ইয়াযীদ কি মদপানকারী ও ছালাত পরিত্যাগকারী?

-আহমাদুল্লাহ
সৈয়দপুর, নীলফামারী

ভূমিকা :

মু‘আবিয়া (রা.)-এর পুত্র  ইয়াযীদ (রাহি.)-এর বিরুদ্ধে অনেক মিথ্যাচার করা হয়েছে। নাঊযুবিল্লাহ! তার বিরুদ্ধে যতগুলো মিথ্যাচার করা হয়েছে, তন্মধ্যে একটি হলো- তিনি নাকি মদপান করতেন। নিম্নে এ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা পেশ করা হলো।

ইয়াযীদের মদপান ও ছালাত বর্জন বিষয়ক বর্ণনাসমূহ :

ইয়াযীদের মদপান ও ছালাত ত্যাগের ব্যাপারে কয়েকটি মিথ্যা বর্ণনা পাওয়া যায়। যেমন-

বর্ণনা-১ : ইমাম ত্ববারী (রাহি.) একটি দীর্ঘ বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন। যেখানে বলা হয়েছে, ‘ইয়াযীদ (রাহি.) মদপান করতেন এবং মাতাল হয়ে ছালাত বর্জন করতেন’। [1]

তাহক্বীক্ব : এই মিথ্যা বর্ণনাটির রাবী হলেন রাবী লূত ইবনে ইয়াহ্ইয়া আবু মেখনাফ। যিনি ‘শী‘আ’ এবং ‘বড় মিথ্যুক’। তার সম্পর্কে ইমামদের মন্তব্য:

(১) ইমাম আবু হাতেম আর-রাযী (রাহি.) বলেছেন, ‘তিনি মাতরূকুল হাদীছ’।[2]

(২) ইমাম ইবনু মাঈন (রাহি.) বলেছেন, ‘আবু মেখনাফ তার বর্ণিত হাদীছের সংখ্যা খুবই কম’। [3]

(৩) ইমাম ইবনু আদী (রাহি.) বলেছেন, ‘তিনি কট্টর শী‘আ এবং শী‘আদের ঐতিহাসিক ব্যক্তি ছিল’।[4]

(৪) ইমাম ক্বওয়ামুস সুন্নাহ বলেছেন, ‘আবু মেখনাফ ও এরূপ রাফেযীরা যেসব বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন, সেগুলো নির্ভরযোগ্য নয়’।[5]

(৫) ইবনুল জাওযী (রাহি.) বলেছেন, ‘আবু মেখনাফ কাযযাব বা মিথ্যুক রাবী’।[6]

(৬) ইবনু তায়মিয়া (রাহি.) তাকে প্রসিদ্ধ কাযযাব (মিথ্যাবাদী) বলেছেন।[7]

(৭) হাফেয যাহাবী (রাহি.) তাকে অনির্ভরযোগ্য এবং মাতরূক (পরিত্যাজ্য) রাবী বলেছেন।[8]  

(৮) ইবনুল আররাক (রাহি.) বলেছেন, লূত ইবনে ইয়াহ্ইয়া আবু মেখনাফ কাযযাব এবং মাতরূক রাবী।[9]

সুতরাং এই মিথ্যুক রাবীর সকল বর্ণনা বাতিল এবং মনগড়া হিসাবে বিবেচিত হবে। তাই যারা না জেনে এই রাবীর বর্ণনার ভিত্তিতে ইয়াযীদকে মদপানকারী এবং ছালাত বজর্নকারী বলেছেন, তাদের উচিত আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং পূর্বের মত হতে ফিরে এসে সঠিকটা প্রচার করা।

বর্ণনা-২ : ইবনু সা‘দ (রাহি.)ও অনুরূপ একটি বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন।[10]

তাহক্বীক্ব : এই বর্ণনাটির রাবী মুহাম্মাদ ইবনে ওমর আল-ওয়াক্বিদী, যিনি একজন মাতরূক রাবী। নিম্নে তার সম্পর্কে ইমামদের বক্তব্য পেশ করা হলো-

(১) ইমাম শাফেঈ (রাহি.) বলেছেন, ‘ওয়াক্বিদীর সকল গ্রন্থই মিথ্যায় ভরপুর’।[11]

(২) ইমাম ইসহাক্ব ইবনে রাহওয়াই (রাহি.) বলেছেন, ‘আমার মতে এই লোকটি হাদীছ (নিজের পক্ষ হতে) তৈরি ছিলেন’।[12]

(৩) ইমাম নাসাঈ (রাহি.) বলেছেন, ‘চারজন প্রসিদ্ধ মিথ্যুকের মধ্যে বাগদাদের ওয়াক্বিদী অন্যতম’।[13]

