ঈদের দিনের কার্যাবলী

মুহাম্মাদ ফাহিমুল ইসলাম
কুল্লিয়া ২য় বর্ষ,  মাদরাসা দারুল হাদীছ সালাফিয়্যাহ,
পাঁচরুখী, আড়াইহাজার, নারায়ণগঞ্জ।

ভূমিকা :

ঈদ ক্বিয়ামত পর্যন্ত থাকবে। ঈদকে ‘ঈদ’ হিসাবে নামকরণের কারণ হচ্ছে এ দিনে আল্লাহর অফুরন্ত অনুগ্রহ অবতীর্ণ হয়, লোকেরা পরস্পরে মিলিত হয়। এদিন প্রতি বছরেই আগমন করে, বার বার আনন্দ নিয়ে ফিরে আসে। এদিন আমাদের কাছে আসে খুশির বার্তা নিয়ে, শুনলেই যেন আনন্দ শুরু হয়ে যায়। ধনী-গরীব, সাদা-কালো সকলেই নিজ নিজ সাধ্য অনুযায়ী সুন্দরভাবে অতিবাহিত করতে চায় এই দিনটাকে। প্রত্যেকেই সুন্দরভাবে, আনন্দময় পরিবেশে অতিবাহিত করুক আমরাও সেটা চাই, তবে সেটা যেন ইসলামী পন্থায় হয়, সেটিই আমাদের কাম্য।

এদিনে ধারাবাহিক আমল :

(১) তাকবীর পাঠ :

ঈদের তাকবীর হিসাবে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রা.) কর্তৃক বর্ণিত বাক্য হচ্ছে, ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ’।[1]  এই তাকবীর পাঠ করা কখন থেকে শুরু করতে হবে এ নিয়ে মতানৈক্য আছে। অধিকাংশ আলেমের মতে ৯ যিলহজ্জ থেকে ১৩ যিলহজ্জ পর্যন্ত তাকবীর পাঠ করতে হবে। অনেকের মতে ১ যিলহজ্জ হতে তাকবীর পাঠ শুরু করবে। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর এবং আবু হুরায়রা (রা.) বাজারে যেতেন, তাকবীর পাঠ করতেন। তাদের সাথে লোকেরাও তাকবীর পাঠ করতো আর এটি যিলহজ্জের ১ তারিখ হতে শুরু করতেন।[2]  এক্ষেত্রে আমাদের জন্য করণীয় হবে যে, যিলহজ্জের ১ তারিখ হতে বেশি বেশি ইবাদত, আল্লাহর  প্রশংসা, গুণগান, ক্ষমাপ্রার্থনা, দু‘আ, দান-ছাদাক্বাহ ইত্যাদি সৎ আমল করা এবং ১০-১৩ যিলহজ্জ নির্ধারিত তাকবীর পাঠ করা। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) ঘর থেকে বের হয়ে ঈদগাহে পৌঁছা পর্যন্ত তাকবীর পাঠ করতেন।[3]

(২) ছিয়াম না রাখা :

ঈদের দিন ছিয়াম পালন করা যাবে না। দুই ঈদের দিন হচ্ছে খানা-পিনা ও আনন্দের দিন।[4]  তবে কুরবানীর দিন সকাল থেকে শুরু করে ঈদের ছালাতের আগ পর্যন্ত না খেয়ে থাকা রাসূল (ছা.)-এর সুন্নাহ।

(৩) ছুরি/চাকু ধার দেওয়া :

কুরবানীর ঈদের পশু যবেহ করার জন্য ছুরি ভালোভাবে ধারালো করা আবশ্যক। নবী (ছা.) এটা বেশ গুরুত্ব প্রদান করতেন। রাসূল (ছা.) তার স্ত্রী আয়েশা (রা.)-কে ছুরি নিয়ে আসতে এবং তা পাথরে ধারালো করতে বলেন।[5]  এই হাদীছ থেকে এটাও প্রতীয়মান হয় যে, মহিলারাও কুরবানীর কাজে সাহায্য করতে পারবে।

(৪) ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় :

