ইসলামে সুন্নাহর মর্যাদা
মূল : আল্লামা নাছিরুদ্দীন আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) 
অনুবাদ : আব্দুর রহমান বিন লুতফুল হক ভারতী *



[এই গ্রন্থটি মূলত ১৩৯২ হিজরীর পবিত্র রামাযান মাসে কাতারের রাজধানী দোহা শহরে দেওয়া আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর একটি লেকচার। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কারণে এবং এই ধরনের বিষয়ে মুসলিমদের প্রয়োজনীয়তার কথা ভেবে কিছু দ্বীনী ভাই এটি বই আকারে ছাপতে তাঁকে পরামর্শ দেন তাদের পরামর্শ অনুসারে এটি বই আকারে ছাপার সিদ্ধান্ত নেন তিনি, যাতে সবাই উপকৃত হতে ও উপদেশ গ্রহণ করতে পারে। পাঠকগণের সুবিধার কথা ভেবে তিনি এর সাথে কিছু শিরোনামও যুক্ত করেছেন। আল্লাহ তাআলা যেন তাকে তাঁর দ্বীন ও শরীআতের হেফাযতকারীদের অন্তর্ভুক্ত করেন এবং এর উত্তম প্রতিদান দান করেন। নিশ্চয় তিনি (আল্লাহ) অতি দয়ালু ও দু‘আ কবুলকারী।]

নিশ্চয় সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য। আমরা তাঁরই প্রশংসা করছি, তাঁর কাছে সাহায্য চাচ্ছি এবং তাঁরই নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আমরা আমাদের প্রবৃত্তির অনিষ্টতা ও কর্মসমূহের অকল্যাণ থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আল্লাহ যাকে হেদায়াত দান করেন, তাকে কেউ বিভ্রান্ত করতে পারে না। আর তিনি যাকে বিভ্রান্ত করেন, তাকে কেউ পথ দেখাতে পারে না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো সত্য উপাস্য নেই। তিনি একক এবং তাঁর কোনো শরীক নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর বান্দা ও রাসূল। ‘হে মুমিনগণ! তোমরা যথার্থভাবে আল্লাহকে ভয় করো এবং মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না’ (আলে ইমরান, ৩/১০২)

‘হে মানব জাতি! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো, যিনি তোমাদেরকে একটি প্রাণ থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তা হতে তার সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন। আর তাদের দুজন থেকে সারা দুনিয়ায় বহু নর-নারী ছড়িয়ে দেন। সেই আল্লাহকে ভয় করো, যার দোহাই দিয়ে তোমরা পরস্পরের কাছ থেকে নিজেদের হক্ব আদায় করে থাক এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক বিনষ্ট করা থেকে বিরত থাকো। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের উপর পর্যবেক্ষক’ (আন-নিসা, ৪/১)। ‘হে বিশ্বাসীগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো’ (আল-আহযাব, ৩৩/৭০)

সবচেয়ে সত্য বাণী আল্লাহর গ্রন্থ এবং সর্বোত্তম আদর্শ মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আদর্শ। পক্ষান্তরে নিকৃষ্টতম কাজ হচ্ছে দ্বীনে নবাবিষ্কৃত কর্ম। আর (দ্বীনে) সকল নবাবিষ্কৃত কর্মই বিদআত এবং সকল বিদআতই ভ্রষ্টতা আর সকল ভ্রষ্টতার পরিণাম জাহান্নাম।

অতঃপর আলেম ও জ্ঞানীদের এই মহাসম্মেলনে নতুন কিছু  পেশ করতে পারব বলে আমার মনে হয় না। আমার এই ধারণা যদি সঠিক হয়, তাহলে আমার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, আমার এই আলোচনাটি নছীহতস্বরূপ হবে এবং আমি আল্লাহর এই আদেশের অনুসরণকারী হব- ‘আর আপনি উপদেশ দিতে থাকুন। কারণ নিশ্চয় উপদেশ মুমিনদের উপকারে আসে’ (আয-যারিয়াত, ৫১/৫৫)

