেহের বশবর্তী হয়ে কুরআন-সুন্নাহর দলীলের ব্যাখ্যা করা আমাদের জন্য বৈধ নয় কিংবা কুরআন-সুন্নাহর দলীলের উপর মানুষের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়া এবং মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত মতবাদকে শরীআতের অকাট্য দলীলের উপর অগ্রাধিকার দেওয়া আমাদের জন্য মোটেই সমীচীন নয়। সুতরাং একমাত্র রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কেই ফয়সলাকারী হিসেবে মানবো এবং একমাত্র তাঁর সুন্নাতের সামনেই নিজেদেরকে সোপর্দ করব, যেভাবে আমরা রাসূল প্রেরণকারী আল্লাহর ইবাদত করে থাকি, তার জন্য নত হই, বিনীত হই, তার দিকেই ফিরে যায় এবং তার উপরই ভরসা করি’।

মোটকথা, আমল করার ক্ষেত্রে এবং শরীআতের সকল বিধান পালনের ক্ষেত্রে কুরআন ও হাদীছের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা যাবে না। এ দুটোরই অনুসরণ মানুষকে বিভিন্ন পথ অনুসরণ করা এবং পথভ্রষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা পাওয়ার গ্যারান্টি দেয়।

বলা বাহুল্য যে, আমরা এখানে যে সুন্নাহর মর্যাদার কথা উল্লেখ করছি, তা হচ্ছে সেই সুন্নাহ, যা রিজাল ও ই‘লাল শাস্ত্রে পণ্ডিত বিশেষজ্ঞ মুহাদ্দিছগণের নিকট নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী দ্বারা ছহীহ সূত্রে প্রমাণিত। সেই সুন্নাহ বা হাদীছগুলো নয়, যেগুলো তাফসীর, ফিক্বহ ও আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব গ্রন্থসমূহে পাওয়া যায়। কেননা এই গ্রন্থগুলোতে অনেক দুর্বল, জাল ও ভিত্তিহীন হাদীছ থাকে, যেগুলোর সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্কই নেই। যেমন হারূত-মারূতের হাদীছ, গারানীক্বের হাদীছ। গারানীক্বের ঘটনা সম্পর্কে আমার একটি পুস্তিকা রয়েছে, যেখানে আমি হাদীছটিকে বাতিল প্রমাণ করেছি।

‘সিলসিলাতুল আহাদীছ আয-যঈফা ওয়াল মাউযূআ’ নামক আমার বিশাল গ্রন্থে এই শ্রেণির বহু হাদীছ সংকলন করেছি। যার সংখ্যা এখন পর্যন্ত চার হাজার হাদীছ পৌঁছে গেছে। যেখানে দুর্বল ও জাল উভয় ধরনের হাদীছ রয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত শুধু পাঁচশত হাদীছই ছাপানো হয়েছে!

আলেমদের জন্য, বিশেষ করে যারা মানুষের মাঝে দ্বীনী মাসআলা-মাসায়েল ও ফাতাওয়া প্রচার করেন, তাদের জন্য এটা জরুরী যে, কোনো হাদীছ থেকে মাসআলা-মাসায়েল বের করার আগে তা যাচাই-বাছাই করে নেওয়া, হাদীছটি ছহীহ না-কি যঈফ। কেননা ফিক্বহের গ্রন্থগুলো, যেগুলো মানুষ বেশি বেশি অধ্যয়ন করেন- বাতিল ও ভিত্তিহীন হাদীছে পরিপূর্ণ- যেমনটা আলেমদের নিকট সুপরিচিত বিষয়। আমি একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করা আরম্ভ করেছিলাম, যেটা ফিক্বহের ছাত্রদের জন্য খুবই উপকারী হত বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো। গ্রন্থটির নামকরণ করেছিলাম,

اَلْاَحَادِيْثُ الضَّعِيْفَةُ وَالْمَوْضُوْعَةُ فِيْ أُمَّهَاتِ الْكُتُبِ الْفِقْهِيَّةِ

ফিক্বহের যে গ্রন্থগুলো আমার এ গ্রন্থে শামিল ছিল তা হচ্ছে নিম্নরূপ :