বর্তমান সময়ে ঈদের চাঁদ উঠতেই শুরু হয়ে যায় ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় পর্ব। শুভেচ্ছার জন্য সকল যুগের সেরা বাক্য হচ্ছে, تَقَبَّلَ اللَّهُ مِنَّا وَمِنْكُمْ ‘তাক্বাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম’। অর্থাৎ ‘আল্লাহ আমাদের ও আপনার পক্ষ হতে কবুল করুন!’[6]

(৫) গোসল ও পোশাক :

মহানবী (ছা.) দুই ঈদের দিনে (ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে) গোসল করতেন।[7] আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) কড়াকড়িভাবে সুন্নাতের অনুসরণ করতেন তাই দুই ঈদে তিনি গোসল করে বের হতেন।[8]

ঈদের দিনে পোশাক পরা নিয়ে বর্তমানে দু’টি দল পাওয়া যায়। একদল যারা নতুন পোশাক পরিধানে কঠোরতা প্রদর্শন করেন, অপর দল নতুন পোশাক পরিধান যেন বাধ্যতামূলক মনে করেন। প্রকৃতপক্ষে উভয় দলেরই সিদ্ধান্ত ভুল। ঈদের দিনে নতুন পোশাক পরিধান করা যেন আবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে! এজন্য অনেক পূর্ব হতেই পোশাক ক্রয়ের ধুম পড়ে যায়। আধুনিকতার দোহাই দিয়ে অশ্লীল পোশাকে যেন দেশটা ভরে গেছে! এমনকি নারী-পুরুষের পোশাকের মাঝে কোনো পার্থক্য করা যায় না।

সুধী পাঠক! ইসলাম এমন একটি ধর্ম, যা প্রত্যেক যুগের জন্যই আধুনিক। প্রত্যেক বিষয়ের প্রয়োজন অনুপাতে নতুনত্ব বয়ে আনে। তাই আধুনিকতার দোহাই দিয়ে বাজে পোশাক পরিধান করার কোনো প্রশ্নই আসে না। ঈদের দিনের জন্য আলাদা পোশাক থাকা উত্তম। ঈদের মাঠে যাওয়ার সময় রাসূল (ছা.) সাধ্যানুযায়ী আলাদা পোশাক পরিধান করতেন। দুই ঈদে ও জুম‘আয় পরিধান করার জন্য তার ভালো ও সুন্দর একটি পোশাক ছিল।[9]  ইবনুল ক্বাইয়িম (রহি.) বলেছেন, রাসূল (ছা.) উভয় ঈদে তার সবচাইতে সুন্দর পোশাক পরিধান করতেন।[10]  অতএব ঈদের দিনে নতুন পোশাক পরিধান করা যাবে যদি তা হারাম পোশাক না হয়।[11]  ঈদের দিনে সকালে গোসল করে, উত্তম পোশাক পরিধান করে, সুগন্ধি ব্যবহার করে ঈদগাহে (সকলেই) যাবে। তবে ঈদের দিন সহ অন্য সময়ও সুন্দর পোশাকের দোহাই দিয়ে বিধর্মীদের পোশাক পরিধান করা হারাম! যেমন: পাখি জামা, কিরণমালা জামা ইত্যাদি। অনুরূপভাবে এদিনে বিধর্মীদের সাথে সাদৃশ্য রেখে মাথার চুল কাটারও একই বিধান। [12]

(৬) ছালাতের সময় :

ঈদুল আযহার ছালাত সকাল সকাল আদায় করতে হয়। এজন্য আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) ঈদুল আযহার দিন সূর্যোদয়ের পূর্বেই ঈদগাহের উদ্দেশ্যে রওনা হতেন।[13] হাদীছে পাওয়া যায়, ইয়াযীদ ইবনে খুমাইর (রহি.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছা.)-এর ছাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে বুসর (রা.) লোকদের সাথে ঈদুল ফিতর কিংবা আযহার ছালাত আদায় করতে যান, ইমাম দেরী করায় তিনি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে বলেন, আমরা তো এ সময়ে ঈদের ছালাত শেষ করতাম।[14]  আর সেই সময়টি ছিল চাশতের ছালাতের সময় অর্থাৎ ঈদের ছালাত শেষ করার সময়টা।[15] চাশতের ছালাতের সময় সম্পর্কে ছালেহ আল-মুনাজ্জিদ (রহি.) বলেন, সূর্য প্রকাশ হওয়ার ১৫ মিনিট পরথেকে যোহরের ১৫ মিনিট পূর্ব পর্যন্ত।[16]  অর্থাৎ ঈদের ছালাত সূর্য প্রকাশ পাওয়ার ১৫ মিনিট পর থেকেই আদায় করা যাবে। অন্য এক মতে পাওয়া যায়, দিনের এক-চতুর্থাংশ অতিবাহিত হওয়ার পর থেকে সূর্য ঢলে যাওয়ার কিছু আগ পর্যন্ত।[17]