(৪) ইমাম ইবনুল কায়সারানী (রাহি.) বলেছেন, ‘তার মাতরূক তথা পরিত্যক্ত রাবী হওয়ার ব্যাপারে মুহাদ্দিছগণের ইজমা‘ রয়েছে’।[14]

(৫) ইমাম যাহাবী (রাহি.) বলেছেন, ‘আজ এ বিষয়ের উপর ইজমা‘ হয়েছে যে, ওয়াক্বিদী দলীল নন। আর তার হাদীছ অত্যন্ত দুর্বল গণ্য হবে’।[15]

(৬) আলবানী (রাহি.) বলেছেন, ‘মুহাম্মাদ ইবনে ওমর ওয়াক্বিদী হলেন মিথ্যুক রাবী’। এমন আরও বক্তব্য পেশ করা যেতে পারে।[16]

বর্ণনা-৩ : ইমাম বালাযুরী (রাহি.)-এর ‘আনসাবুল আশরাফ’ গ্রন্থে (৫/৩৩৮) বর্ণিত বর্ণনায় আওয়ানা ইবনুল হাকাম আল-কূফী নামক রাবী আছেন। যিনি ইয়াযীদের মদপান ও ছালাত বর্জনের ব্যাপারে বর্ণনাটি সনদহীন বর্ণনা করেছেন। উপরন্তু আওয়ানাকে মিথ্যার দোষে অভিযুক্ত করা হয়েছে।[17]   তা ছাড়াও তিনি হাররা-এর ঘটনার যুগ পাননি। তাই কোনোভাবেই এই বর্ণনাটি গ্রহণযোগ্য নয়; বরং বাতিল ও মনগড়া।

বর্ণনা-৪ : ইমাম ইবনু আসাকির (রাহি.) স্বীয় তারীখে দিমাশক্ব গ্রন্থে ইয়াযীদের মদপান বিষয়ক বর্ণনাটি উল্লেখ করেছেন।[18]

তাহক্বীক্ব : তিনি নিজেই বলেছেন, ‘এটা মুনক্বাতি‘ বা বিচ্ছিন্ন সনদে বর্ণিত ঘটনা’।[19]

সুতরাং এটা মনগড় ও বাতিল বর্ণনা। কেননা এর রাবী ওমর ইবনে শাবা ১৭২ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেছেন।[20]  অন্যদিকে ইয়াযীদ (রাহি.) ৬৫ হিজরীতে মারা গিয়েছেন। অর্থাৎ উভয়ের মাঝে শত বছরের ব্যবধান রয়েছে।

বর্ণনা-৫ : ‘মু‘আবিয়া (রা.)-এর  আমলে ইয়াযীদ হজ্জের মওসূমে মদীনায় বসে মদপান করতেন’।[21]

তাহক্বীক্ব : এটা যে মিথ্যা বর্ণনা, তা মূল বক্তব্যের দিকে লক্ষ্য করলেই বুঝা যায়। কেননা এখানে ছাহাবী মু‘আবিয়া (রা.)-কে মদপানে উৎসাহদাতা হিসাবে দেখানো হয়েছে।

এই বর্ণনাটির রাবী ‘মুহাম্মাদ ইবনে যাকারিয়া আল-গুলাবী’ সম্পর্কে ইমামগণ যা বলেছেন-

(১) ইমাম যাহাবী (রাহি.) বলেছেন, ‘মুহাম্মাদ ইবনে যাকারিয়া আল-গুলাবী মহামিথ্যুক’।[22]

(২) ইমাম দারাকুত্বনী (রাহি.) বলেছেন, ‘তিনি হাদীছ জাল করতেন’।[23]

সুতরাং এই বর্ণনাটি জাল।

বর্ণনা-৬ : ‘ইয়াযীদ মাতাল হয়ে ছালাত বর্জন করতেন। ফলে লোকেরা তার বায়‘আত ভঙ্গ করতে একত্র হয় এবং তার বায়‘আত ভঙ্গ করে’।[24]

তাহক্বীক্ব : এই বর্ণনার রাবী ‘ইবনু ফুলাইহ’ মাজহূল রাবী। কেউ তাকে ছিক্বাহ বা গ্রহণযোগ্য বলেননি। ইমাম ইবনু হাযম (রাহি.) বলেছেন, ‘ইয়াহ্ইয়া ইবনে ফুলাইহ একেবারেই মাজহূল (অপরিচিত) রাবী’।[25]

এ ছাড়াও ফুলাইহ সনদের পরের অংশটুকু বর্ণনা করেননি। তিনি কমপক্ষে দু’জন রাবীকে সনদ থেকে বাদ দিয়েছেন।

