ঈমানের শাখা

হাফেয আব্দুল মতীন মাদানী
এম এ, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব,
শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, রুপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ।

(পর্ব-৯)

(৪৭)  আল্লাহর আনুগত্য, রাসূল (ছাঃ)-এর আনুগত্য ও নেতৃবৃন্দের আনুগত্য :

মহান আল্লাহ বলেন,  يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ ‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো এবং রাসূলের আনুগত্য করো ও তোমাদের নেতৃবৃন্দের আনুগত্য করো’ (নিসা, ৪/৫৯)। হাদীছে এসেছে,

عَنِ أَبيَ هُرَيْرَةَ رضى الله عنه أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ مَنْ أَطَاعَنِى فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ، وَمَنْ عَصَانِى فَقَدْ عَصَى اللَّهَ، وَمَنْ أَطَاعَ أَمِيرِى فَقَدْ أَطَاعَنِى، وَمَنْ عَصَى أَمِيرِى فَقَدْ عَصَانِى.

আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘যে আমার আনুগত্য করল, সে আল্লাহরই আনুগত্য করল। আর যে আমার নাফরমানী করল, সে আল্লাহরই নাফরমানী করল। যে আমার আমীরের আনুগত্য করল, সে আমারই আনুগত্য করল। যে আমার আমীরের নাফরমানী করল, সে আমারই নাফরমানী করল’।[1] অন্য হাদীছে এসেছে,

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رضى الله عنه قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم اسْمَعُوا وَأَطِيعُوا وَإِنِ اسْتُعْمِلَ عَلَيْكُمْ عَبْدٌ حَبَشِىٌّ كَأَنَّ رَأْسَهُ زَبِيبَةٌ.

আনাস ইবনু মালেক (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘যদি তোমাদের উপর এমন কোনো হাবশী দাসকেও শাসক নিযুক্ত করা হয় যার মাথাটি কিসমিসের মতো, তবুও তার কথা শোনো ও তার আনুগত্য করো’।[2]

(৪৮) জামাআতবদ্ধ জীবন যাপন করা :

মহান আল্লাহ বলেন, وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا ‘তোমরা সকলে সমবেতভাবে আল্লাহর রজ্জুকে ধারণ করো এবং পরস্পরে বিচ্ছিন্ন হয়ো না’ (আলে ইমরান, ২/১০৩)। হাদীছে এসেছে,

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ يَرْوِيهِ قَالَ قَالَ النَّبِىُّ صلى الله عليه وسلم مَنْ رَأَى مِنْ أَمِيرِهِ شَيْئًا فَكَرِهَهُ فَلْيَصْبِرْ، فَإِنَّهُ لَيْسَ أَحَدٌ يُفَارِقُ الْجَمَاعَةَ شِبْرًا فَيَمُوتُ إِلاَّ مَاتَ مِيتَةً جَاهِلِيَّةً.

ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, ‘কেউ যদি তার আমীর (ক্ষমতাসীন ব্যক্তি) থেকে এমন কিছু দেখে যা সে অপসন্দ করে তাহলে সে যেন ধৈর্য ধারণ করে। কারণ যে কেউ জামা‘আত থেকে এক বিঘত পরিমাণ দূরে সরে মারা যাবে, তার মৃত্যু হবে জাহেলিয়াতের মৃত্যু’।[3]  এ বিষয়ে অন্য একটি হাদীছ,

عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مَنْ خَرَجَ مِنَ الطَّاعَةِ وَفَارَقَ الْجَمَاعَةَ ثُمَّ مَاتَ مَاتَ مِيتَةً جَاهِلِيَّةً

আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি (আমীরের) আনুগত্য থেকে বের হলো এবং জামা‘আত পৃথক করল, অতঃপর মৃত্যুবরণ করল, সে যেন জাহেলিয়াতের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করল’।[4]

(৪৯) মানুষের মাঝে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা :

মহান আল্লাহ বলেন, وَإِذَا حَكَمْتُمْ بَيْنَ النَّاسِ أَنْ تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ ‘আর যখন তোমরা লোকদের মধ্যে বিচার করবে, তখন ন্যায়বিচার করবে’ (নিসা, ৪/৫৮)। পবিত্র কুরআন-সুন্নাহর আইন প্রতিষ্ঠার মধ্যেই মানবজাতির শান্তি নিহিত রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, إِنَّا أَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِتَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ بِمَا أَرَاكَ اللَّهُ وَلَا تَكُنْ لِلْخَائِنِينَ خَصِيمًا ‘নিশ্চয়ই আমরা তোমার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি সত্য সহকারে। যাতে তুমি সে অনুযায়ী লোকদের মধ্যে বিচার-ফায়ছালা করতে পারো, যা আল্লাহ তোমাকে জানিয়েছেন। আর তুমি বিশ্বাসঘাতকদের পক্ষে বাদী হয়ো না’ (নিসা, ৪/১০৫)।