(৭) ছালাত আদায়ের স্থান :

ঈদের ছালাত খোলা মাঠে আদায় করতে হবে। রাসূল (ছা.) ফাঁকা ময়দানেই আদায় করেছেন। আবু সাঈদ খুদরী (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম (ছা.) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিন ঈদের মাঠে গমন করতেন।[18]  এটি ছিল নির্ধারিত একটি পরিচিত জায়গা। মদীনার পূর্ব প্রবেশ পথে একটি মাঠ ছিল, ঐ মাঠেই তিনি (ছা.) ঈদের ছালাত আদায় করতেন। আজকাল সেখানে হাজীরা যানবাহন রাখে।[19]

রাসূল (ছা.) সর্বদায় মাঠে বা ঈদগাহে ছালাত আদায় করতেন। শুধুমাত্র একবার মসজিদে ঈদের ছালাত আদায় করেছিলেন বৃষ্টির কারণে। উক্ত হাদীছের সনদ যঈফ।[20]

ঝড়, বৃষ্টি ও সমস্যার কারণে মসজিদেও ঈদের ছালাত আদায় করা যাবে।[21] তবে ঈদগাহ থাকতে বড় মসজিদের দোহাই দিয়ে মসজিদে ঈদের ছালাত আদায় করা সুন্নাহ বিরোধী। জায়গা সমস্যার কারণে ফাঁকা ময়দান হিসাবে মসজিদের ছাদেও আদায় করা যাবে।

(৮) মাঠে গমন :

ঈদের ছালাত আদায়ের জন্য ঈদগাহে যেতে হবে। আর এর সাথে কয়েকটি বিষয় জড়িত। তা হচ্ছে-

(ক) না খেয়ে যাওয়া : ঈদুল আযহাতে না খেয়ে মাঠে যেতে হবে এবং ঈদুল ফিতরে খেয়ে যেতে হবে। আর এটাই রাসূল (ছা.)-এর সুন্নাত। হাদীছে পাওয়া যায়, আব্দুল্লাহ ইবনে বুরায়দা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি তার পিতা হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, নবী করীম (ছা.) ঈদুল ফিতরে না খেয়ে (ঈদগাহের জন্য) বের হতেন না আর ঈদুল আযহার দিন কোনো কিছু খেতেন না, যতক্ষণ না ছালাত শেষ হতো।[22]  ঈদগাহ হতে ফিরেই খেতে পারবে, তবে উত্তম হচ্ছে কুরবানীর পশুর গোশত দিয়ে খাওয়া শুরু করা।

(খ) পায়ে হেঁটে যাওয়া : আরোহী না হয়ে, পায়ে হেঁটে ঈদগাহে গমন করা উত্তম। রাসূল (ছা.) পায়ে হেঁটেই মাঠে যেতেন। হাদীছে পাওয়া যায়, ইবনে ওমর (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছা.) পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যেতেন এবং পায়ে হেঁটেই ফিরে আসতেন।[23]

(গ) পথ পরিবর্তন করা : ঈদগাহে যাতায়াতের পথ পরিবর্তন করা উত্তম অর্থাৎ এক রাস্তা দিয়ে ঈদগাহে যাবে এবং অন্য রাস্তা দিয়ে ফিরবে। জাবির (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম (ছা.) ঈদের দিন (ঈদগাহে) যাতায়াতের পথ পরিবর্তন করতেন।[24]