১. হানাফী মাযহাবের গ্রন্থ ‘আল-হেদায়া’। লেখক- আল মারগীনানি।

২. মালেকী মাযহাবের গ্রন্থ ‘আল-মুদাওওয়ানা’। লেখক- ইবনুল কাসেম।

৩. শাফেঈ মাযহাবের ‘শারহুল ওয়াজীয’। লেখক- রাফেঈ।

৪. হাম্বালী মাযহাবের ‘আল-মুগনী’। লেখক- ইবনু কুদামা।

৫. তুলনামূলক ফিক্বহ শাস্ত্রের মধ্যে ইবনু রুশদ আল আন্দালুসীর ‘বিদায়াতুল মুজতাহিদ’।   

কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো এই যে, গ্রন্থটি সম্পন্ন করার সুযোগ পাইনি। কেননা কুয়েতের الوعي الإسلامي নামক যে পত্রিকাটি আমার এ গ্রন্থের প্রবন্ধগুলো ছাপানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ও আমার এ পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছিল, সে তার দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করেনি। যদিও এ কাজটি সম্পন্ন করা হয়নি, তবে অন্য কোনো সুযোগে ইনশাআল্লাহ ফিক্বহ শাস্ত্রের জ্ঞানপিপাসুদের উদ্দেশ্যে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও সূক্ষ্ম মূলনীতি তৈরি করব, যা তাদের জন্য উপকারী হবে এবং হাদীছের উ‌ৎসগ্রন্থের দিকে প্রত্যাবর্তন করে  হাদীছের মান জানার পদ্ধতি তাদের জন্য খুব সহজ করে তুলবে। আল্লাহ যেন আমাকে এ কাজের তাওফীক্ব দান করেন। 

রায়-ইজতিহাদ সম্পর্কে বর্ণিত মুআয (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাদীছটি দুর্বল ও মুনকার : আলোচনা শেষ করার পূর্বে একটি খুবই প্রসিদ্ধ হাদীছের দিকে সম্মানিত উপস্থিতির দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাচ্ছি। উছূলে ফিক্বহের এমন কোনো গ্রন্থ নেই, যেখানে হাদীছটি উল্লেখ করা হয়নি। হাদীছটি এখানে আলোচনা করার মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে, হাদীছের সনদটি দুর্বল। অতঃপর আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, শরীআতের বিধি-বিধানের ক্ষেত্রে কুরআন ও হাদীছের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা যাবে না এবং দুটোর উপর একসাথে আমল করা জরুরী। আর হাদীছটি সেই সিদ্ধান্তের সাথে সাংঘর্ষিক।

সেই হাদীছটি হচ্ছে, মুআয ইবনু জাবাল (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাদীছ। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন মুআয (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে ইয়ামানে পাঠাতে মনস্থ করলেন, তখন তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কীভাবে বিচার করবে? তিনি বললেন, আমি আল্লাহর কিতাব অনুসারে বিচার করব। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, তা যদি আল্লাহর কিতাবে না পাও?  মুআয (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাহ দ্বারা ফয়সালা করব। রাসূলুল্লাহ বললেন, যদি রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাহতে না পাও? এর উত্তরে তিনি বললেন, তাহলে আমি আমার বুদ্ধি-বিবেচনা প্রয়োগ করব এবং তাতে বিন্দুমাত্র ত্রুটি করব না। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, ‘সমস্ত প্রশংসা একমাত্র ঐ আল্লাহর জন্য, যিনি তাঁর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতিনিধিকে সেই জিনিসের তাওফীক্ব দান করেছেন, যে ব্যাপারে তাঁর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সন্তুষ্ট’।[5]

সনদের দিক দিয়ে যে এটি দুর্বল, তা বিস্তারিত আলোচনা করার এখানে সুযোগ নেই। ‘সিলসিলাতুয যঈফা’-তে এর বিস্তারিত আলোচনা করেছি। এখানে শুধু এতটুকুই বলা যথেষ্ট হবে, আমীরুল মুমিনীন ইমাম বুখারী মুআয (রাযিয়াল্লাহু আনহু)–এর উক্ত হাদীছ সম্পর্কে বলেন, ‘এ হাদীছটি মুনকার’। 