রামাযানুল মুবারকের এই পবিত্র রাতে, আমি রামাযানের ফযীলত, আহকাম ও তারাবীর গুরুত্ব ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা করব না, বরং একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করব। আর সেটি হচ্ছে ইসলামে সুন্নাহর মর্যাদা

কুরআনের সাথে সুন্নাহর সম্পর্ক : আপনারা সকলেই অবগত আছেন যে, আল্লাহ তাআলা মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে শেষ নবী হিসেবে মনোনীত করেছেন, তাঁকে রিসালত দান করেছেন ও তাঁর উপর কুরআন নাযিল করেছেন। তাঁকে যা কিছু আদেশ করেছেন, তন্মধ্যে একটি আদেশ ছিল কুরআন মাজীদের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা এবং মানুষকে তা স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেওয়া। মহান আল্লাহ বলেন, وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ  ‘আপনার প্রতি আমি কুরআন নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে যা তাদের প্রতি নাযিল করা হয়েছে, তা স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেন’ (আন-নাহল, ১৬/৪৪)। 

আমি মনে করি, উপরিউক্ত আয়াতে মানুষকে কুরআনের যে বর্ণনা ও স্পষ্ট ব্যাখ্যা বুঝিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, তাঁর বর্ণনা এই দু’টি পদ্ধতিতে হয়েছে- একটি মানুষের কাছে কুরআনের শব্দ ও বাক্য হুবহু পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে। আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে এ কথাই বলেছেন, يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَبِّكَ ‘হে রাসূল! আপনার রবের কাছ থেকে আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, তা পৌঁছে দিন’ (আল-মায়েদা, ৫/৬৭)। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, ‘যে ব্যক্তি এমন কথা বলে যে, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর কিতাবের কোনো কথা গোপন রেখেছেন, সে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভীষণ অপবাদ দেয়’।[1] মুসলিমের আর এক বর্ণনায় এসেছে, আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, যদি মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর উপর অবতীর্ণ অহীর কোনো অংশ গোপন করতেন, তবে তিনি এ আয়াতটি অবশ্যই গোপন করতেন, ‘স্মরণ করুন! আল্লাহ যাকে অনুগ্রহ দান করেছেন এবং আপনিও যার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, আপনি তাকে বলছিলেন, তুমি তোমার স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক বজায় রাখো এবং আল্লাহকে ভয় করো। আর আপনি আপনার অন্তরে এমন কিছু গোপন করছিলেন, যা আল্লাহ প্রকাশকারী। আপনি লোককে ভয় করছিলেন অথচ আল্লাহকে ভয় করা আপনার জন্য অধিকতর সংগত’।[2]

আরেকটি পদ্ধতি হচ্ছে কুরআনের ব্যাখ্যার মাধ্যমে। অর্থাৎ কুরআনের শব্দ বা বাক্যের ব্যাখ্যা উম্মতকে জানিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে। তিনি কুরআনের সংক্ষিপ্ত আয়াতসমূহকে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। ব্যাপক অর্থবোধক আয়াতকে বিশেষ অর্থে ব্যবহার করেছেন। সাধারণ আয়াতকে সীমাবদ্ধ করেছেন। আবার শর্তযুক্ত আয়াতকে সাধারণ করেছেন। আর তা হয়েছে তাঁর কথা, কাজ ও সমর্থনের মাধ্যমে।

কুরআন বুঝার জন্য সুন্নাহর প্রয়োজনীয়তা ও তার কিছু উদাহরণ : আল্লাহ তাআলা বলেন, وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا ‘পুরুষ চোর ও নারী চোরের হাত কেটে দাও’  (আল-মায়েদা, ৫/৩৮)। কুরআনের এই আয়াতে কী পরিমাণ সম্পদ চুরি করলে হাত কাটা যাবে এটা বলা হয়নি। কী পরিমাণ হাত কাটতে হবে, কব্জি থেকে না কনুই থেকে? এটাও বলা হয়নি। শুধু সুন্নাহতেই এর বিবরণ এসেছে যে, কী পরিমাণ মাল চুরি করলে হাত কাটা যাবে। হাদীছে এসেছে, কেবল ঐ চোরের হাত কাটা যাবে, যে এক দ্বীনারের চার ভাগের এক ভাগ বা এর বেশি চুরি করবে। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘এক-চতুর্থাংশ দীনার অথবা এর অধিক মাল চুরি ব্যতীত চোরের হাত কাটা যাবে না’।[3]

অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও ছাহাবীগণের আমল ও অনুমোদন দ্বারা প্রমাণিত যে, তাঁরা চোরের কব্জি পর্যন্ত হাত কাটতেন, যেমনটি হাদীছ গ্রন্থে সুপরিচিত বিষয়।

তায়াম্মুমের আয়াতে যে হাত মাসাহ করার কথা বলা হয়েছে, فَامْسَحُوا بِوُجُوهِكُمْ وَأَيْدِيكُمْ ‘তোমরা তোমাদের চেহারা ও হাত মাসাহ করো’ (আন-নিসা, ৪/৪৩)। সুন্নাহতে তা স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, এখানে ‘হাত মাসাহ করা’ থেকে কব্জি পর্যন্ত মাসাহ করা বোঝানো হয়েছে, কনুই পর্যন্ত নয়। আমি এখানে কুরআনের আয়াতের আরো কিছু উদাহরণ পেশ করব, যে আয়াতগুলো সুন্নাহ ব্যতীত সঠিকভাবে বুঝা সম্ভব নয়।

(১) আল্লাহ তাআলা বলেন,

الَّذِينَ آمَنُوا وَلَمْ يَلْبِسُوا إِيمَانَهُمْ بِظُلْمٍ أُولَئِكَ لَهُمُ الْأَمْنُ وَهُمْ مُهْتَدُونَ

‘যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের ঈমানকে যুলমের সাথে মিশ্রিত করেনি, নিরাপত্তা তাদের জন্যই এবং তারাই হেদায়াতপ্রাপ্ত’ (আল-আন‘আম, ৬/৮২)। এই আয়াতে বলা হয়েছে, ‘যারা নিজেদের ঈমানকে যুলমের সাথে মিশ্রিত করেনি’-এর মধ্যে ‘যুলম’ শব্দটি থেকে কিছু ছাহাবীর ভুল ধারণা হয়েছিল যে, বোধ হয় এখানে যুলম থেকে সব ধরনের যুলম ও অন্যায়কে বোঝানো হয়েছে, যদিও তা নগণ্য হোক না কেন। ছাহাবীগণের কাছে এ আয়াতটি খুব কঠিন মনে হলো। তাই তাঁরা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মধ্যে কে এমন আছে, যে নিজের উপর যুলম করেনি? তখন নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, এখানে অর্থ তা নয়; এখানে যুলমের অর্থ হলো শিরক। তোমরা কি কুরআনে শোনোনি, লুক্বমান তাঁর ছেলেকে নছীহত করার সময় কী বলেছিলেন? তিনি বলেছিলেন, ‘নিশ্চয় শিরক একটা বিরাট যুলম’।[4]

(২) আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَإِذَا ضَرَبْتُمْ فِي الْأَرْضِ فَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَنْ تَقْصُرُوا مِنَ الصَّلَاةِ إِنْ خِفْتُمْ أَنْ يَفْتِنَكُمُ الَّذِينَ كَفَرُوا

‘তোমরা যখন সফর করবে, তখন যদি তোমাদের আশঙ্কা হয় যে, কাফেররা তোমাদের জন্য ফিতনা সৃষ্টি করবে, তবে ছালাত ক্বছর করাতে তোমাদের কোনো দোষ নেই’ (আন-নিসা, ৪/১০১)। এই আয়াতের বাহ্যিক অর্থ এটাই যে, ক্বছর কেবল ভয়-ভীতির অবস্থার জন্য; শান্তির অবস্থায় ক্বছর করা যাবে না। তাই কিছু ছাহাবী নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এখন তো আমরা নিরাপদ ও ভীতিমুক্ত হয়ে গেছি। অতএব এখন ছালাত ক্বছর করার কী প্রয়োজন? এর উত্তরে রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘এটা তো তোমাদের জন্য আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে ছাদাক্বা। অতএব তোমরা তার ছাদাক্বা গ্রহণ করো’।[5]