(৯) মহিলা ও শিশুদের ঈদগাহে গমন :

মহিলারা ঈদগাহে যাবে। এমনকি হায়েয ও নিফাসগ্রস্ত মহিলারাও মাঠে যাবে। যে সমস্ত নারীদের বোরকা থাকবে না, তারা অন্যদের থেকে ধার নিয়ে হলেও মাঠে যাবে। এমনকি ছোট মেয়েরাও উপস্থিত হবে। তবে হায়েয ও নিফাসগ্রস্তরা ছালাতে অংশগ্রহণ করবে না, এক পার্শ্বেআলাদা হয়ে বসে থাকবে। তারা তাকবীর পাঠ করবে ও খুৎবা শ্রবণ করবে। খুৎবার মাঝে সকলের জন্য যখন দু‘আ হবে, তখন তাতে অংশগ্রহণ করবে। উম্মু আত্বিয়্যাহ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছা.) আমাদেরকে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিন (ঈদগাহে) মহিলাদের নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, আমরা বললাম, তাদের কারও যদি চাদর না থাকে, তার ব্যাপারে আপনার মত কী? রাসূল (ছা.) বলেন, ‘তার বোন নিজ চাদর থেকে তাকে পরাবে’।[25]  অপর হাদীছে পাওয়া যায়, উম্মু আত্বিয়্যাহ (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূল (ছা.) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিন কুমারী, তরুণী, প্রাপ্তবয়স্কা সব মহিলাকে (ঈদের মাঠের জন্য) বের হওয়ার হুকুম করতেন।[26]  তবে মহিলারা বেপর্দা অবস্থায় এবং অশ্লীল পোশাক পরে ঈদগাহে যেতে পারবে না। এ সম্পর্কে ইবনুল মুবারক (রহি.) বলেছেন, আজকাল ঈদের মাঠে মহিলাদের যাওয়াকে আমি অপসন্দনীয় মনে করি। যদি কেউ যাওয়ার ব্যাপারে পীড়াপীড়ি করে, তবে তাকে পুরনো কাপড় পরিধান করে যাওয়ার অনুমতি দিবে, কিন্তু সাজসজ্জা করে বের হতে দিবে না।[27]

শিশুদেরকে ঈদগাহে নিয়ে যেতে হবে। ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (ছা.)-এর সঙ্গে ঈদুল ফিতর বা ঈদুল আযহার দিন বের হলাম। তিনি (ছা.) ছালাত আদায় করলেন অতঃপর খুৎবা দিলেন। অতঃপর নারীদের নিকটে গিয়ে তাদের নছীহত করলেন এবং তাদেরকে ছাদাক্বাহ করার নির্দেশ দিলেন।[28]  ইবনে আব্বাস (রা.) যখন রাসূল (ছা.)-এর সাথে ঈদগাহে যান, তখন তিনি ছোট বালক ছিলেন।[29]

(১০) ঈদগাহে বর্জনীয় কার্যাবলি :

(ক) ঈদগাহে যাওয়ার জন্য কোনো আযান, ইক্বামত এবং কোনো আহ্বান বা ডাকাডাকি নেই।[30]  ঈদের মাঠের জন্য মাইকে কোনো প্রকার ডাকাডাকি করা চলবে না, এমনকি ছালাতের আর মাত্র ৫ মিনিট সময় আছে, তাড়াতাড়ি চলে আসুন! এমনটি বলাও সুন্নাত বিরোধী।[31]

(খ) ঈদগাহে খুৎবা প্রদানের জন্য মিম্বার থাকবে না।[32]

(গ) ছালাতের পূর্বে খুৎবা বা বক্তব্য প্রদান করা যাবে না। চেয়ারম্যান, মেম্বার, দলীয় নেতা অথবা যে কোনো স্তরের সমাজ প্রতিনিধিই হোক না কেন, ঈদের ছালাতের পূর্বে বক্তব্য প্রদান করতে পারবে না।[33]

(ঘ) ঈদগাহে ছালাতের পূর্বে মাইকে তাকবীর ব্যতীত গান, গযল ইত্যাদি বলাও সুন্নাতের বরখেলাফ।