মহান আল্লাহ বলেন, وَإِنْ طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا فَإِنْ بَغَتْ إِحْدَاهُمَا عَلَى الْأُخْرَى فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّى تَفِيءَ إِلَى أَمْرِ اللَّهِ فَإِنْ فَاءَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ– ‘আর যদি মুমিনদের দু’দল যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তাহলে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও। অতঃপর যদি তাদের একদল অপর দলের উপর বাড়াবাড়ি করে, তাহলে যে দলটি বাড়াবাড়ি করবে, তার বিরুদ্ধে তোমরা যুদ্ধ করো, যতক্ষণ না সে দলটি আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। তারপর যদি দলটি ফিরে আসে, তাহলে তাদের মধ্যে ইনছাফের সাথে মীমাংসা করো এবং ন্যায়বিচার করো। নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়বিচারকারীদের ভালোবাসেন’ (হুজুরাত, ৪৯/৯)। মুমিনগণ পরস্পর ভাই-ভাই। সুতরাং তাদের মাঝে সুবিচার করতেই হবে।

মহান আল্লাহ বলেন, إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ ‘নিশ্চয় মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। কাজেই তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে আপোস-মীমাংসা করে দাও। আর তোমরা আল্লাহর তাক্বওয়া অবলম্বন করো, আশা করা যায় তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হবে’ (হুজুরাত, ৪৯/১০)।

আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ প বলেন, রাসূল ধ বলেছেন, لَا حَسَدَ إِلاَّ فِى اثْنَتَيْنِ رَجُلٌ آتَاهُ اللَّهُ مَالاً فَسَلَّطَهُ عَلَى هَلَكَتِهِ فِى الْحَقِّ، وَرَجُلٌ آتَاهُ اللَّهُ حِكْمَةً فَهْوَ يَقْضِى بِهَا وَيُعَلِّمُهَا ‘কেবল দু’টি বিষয়ে ঈর্ষা করা বৈধ- ১. সে ব্যক্তির উপর, যাকে আল্লাহ সম্পদ দিয়েছেন, অতঃপর তাকে বৈধ পন্থায় অকাতরে ব্যয় করার ক্ষমতা দিয়েছেন। ২. সে ব্যক্তির উপর, যাকে আল্লাহ তা‘আলা প্রজ্ঞা দান করেছেন, অতঃপর সে তার মাধ্যমে বিচার-ফায়ছালা করে ও অন্যকে শিক্ষা দেয়’।[5]

(৫০) সৎকাজের আদেশ, অসৎকাজে নিষেধ :

মহান আল্লাহ বলেন, وَلْتَكُنْ مِنْكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ  ‘আর তোমাদের মধ্যে একটা দল থাকা চাই, যারা মানুষকে কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে ও অন্যায় থেকে নিষেধ করবে। বস্তুত তারাই হলো সফলকাম’ (আলে ইমরান, ৩/১০৪)।

আল্লাহ বলেন, ‘তোমরাই হলে শ্রেষ্ঠ জাতি, যাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে মানবজাতির কল্যাণের জন্য। তোমরা সৎকাজের আদেশ করবে ও অন্যায় কাজে নিষেধ করবে এবং আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখবে’ (আলে ইমরান, ৩/১১০)। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ট ইবাদত হলো তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করা, সকল ইবাদত আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা, আর সর্বনিকৃষ্ট কাজ হলো আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে অংশী স্থাপন করা।

মহান আল্লাহ বলেন, الَّذِينَ إِنْ مَكَّنَّاهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ وَأَمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنْكَرِ وَلِلَّهِ عَاقِبَةُ الْأُمُور- ‘তারা এমন লোক, যাদেরকে আমরা যদি পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা দান করি, তাহলে তারা ছালাত ক্বায়েম করে, যাকাত আদায় করে, সৎকাজের আদেশ দেয় ও অসৎকাজে নিষেধ করে। আর সকল কাজের পরিণাম আল্লাহর ইচ্ছাধীন’ (হজ্জ, ২২/৪১)। ‘আয়াতটিতে আদেশ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সর্বপ্রথম কাজ হলো তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করা, সকল ইবাদত আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা ও যাবতীয় শিরকী কাজ থেকে দূরে থাকা’।[6]