(৩) আল্লাহ তাআলা বলেন, حُرِّمَتْ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ ‘তোমাদের জন্য মৃত জন্তু ও রক্ত হারাম করা হয়েছে’ (আল-মায়েদা, ৫/৩)। কিন্তু সুন্নাহতে বলা হয়েছে যে, দুই প্রকারের মৃত প্রাণী এবং দুই প্রকার রক্ত হালাল। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘খাদ্যরূপে দুই প্রকারের মৃত প্রাণী এবং দুই প্রকার রক্তকে আমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে। দুই প্রকার মৃত প্রাণী হচ্ছে, পঙ্গপাল ও মাছ এবং দুই প্রকার রক্ত হচ্ছে কলিজা ও হৃৎপিণ্ড’।[6] বায়হাক্বী ও অন্যান্য ইমাম এটিকে মারফূ‘ ও মাওকূফরূপে বর্ণনা করেছেন এবং মাওকূফ বর্ণনার সনদ ছহীহ। আর মাওকূফ বর্ণনাটি মারফূর হুকুম রাখে। কারণ এটা এমন একটি বিষয়, যা বুদ্ধি-বিবেক খাটিয়ে বলা যায় না।

(৪) আল্লাহ তাআলা বলেন,

قُلْ لَا أَجِدُ فِي مَا أُوحِيَ إِلَيَّ مُحَرَّمًا عَلَى طَاعِمٍ يَطْعَمُهُ إِلَّا أَنْ يَكُونَ مَيْتَةً أَوْ دَمًا مَسْفُوحًا أَوْ لَحْمَ خِنْزِيرٍ فَإِنَّهُ رِجْسٌ أَوْ فِسْقًا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللَّهِ بِهِ

‘আপনি বলুন, আমার নিকট যে অহী এসেছে, তাতে এমন কোনো বস্তু পাই না, যা খাওয়া কারো পক্ষে হারাম, মৃত প্রাণী, বহমান রক্ত ও শূকরের গোশত ছাড়া। কারণ তা নাপাক। অথবা (যবেহকালে) আল্লাহ ছাড়া অন্যের নাম নেওয়ার কারণে যা অবৈধ’ (আল-আন‘আম, ৬/১৪৫)। কিন্তু এ আয়াতে উল্লেখিত চারটি জিনিস ছাড়াও আরো কয়েকটি জিনিসের হারাম হওয়ার উল্লেখ একাধিক হাদীছে এসেছে। যেমন ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সব ধরনের হিংস্র জন্তু এবং সব ধরনের নখধারী পাখি খেতে নিষেধ করেছেন’।[7] যেমন অন্য আরেকটি হাদীছে এসেছে যে, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তোমাদেরকে গৃহপালিত গাধার গোশত খেতে নিষেধ করেছেন। কারণ তা নাপাক’।[8]

(৫) আল্লাহ তাআলা বলেন,قُلْ مَنْ حَرَّمَ زِينَةَ اللَّهِ الَّتِي أَخْرَجَ لِعِبَادِهِ وَالطَّيِّبَاتِ مِنَ الرِّزْقِ ‘বলো, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য যেসব সাজসজ্জা এবং পবিত্র জীবিকা সৃষ্টি করেছেন, তা কে হারাম করেছে?’ (আল-আ‘রাফ, ৭, ৩২)। অথচ হাদীছে এসেছে যে, কিছু শোভা-সৌন্দর্য ও সাজসজ্জার বস্তু আছে, যেটা হারাম। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে প্রমাণিত যে, ‘একদা তিনি বের হলেন, তাঁর এক হাতে রেশম আর অন্য হাতে স্বর্ণ ছিল। তিনি বললেন, এ দুটি জিনিস আমার উম্মতের পুরুষদের জন্য হারাম’।[9] এই হাদীছটি ইমাম হাকেম বর্ণনা করেছেন এবং হাদীছটি ছহীহ বলেছেন। এই বিষয়ে ছহীহ বুখারী, ছহীহ মুসলিম ও অন্যান্য গ্রন্থে বহু ছহীহ হাদীছ রয়েছে।

