ঈদুল আযহার তাৎপর্য
-মহিউদ্দিন বিন জুবায়েদ*

ভূমিকা :

মুসলিমদের অন্যতম বৃহৎ উৎসব ঈদুল আযহা বা কুরবানীর ঈদ। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন,﴿وَلِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنْسَكًا لِيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَى مَا رَزَقَهُمْ مِنْ بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ﴾ ‘আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কুরবানীর এক বিশেষ রীতি-পদ্ধতি নির্ধারণ করে দিয়েছি, যেন তারা ওসব পশুর উপর আল্লাহর নাম নিতে পারে, যেসব আল্লাহ তাদেরকে দান করেছেন’ (আল-হজ্জ, ২২/৩৪)। কবির ভাষায়—

‘ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন

ঐ খুনের খুঁটিতে কল্যাণকেতু লক্ষ্য ঐ তোরণ’।

ঈদুল আযহা ও কুরবানী মুসলিমদের শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং পরিশুদ্ধ জীবন গঠনের নিয়মতান্ত্রিক অনুশীলনও বটে। এর মাধ্যমে একজন মুসলিম তাওহীদী আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে ইখলাছ ও তাক্বওয়া অর্জনের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণের অপূর্ব নজির স্থাপন করতে পারে। যিলহজ্জ মাসের ১০ থেকে ১২ তারিখের মধ্যে এই ইবাদত পালন করতে হয়।

নামকরণ :

হজ্জ মৌসুমে উদযাপিত ঈদকে ইসলামী পরিভাষায় ঈদুল আযহা বলা হয়। রাসূলুল্লাহ a এ নামকরণ করেছেন। এছাড়া ‘ইয়াওমুন নাহর’ও বলা হয়। আফগানিস্তানসহ এই উপমহাদেশের অধিকাংশ লোকেরা কুরবানীর ঈদ নামে অভিহিত করেন।

‘আযহা’ শব্দটিকে আরবীতে ‘কুরব’ও বলা হয়ে থাকে, যা ফারসী বা উর্দূতে ‘কুরবানী’রূপে পরিচিত হয়েছে। কুরব-এর শাব্দিক অর্থ হলো— ১. নৈকট্য অর্জন করা। ২. কাছাকাছি যাওয়া। পরিভাষায় ‘কুরবানী’ ওই মাধ্যমকে বলা হয়, যার দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য হাছিল হয়। প্রচলিত অর্থে— আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে শারঈ ত্বরীকায় যে পশু যবেহ করা হয়, তাকে ‘কুরবানী’ বলা হয়।

ইতিহাস :

আদি পিতা আদম e-এর দুই পুত্র কাবীল ও হাবীলের দেওয়া কুরবানী থেকেই কুরবানীর ইতিহাসের গোড়াপত্তন হয়েছে। তারপর থেকে বিগত সকল উম্মতের উপর এই বিধান ছিল। আমাদের উপর যে কুরবানীর নিয়ম নির্ধারিত হয়েছে, তা মূলত ইবরাহীম e কর্তৃক শিশু পুত্র ইসমাঈল e-কে আল্লাহর জন্য কুরবানী দেওয়ার অনুসরণে। মক্কা নগরীর জনমানবহীন ‘মিনা’ প্রান্তরে আল্লাহর দুই আত্মনিবেদিত বান্দা ইবরাহীম e ও ইসমাঈল e আল্লাহর কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মাধ্যমে তুলনাহীন ত্যাগের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন তাই ‘ঈদুল আযহা’ বা কুরবানীর ঈদ।

ঈদুল আযহার গুরুত্ব : 

কুরআন-হাদীছে এ ব্যাপারে যথেষ্ট তাগিদ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা  বলেন,﴿وَالْبُدْنَ جَعَلْنَاهَا لَكُم مِّنْ شَعَائِرِ اللهِ لَكُمْ فِيْهَا خَيْرٌ﴾ ‘আর কুরবানীর পশুসমূহকে আমরা তোমাদের জন্য আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত করেছি। এর মধ্যে তোমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে’ (আল-হজ্জ, ২২/৩৬)। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা  আরও বলেন, ﴿وَفَدَيْنَاهُ بِذِبْحٍ عَظِيْمٍ- وَتَرَكْنَا عَلَيْهِ فِي الْآخِرِيْنَ﴾ ‘আর আমরা তাঁর (ইসমাঈলের) পরিবর্তে যবেহ করার জন্য দিলাম একটি মহান কুরবানী। আমরা এটিকে পরবর্তীদের মধ্যে রেখে দিলাম’ (আছ-ছাফফাত, ৩৭/১০৭-১০৮)। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আরও বলেন, ﴿فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ﴾  ‘তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে ছালাত আদায় করো এবং কুরবানী করো’ (আল-কাওছার, ১০৮/২)। নবী করীম a বলেছেন, مَنْ كَانَ لَهُ سَعَةً وَلَمْ يُضَحِّ فَلاَ يَقْرِبَنَّ مُصَلاَّنَا ‘সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি কুরবানী করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না হয়’।[1]