মহান আল্লাহ লোক্বমান সম্পর্কে বলেন,  وَإِذْ قَالَ لُقْمَانُ لِابْنِهِ وَهُوَ يَعِظُهُ يَا بُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ ‘স্মরণ করো, যখন লোক্বমান উপদেশ দিয়ে তার পুত্রকে বলেছিল, হে বৎস! আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করো না। নিশ্চয়ই শিরক সবচেয়ে বড় যুলম’ (লোক্বমান, ৩১/১৩)। মহান আল্লাহ লোক্বমান সম্পর্কে আরও বলেন, يَا بُنَيَّ أَقِمِ الصَّلَاةَ وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوفِ وَانْهَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَاصْبِرْ عَلَى مَا أَصَابَكَ إِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ ‘হে বৎস! ছালাত ক্বায়েম করো, সৎকাজের আদেশ দাও ও অসৎকাজে নিষেধ করো এবং বিপদে ধৈর্যধারণ করো। নিশ্চয় এটি শ্রেষ্ঠ কর্মসমূহের অন্তর্ভুক্ত (লোক্বমান, ৩১/১৭)। প্রত্যেক নবী-রাসূল মানবজাতিকে ত্বাগূত পরিহার করে একমাত্র আল্লাহর দাসত্ব করার আদেশ দিয়ে গেছেন। মহান আল্লাহ বলেন,  وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ ‘প্রত্যেক সম্পদায়ের নিকট আমরা রাসূল প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং ত্বাগূত থেকে দূরে থাকো’ (নাহল, ১৬/৩৬)। অতএব যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত অন্য সকল ত্বাগূতী পথকে অস্বীকার করে এবং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, সে দৃঢ়তর রজ্জুকে আঁকড়ে ধরলো যা কখনো ছিন্ন হওয়ার নয়। আল্লাহ বলেন, لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ قَدْ تَبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَيِّ فَمَنْ يَكْفُرْ بِالطَّاغُوتِ وَيُؤْمِنْ بِاللَّهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَى لَا انْفِصَامَ لَهَا وَاللَّهُ سَمِيعٌ  عَلِيمٌ ‘দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই। নিশ্চয়ই সুপথ ভ্রান্তপথ হতে স্পষ্ট হয়ে গেছে। এক্ষণে যে ব্যক্তি ত্বাগূতে অবিশ্বাস করবে এবং আল্লাহতে বিশ্বাস স্থাপন করবে, সে ব্যক্তি এমন এক মযবূত হাতল আঁকড়ে ধরল, যা কখনোই ভাঙবার নয়। বস্তুত আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ’ (বাক্বারাহ, ২/২৫৬)।

শান্তিতে জীবন যাপন করতে চাইলে নিজের জীবনে তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করবে এবং অপরকে আদেশ করবে, নিজেকে শিরকী কাজ থেকে বেঁচে থাকতে হবে এবং অপরকে শিরকী কাজ করা থেকে নিষেধ করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন,  الَّذِينَ آمَنُوا وَلَمْ يَلْبِسُوا إِيمَانَهُمْ بِظُلْمٍ أُولَئِكَ لَهُمُ الْأَمْنُ وَهُمْ مُهْتَدُونَ ‘যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের ঈমানের সাথে শিরককে মিশ্রিত করেনি, তাদের জন্যই রয়েছে নিরাপত্তা এবং তারাই হেদায়াতপ্রাপ্ত’ (আন‘আম, ৬/৮২)। সমাজে ক্ষমতা পেতে চাইলে, দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেতে চাইলে তাকে অবশ্যই প্রথমে আদেশ করতে হবে তাওহীদ প্রতিষ্ঠার এবং সর্বপ্রথম নিষেধ করতে হবে শিরক থেকে। মহান আল্লাহ বলেন,

وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَى لَهُمْ وَلَيُبَدِّلَنَّهُمْ مِنْ بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنًا يَعْبُدُونَنِي لَا يُشْرِكُونَ بِي شَيْئًا وَمَنْ كَفَرَ بَعْدَ ذَلِكَ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ

‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎকর্মসমূহ সম্পাদন করে, আল্লাহ তাদের ওয়াদা দিয়েছেন যে, তিনি তাদেরকে অবশ্যই পৃথিবীতে শাসন ক্ষমতা দান করবেন, যেমন তিনি দান করেছিলেন পূর্ববর্তীদেরকে। আর তিনি অবশ্যই সুদৃঢ় করবেন তাদের ধর্মকে, যা তিনি তাদের জন্য মনোনীত করেছেন এবং তিনি তাদেরকে ভয়-ভীতির বদলে অবশ্যই নিরাপত্তা দান করবেন। (শর্ত হলো) তারা কেবল আমারই দাসত্ব করবে এবং আমার সাথে কাউকে শরীক করবে না। এরপরে যারা অবাধ্য হবে, তারাই হবে পাপাচারী’ (নূর, ২৪/৫৫)। জান্নাত পেতে হলে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করতেই হবে। আর এ দাওয়াতী কাজে নবী-রাসূলগণের পথ, সালাফে ছালেহীনের পথ ধরতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন,

إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَى مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنْفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَيَقْتُلُونَ وَيُقْتَلُونَ وَعْدًا عَلَيْهِ حَقًّا فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيلِ وَالْقُرْآنِ وَمَنْ أَوْفَى بِعَهْدِهِ مِنَ اللَّهِ فَاسْتَبْشِرُوا بِبَيْعِكُمُ الَّذِي بَايَعْتُمْ بِهِ وَذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ-التَّائِبُونَ الْعَابِدُونَ الْحَامِدُونَ السَّائِحُونَ الرَّاكِعُونَ السَّاجِدُونَ الْآمِرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَالنَّاهُونَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَالْحَافِظُونَ لِحُدُودِ اللَّهِ وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِينَ-

‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের নিকট থেকে তাদের জান ও মাল খরীদ করে নিয়েছেন জান্নাতের বিনিময়ে। তারা আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করে। অতঃপর তারা হত্যা করে অথবা নিহত হয়। এর বিনিময়ে তাদের জন্য (জান্নাত লাভের) সত্য ওয়াদা করা হয়েছে তওরাত, ইনজীল ও কুরআনে। আর আল্লাহর চাইতে নিজের অঙ্গীকার অধিক পূরণকারী আর কে আছে? অতএব তোমরা এই ক্রয়-বিক্রয়ের বিনিময়ে (জান্নাতের) সুসংবাদ গ্রহণ করো যা তোমরা তাঁর সাথে করেছ। আর এটাই হলো মহা সফলতা। (যাদেরকে আল্লাহ জান্নাতের বিনিময়ে খরীদ করে নিয়েছেন, তারা হলো) তওবাকারীগণ, ইবাদতকারীগণ, (সুখে-দুঃখে) আল্লাহর প্রশংসাকারীগণ, আল্লাহর পথে ভ্রমণকারীগণ, রুকূ ও সিজদাকারীগণ, সৎকাজের আদেশ দানকারী ও অসৎকাজে নিষেধকারীগণ এবং আল্লাহর সীমারেখাসমূহের হেফাযতকারীগণ। আর তুমি বিশ্বাসীদের (জান্নাতের) সুসংবাদ শুনিয়ে দাও’ (তওবাহ, ৯/১১১-১১২)। ভাল কাজের আদেশ, খারাপ কাজের নিষেধ অবশ্যই করতে হবে, যার যতটুকু সামর্থ্য রয়েছে। নচেৎ আল্লাহর পক্ষ থেকে গযব নাযিল হবে। আর আদেশ এবং নিষেধের আগে দাঈর অবশ্যই সে সম্পর্কে জ্ঞান থাকা লাগবে। মহান আল্লাহ বলেন,

لُعِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ عَلَى لِسَانِ دَاوُودَ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ ذَلِكَ بِمَا عَصَوْا وَكَانُوا يَعْتَدُونَ -كَانُوا لَا يَتَنَاهَوْنَ عَنْ مُنْكَرٍ فَعَلُوهُ لَبِئْسَ مَا كَانُوا يَفْعَلُونَ