(ঙ) ঈদগাহে সামিয়ানা টাঙ্গানো, ঝাঁড়বাতি জ্বালানোও সুন্নাতের বরখেলাফ।

(১১) ঈদের ছালাত :

ঈদের ছালাত সুন্নাতে মুআক্কাদা। ইমামের পিছনে জামা‘আতবদ্ধভাবে ঈদের ছালাত আদায় করতে হবে। এক্ষেত্রে মহিলারা পিছনের কাতারগুলোতে থাকবে এবং পুরুষেরা সামনের কাতারগুলোতে থাকবে।[34] বারো তাকবীরে (৭+৫) ঈদের ছালাত আদায় করা ছহীহ সুন্নাহ সম্মত।[35] ছালাত আদায়ের পর ইমাম দাঁড়িয়ে হাতে লাঠি নিয়ে খুৎবা প্রদান করবেন।[36] খুৎবা হবে শ্রোতাদের বোধগম্য ভাষায়।

ঈদের ছালাতের সাথে জড়িত কয়েকটি বিষয় :

(ক) পূর্বে ও পরে কোনো ছালাত নেই : ঈদের ছালাতের পূর্বে ও পরে কোনো ছালাত আদায় করার বিধান নেই। অর্থাৎ ঈদগাহে গিয়ে জামা‘আতের সহিত যে দুই রাক‘আত ছালাত আদায় করা হয়, তা ব্যতীত কোনো ছালাত আদায় করা যাবে না। ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, নবী করীম (ছা.) বেলাল (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে ঈদুল ফিতরের  দিন বের হয়ে দুই রাক‘আত ছালাত আদায় করেন। রাসূল (ছা.)-এর পূর্বে ও পরে কোনো ছালাত আদায় করেননি।[37]

(খ) ছালাতের ক্বিরাআত : ঈদের ছালাতের প্রথম রাক‘আতে সূরা ক্বাফ এবং দ্বিতীয় রাক‘আতে সূরা ক্বামার তিলাওয়াত করা উত্তম।[38]  অথবা প্রথম রাক‘আতে সূরা আ‘লা এবং দ্বিতীয় রাক‘আতে সূরা গাশিয়াহ তিলাওয়াত করা উত্তম।[39]  তবে অন্যান্য সূরাও তিলাওয়াত করা যাবে।

(গ) ঈদের ছালাত ছুটে গেলে : কোনো ব্যক্তি যদি ঈদের ছালাত না পায়, তাহলে সে দুই রাক‘আত ছালাত নিজ বাড়ি বা এলাকায় আদায় করে নিবে অর্থাৎ সে ক্বাযা আদায় করবে। ইকরিমা (রহি.) বলেছেন, গ্রামের অধিবাসীরা ঈদের দিন সমবেত হয়ে ইমামের ন্যায় দুই রাক‘আত ছালাত আদায় করবে। আত্বা (রহি.) বলেন, যখন কারও ঈদের ছালাত ছুটে যায়, তখন সে দুই রাক‘আত ছালাত আদায় করবে।[40]

(১২) কোলাকুলি করা :

ঈদের দিনকে কেন্দ্র করে কোলাকুলি করার কোনো বিধান ইসলামে নেই। অথচ বর্তমানে এটাকে ঈদের একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে করা হয়ে থাকে। তাছাড়া বর্তমানে প্রচলিত ৩ বার কোলাকুলির নিয়মটি ছহীহ সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয়।

(১৩) কবর যিয়ারত :

ঈদের দিনে সকালে অথবা ঈদের ছালাত আদায়ের পর অনেকেই কবরস্থানে পিতা-মাতাসহ অন্যদের কবর যিয়ারত করতে যায়। এমনকি যারা কোনো দিন যায় না, তারাও এদিন গিয়ে থাকে। এই দিনের একটি বিশেষ ইবাদত হিসাবে মনে করা হয় এটিকে! অথচ এই দিনকে কেন্দ্র করে কবর যিয়ারতের কোনো বিধান ইসলামে নেই।

(১৪) দান করা :