এটি ইসলামের একটি ‘মহান নিদর্শন’ যা ‘সুন্নাতে ইবরাহীম’ হিসাবে রাসূলুল্লাহ a নিজে মদীনায় প্রতি বছর আদায় করেছেন এবং ছাহাবীগণও নিয়মিতভাবে কুরবানী করেছেন।
অতঃপর ধারাবাহিকভাবে মুসলিম উম্মাহর সামর্থ্যবানদের মধ্যে এটি আজ পর্যন্ত চালু আছে। এটি কিতাব ও সুন্নাহ এবং ইজমায়ে উম্মত দ্বারা প্রমাণিত।

ঈদুল আযহার তাৎপর্য : 

ঈদুল আযহা ইবরাহীম e, বিবি হাজেরা ও ইসমাঈল e-এর পরম ত্যাগের স্মৃতি বিজড়িত উৎসব। এজন্য ইবরাহীম e-কে কুরআনুল কারীমে মুসলিম জাতির পিতা বলে উল্লেখ করা হয়েছে (আল-হজ্জ, ২২/৭৮)। তাই ঈদুল আযহার দিন সমগ্র মুসলিম জাতির এই সুন্নাত পালনের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের প্রাণপণ চেষ্টা করে। যিলহজ্জ মাসে হজ্জ উপলক্ষ্যে সমগ্র পৃথিবী থেকে লাখ লাখ মুসলিম সমবেত হয় ইবরাহীম e-এর স্মৃতি বিজড়িত মক্কা-মদীনায়। হজ্জ মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, সংহতি ও ভ্রাতৃত্ববোধের এক অনন্য উদাহরণ। যা প্রতি বছরই আমাদেরকে তাওহীদী প্রেরণায় উজ্জীবিত করে। আমরা নিবিড়ভাবে অনুভব করি বিশ্ব মুসলিম ভ্রাতৃত্ব।

ঈদের উৎসব একটি সামাজিক উৎসব, সমষ্টিগতভাবে আনন্দের অধিকারগত উৎসব। ঈদুল আযহা উৎসবের একটি অঙ্গই হচ্ছে কুরবানী। কুরবানী হলো আত্মশুদ্ধির এবং পবিত্রতার মাধ্যম। আমাদের বিত্ত, সংসার ও সমাজ তাঁর উদ্দেশ্যেই নিবেদিত এবং কুরবানী হচ্ছে সেই নিবেদনের একটি প্রতীক। মানুষ কুরবানীর মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভে ধন্য হতে চায়। আল্লাহর জন্য মানুষ তার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস ত্যাগ করতে রাজী আছে কি-না সেটাই পরীক্ষার বিষয়। কুরবানী আমাদেরকে সেই পরীক্ষার কথাই বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়। ইবরাহীম e-এর কাছে আল্লাহর পরীক্ষাও ছিল তাই। হালাল পশু কুরবানী করেই আমরা সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারি।

কুরবানী একটি প্রতীক :

কুরবানী আল্লাহর জন্য আত্মত্যাগের একটি দৃষ্টান্ত মাত্র। সারা বছরই আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রত্যাশায় নিজ সম্পদ অন্য মানুষের কল্যাণে ত্যাগ করতে হবে। এই ত্যাগের মনোভাব যদি গড়ে ওঠে, তবে বুঝতে হবে কুরবানীর ঈদ সার্থক হয়েছে। কুরআনুল কারীমে আল্লাহ বারবার ত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন,﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَنْفِقُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا كَسَبْتُمْ وَمِمَّا أَخْرَجْنَا لَكُمْ مِنَ الْأَرْضِ﴾ ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা তোমাদের উপার্জিত হালাল মালের কিছু অংশ এবং আমি যা তোমাদের জন্য যমীন হতে বের করেছি তার অংশ ব্যয় করো’ (আল-বাক্বারা, ২/২৬৭)

মানবতার সেবায় সরকারের পাশাপাশি সকল বিত্তশালী লোককে এগিয়ে আসতে হবে। আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের কথা বিবেচনা করে মানুষকে সাহায্য করতে হবে।

ঈদুল আযহার লক্ষ্য :

ধনী-গরীব সকলের সাথে সদ্ভাব, আন্তরিকতা এবং বিনয়-নম্র আচরণ করা। মুসলিমদের জীবনে এই সুযোগ সৃষ্টি হয় বছরে মাত্র দু’বার। ধনী-দরিদ্র, রাজা-প্রজা একই কাতারে দাঁড়িয়ে পায়ে পা এবং কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দুই রাকআত ঈদের ছালাত আদায়ের মাধ্যমে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে যায়। পরস্পরে কুশল বিনিময় করে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়, জীবনকে স্বাচ্ছন্দ্যময় এবং আন্তরিক মহানুভবতায় পরিপূর্ণ করে। মূলত ঈদুল আযহার লক্ষ্য,  আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যে দৈন্য, হতাশা তা দূরীকরণ। যারা অসুখী এবং দরিদ্র তাদের জীবনে সুখের প্রলেপ দেওয়া।