বর্ণনা-৭ : মু‘আবিয়া (রা.)  একদিনে জানতে পারলেন যে, ইয়াযীদ মদপান করতেন’।[26]

তাহক্বীক্ব : এর রাবী ‘মুহাম্মাদ ইবনে দাব’ একজন বড় মিথ্যুক। তিনি খুব নিকৃষ্টমানের মিথ্যুক। ইমাম আবু যুর‘আহ (রাহি.) বলেছেন, ‘তিনি মিথ্যা কথা বলতেন’।[27]  হাফেয ইবনু হাজার (রাহি.) বলেছেন, ‘তাকে আবু যুর‘আহ কাযযাব বলেছেন।[28]  এ ছাড়াও এই বর্ণনাগুলো সঠিক ধরা হলে মু‘আবিয়া (রা.)  জানার পরও নিজের পুত্রকে মদপান হতে নিষেধ করেননি বলে প্রমানিত হয়। যা দ্বারা একজন জান্নাতী ছাহাবীর উপর অপবাদ আরোপ করা হচ্ছে, যা কুফরী।

উপসংহার :

উপরিউক্ত বর্ণনাগুলোতে আরও সমস্যা রয়েছে। আমরা খুব সংক্ষেপে শুধু বর্ণনার সারাংশ ও রাবীর অবস্থান উল্লেখ করেছি, যেন কেউ ধোঁকায় পতিত না হয়। মূলত এগুলো সবই শী‘আদের ও ইসলাম বিদ্বেষীদের বানানো বর্ণনা। যেগুলো মুসলিম সমাজে অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে তাদেরকে গোমরাহ বানানোর পাঁয়তারা করা হচ্ছে। প্রতিটি মুসলিমের উচিত সতর্ক হওয়া এবং এ জাতীয় বর্ণনার তাহক্বীক্ব জেনে তা প্রচার করা। আল্লাহ আমাদের সকলকে বুঝার তওফীক্ব দান করুন- আমীন!

[1]. তারীখুত্ব ত্বাবারী, ৫/৪৮০, ৪৮১।

[2]. ইবনু আবী হাতিম, আল-জারহু ওয়াত-তা‘দীল, ৭/১৮২।

[3]. তারীখু ইবনু মাঈন, দূরীর বর্ণনা, ৩/৪৩৯।

[4]. ইবনু আদী, আল-কামিল ফী যু‘আফায়ির রিজাল, ৭/২৪১।

[5].  ক্বিওয়ামুস সুন্নাহ, আল-হুজ্জাহ ফী বায়ানিল মাহাজ্জাহ, ২/৫৬৮।

[6]. ইবনুল জাওযী, আল-মাওযূ‘আত, ১/৪০৬, ভাবার্থ অনুবাদ|

[7]. মিনহাজুস সুন্নাহ, ১/৫৯।

[8]. মীযানুল ই‘তিদাল, ৩/৪১৯।

[9].  তানযীহুশ শারী‘আহ, ১/৯৮।

[10]. ইবনু সা‘দ, আত-ত্বাবাকাতুল কুবরা, ৫/৪৯।

[11]. ইবনু আবী হাতিম, আল-জারহু ওয়াত-তা‘দীল, ৮/২০।

[12]. ইবনু আবী হাতিম, আল-জারহু ওয়াত-তা‘দীল, ৮/২০।

[13]. আসয়িলা লিন নাসাঈ, পৃ. ৭৬।

[14]. মা‘রিফাতুত তাযকিরা, পৃ. ১৬৩।

[15]. যাহাবী, সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৯/৪৬৯।

[16]. সিলসিলা যঈফা, ৪/১৩।

[17]. যারাকশী, আল-আলাম, ৫/৯৩।

[18]. তারীখে দিমাশক্ব, ৬৫/৪০৬।

[19]. তারীখে দিমাশক্ব, ৬৫/৪০৬।

[20]. তাহযীবুল কামাল, ২১/৩৯০।

[21]. ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাশক্ব, ৬৫/৪০৩।

[22]. মীযানুল ই‘তিদাল, ৩/১৬৬।

[23]. সুওয়ালাতুল হাকিম লিদ দারাকুত্বনী,  ১৪৮।

[24]. ইমাম বায়হাক্বী, দালায়েলুন নুবুওয়াত, ৬/৪৭৪।

[25]. ইবনু হাযম, আল-ইহকাম ফী উছূলিল আহকাম, ৭/১৬২।

[26]. ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাশক্ব, ৬৫/৪০৫।

[27]. ইবনু আবী হাতিম, আল-জারহু ওয়াত-তা‘দীল, ৭/২৫০।

[28]. তাকরীবুত তাহযীব, রাবী নং ৫৮৬৬।