‘বনু ইসরাঈলের মধ্যে যারা কাফির ছিল তাদেরকে লা‘নত করা হয়েছিল দাঊদ ও মারইয়াম-তনয় ঈসার যবানীতে। সেটা এজন্য ছিল যে, তারা অবাধ্যতা করেছিল এবং সীমালঙ্ঘন করেছিল। তারা যেসব মন্দকাজ করত, তা থেকে পরস্পরকে নিষেধ করত না। এভাবে তারা অবশ্যই গর্হিত কাজ করত’ (মায়েদাহ, ৪/৭৮-৭৯)। তারা পাপ কাজ, অন্যায় কাজ করত কিন্তু কেউ কাউকে বাধা দিত না, যারা জেনে-শুনে পাপ কাজকর্ম দেখে অথচ নিষেধ করে না, বাধা দেয় না তারা যেন সে পাপ কর্মে শামিল।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ وَذَلِكَ أَضْعَفُ الإِيمَانِ.. ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কোনো অন্যায় কাজ দেখবে সে যেন সেটাকে হাত দিয়ে বাধা দেয়। এটিতে যদি সে সক্ষম না হয় তবে যেন মুখ দিয়ে বাধা দেয়। এটিতেও যদি সে সক্ষম না হয় তবে সে যেন অন্তর থেকে ঘৃণা করে, আর এটা হলো দুর্বল ঈমান’।[7]  হাদীছে এসেছে,

عَنْ زَيْنَبَ ابْنَةِ جَحْشٍ رضى الله عنهن أَنَّ النَّبِىَّ صلى الله عليه وسلم دَخَلَ عَلَيْهَا فَزِعًا يَقُولُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ، وَيْلٌ لِلْعَرَبِ مِنْ شَرٍّ قَدِ اقْتَرَبَ فُتِحَ الْيَوْمَ مِنْ رَدْمِ يَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ مِثْلُ هَذِهِ. وَحَلَّقَ بِإِصْبَعِهِ الإِبْهَامِ وَالَّتِى تَلِيهَا. قَالَتْ زَيْنَبُ ابْنَةُ جَحْشٍ فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَنَهْلِكُ وَفِينَا الصَّالِحُونَ قَالَ نَعَمْ، إِذَا كَثُرَ الْخُبْثُ. .

যয়নব বিনতে জাহশ (রাঃ) হতে বর্ণিত একবার রাসূল (ছাঃ) ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় তাঁর নিকট আসলেন এবং বলতে লাগলেন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য মা‘বূদ নেই)। আরবদের জন্য সেই অনিষ্টের কারণে ধ্বংস অনিবার্য, যা নিকটবর্তী হয়েছে। আজ ইয়াজূজ ও মাজূজের প্রাচীর এ পরিমাণ খুলে গেছে। এ কথা বলার সময় তিনি তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলির অগ্রভাগকে তার সঙ্গের শাহাদাত আঙ্গুলির অগ্রভাগের সঙ্গে মিলিয়ে গোলাকার করে ছিদ্রের পরিমাণ দেখালেন। যয়নব বিনতে জাহশ (রাঃ) বলেন, তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আমাদের মধ্যে পুণ্যবান লোকজন থাকা সত্ত্বেও কি আমরা ধ্বংস হয়ে যাব? তিনি বললেন, হ্যাঁ, যখন পাপ কাজ অতি মাত্রায় বেড়ে যাবে’।[8]  ওমর ইবনে আব্দুল আযীয বলেন, বলা হত যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা সাধারণ মানুষের উপর নির্দিষ্ট ব্যক্তির পাপের কারণে আযাব নাযিল করবেন না। কিন্তু যখন অন্যায় কাজ প্রকাশ্যে করা হবে অথচ কেউ সেটি বাধা দিবে না, তখনই তারা সবাই শাস্তি ভোগের উপযোগী হবে (আল্লাহর গযব নাযিল হবে)।[9]

(৫১) কল্যাণ এবং তাক্বওয়ার কাজে পরস্পর সহযোগিতা করা :

মহান আল্লাহ বলেন,  وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ- ‘তোমরা সৎকর্ম ও আল্লাহভীতির কাজে পরস্পরকে সাহায্য করো এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সাহায্য করো না। আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ কঠোর শাস্তি দানকারী’ (মায়িদাহ, ৫/২)। হাদীছে এসেছে,

عَنْ أَنَسٍ رضى الله عنه قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم انْصُرْ أَخَاكَ ظَالِمًا أَوْ مَظْلُومًا. فَقَالَ رَجُلٌ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَنْصُرُهُ إِذَا كَانَ مَظْلُومًا، أَفَرَأَيْتَ إِذَا كَانَ ظَالِمًا كَيْفَ أَنْصُرُهُ قَالَ تَحْجُزُهُ أَوْ تَمْنَعُهُ مِنَ الظُّلْمِ، فَإِنَّ ذَلِكَ نَصْرُهُ-