উল্লেখিত উদাহরণ ছাড়াও আরও অগণিত অনেক উদাহরণ আছে, যা হাদীছ ও ফিক্বহ বিশারদগণের কাছে সুপ্রসিদ্ধ ও সুপরিচিত বিষয়।

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে আমাদের নিকটে ইসলামে সুন্নাহর মর্যাদা ও গুরুত্ব সাব্যস্ত হয়। এই উদাহরণগুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত করলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস জন্মায় যে, সুন্নাহ বা হাদীছ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান ছাড়া সঠিকভাবে কুরআনের অর্থ বুঝা একেবারেই অসম্ভব।

১ম উদাহারণে ‘যুলম’ শব্দটি থেকে ছাহাবায়ে কেরাম যুলমের সাধারণ অর্থ পাপ এবং অত্যাচার মনে করেছিলেন। তা সত্ত্বেও ইবনু মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তাঁদের সম্পর্কে বলেন, ‘তাঁরা ছিলেন এ উম্মতের মধ্যে আত্মার দিক থেকে সবচেয়ে বেশি নেককার, সর্বাধিক গভীর জ্ঞানের অধিকারী ও সর্বাধিক কৃত্রিমতা পরিহারকারী’। লক্ষ্য করুন, তাঁদের এত গভীর জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও উল্লেখিত আয়াতে বর্ণিত ‘যুলম’ শব্দের অর্থ ভুল বুঝেছিলেন। যদি রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের ভুল শুধরিয়ে না দিতেন এবং বুঝিয়ে না দিতেন যে, এখানে যুলম মানে শিরক, তাহলে আমরাও তাঁদের ভুলের অনুসরণ করতাম। কিন্তু আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর দিক-নির্দেশনা ও সুন্নাহ দ্বারা আমাদেরকে এ থেকে রক্ষা করেছেন।

২য় উদাহরণটি দেখুন, আমরা যদি হাদীছের দিকে ফিরে না যেতাম, তাহলে শান্তির অবস্থায় ছালাত ক্বছর করা যাবে কি-না কমপক্ষে এই ব্যাপারে আমাদের সন্দেহ থেকেই যেত- যদিও তা শর্ত মনে না করতাম। যেমন কোনো কোনো ছাহাবীর মনে এ ধারণা এসেছিল যে, এখন তো আমরা নিরাপদ, তাই এখন ছালাত ক্বছর করার কী প্রয়োজন? কিন্তু তাঁরা রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে শান্তির অবস্থায় ছালাত ক্বছর করতে দেখেছেন এবং তাঁরাও তাঁর সাথে ক্বছর করেছেন। তাই তাঁদের এ ধারণার নিরসন হয়।

(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)


 

* পিএইচডি গবেষক, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব।

[1]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৬১২; ছহীহ মুসলিম, হা/২৮৭।

[2]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৮৮।

[3]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৭৮৯; ছহীহ মুসলিম, হা/১৬৮৪।

[4]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৩৬০; ছহীহ মুসলিম, হা/১২৪।

[5]. ছহীহ মুসলিম, হা/৬৮৬।

[6]. মুসনাদে আহমাদ, হা/৫৭২৩; ইবনু মাজাহ, হা/৩২১৮’ বায়হাক্বী, হা/১১৯৬।

[7]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৯৩৪।

[8]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৫২৮; ছহীহ মুসলিম, হা/১৯৪০।

[9]. মুসনাদে আহমাদ, হা/৭৫০; আবূ দাঊদ, হা/৪০৫৭; ইবনু মাজাহ, হা/৩৫৯৫।