এখন হাদীছটি পরস্পর বিরোধী কেন? এর বিস্তারিত আলোচনা করব।

মুআয (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর এ হাদীছটিতে বিচারকের জন্য তিনটি পর্যায় নির্ধারণ করা হয়েছে। রায় ও বিবেক-বুদ্ধি দ্বারা তখনই ফয়সালা করা যাবে, যখন তা সুন্নাহতে পাওয়া যাবে না। আর সুন্নাহ অনুসারে তখনই ফয়সালা করা যাবে, যখন তা আল্লাহর কিতাবে পাওয়া যাবে না। রায় ও বিবেক-বুদ্ধির ক্ষেত্রে যদিও এটা উলামায়ে কেরামের নিকট সঠিক। কেননা তাঁরা বলে থাকেন যে, হাদীছ এসে গেলে সব ধরনের রায় ও ক্বিয়াস বাতিল হয়ে যায়, কিন্তু সুন্নাহর ক্ষেত্রে এটা সঠিক নয়। কারণ সুন্নাহ কুরআনের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করে এবং তার অর্থ স্পষ্ট ভাষায় বর্ণনা করে। তাই কোনো বিধান সম্পর্কে যদি মনে হয় এটি কুরআনে আছে, তা সত্ত্বেও সুন্নাহতে সেই বিধান সম্পর্কে অনুসন্ধান করা জরুরী। কুরআনের সাথে সুন্নাহর যে সম্পর্ক, রায় বা ক্বিয়াসের সাথে সুন্নাহর সে সম্পর্ক হতে পারে না। কখনই না, কখনই না। বরং কুরআন ও সুন্নাহকে একটিই উৎস মনে করতে হবে। এ দুটোর মধ্যে কোনো পার্থক্য করা যাবে না। যেমন নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘আমাকে কুরআন ও তার ন্যায় আরেকটি বস্তু দেওয়া হয়েছে’। অর্থাৎ সুন্নাহ। তিনি আরো বলেন, ‘এ দুটি কখনো আলাদা হবে না, কাওছার নামক ঝর্ণায় আমার সাথে একত্রিত না হওয়া পর্যন্ত’।[6]  

তাই উপরে বর্ণিত শ্রেণি বিভাগটি সঠিক নয়। কেননা এই শ্রেণি বিভাগের দাবি হলো, কুরআন ও সুন্নাহকে আলাদা করা। আর এটাই হচ্ছে বাতিল।


* পিএইচডি গবেষক, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব।

[1]. আবূ দাঊদ, হা/৪৬০৫; তিরমিযী, হা/২৬৬৩; ইবনু মাজাহ, হা/১৩, মুসনাদে আহমাদ, হা/২৩৮৭৬, এ সনদের সকল বর্ণনাকারী ছিক্বাহ ও নির্ভরযোগ্য এবং এরা সকলেই ছহীহ বুখারী ও ছহীহ মুসলিমের বর্ণনাকারী, হাদীছটিকে আলবানী ছহীহুল জামে‘ (হা/৭১৭২) গ্রন্থে ছহীহ বলেছেন।

[2]. মুসনাদে আহমাদ, হা/১৭১৭৪।

[3]. মুসনাদে আহমাদ, হা/১৭১৯৪; ইবনু মাজাহ, হা/১২।

[4]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৯৩৯; ছহীহ মুসলিম, হা/২১২৫।

[5]. মুসনাদে আহমাদ, হা/২২০০৭; আবূ দাঊদ, হা/৩৫৯২; তিরমিযী, হা/১৩২৭।

[6]. মুসনাদে আহমাদ, হা/১১০৪; তিরমিযী, হা/৩৭৮৮; হাকেম, হা/৩১৯; মুসনাদুল বাযযার, হা/৮৯৯৩; আলবানী হাদীছটিকে ছহীহ বলেছেন, সিলসিলা ছহীহা, হা/১৭৫০ ।