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘তোমার ভাইকে সাহায্য করো। সে যালিম হোক অথবা মাযলূম হোক। এক লোক বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! মাযলূম হলে তাকে সাহায্য করব তা তো বুঝলাম কিন্তু যালিম হলে তাকে কীভাবে সাহায্য করব? তিনি বললেন, তাকে অত্যাচার থেকে বিরত রাখবে। আর এটাই হলো তার সাহায্য’।[10]

(৫২) লজ্জাশীলতা :

হাদীছে এসেছে, আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, একদা আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) এক আনছারী ব্যক্তির পাশ দিয়ে পথ অতিক্রম করছিলেন। তিনি তাঁর ভাইকে তখন লজ্জা ত্যাগের জন্য নছীহত করছিলেন। আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) তাকে বললেন,  دَعْهُ فَإِنَّ الْحَيَاءَ مِنَ الإِيمَانِ ‘ওকে ছেড়ে দাও। কারণ লজ্জা ঈমানের অঙ্গ’।[11]  অন্য হাদীছে এসেছে, ইমরান ইবনু হুছাইন (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, الْحَيَاءُ لاَ يَأْتِى إِلاَّ بِخَيْرٍ ‘লজ্জাশীলতা কল্যাণ ছাড়া কোনো কিছুই নিয়ে আসে না’।[12]  অপর হাদীছে এসেছে,

عَنْ أَبِى سَعِيدٍ الْخُدْرِىِّ قَالَ كَانَ النَّبِىُّ صلى الله عليه وسلم أَشَدَّ حَيَاءً مِنَ الْعَذْرَاءِ فِى خِدْرِهَا، فَإِذَا رَأَى شَيْئًا يَكْرَهُهُ عَرَفْنَاهُ فِى وَجْهِهِ.

আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, ‘নবী (ছাঃ) গৃহবাসিনী পর্দানশীল কুমারীদের চেয়েও বেশি লজ্জাশীল ছিলেন’।….. যখন নবী করীম (ছাঃ) কোন কিছু অপসন্দ করতেন, তখন তা চেহারায় বুঝা যেত।[13]  অপর এক হাদীছে এসেছে, আবু মাসঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন,

إِنَّ مِمَّا أَدْرَكَ النَّاسُ مِنْ كَلاَمِ النُّبُوَّةِ إِذَا لَمْ تَسْتَحِى فَاصْنَعْ مَا شِئْتَ-

‘আম্বিয়ায়ে কেরামের উক্তিসমূহ যা মানবজাতি লাভ করেছে, তন্মধ্যে একটি হলো, যদি তোমার লজ্জা না থাকে, তাহলে তুমি যা ইচ্ছা তাই করো’।[14]

(চলবে)

 

[1]. বুখারী, হা/৭১৩৭; মুসলিম, হা/১৮৩৫; আহমাদ, হা/৭৬৫৬।

[2]. বুখারী, হা/৭১৪২; আহমাদ, হা/১২১২৬।

[3]. বুখারী, হা/৭১৪৩; মুসলিম, হা/১৮৪৯; আহমাদ, হা/২৪২৭।

[4]. মুসলিম, হা/৪৮৯৪; আহমাদ, হা/৭৯৪৪।

[5]. বুখারী, হা/৭৩; মুসলিম, হা/৮১৬; আহমাদ, হা/৩৬৫১।

[6]. ইমাম আলুসী, রূহুল মা‘আনী, ১/২১৪ (দারু ইহয়া আত-তুরাছ আল-আরাবী, বৈরূত লুবনান, ১ম সংস্করণ ১৪২০ হিঃ)।

[7].  মুসলিম, হা/১৮৬; আহমাদ, হা/১১৫১৪।

[8]. বুখারী, হা/৩৩৪৬; মুসলিম, হা/২৮৮০; আহমাদ, হা/২৭৪১৩।

[9]. মুখতাছার শু‘আবিল ঈমান, পৃঃ ৮৩।

[10].  বুখারী, হা/৬৯৫২; আহমাদ, হা/১১৪৯।

[11].  বুখারী, হা/২৪; মুসলিম, হা/৩৬; আহমাদ, হা/৫১৮৩।

[12]. বুখারী, হা/৬১১৭; মুসলিম, হা/১৬৫; আহমাদ, হা/১৯৮৩০।

[13]. বুখারী, হা/৬১০২; মুসলিম, হা/২৩২০; আহমাদ, হা/১১৬৮৩।

[14]. বুখারী, হা/৩৪৮৪; আহমাদ, হা/১৭০৯০।