ঈদের মাঠে দান করার জন্য রাসূল (ছা.) উৎসাহ প্রদান করেছেন, রাসূল (ছা.)-এর যামানায় নারী-পুরুষ সকলেই দান করতেন, তবে নারীরা ছিল দানের দিক দিয়ে অগ্রগামী (ঈদের মাঠে)। মহিলারা এমনভাবে দান করতেন যে, হাতের, কানের, নাকের, গলার গহনাগুলো খুলে খুলে দান করতেন।[41]  অতএব ঈদগাহে সকলের উচিত বেশি বেশি দান করা।

(১৫) কুরবানী করা :

আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টির জন্য সকলেই যিলহজ্জ মাসের ১০ তারিখে বিভিন্ন ধরনের পশু কুরবানী করে থাকে আর এক্ষেত্রে রাসূল (ছা.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী কিছু নিয়ম আছে।

(ক) ঈদগাহে কুরবানী করা : ঈদের মাঠেই অর্থাৎ যেখানে ঈদের ছালাত আদায় করা হয় সেখানেই কুরবানী করা রাসূল (ছা.)-এর সুন্নাত। ইবনে ওমর (রা.) হতে বর্ণিত, নবী করীম (ছা.) ঈদের মাঠে নহর করতেন (যবেহ করতেন)।[42]

(খ) নিজ হাতে কুরবানী করা : নিজের পশু নিজ হাতেই কুরবানী বা যবেহ করবে। ইমাম বা বড় হুযূরের নিকট থেকে করে নিতে হবে এমনটি নয়। আনাস (রা.) হতে বর্ণিত, নবী করীম (ছা.) দু’টি শিংওয়ালা সাদা-কালো রঙের ভেড়া কুরবানী করেন। তিনি (ছা.) পশুগুলোর পার্শ্বতার পায়ে চেপে ধরে সেগুলোকে নিজ হাতে যবেহ করেন।[43]

(গ) দুআ পড়ে করা : কুরবানী করার সময় অর্থাৎ যবেহ করার সময় যবেহকারীকে দু‘আ পাঠ করতে হবে। রাসূল (ছা.)-এর সুন্নাহ হতে কয়েকটি দু‘আ পাওয়া যায়। তার মধ্য হতে একটি হচ্ছে ‘বিসমিল্লাহি ওয়াল্লাহু আকবার’।[44]

(ঘ) আগে যবেহ না করা : ঈদের ছালাত আদায় করার পূর্বে কুরবানী করা যাবে না। ঈদের ছালাত আদায়ের পরে যবেহ করতে হবে। যদি কেউ আগেই করে, তাহলে তার কুরবানী হবে না।[45]

(১৬) কুরবানীর গোশত বিতরণ সম্পর্কিত বিষয়াদি :

(ক) বণ্টন : কুরবানীর পশুর গোশত ৩ ভাগ করা যাবে, তবে এটি আবশ্যক নয়। যদি সমাজে এ নিয়ম চালু থাকে, তাহলে তা পালন করাতে দোষের নয়। তবে ৩ ভাগে ভাগ করাই লাগবে এমনটি নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘তোমরা খাও এবং দুস্থ অভাবীদের খাওয়াও’ (হজ্জ, ২৮)। আরও বলেন, ‘তোমরা খাও এবং যারা চায় না এমন অভাবী আর যারা চায় এমন অভাবীদের খাওয়াও’ (হজ্জ, ৩৬)। আল্লাহর  বিধান মতে, ৩ প্রকার লোকের প্রমাণ পাওয়া যায়। যথা- (১) নিজে, (২) অভাবী পাড়া-প্রতিবেশী অর্থাৎ যারা কুরবানী করতে পারেনি, (৩) ফক্বীর অর্থাৎ যারা চেয়ে বেড়ায়। আত্মীয়-স্বজনদের জন্য একভাগ গোশত করা যরূরী নয়, তবে তাদের মাঝে কুরবানী দেয়নি এমন থাকলে তাদেরকেও গোশত দেওয়া প্রয়োজন।

