ঈদ উৎসব

-মহিউদ্দিন বিন জুবায়েদ*


মুসলিমদের জন্য ঈদ একটা বিশেষ ধর্মীয় উৎসব। এই দিনে ঈদের জামাআতে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে এক সঙ্গে ছালাত আদায় করেন। তারপর বন্ধুত্ব, সৌহার্দ, ভালোবাসা, শুভেচ্ছা, দু‘আ এবং আনন্দ ভাগাভাগি করেন সবাই।

সে এক অপূর্ব দৃশ্য। অপূর্ব অনুভব। ঈদের দিন হয়ে ওঠে মানুষের মহামিলন। মনের রাগ-অভিমান ভুলে গিয়ে একদিনের জন্য হলেও প্রফুল্ল রাখতে হয় মনকে। একটানা ধর্মকর্মের অনুষ্ঠান করে  বৈচিত্রহীন নিরস জীবনযাপন করুক ইসলাম এমন বিধান আরোপ করেনি।

একঘেয়ে জীবন কারোই কাম্য নয়। সেটা স্থবিরতা ডেকে আনে। এজন্য ইসলাম মুসলিমদের এমন কতগুলো পর্ব দান করেছে, যা উদযাপনে ইবাদতও হয় আবার আনন্দও হয়ে থাকে। ঈদুল ফিত্বর ও ঈদুল আযহা তেমনি দুটি উৎসব।
ঈদুল ফিত্বর মানে ফিত্বরা দানের উৎসব। বস্তুত এ ফিত্বরা শব্দের মধ্যেও বিদীর্ণ করার অর্থ বিদ্যমান। ফিত্বরা ছিয়াম সাধনার যাবতীয় ভুলত্রুটি বিনাশ করে ছিয়ামকে পূত-পবিত্র করে তোলে। পাশাপাশি নিঃস্ব ও গরীবদের অর্থাভাব বিদীর্ণ করে অর্থ ও আনন্দের স্তরে পৌঁছিয়ে দেয়। ফিত্বরা দ্বারা তাদের সাময়িক চাহিদা পূরণ হয়। হাদীছে সুস্পষ্টভাবে এ কথা ফুটে উঠেছে।

মক্কাবাসীরা যখন রাসূল a-এর উপর নানা রকমের অত্যাচার শুরু করল, তখন তিনি হিজরত করে মদীনায় আসেন। এসময় রাসূলুল্লাহ a মদীনার লোকদের দুটি উৎসবে মেতে উঠতে দেখলেন। আর জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা এ কীসের উৎসব পালন করছ?’  তারা জবাবে বলল, আমাদের পূর্বপুরুষদের থেকে ধারাবাহিকভাবে এ উৎসবদ্বয় পালিত হয়ে আসছে।  আমরা তাদের অনুকরণে প্রতিবছর তা উৎযাপন করে আসছি। তখন রাসূল a বললেন, ‘আল্লাহ তোমাদের এ দু’দিনের বদলে এমন দুটি দিন দান করেছেন, যা তোমাদের নির্বাচিত দিনদ্বয়ের চেয়ে উত্তম। একটি হচ্ছে— ঈদুল ফিত্বর এবং অন্যটি ঈদুল আযহা’।[1]
ঈদ উৎসব বিশ্লেষণে বলা যায়, ঈদ সুষম সমাজ গড়ার বাস্তব অনুশীলন। ভ্রাতৃত্ববোধের সুগভীর প্রশিক্ষণ ও মুসলিম উম্মাহর আনন্দ আর উচ্ছ্বাস প্রকাশ করার দিন। ঈদ আমাদের জানিয়ে দেয় আমরা মুক্ত।  আমরা ইসলামের ভিত্তিতে স্বাধীন জীবনযাপন করছি।  আমাদের উপর কারও কর্তৃত্ব নেই। আমরা কারও অধীনে নই। ঈদ উৎসবটি নিছক অনুষ্ঠান বা শুধু পার্থিব উৎসবই নয়।  এটি মুসলিমদের একটি পবিত্র ইবাদত।

ঈদ আমাদের সাংস্কৃতিক দিক-নির্দেশনা দান করে। ঈদবিহীন আমাদের সংস্কৃতি পঙ্গু, অস্পষ্ট, ধোঁয়াটে। ঈদ আত্মকেন্দ্রিক উৎসব নয়। এটি হচ্ছে, সমাজকেন্দ্রিক ও মানবকেন্দ্রিক। এ উৎসবের মর্মবাণী হলো—  ধনী-গরীব, ছোট-বড় সবাই মিলেমিশে থাকা।

অথচ সেই ঈদ আমাদের কাছে  এখন  একটি প্রথাগত উৎসব। ঈদ আমাদের কাছে ব্যবসার মৌসুম। ঈদ আসে আমাদের কাছে বিত্তবানদের সম্পদের প্রদর্শনীর দিন হয়ে। এ দিনে তারা প্রতিযোগিতা করে কে বেশি অর্থ খরচ করে উৎসব পালন করতে পারে। অথচ নিম্নবিত্তদের দিকে তাদের কোনো খেয়াল নেই। তারা ঈদের দিনে ভালো পোশাক পরা তো দূরের কথা একটু ভালো খাবারও খেতে পারে না। এটা আসলেই অমানবিক।

ইসলামের আনন্দ উৎসব বেপরোয়া লাগামহীন উচ্ছৃঙ্খলতা নয়। বরং নির্মল পরিবেশে সুস্থ বিনোদন লাভই এর লক্ষ্য। প্রতি উৎসবে তাকীদ দেওয়া হয় মানবতাবোধে উজ্জীবিত হতে, দুঃখী মানুষের প্রতি সহমর্মিতা দেখাতে। মানব কল্যাণই এর প্রধান লক্ষ্য।

যাকাত-ফিত্বরা, দান-খয়রাত ইত্যাদির মাধ্যমে গরীব-দুঃখী মানুষের মুখে  হাসি ফুটানোই উদ্দেশ্য, যাতে সবাই উৎসবে শরীক হতে পারে। যাদের অর্থ আছে, তারাই শুধু ঈদের আনন্দ করবে আর যাদের অর্থ নেই, নিঃস্ব তারা মুখ মলিন করে তাকিয়ে দেখবে— তা কিন্তু নয়। সম্পদশালীরা পেট পুরে খাবে, সুন্দর সুন্দর কাপড় পরবে, ফূর্তি করে বেড়াবে আর দুঃখী মানুষের দিকে ফিরেও তাকাবে না—  এমন আনন্দ ইসলামে প্রকৃত আনন্দ নয়। ধনী-গরীব সকলে মিলে যে আনন্দ তাকেই বলে প্রকৃত আনন্দ।

ঈদ মানুষকে ভালো হতে শেখায়। সহানুভূতিশীল হতে শেখায়। ভালোবাসা ও সাম্য-মৈত্রীর সমাজ গড়তে শেখায়। আমাদের উৎসবে সকলের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ আছে। ঈদের আনন্দ এক কলুষমুক্ত পবিত্র আনন্দ। এখানে নেই কোনো অপবিত্রতার ছোঁয়া।

পরিশেষে এ কথা মনে রাখতে হবে যে, ঈদের খুশি যেন শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে না থাকে, এটি যেন সকল শ্রেণির লোক উপলব্ধি করতে পারে। ধন্য হোক ঈদের দিন। উৎসবে মুখরিত হোক মুসলিম উম্মাহর এ দিনের খুশি।


* মুহিমনগর, চৈতনখিলা, শেরপুর।

[1] . আবু দাঊদ, হা/১১৩৪; নাসাঈ, হা/১৫৫৬, ছহীহ।