ঈদুল আযহার বা কুরবানীর শিক্ষা : 

কবির ভাষায়— ‘তোরা ভোগের পাত্র ফেলরে ছুঁড়ে, ত্যাগের তরে হৃদয় বাঁধ’।

মানুষ আল্লাহর জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করবে, এই শিক্ষাই ইবরাহীম e আমাদের জন্য রেখে গেছেন। আর ঈদুল আযহার মূল আহ্বান হলো সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ আনুগত্য প্রকাশ করা। আল্লাহর ভালোবাসার চাইতে যে পুত্রের ভালোবাসা বড় নয়, এটিই প্রমাণিত হয়েছে। আল্লাহ এটাই চেয়েছিলেন। আর এটাই হলো প্রকৃত তাক্বওয়া বা আল্লাহভীতি। ইবরাহীম e তাঁর প্রিয় পুত্র ইসমাঈল e-কে কুরবানী করে এক বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, যাতে অনাগত ভবিষ্যতের অগণিত মানুষ আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণের বাস্তব শিক্ষা লাভ করতে পারে। আল্লাহই একমাত্র সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক, তাঁর ইচ্ছা ও সন্তুষ্টির প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনই প্রকৃত মুমিনের কাজ এবং তাতেই নিহিত রয়েছে অশেষ কল্যাণ ও প্রকৃত সফলতা।

জনৈক উর্দূ কবি বলেন— ‘যদি আমাদের মাঝে ফের ইবরাহীমের ঈমান পয়দা হয়, তাহলে অগ্নির মাঝে ফের ফুলবাগানের নমুনা সৃষ্টি হতে পারে’।

মহান আল্লাহর তাওহীদ বা এককত্ব বিশ্বের বুকে প্রতিষ্ঠা করা কুরবানীর অন্যতম শিক্ষা। কারণ, একমাত্র বিশ্বজাহানের মালিক মহান আল্লাহর উদ্দেশ্যে, তাঁর নামেই পশু কুরবানী দেওয়া হয়। জগতের অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা যেখানে তাদের মনগড়া উপাস্যদের নামে কুরবানী করে, সেখানে মুসলিম সমাজ কুরবানী দেয় একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে।

কুরবানীর গুরুত্বপূর্ণ আরও শিক্ষা হলো, আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ। আল্লাহর সকল আদেশের সামনে বিনা প্রশ্নে মাথানত করে দেওয়াই হলো পূর্ণ আত্মসমর্পণের সমুজ্জ্বল বহিঃপ্রকাশ। ইবরাহীম e ও তাঁর পুত্র ঈসমাইল e-এর এরূপ পূর্ণ আত্মসমর্পণের চিত্রই পবিত্র কুরআনুল কারীমে দেখতে পাই।

ইখলাছ ছাড়া পরকালীন কোনো কাজই আল্লাহ তাআলা কবুল করেন না। আন্তরিকতা ও ভালোবাসা-বর্জিত ইবাদত প্রাণহীন কাঠামো মাত্র। তাই কুরবানীও একমাত্র আল্লাহ তাআলার ভালোবাসা ও সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,﴿لَنْ يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَكِنْ يَنَالُهُ التَّقْوَى مِنْكُمْ﴾ ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলার নিকট কুরবানীর পশুর গোশত ও রক্ত পৌঁছায় না। তার নিকট তোমাদের তাক্বওয়া (ইখলাছ) পৌঁছায়’ (আল-হজ্জ, ২২/৩৭)। ইখলাছপূর্ণ কুরবানী হওয়ার কারণেই আল্লাহ তাআলা ইবরাহীম e-এর কুরবানী কবুল করে নিয়েছিলেন।

কুরবানীর আরও একটি শিক্ষা হলো, দরিদ্র ও অনাথের সুখ-দুঃখে ভাগীদার হওয়া। ঈদুল আযহার ছালাতে সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের সহাবস্থানের পাশাপাশি আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্র-ইয়াতীমের মধ্যে কুরবানীর গোশত বণ্টন আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, আমাদের সম্পদে সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের অধিকার রয়েছে।

পরিশেষে ঈদুল আযহার খুশী ও আত্মত্যাগের বার্তা বয়ে যাক প্রতিটি মুসলিম মিল্লাতের ঘরে ঘরে— এই কামনা মহান প্রভুর নিকট। আমীন! ছুম্মা আমীন!


* মুহিমনগর, চৈতনখিলা, শেরপুর।

[1] . ইবনু মাজাহ, হা/৩১২৩।