(খ) জমা করে রাখা : কুরবানীর গোশত নিজের পরিবার এবং গরীব-দুঃখীদের জন্য ব্যবস্থা করার পর আরও অতিরিক্ত থাকলে তা ফ্রিজে জমা করে রাখতে পারবে। তবে বছরের বাজারখরচ কমানোর জন্য গরীব-দুঃখীদের মাঝে বিতরণ না করে ফ্রিজে জমা করে রাখা উচিত হবে না।[46]

(১৭) চুল, নখ কর্তন করা :

ঈদের আগে চুল, নখ কর্তন না করে তা ঈদের দিনে করতে হবে। হাদীছে এসেছে, উম্মু সালামা (রা.) হতে বর্ণিত, নবী করীম (ছা.) বলেছেন, ‘যখন (যিলহজ্জের) প্রথম দশদিন উপস্থিত হয়, আর তোমাদের কেউ কুরবানী করার ইচ্ছা করে, তাহলে সে যেন তার চুল ও নখের কিছুই স্পর্শ না করে’ (না কাটে)।[47]  এ বিধান কুরবানীদাতার জন্য প্রযোজ্য।

(১৮) জুমআর দিনে ঈদ :

জুম‘আর দিন অর্থাৎ শুক্রবারে ঈদ হলে যে ব্যক্তি ঈদের ছালাত আদায় করবে, তার জন্য জুম‘আর ছালাত আবশ্যক নয় অর্থাৎ সেদিন জুম‘আর ছালাত না আদায় করে যোহর ছালাত আদায় করতে পারবে।তবে জুম‘আর ছালাত আদায় করাই কল্যাণকর। কেননা জুম‘আর ফযীলত অনেক।[48]

(১৯) আনন্দ, উল্লাস ও খেলাধুলা :

ঈদের দিনে আনন্দ, উল্লাস এবং বৈধ খেলাধুলা করা যাবে। আনন্দের দোহাই দিয়ে এ দিনে পার্কে ও বিভিন্ন মেলায় যাওয়া এবং খেলাধুলার দোহাই দিয়ে অশ্লীলতা ও জুয়া থেকে সতর্ক থাকতে হবে। আনন্দের জন্য ফুটবল, কাবাডি ইত্যাদি খেলাধুলা করা যেতে পারে যদি তাতে জুয়া না থাকে। এক কথায় বলা যায় যে, ঈদের দিনে আনন্দ, উল্লাস ও খেলাধুলা করা যাবে।[49]

উপসংহার :

মুসলিমদের জন্য বৈধ দু’টি দিন, যা তারা আনন্দে কাটাবে, সেটাই ঈদ। তবে সেই আনন্দ যেন ইসলামসম্মত হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। মহান আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে সুন্দরভাবে ঈদের দিনটি অতিবাহিত করার তাওফীক্ব দান করুন। আমীন!

[1]. ছহীহ ফিক্বহুসসুন্নাহ, ১/৬০৩।

[2]. উরসাদুস সারী, (বৈরূত) আইয়ামে তাশরীকে আমলের ফযীলত, অধ্যায়-২, পৃ. ৩৮৭।

[3]. যাদুল মা‘আদ, পৃ. ১৯৮।

[4]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৫৭১।

[5]. ছহীহ মুসলিম, হা/৪৯৮৫।

[6]. তামামুল মিন্নাহ, ১/৩৫৪, সনদ হাসান।

[7]. যাদুল মা‘আদ, (সৃজনী প্রকাশনী), পৃ. ১৯৮।

[8]. মুওয়াত্ত্বা মালেক,হা/১৭৭।

[9]. যাদুল মা‘আদ, পৃ. ১৯৮; ফিক্বহুস সুন্নাহ, (শতাব্দী প্রকাশনী), ১/২৭৩।

[10]. ফিক্বহুস সুন্নাহ, পৃ. ২৭৩।

[11]. ছহীহ বুখারী, হা/৯৪৮।

[12]. আবুদাঊদ, হা/৪০৩১।

[13]. যাদুল মা‘আদ, পৃ. ১৯৮।

[14]. আবুদাঊদ, হা/১১৩৫।

[15]. ইবনে মাজাহ, হা/১৩১৭।

[16]. ইসলাম ওয়েব ফাতাওয়াহ, ফতওয়া নং২৮৯১৬।

[17]. আওনুল মা‘বূদ (মিশর), ৩/৯৫।

[18]. ছহীহ বুখারী, হা/৯৫৬; মিশকাত, হা/১৪২৬।

[19]. যাদুল মা‘আদ, পৃ. ১৯৮।

[20]. আবুদাঊদ, হা/১১৬০; ইবনে মাজাহ, হা/১৩১৩।

[21]. ফিক্বহুস সুন্নাহ, পৃ. ২৭৩।

[22]. তিরমিযী, হা/৫৪২; ইবনে মাজাহ, হা/১৭৫৬।

[23]. তিরমিযী, হা/৫৩০; ইবনে মাজাহ, হা/১২৯৪, ১২৯৭।

[24]. ছহীহ বুখারী, হা/৯৮৬; তিরমিযী, হা/৫৪১; ইবনে মাজাহ, হা/১২৯৯, ১০৩১; আবুদাঊদ, হা/১১৫৬।

[25]. ছহীহ বুখারী, হা/৩২৪, ৯৮০; ইবনে মাজাহ, হা/১৩০৭।

[26]. ছহীহ বুখারী, হা/৯৭১, ৯৭৪, ৯৮১; ছহীহ মুসলিম, হা/১৯৩৯; তিরমিযী, হা/৫৩৯; ইবনে মাজাহ, হা/১৩০৭, ১৩০৮।

[27]. তিরমিযী, হা/৫৪০-এর ব্যাখ্যা।

[28]. ছহীহ বুখারী, হা/৯৭৫, ৯৭৭।

[29]. ছহীহ বুখারী, হা/৮৯৩।

[30]. যাদুল মা‘আদ, (সৃজনী প্রকাশনী), পৃ. ১৯৯।

[31]. আবুদাঊদ, হা/১১৪, ১১৮; তিরমিযী, হা/৫৩২; ইবনে মাজাহ, হা/১২৭৪; মিশকাত, হা/১৪৫১।

[32]. ছহীহ বুখারী, হা/৯৫৬; ছহীহ মুসলিম, হা/৮৮৯; আবুদাঊদ, হা/১১৪০; মিশকাত, হা/১৪৫২।

[33]. ছহীহ বুখারী, হা/৯৭৭, ৯৫৬; আবুদাঊদ, হা/১১৪০; তিরমিযী, হা/৫৩১; মিশকাতহা/১৪৫২।

[34]. ছহীহ বুখারী, হা/৮৭০, ৯৭১।

[35]. ইবনে মাজাহ, হা/১২৭৭, ৮০।

[36]. আবুদাঊদ, হা/১১৪৫।

[37]. ছহীহ বুখারী, হা/৯৮৯।

[38]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৯৪৪, ১৯৪৫; ইবনে মাজাহ, হা/১২৮২।

[39]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৯১৩; ইবনে মাজাহ, হা/১২৮১, ১২৮৩।

[40]. ছহীহ বুখারী, অধ্যায়-১৩, অনুচ্ছেদ-২৫।

[41]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৯৩৩, ১৯৩২, ১৯৩০, ১৯২৯।

[42]. ছহীহ বুখারী, হা/৯৮২, ৫৫৫২।

[43]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৫৬৪, ৫৫৫৪; ছহীহ মুসলিম, হা/৫৫৫৯।

[44]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৫৬৫, ৫৫৫৮; ছহীহ মুসলিম, হা/৪৯৮২, ৪৯৮৫।

[45]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৫৪৫, ৫৫৪৬, ৫৫৪৯, ৫৫৫৬; ছহীহ মুসলিম, হা/৪৯৫৮, ৪৯৭৫।

[46]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৫৬৮, ৫৫৬৯; ছহীহ মুসলিম, হা/৪৯৯৭, ৫০০৯।

[47]. ছহীহ মুসলিম, হা/৫০১১।

[48].ছহীহ বুখারী, হা/৫৫৭২; ইবনে মাজাহ, হা/১২৯০।

[49]. ছহীহ বুখারী, হা/৯৪৯, ৯৫০, ৯৫২, ৯৮৭, ৯৮৮; ছহীহ মুসলিম, হা/১৯৪৬-১৯৫৪।